হরি ভাই
কালিম্পংয়ের থেকে বেশি দূর নয় ইচ্ছেগাঁও। হাতে গোনা কিছু বাড়িঘর সেই গ্রামে। প্রতিটি পরিবারই আত্মীয়তার সম্পর্কে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। তাদেরই একজনের বাড়িতে ছিলাম আমরা কদিনের জন্য। সে বাড়িতে থাকতে আসা অতিথিদের জন্য দিনরাত এক করে কাজ করেন হরি ভাই। কিছু মানুষ থাকেন, যারা রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও তাদের ছাড়া গৃহকোণ অচল হয়ে পড়ে। হরি ভাই তেমনই, সেই বাড়ির চালিকাশক্তি। তিনি ভিন গ্রাম থেকে আসা মানুষ, কাজ করেন কর্মচারীর পদে। কিন্তু অতিথিনিবাসটির প্রাণকেন্দ্র হরি ভাই; তিনি সে বাড়ির কেউ না হয়েও প্রায় সবকিছু।
পাহাড়ি গ্রামের নির্জনতায় খুব সামান্য কোনও শব্দ হলেও এক একসময় ঘুম ভেঙে যায়। তেমনই একদিন ঠুং ঠাং শব্দ পেয়ে কম্বলের আড়াল থেকে মুখ বার করে দেখি, ঘড়িতে সবে সাড়ে চারটে। কৌতূহলবশত জানলার পর্দা সরিয়ে দেখি, কলতলায় গত রাতের বাসন ধুচ্ছেন হরি ভাই। তাঁর প্রতিটি কাজ কী ভীষণ সন্তর্পণে! পাছে বেশি আওয়াজ হলে বাড়ির মালিক আর অতিথিদের বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটে।
বেলা একটু বাড়লে, সোনালী রঙের লিকার চা নিয়ে ঘরে আসেন হরি ভাই। চায়ের কাপের পাশে আলাদাভাবে চিনির বাটি রেখে যান, যদি আমাদের লাগে। খোঁজ নিয়ে যান, জলখাবারে কী খাব। বেলা বাড়ে, হরি ভাই কাজ করতে থাকেন ঘুরে ঘুরে। কখনও গাছে জল দেন, কখনও কুকুরদের খাওয়ান, কখনও পাহাড় ভেঙে নীচে যান জল আনতে, কখনও খড়-বিচালি নিয়ে যান গোয়ালে। ছোটখাটো চেহারার মানুষ হরি ভাই। কব্জি, কনুই, গোড়ালির গাঁটগুলো চওড়া, উঁচিয়ে আছে বাকি শরীর থেকে। ফোলা ফোলা, সরু চোখের পাশে বয়সের বলিরেখা। মাথায় সারাক্ষণ একটা টুপি। মুখে লেগে আছে ছোঁয়াচে এক হাসি।
পাহাড়ে মানুষে মানুষে যোগ অদ্ভুত, এবং কিছুটা আশ্চর্যেরও বটে – কারণ তা প্রাকৃত, স্বাভাবিক। আমি হোম স্টে চালিয়ে উপার্জন করি, তুমি সেই হোম স্টে-র কর্মচারী হয়ে উপার্জন করো – কিন্তু তুমি আমার 'ভৃত্য' নও। আমি তুমি দুটো মানুষ – খুঁজে নিয়েছি দুজনের মতো দুটো কাজ, যা পাকেচক্রে এক সুতোয় বাঁধা। পাহাড়ের পারস্পরিক সম্মান সমতলের শহর-গ্রাম বহুদিন হল ভুলে গেছে। চাকরি আর চাকরামিতে মত্ত তারা; কাছে টেনে নিতে জানে না।
সে বাড়িতে কথা হয় নেপালিতে, আমরা বুঝি না তেমন কিছুই। তবু কথার সুর শুনে বুঝি, হরি ভাই সে বাড়ির ছেলে বৌমার প্রবীণ জ্যেঠু; রক্তের যোগ না থেকেও সে বাড়ির মালিকের তিনি ভাই-ই। অথচ ভ্রমণপিপাসু বলে নিজের পরিচয় দেওয়া অসভ্য বাঙালি টুরিস্ট মধ্যবিত্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার মধ্যবয়সী উন্নাসিকতায় ডেকে ওঠে, "এয় হরি! গরম পানি হুয়া কে নেহি? ইতনা দের কাহে লাগতা?" ঝুপসি ছাউনির আড়াল থেকে হরি ভাই হাসিমুখটি বার করে বলেন, "বস আয়া, সাব।" পাকোড়া খেতে খেতে বিশ্রী সুরে আবার ডাক পড়ে হরি ভাইয়ের, "ইতনা ছোটা কটোরি মে কাহে পাকোড়া দিয়া? বড়া কুছ নেহি হ্যায়?" হরি ভাই বলেন, "পিলেট হোগা সাব।" উত্তর আসে, "তো লে আ না যাকে; ইয়ে ভি বোলনা পড়েগা?" হরি ভাই ছুটে ছুটে যান রান্নাঘরে, নিয়ে আসেন অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য সাধ্যমতো সব। পরদিন সকাল সকাল তারা বেরিয়ে পড়ার সময় আবার কুৎসিত ভাবে ডাকে হরি ভাইকে। গাড়ি অবধি অনেকটা পথ। হরি ভাই যেন তাদের গর্দভ, এমন করে একের পর এক মাল তারা তুলে দিতে থাকে তাঁর ঘাড়ে।
সেখানে, শেষ বিকেলে যখন চা খাচ্ছি, আমাদের জন্য জলের বোতল ভরে দিচ্ছেন হরি ভাই। বোতল গুলো আমাদের সামনে রেখে, খুব হেসে হেসে নেপালি-হিন্দি-বাংলা মেশানো এক আশ্চর্য আলাপের সুরে বললেন, "কাল আপলোগ চলে যাবেন, তো ফির শূন্য শূন্য লাগবে।" সন্ধের মুখে ভারী কুয়াশা ঠেলে হরি ভাই কয়েক ধাপ উঠে যান সেই বাড়ির ঠাকুরঘরে। আলো, দীপ জ্বেলে ধুপ দেখান। সে ধুপের গন্ধ ভেজা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে – সেইসব গন্ধে নির্জন হিমালয়কে অতীন্দ্রিয় এক দেবতা বলে মনে হয়। ঠাকুরঘরের দরজা টেনে, হরি ভাই এগিয়ে যান পরের কাজে। ছোট ছোট কাঁটা-জংলা তাঁর পাজামার গায়ে বিঁধে, তাঁকে যেন আঁকড়ে টেনে ধরে। তারা বড়ই ভালবাসে পাহাড়ের এই মানুষটিকে। গ্রামের কুকুর মুক্কু পিছু নিয়েছে হরি ভাইয়ের। মুক্কু, পাশের বাড়ির বেড়াল ডেইজি, একতলার জার্মান শেপার্ড রকি – এরা সবাই খুব ভালবাসে হরি ভাইকে। কারণ হরি ভাই এদের, এবং এদের মতো আরও অনেককে, গাছকে, পাখিকে, পাহাড়কে, মানুষকে ভালবাসেন। তাই, হরি ভাইকে যখন চলে যেতে দেখি কোথাও, মনে হয় সমস্ত অসূয়ার বিরুদ্ধে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ রেখে যাচ্ছেন প্রতিটি পদক্ষেপে। প্রেম। ভক্তি।
Comments
Post a Comment