Followers

আজকের 'রক্তকরবী'

'রক্তকরবী'
প্রযোজনা – থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক
নির্দেশক – জয়রাজ ভট্টাচার্য
অভিনয়ে – শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য, তথাগত চৌধুরী, বুদ্ধদেব দাস, ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ।
একাডেমি অফ ফাইন আর্টস || ২৪শে আগস্ট ২০২৬ || সন্ধে ৬:৩০
_______________

আর জি কর আন্দোলনের সময় রক্তকরবীর একটি সংলাপ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল নতুন করে আমাদের মধ্যে। "আমার অস্ত্র নেই, আমার অস্ত্র মৃত্যু।" রাজার বিরুদ্ধে নন্দিনীর রণহুঙ্কার। আমরা অনেকেই এই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছিলাম যেন তরুণী সেই চিকিৎসকের চিরতরে নীরব হয়ে যাওয়া কন্ঠে, যাঁকে কেন্দ্র করে এই রাজ্যে কয়েকমাসব্যাপী একটি গণ-অভ্যুত্থান গড়ে উঠেছিল।

সেই অভ্যুত্থানের সততা ও সাময়িকতা – উভয়কেই অতিক্রম করে রক্তকরবীর মতো টেক্সটের জন্য আরও বড় একটা ক্যানভাস রাখা থাকে সবসময়ই, যেখানে সে বিশ্বজনীন, এবং একবার নয়, বারবার প্রাসঙ্গিক।

জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত রক্তকরবী সেই বৃহত্তর ক্যানভাসের একটি প্রকাশ। যুগে যুগে যে হীনবুদ্ধি শাসক ও সমাজ ব্যক্তিকে পরিণত করে যন্ত্রে, নামপরিচয়কে ঢেকে দেয় কিছু সংখ্যা দিয়ে, জয়গান গায় বস্তু ও বিত্তের, রগরগে ক্ষমতার, তার দলিল হয়ে থাকে জয়রাজের রক্তকরবী। বিবেকানন্দ বলেন, স্বার্থপর হাজার হাজার মানুষ বাধা দিলেও সকল ধর্মের পতাকায় শেষ অবধি লেখা থাকবে – বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি। অথচ বাস্তবে ধর্ম যখন ভক্তি ও আনুগত্যের দোহাই দিয়ে মানুষকে ভীরু করে তোলে, তাকে আফিমাসক্ত করে ভুলিয়ে দেয় তার প্রার্থিত জীবনজিজ্ঞাসাগুলো, যে ধর্ম বিবাদ ও বিনাশের এক স্টেট-মেশিনারি হয়ে ওঠে, জয়রাজের রক্তকরবী সেই ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

গঠন বিষয়ক কয়েকটি কথা বলি। আজকের দিনের নাট্যকার ও নির্দেশকদের পক্ষে রবীন্দ্রনাট্য – তার ফর্ম, ভাষা, সংলাপ, দৃশ্যকল্প, সবকিছু সমেতই – খুব কঠিন ঠাঁই। আশীর্বাদ ও অভিশাপ, দুই হয়ে ওঠার সম্ভাবনাই তার মধ্যে আছে। রবীন্দ্র-টেক্সটের প্রতি অতি সাবধানী, শুদ্ধাচারী, অনুগত মনোভাব আজকের দিনে অপ্রাসঙ্গিক। আবার অন্যদিকে, 'পোস্টমডার্ন' ট্যাগলাভের সুপ্ত আকাঙ্খায় রবীন্দ্রনাথকে দুরমুশ করে জেলিফিশে পরিণত করাও অর্থহীন ও দৃষ্টিকটু। জয়রাজের নাট্যভাবনায় এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ পাওয়া গেছে। যে অংশগুলি তিনি সরাসরি রক্তকরবী নাটক থেকে তুলে এনেছেন, তার ভাষা ও সংলাপ নিয়ে বড় একটা পরীক্ষা নিরীক্ষার চেষ্টা করেন নি তিনি। 'শুনলেম', 'ছিলেম', 'দেখলেম না', প্রভৃতি রাবীন্দ্রিক ব্যবহার, বা এমনকি রবীন্দ্র-সংলাপের কবিত্বও অক্ষুণ্ন সেখানে। আবার যে অংশগুলি জয়রাজ নিজে গড়েছেন রক্তকরবী ন্যারেটিভের একরকম extension হিসেবে, নিজের স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা হিসেবে, সেখানে তিনি ভীরু রবীন্দ্রপূজারী হয়ে থাকেন নি। তাই খুব আজকের দিনের মতো খুব সাবলীলভাবেই নন্দিনী বা বিশু পাগলের সংলাপে ইংরাজি শব্দ ঢুকেছে, রবীন্দ্রগানের পাশাপাশি গীত হয়েছে বব ডিলানের গান। রবীন্দ্র-কুলীনরা এতে অস্বস্তিবোধ করতে পারেন, কিন্তু এই প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথ নিজের সুকর্মের জন্য হাততালি কুড়োতে আসেন নি। বরং জয়রাজের ব্যবহৃত এই correlative গুলো সমকালে রবীন্দ্রপাঠের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল বলেই মনে হয়। 

অভিনয়ক্ষেত্রের সীমানা ভেঙে দর্শকদের পিছন থেকে, দুই পাশ দিয়ে চরিত্রদের আসা যাওয়া, দর্শকদের অন্ধকারে না রেখে আলোয় রাখা – এসবই বহুপরিচিত বিকল্প নাট্যভাষ। কিন্তু তার সঠিক, সময়োচিত ব্যবহার কম দেখা যায়। বড় বড় নাট্যগুরুরাও 'বিকল্প থিয়েটার করছি' – এই আনন্দে ব্যবহার করেন এসব অস্ত্র। এই নাটকেও এ সবই ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু দর্শনগত জায়গা থেকে – তাই তাদের প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট করে বোঝা গেছে। দর্শক আমরা হয়ে উঠেছি যক্ষপুরীর অংশ। যখন আমাদের মুখে গায়ে এসে পড়েছে প্রোজেকশন, সেখানে দেখানো হয়েছে প্রোলেতারিয়েত-শোষণের ইতিহাস,আর তার উপর দিয়ে ছায়ামূর্তির মতো হেঁটে গেছে 'রাজার এঁটো'রা – আমাদের গায়ে লেগেছে সেইসব অপরাধের ছোঁয়া, আমরা হয়ে উঠেছি সেইসব ইতিহাসের সাক্ষী। সেই ঘটনাগুলো হয়তো রক্তকরবী টেক্সটে নেই, কিন্তু রক্তকরবীর চেতনায় আছে। এখানেই রবীন্দ্রনাথের চিত্রপট পেরিয়ে চিত্তপটে পৌঁছনোর কাজটি সার্থকভাবে সম্পন্ন করেন নির্দেশক – রক্তকরবী দেখলেও আমাদের মনে হয় যেন রক্তকরবীতেই থেমে নেই আমরা কেবল।

নাটকের শেষে রাজার শুভবুদ্ধির উদয় ও উত্তরণ দূরের স্বপ্ন আজ। তবু, মানুষের মন তো। দুঃসময়ে সামান্য আশ্বাসেই তা গলে; চোখ ভিজে যায়। নাটকের শেষে কলাকুশলী ও দর্শকদের সমবেত কণ্ঠে গীত হয় 'Internationale' – আজকের রাজনৈতিক পরিসরে যা অনন্য এক সংযোজন। শেষ দেড় দশক ধরে এই রাজ্যে বামপন্থী আন্দোলনকে লড়তে হয়েছে একরকম সিউডো-ফ্যাসিস্ট, সিউডো-ডেমোক্র্যাট শক্তির সঙ্গে। এবার ওইসব মুখোশ খুলে রেখে সশরীরে আবির্ভূত হয়েছে ফ্যাসিজম। এখন লড়াইটা আরও স্পষ্ট। 

নাটকের শেষে জয়রাজ ভট্টাচার্যও সে কথা বলেন – ফ্যাসিজম একটা কাজ সহজ করে দিয়েছে আমাদের – পক্ষ নেওয়ার কাজটা। তিনি বললেন, "পার্কস্ট্রিটে পথচারী শিশুর জন্য তার মা দুধ জ্বাল দেবেন কিনা, অলি পাবে গোমাংস পাওয়া যাবে কিনা – হয় আমি তার পক্ষে, অথবা বিপক্ষে।" এই কথাটি একটু কানে লাগে আমার। দুটি ঘটনা একই পঙক্তিতে বসার যোগ্য কিনা, মনে হয়। একটি প্রয়োজন, অন্যটি সাধ। দুটি ঘটনার কোনোটিতেই হস্তক্ষেপ করার কোনও অধিকার ফ্যাসিজমের নেই। আমি গোমাংস খাব কি খাব না, শনি মঙ্গলবার মন্দিরে যাব কি যাব না, জর্জ অরওয়েল পড়ব কি পড়ব না – এসব রাষ্ট্র আমার হয়ে ঠিক করে দেবে না। তবে এ কথাও মনে হয়, যে আমার শনি মঙ্গল পালন করার চাইতে, গোমাংস খাওয়ার চাইতে, বা অরওয়েল পড়ার চাইতেও, প্রায়োরিটি লিস্টে আশু প্রয়োজন ওই বাচ্চাটির জন্য গরম দুধ, হকারদের জন্য পুনর্বাসন, প্রান্তিকতার প্রতি আস্থা ও সম্মান। 

তবে শেষ অবধি জয়রাজের উপলব্ধিটুকু বুকে বেঁধেই ঘরে ফিরেছি কাল – "আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ আছেন। তাই, আমরা কোনোদিনই হারতে পারি না।" এখনও এ কথা লিখতে গিয়ে চোখ ভারী হয়ে আসছে। রবীন্দ্রনাথকে এভাবে আস্বাদ করার সুযোগ কমই আসে। রঙমেলান্তি পাঞ্জাবি আর শাড়িতে, খোঁপার ফুলে, আবেগমথিত থরথর কণ্ঠে, ট্রাফিক সিগন্যালে, 'লহ প্রণাম'-এ সেই রবীন্দ্রনাথ থাকেন না। তিনি থাকেন জলে জঙ্গলে, খনিতে মাঠে, স্কুলে কলেজে, এয়ার-কন্ডিশনড্ আপিসের শ্বাসরোধ করা ক্যুপে-কেবিনে; শরীরে-বুদ্ধিতে-চেতনায় শোষিত হতে থাকা অজস্র শ্রমিকের হৃদয়ে তিনি বাস করেন। আমাদের সেই অন্তর্গত জীবনের রবীন্দ্রনাথকে যাঁরা গতকাল প্রকাশ করলেন মঞ্চে – কেউ রাজা সেজে, কেউ নন্দিনী, কেউ বিশু, কেউ কিশোর, কেউ সর্দার, কেউ ফাগুলাল – তাঁদের সকলকে নমস্কার ও শ্রদ্ধা জানাই।

Comments