নাটকঃ শেষ কথা
[নাটকটি যদি কেউ অভিনয় করতে চান, নির্দ্বিধায় করতে পারেন। অনুমতি নিষ্প্রয়োজন। -- লেখক ]
প্রথম দৃশ্য
(কলেজের
প্রিন্সিপালের ঘর। ঘরের ভিতর দুজন। প্রিন্সিপাল, আর অধ্যাপক মনোতোষ রায় বসে আছেন।
চিন্তিত মুখ। বাইরে থেকে স্লোগান, চিৎকারের চাপা আওয়াজ।)
প্রিন্সিপাল।।
দু ঘন্টা হয়ে গেল! আর কতক্ষণ? বেরোতে হবে তো। ওইদিকে নাহলে দেরী হয়ে যাবে।
রায়।।
আপনি ব্যাপারটা বুঝছেন না বলে এসব বলছেন।
প্রিন্সিপাল।।
স্টুডেন্টরা জমায়েত করে দাবি দাওয়া জানাচ্ছে। এতে বোঝার কী আছে, মনোতোষ? এমন করছো,
যেন নতুন এসব তোমার কাছে?
রায়।।
অলরেডি বার দশেক আপনাকে বলেছি, this is not like any other gherao! আপনি শুনলে তো!
প্রিন্সিপাল।।
আমি তো এটাই বুঝছি না ডোডোর এত ধৈর্য এল কবে থেকে! বেশির ভাগ ঘেরাওতেই তো আধ ঘণ্টা
পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর নিজেই দেখা করে মিটিয়ে নেয়। এত সিরিয়াসলি দু ঘন্টা ধরে পার্টি
করা কবে শুরু করলো? কাউকে দিয়ে ওকে ডেকে পাঠাও তো। কথা বলে সরাই এবার এদেরকে।
রায়।।
আরে সেটাই তো বলছি। এই ঘেরাওতে ডোডো নেই। এটা ওদের পার্টির নয়।
প্রিন্সিপাল।।
পার্টির নয়? ডোডো নেই? মানে?
রায়।।
আপনার so-called ভদ্র ছাত্রছাত্রীরা ভিড় করেছে বাইরে। তাদের দাবি নাকি আরও জেনুইন!
প্রিন্সিপাল।।
কী বলছো? কলেজের ভালো ছেলেমেয়েরা?
রায়।।
এ বছরের টপ স্কোরারকে মনে আছে? সোশ্যালের দিন যার হাতে পুরস্কার দিলেন?
প্রিন্সিপাল।।
ওই যে, ইতিহাসের মেয়েটি?
রায়।।
জুলজি। ছেলে।
প্রিন্সিপাল।।
ওহহো, সরি! সরি! How could I miss! অমলেন্দু!
রায়।।
আলম।
প্রিন্সিপাল।।
হুঁ।
রায়।।
আপনি বাইরে নিজের কলেজকে নিয়ে মুখ খোলেন না তো স্যার?
প্রিন্সিপাল।।
কোথায় আর সেই সুযোগ, মনোতোষ।
রায়।।
হ্যাঁ, বেশ হয়েছে। মুখ খুলবেনও না। প্রশংসাও করবেন না। প্লিজ। আপনি কিছুই বলতে
পারবেন না।
প্রিন্সিপাল।।
উফ! হয়েছে হয়েছে! প্রশংসা যদি আমিই করবো, তোমাকে আর এত বড় চেয়ারটায় রেখেছি কেন!
দ্যাখো, কথা এবং মিথ্যে কথা, দুটোই আমার চেয়ে ভালো বলো তুমি… যাক গে, তো কী করেছে
সেই ছেলে? কী বললে বেশ… আলম।
রায়।।
সে আজকে পালের গোদা!
প্রিন্সিপাল।।
মানে? বাইরে যারা ঝামেলা করছে, তাদের মধ্যে ও?
রায়।।
রোহিনীকে মনে আছে? তিয়াস? সব্যসাচী?
(প্রিন্সিপাল
এমনভাবে তাকান, এই নামগুলো তিনি প্রথম শুনছেন।)
রায়।।
ছাড়ুন, বুঝেছি। এরা সবাইই নানা ডিপার্টমেন্টের ভালো রেজাল্ট করা ছেলেমেয়ে। বিশেষত
রোহিনী আর সরোজ তো কালচারাল কম্পিটিশনেও বেশ ভালো করলো এবার।
প্রিন্সিপাল।।
তুমি কীভাবে এদের নামগুলো মনে রাখো মনোতোষ? আমি তো, মানে, কূলকিনারা…
রায়।।
এই trick গুলো তো একটু খেলতে হয় দাদা! নাহলে জমিটা ধরবেন কী করে? আপনি আসার আগে
যখন কলেজটা সামলাতে হয়েছিল আমায়, তখন এগুলোই শিখেছিলাম একটু একটু করে। এই
ছেলেমেয়েগুলো তেমন কিছু expect করে না, আপনি প্রিন্সিপাল হিসেবে ওদের কয়েকজনের নাম
মনে রাখতে পারলেই যথেষ্ট! ওদের সমস্ত হইচই কুঁইকুঁই করে গুটিয়ে যাবে। সব্বাই আপনার
বশ। … যেটা বলছিলাম, এরা সব্বাই আজকের এই ভিড়ে আছে দেখে এলাম।
প্রিন্সিপাল।।
কী বক্তব্য এদের?
রায়।।
(সিগারেট ধরিয়ে, সুখটান দিয়ে) আলবাল! বুলশিট! কলেজে রেগুলার ক্লাস না হওয়া নিয়ে!
কার ডিপার্টমেন্টে নাকি রেজিস্টার নেই! কোথায় ফার্স্ট এড বক্স নেই! আরে এগুলো যদি
সমস্যা হয় তো তোদের টিচাররা বলছে না কেন? তুই টিচারের চেয়ে বেশি বুঝিস?
প্রিন্সিপাল।।
বাবাঃ! আমার কলেজে পড়াশুনা নিয়ে বিদ্রোহ হচ্ছে? ফেমাস হয়ে গেলাম তো মনোতোষ!
রায়।।
সে তো হলো। কিন্তু কথা হচ্ছে, আপনি ঝামেলার সময়ে ডোডোকে ঘরে বসিয়ে মিষ্টি খাওয়ান,
আর এদেরকে মুখ অব্দি দেখান না – এই বার্তাটা গেলে কিন্তু চলবে না। একটা মধ্যস্থতা
দরকার। কিছু ঢপের প্রতিশ্রুতিই শোনান আবার। কিন্তু একবার মিট করা দরকার।
প্রিন্সিপাল।।
ভালো ছেলেমেয়েদের agitation তো! ওরা minority, in any case! আর এক ঘন্টা গেলে
এমনিই পাতলা হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে তো পড়া আছে গুড বয়, গুড গার্লদের।
রায়।।
আর পাতলা না হলে?
প্রিন্সিপাল।।
দ্যাখো মনোতোষ, সোজা কথা – আর ঘন্টা দেড় পর Xcellence এর সঙ্গে মিটিংটাই এখন আমার
মাথায় ঘুরছে। কপিউটার ল্যাবের প্রোপোজালটা দিয়ে ২০ লাখের ফান্ডিংটা যদি বাগাতে
পারি রে ভাই! তারপর ল্যাব can wait, ওটা দিয়ে কলেজ ইনস্পেকশনের আগে এই রুমটাকে
স্টেট-অফ-দ্য-আর্ট করে নেবো, তোমাদের cabinet গুলোয় এসির কাজটা হয়ে যাবে। আর ওই
BMC-র যে ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেটটা দিতে পারছি না ওদের টাকাটা শেয়ারে লাগানোয়,
ওটা চটজলদি produce করে দেবো!
রায়।।
কিন্তু Xcellence তোমার কাছ থেকে রিপোর্ট চাইবে না?
প্রিন্সিপাল।।
আরে বাবা, চাইলেও, সে তো infrastructual খরচাপাতির একটা হিসেব চাইবে। কম্পিউটার
ল্যাবের ছবি কি পাঠাতে বলবে?
রায়।।
আর তুমি যে প্ল্যান করছো এই টাকাটা BMC-তে লাগাবে, তাহলে এদের রিপোর্টটা দেবে
কীভাবে? অডিট তো করাতে হবে?
প্রিন্সিপাল।।
Why do you even care! পাঁচ বছরের span আছে! আমি আর আড়াই বছর, তুমি আর সাড়ে চার
বছর! কে থাকবো পাঁচ বছর পর? নতুন লোক আসবে, তাদের বুঝতে দাও না।
রায়।।
বুঝলুম। তাই এখন তুমি সেইসব স্বপ্নে এতই preoccupied যে এই গাড়লগুলোকে নিয়ে আর
মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করছে না।
প্রিন্সিপাল।।
হ্যাঁ মাইরি! আধবুড়ো ছেলেমেয়ে সব, এখন কলেজের পড়াশুনা নিয়ে আন্দোলন নামাচ্ছে!
Impractical fools! যা আছে সেই নিয়েই খুশি থাকো না বাবা। কিছু নেইয়ের চেয়ে তো
ভালো। গরীব দেশ, গরীব সরকার, গরীব কলেজ। (হাই তুলতে তুলতে)
রায়।।
গতকাল আবার রাজারহাটের ফ্ল্যাটে ৪২ কোটি উদ্ধার হয়েছে দেখেছেন?
প্রিন্সিপাল।।
কার?
রায়।।
কার আবার! আছেন ক জন আর পড়ে?
প্রিন্সিপাল।।
শিক্ষা?
রায়।।
ইয়েস স্যর! চ্যানেলে চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ! ৩০ কোটির গয়নাগাটি, আর করকরে পাঁচশোর
নোটে বারো কোটি ক্যাশ। টোটাল বেয়াল্লিশ কোটি।
প্রিন্সিপাল।।
১৪২ কোটির দেশে একজন না হয় ৪২ কোটি পেল! আমরা কৃপা পাই, তাহলেই হবে। এখন বলো, এই
বাইরে ঝামেলা করা পিসগুলোকে নিয়ে কী করা!
(এমন
সময়ে ঘরে ঢোকে সিদ্ধার্থ মিত্র, কলেজের আরেক অধ্যাপক। বয়সে উপস্থিত দুজনের চেয়ে
ছোট। ঢুকে একটি রেজিস্টার রেখে, অন্য আরেকটি রেজিস্টার তাক থেকে বার করে ক্লাসে
যেতে উদ্যত হয়। তারপর কী মনে করে, একটু দাঁড়িয়ে আগের রেজিস্টারে ঠিকঠাক attendance
পড়েছে কিনা, মিলিয়ে দেখার জন্য আবার হাতে তুলে নেয়। মনোতোষ রায় আর প্রিন্সিপাল একে
অন্যের সঙ্গে চোখাচুখি করে – অর্থ এই, যে ছাত্রছাত্রীদের face করার জন্য একজন
'বখরা'কে পাওয়া গেছে। একেই ঠেলে দেওয়া যাবে।)
রায়।।
(শুনিয়ে শুনিয়ে) এইরকম সব টিচার আছে আমাদের কলেজে, সিদ্ধার্থের মতো! তারপরেও নাকি
স্টুডেন্টদের ক্ষোভ।
(সিদ্ধার্থ
রেজিস্টারে মগ্ন।)
প্রিন্সিপাল।।
মনোতোষ, তোমাকে কারা এসব খবর দেয় যে কলেজে রেজিস্টার নেই? সিদ্ধার্থকে দ্যাখো,
একটা ক্লাস থেকে এসে রেজিস্টার রাখলো। অন্য ক্লাসে রেজিস্টার নিয়ে যাচ্ছে। এ থেকেই
বোঝা যায়, স্টুডেন্টদের অভিযোগ কী ভীষণ মিথ্যে!
রায়।।
ইন ফ্যাক্ট, আমার মনে হয় সিদ্ধার্থের মতো একজন টিচার যদি ওদের সামনে গিয়ে একবার
জোরের সঙ্গে বলে এইসব নকশা বন্ধ করতে, একদম চুপ মেরে যাবে ওরা। ওর সঙ্গে
স্টুডেন্টদের বেশ ভালো খাতির, এবং ওর কথা ওরা ফেলতে পারবে না।
প্রিন্সিপাল।।
সিদ্ধার্থ, শুনছো!
(সিদ্ধার্থ
মুখ তুলে তাকায়।)
রায়।।
দেখছো তো ভাই, বাইরে কী জঘন্য অবস্থা করে রেখেছে!
সিদ্ধার্থ।।
হুঁ, ওখান দিয়েই তো এলাম।
প্রিন্সিপাল।।
কী বলছে গো বোকাগুলো?
সিদ্ধার্থ।।
ওদের কিছু বক্তব্য আছে, পড়াশুনা নিয়েই। অনেকদিন ধরে বলে বলে কিছু জিনিস পাচ্ছে না।
তাই…
প্রিন্সিপাল।।
একটা কাজ করো সিদ্ধার্থ। তুমি জাস্ট একবার বাইরে গিয়ে ওদের এই গ্রূপটাকে বলে এসো
তো, এইসব গিমিক দিয়ে কলেজের ইমেজ নষ্ট করা ছাড়া আর better কিছু করছে না ওরা! এসব
বন্ধ করে বাড়ি যাক। না পোষালে কলেজে আসার দরকার নেই।
(সিদ্ধার্থ
চুপ করে তাকিয়ে থাকে।)
রায়।।
কী ভাবছো? আরে, we trust you! কনফিডেন্ট থাকো, সিদ্ধার্থ! তুমি তো বেশ কিছু বছর
আছো এখানে। You are a senior teacher now, আর এখন তো আস্তে আস্তে তোমাদের মতো
লোকেদের কলেজের এইসব প্রশাসনিক কাজে আসতে হবে। প্রিন্সিপাল স্যর তোমায় ভরসা করেন
বলেই বলছেন। আরে, তুমি পারবে!
সিদ্ধার্থ।।
'প্রশাসনিক কাজ' কোনটা?
রায়।।
আরে, কলেজটা তো আমরা সবাই মিলেই চালাবো, নাকি? এরা নাকি এসব ছোটখাটো কারণের জন্য
প্রিন্সিপালকে ব্যতিব্যস্ত করবে। কোনও মানে আছে? On his behalf, তুমি গিয়ে জাস্ট
দাবড়ে এসো তো।
সিদ্ধার্থ।।
আমি যেটুকু জানি, ওদের concern গুলো পুরোপুরিই academic। আর সেগুলো resolve করার
প্রয়োজন হলে যে প্রশাসনিক engagement দরকার, সেটা তো প্রিন্সিপালের তরফ থেকেই
যাওয়া ভালো। I mean, in person.
রায়।।
প্রিন্সিপাল স্যর একটা মিটিং নিয়ে খুব ব্যস্ত। তুমিই যাও বরং।
সিদ্ধার্থ।।
আপনি?
রায়।।
(হেসে উঠে) এই তুমি ভয় পাচ্ছ নাকি? স্যর দেখুন, সিদ্ধার্থ কিন্তু ভয় পাচ্ছে! আপনার
কলিগরাই আপনাকে ডিফেন্ড করতে ঘাবড়ে আছে! (সিদ্ধার্থকে) আরে কিচ্ছু হবে না, যাও না!
আমি তো এতদিন সামলেই দিলাম সব। এবার তোমরা এগিয়ে এসো। Be bold and brave! দেখবে,
একবার confront করলে তোমার ইমেজই আলাদা হয়ে যাবে কলেজে ওদের কাছে। further এগোনোর
আগে তোমার কথা ভেবে গুটিয়ে থাকবে। ভয় কীসের?
সিদ্ধার্থ।।
ভয় থেকে তো বলছি না।
প্রিন্সিপাল।।
তাহলে? তোমার ক্লাসের দেরী হয়ে যাবে? সে তো এখন যে delay করছো যেতে, তাতেই তো …
সিদ্ধার্থ।।
যেতে চাইছি না, কারণ … কারণ আমার মনে হয় ওদের দাবি পুরোপুরি অন্যায্য নয়।
প্রিন্সিপাল।।
তুমি নিজে রেজিস্টার হাতে ধরে বলছো রেজিস্টারে সমস্যা সত্যি?
সিদ্ধার্থ।।
আমার রেজিস্টার ধরে থাকা না থাকাটা কথা নয় স্যর। যে সমস্যাগুলোর কথা বলতে ওরা জড়ো
হয়েছে বাইরে, প্রতিটাই কমবেশি এই কলেজে আছে। আজ আমি রেজিস্টার নিচ্ছি মানে কি সব
ডিপার্টমেন্ট নিচ্ছে? আপনি খোঁজ নিয়েছেন?
প্রিন্সিপাল।।
কে নিচ্ছে না?
সিদ্ধার্থ।।
বাংলা ডিপার্টমেন্টে চারশোর কাছাকাছি স্টুডেন্ট। তাদের কোনও রেজিস্টার নেই। দিনের
পর দিন যেমন ইচ্ছে তেমন attendance পড়ে। যারা আসে না, তারা পেয়ে যায়। আর যারা আসে,
তাদের মনে হতে থাকে attendance পাওয়া যদি এতই সোজা হয়, আমরাই বা আর আসবো কেন!
প্রিন্সিপাল।।
কী আশ্চর্য! আজ অব্দি আমাকে কেউ ইনফর্ম করলো না, বাংলা ডিপার্টমেন্টে এই অরাজকতা!
সিদ্ধার্থ।।
কেন স্যর! কে ইনফর্ম করবে? চারশো জনের রোল কল করার দায় কে নিতে চাইবে, যদি না আপনি
সেটাকে কর্তব্য হিসেবে বাধ্যতামূলক করেন? কে গলায় পড়ে আপনাকে বলবে যে রেজিস্টার
নেই, আমি রোল কল করতে চাই? আমাদের শিক্ষকদের সেই সততা নেই, যতটা বাইরে দাঁড়ানো ওই
কটা ছেলেমেয়ের আছে। Let us respect that! ওরা নিয়মিত আসে, আসতে চায় বলেই এসেছে এই
বঞ্চনার কথাটা বলতে।
রায়।।
ঠিক, ঠিক। সে ব্যাপারটা দেখা হবে কলেজ থেকে, এটা বলে দিও কথা বলার সময়। এখন যাও,
সামলে নাও চট করে।
সিদ্ধার্থ।।
আর ল্যাবের যে reagent গুলো? সেগুলো নিয়ে কী জবাব দেবো স্যর?
প্রিন্সিপাল।।
সেগুলোর কী?
সিদ্ধার্থ।।
আপনি জানেন, বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের বেশিরভাগ ফাইনাল সেমিস্টারের? ওদের আর
তিন সপ্তাহ পর পরীক্ষা, অথচ আজও ৮০% ল্যাব-ওয়ার্ক হয়নি!
প্রিন্সিপাল।।
(চশমা খুলে মুছতে মুছতে) সে কী, কেন?
সিদ্ধার্থ।।
সেই! 'কেন'! আপনি ব্যস্ত মানুষ, আপনার হয়তো মনে নেই, ঠিক পাঁচ মাস আগে, এই
সেমিস্টার শুরু হওয়ারও আগে, সায়েন্স ডিপার্টমেন্টগুলো থেকে আমরা আপনাকে
requisition দিয়েছিলাম, ল্যাবগুলোয় কী কী reagent লাগবে, তার জন্য ভেন্ডারকে
যোগাযোগ করার রিকুয়েস্ট জানিয়ে। তারপর দেড় মাসের মাথায়, তারপর আবার তিনমাসের মাথায়
আপনাকে remind করি। এখন অফিস থেকে বলছে, কোটেশন চাওয়া হয়েছে সবে ভেন্ডারদের থেকে।
এটাই তাহলে আমি স্টুডেন্টদের বলবো তো?
প্রিন্সপাল।।
কেন? তোমাদের তো বাইরের কত কলেজে চেনা! সেখান থেকে একটু reagent জোগাড় করে এই
সেমিস্টারটা চালিয়ে দিতে পারলে না? পরের সেমে না হয়…
সিদ্ধার্থ।।
ভিখারির মতো পাঁচ ছটা কলেজের ল্যাবে ঘুরে বেড়াতে আমাদের ভালো লাগে না স্যার। আমার
অন্তত ভালো লাগে না। ওটা আমার কাজ নয়। আমার কাজ স্টুডেন্টদের পড়ানো। আর আপনার কাজ
সেই পরিবেশটা রাখা। যদি বাইরের কলেজেই ভিক্ষা করবো, এই কলেজে চাকরি করছি কেন?
রায়।।
সিদ্ধার্থ, calm down … তোমাকে ওদের শান্ত করতে বলা হয়েছে। ওদের হয়ে বিপ্লব করতে
নয়।
সিদ্ধার্থ।।
জানেন, বাইরে ওদের মধ্যে জেনারেল কোর্সের আলতাফ আর সোহিনীও আছে? যে জেনারেল
কোর্সের ক্লাস আপনার কলেজ রুটিনে রাখতে ভুলে যায়। ওদের মধ্যে যারা ক্লাস করতে আসে,
এসে দেখে যে ওদের বসার জন্য একটা ক্লাসরুমও নেই। How would you justify this, sir?
প্রিন্সিপাল।।
Stay within your limits.
সিদ্ধার্থ।।
Certainly I will. ছাত্রছাত্রীদেরকে যখন আপনারা এভাবে বুঝিয়ে দেন তাদের লিমিট
কতটা, আমার লিমিট তো কোন ছার! জেনারেল কোর্স তো সবসময়ই আপনার কাছে একটা appendix,
না স্যর? অনার্স চললেই হলো। তাও এইভাবে। অথচ, আপনার কলেজের এডমিশনের মুনাফাটা হয়
কিন্তু ওই জেনারেল কোর্সের ছেলেমেয়েগুলোর টাকা থেকেই। তাই না? এটাও কি মনে করিয়ে
দেবো আমরা?
রায়।।
(প্রচণ্ড শীতলভাবে, কেটে কেটে) বুঝেশুনে কথা বলো সিদ্ধার্থ।
সিদ্ধার্থ।।
(শুকনো হেসে) কেন, 'প্রশাসনে' ঢুকবো না?
রায়।।
যতটা করতে বলা হয়েছে, করবে। এক্তিয়ারের বাইরে যাবে না।
সিদ্ধার্থ।।
তাহলে আমার কী করণীয়, মিলর্ড?
প্রিন্সিপাল।।
বাইরে যাও। সিচুয়েশনটা সামলাও।
(সিদ্ধার্থ
এগোয় দরজার দিকে।)
রায়।।
কী বলবে গিয়ে?
সিদ্ধার্থ।।
এই যে, তোমাদের সমস্যা যতগুলো তার চেয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের শিরদাঁড়ায় হাড়ের
সংখ্যা একটু কম পড়ে যাচ্ছে। কয়েকটা সমস্যা কমিয়ে নিয়ে এসো।
প্রিন্সিপাল।।
(চিৎকার করে) I will place this on GB meeting, সিদ্ধার্থ মিত্র! তোমার মতো সব
শিক্ষকদের ছাত্রদরদ ঘুচিয়ে দেবো!
(সিদ্ধার্থ
হাসতে থাকে। একটু পর, সামলে নিয়ে –)
সিদ্ধার্থ।।
এই যে, পনেরো মিনিটে আপনারা কেমন অন্য পার্টিতে গিয়ে নাম লেখালেন – এইটাই দিনশেষের
প্রাপ্তি, জানেন তো! কিছুক্ষণ আগে "আহা সিদ্ধার্থের মতো টিচার", আর এখন
"উহু সিদ্ধার্থের মতো টিচার"!
রায়।।
একটা জিনিস সরাসরি বলো তো সিদ্ধার্থ – তুমিই কি ওদের এই আন্দোলনটা mastermind
করছো? ওদের সমস্যার বিষয়ে তোমার যা জ্ঞান দেখছি টনটনে…
সিদ্ধার্থ।।
আমার সবচেয়ে আনন্দের জায়গা কোনটা জানেন? ওরা আন্দোলনে যে সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে
এসেছে, সেটার জন্য আমাকে বা কাউকেই mastermind করতে হয়নি। বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন
ছেলেমেয়ে হিসেবে ওরাই বুঝেছে। I am glad that they have come up with this. আমরা
যারা রোজ কলেজে আসছি, কাজ করছি, আমরা চোখের সামনে দেখছি কী হচ্ছে। আপনি ব্যস্ততার
চোটে তাকানোর সময় পান না, সে অন্য প্রসঙ্গ! তাকালে দেখতেন, আপনার কলেজে আটটা water
purifier এর মধ্যে পাঁচটা খারাপ শেষ তিন মাস। এতগুলো বাথরুমের মধ্যে দুটো জেন্টস
আর একটা লেডিজ টয়লেট functioning অবস্থায় আছে ছেলেমেয়েদের জন্য। দেখতে পেতেন যে গত
শীত থেকে ক্যান্টিন বন্ধ। ছেলেমেয়েদের যে সারাদিন ক্লাস করতে বলবো, সে কোন মুখে?
ক্যান্টিনে খাবারের একটা ব্যবস্থা থাকবে না ছাত্র বা শিক্ষকদের জন্য?
প্রিন্সিপাল।।
কোনও কলেজে এডমিশনের সময়ে, বা তোমাদের চাকরি দেওয়ার সময়ে লেখা থাকে না যে খেতে
পাওয়া যাবে।
রায়।।
আবেগে চলছো তুমি, সিদ্ধার্থ। আমরা কি তাহলে এখন সবকিছু ছেড়ে রান্না করতে বসবো
কলেজে এসে, ক্যান্টিন নেই বলে?
সিদ্ধার্থ।।
সেটা সম্পূর্ণ আপনাদের ব্যাপার। কলেজ থেকে টাকা নেওয়া হয় basic facilities দেওয়া
হবে বলে। তার মধ্যে কি পানীয় জল পড়ে না? পরিচ্ছন্ন বাথরুম পড়ে না? Subsidised
rate-এ ক্যান্টিনের খাবার পড়ে না?
প্রিন্সিপাল।।
Enough!
সিদ্ধার্থ।।
Yes, enough! I am glad that they are bringing up these issues!
রায়।।
এই মুহূর্তে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে তুমি ক্ষমা চাও, unconditionally!
সিদ্ধার্থ।।
ক্ষমা? সে চাইতে হলে আপনারা চান, ওই বাইরে গিয়ে। যা কিছু দিতে পারেন নি, তার জন্য।
এবং সেগুলো এবার দিন। তবে প্রায়শ্চিত্ত হবে।
প্রিন্সিপাল।।
রেনেগেড!
সিদ্ধার্থ।।
মনে রাখবেন স্যর, এরা কিন্তু রোজকার পার্টি করা ছেলে নয়। এরা চাঁদা চাইতে, বা
মিষ্টি খেতে আসেনি। আপনার পা ধরতে আসেনি, যে ক্লাস করিনি, তাও পরীক্ষায় বসিয়ে দিন।
পারলে পাশটাও করিয়ে দিন। এরা পড়াশুনা করবে বলে এসেছে। Treat them differently.
প্রিন্সিপাল।।
তুমি এখন আসতে পারো সিদ্ধার্থ। তোমার আজকের আচরণ GB মিটিংয়ে place করা হবে।
ইন্টার্নাল কমপ্লেন কমিটির সামনে তোমায় বসতে হবে।
রায়।।
As a respected member of the GB, I promise – তোমার এই ঔদ্ধত্যের শেষ দেখে আমি
ছাড়বো!
সিদ্ধার্থ।।
(হেসে, রেজিস্টার হাতে এগোতে এগোতে) অবশ্যই। না দেখে একদম ছাড়বেন না। তবে কী জানেন
তো – যা কিছু হয়ে যাক, (দরজার বাইরে যারা দাঁড়িয়ে, সেদিকে ইঙ্গিত করে বলে) I am
with them! (এবার দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যেতে, আরও একটু গলা তুলে বলে) I am always
with them – my students!
দ্বিতীয় দৃশ্য
(মেট্রো
স্টেশনে অপেক্ষারত সিদ্ধার্থ মিত্র। প্ল্যাটফর্মের সিটে বসে আছে সে কিছুক্ষণ।
দৃশ্যতই সে কিছুটা অস্থির। ঘড়ি দেখলো, তারপর একটা ফোন করলো।)
সিদ্ধার্থ।।
হ্যালো … হ্যাঁ, ফিরতে একটু সময় লাগবে। … না না, স্টেশনেই। লাইনে একটা accident
হওয়ায় ট্রেন আসতে দেরী হবে। … আরে না, আমার accident না, উফ! … একটা কিছু বললেও এত
সমস্যা! আমি ঠিক আছি… রাখছি।
(সে
ফোন রাখে। পাশের সিটে এক ভদ্রলোক এসে বসে। মধ্যবয়স্ক। চেহারায় উচ্চ-মধ্যবিত্তির
ছাপ। দেখেই মনে হয়, কথা বলার জন্য উশখুশ করছেন।)
ভদ্রলোক।।
(ইঙ্গিতে ট্রেন বুঝিয়ে) কী হলো, দাদা? লাইনে accident?
সিদ্ধার্থ।।
হুঁ? হুঁ।
ভদ্র।।
সুইসাইড, নাকি?
সিদ্ধার্থ।।
শুনলাম সেরকমই।
ভদ্র।।
মরে গেছে? একদম পুরোপুরি?
(সিদ্ধার্থ
অবাক হয়ে তাকায়।)
ভদ্র।।
শুনলেন নাকি কিছু?
সিদ্ধার্থ।।
না।
ভদ্র।।
অ।
(এদিক
ওদিক তাকান। কাঁধের ঝোলা থেকে খবরের কাগজ বার করে বসেন। পড়েন। কিন্তু খবরে মন নেই।
চোখ বারবার উঠছে, আশপাশে লোকের চলাফেরা দেখছেন। সিদ্ধার্থকে আড়চোখে দেখছেন।)
ভদ্র।।
ট্রেন accident এ বডিটা একদম দলা পাকিয়ে, তাল পাকিয়ে যায়। চেনাই যায় না। দেখেছিলাম
তো একবার এরকম সুইসাইড কেস, মেচেদায়। ওই সিঙাড়া পাওয়া যায় যেখানে।
সিদ্ধার্থ।।
বুঝেছি।
ভদ্র।।
হেবি ব্যাপার পুরো।
সিদ্ধার্থ।।
Accident!?
ভদ্র।।
সিঙাড়া। উপরে হালকা করে চাট মশলা ছড়িয়ে দেয়।
(সিদ্ধার্থ
মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। একটু পর –)
ভদ্র।।
স্টুডেন্ট-ফুডেন্ট, নাকি, বলুন তো?
সিদ্ধার্থ।।
কে?
ভদ্র।।
আরে যে দলা পাকালো!
সিদ্ধার্থ।।
কী করে বলবো, বলুন! আমি তো দেখিনি! আপনি পুলিশের সঙ্গে গিয়ে কথা বলুন না, ওই তো
দাঁড়িয়ে আছে।
ভদ্র।।
না না, নাথিং সিরিয়াস। আরে এই মেট্রোয় সুইসাইড করা বোগাস। নিজেও গেল, বাকিদেরও
দেরী। এইসব মোটাবুদ্ধি ওই ছাত্রছাত্রীগুলোরই হয়।
সিদ্ধার্থ।।
(একটু থমকে) কেন?
ভদ্র।।
কী আর! পড়াশুনা নেই তো! (কান চুলকোতে চুলকোতে) এখন তো ঢুকলেই পাশ! ঢুকলেই পাশ!
ইস্কুল বলুন, কলেজ বলুন। নম্বর নিয়ে বসে আছে কাঁঠালি কলার মতো।
সিদ্ধার্থ।।
তাই? আর?
ভদ্র।।
আরে পড়তো আমাদের সময়ে! পড়ার চাপের ঠেলায় সুইসাইড বেরিয়ে যেত! কী চাপ, কী চাপ বাবা!
উঃ! মাথা তোলার সময় নেই দাদা। আর সেরকম স্ট্রিক্ট খাতা দেখা। এখন তো পাইয়ে দেওয়ার
আমল।
সিদ্ধার্থ।।
তার সঙ্গে সুইসাইডের কী যোগ?
ভদ্র।।
এদের জীবনে হার্ডশিপ কোথায় বলুন তো? ইচ এন্ড এভরিথিং, একে ধরো, তাকে ধরো, ধরে পেয়ে
যাও। মানুষ হওয়ার পথ স্ট্রাগলে ভরা। এদের তো সেটা নেই। ফলে জীবনটা উচ্ছন্নে দিয়ে
দিচ্ছে। ভিডিও গেম, নেশা … আর তারপর একটু ধাক্কা খেলেই মেট্রো রেলের তলা তো রইলোই।
সিদ্ধার্থ।।
(বিরক্তি ও বিস্ময় মিশিয়ে) কিছু মনে করবেন না, আপনার কথা শুনতে এত ইন্টারেস্টিং
লাগছে! এই কনক্লুশনগুলো কীভাবে পেলেন আপনি?
ভদ্র।।
পাওয়ার কী আছে দাদা! আপনি এই লাইনের খবর একটু রাখলেই বুঝতেন! অবক্ষয় ধরেছে সমাজে।
আর শিক্ষা হলো নাটের গুরু! খবরের দিকে তাকান, দিনে ৩৫-৪০টা করে ছেলেমেয়ে গলায় দড়ি
দিচ্ছে, শিরা কাটছে, চাকার তলায় যাচ্ছে! রাবিশ! লড়তে শেখে নি।
সিদ্ধার্থ।।
আপনি যে সহজে পেয়ে যাওয়ার কথা বলছেন, অস্বীকার করছি না। একটা অংশ সেই সুবিধা
নিচ্ছে, লড়াইয়ের মানসিকতা কমছে তাদের। ঠিক, সব ঠিক। কিন্তু সবার উপর দিয়ে এই কথাটা
চালিয়ে দেওয়া কি উচিৎ? শিক্ষার ক্ষেত্রে স্টুডেন্টদের ফেস করা সিরিয়াস সমস্যা নেই
বলছেন? আমি পড়াই। আপনি কিসে চাকরি করেন?
ভদ্র।।
বাবাঃ! এ তো পর্বত খোদ মহম্মদের কাছে এসে হাজির। না দাদা, আমি পড়াই না। ব্যাঙ্কের
ম্যানেজার আমি। কিন্তু খোঁজখবর রাখি চারদিকের।
সিদ্ধার্থ।।
রাখলে, এটুকু কেন আপনার চোখে পড়ে না যে ছাত্রছাত্রী মাত্রেই আপনার দেখানো ওরকম
shallow, অর্থহীন জীবন বেঁচে থাকে না। তারাও জীবনে অর্থ নিয়ে বাঁচতে চায় দাদা।
সবাই না হলেও, অনেকেই চায়। তারা যা চায়, তার bare minimum টুকুও কি তাদের দেওয়া
হচ্ছে?
ভদ্র।।
আপনি minority-র কথা বলছেন স্যার। তারা কজন? ১০, ২০, ৫০, ১০০, ৫০০? শুমারি বলছে,
দিনে ৩৫টা ছেলেমেয়ে মরার পথ বেছে নিচ্ছে। তার সামনে ওই খেটে খেতে চাওয়া minority
কজন?
সিদ্ধার্থ।।
আর আপনারই বা কী করে ধারণা হচ্ছে, যারা মরছে, সব্বাই নিজের জীবনের অর্থ না বুঝে,
খেলো খেলো ভাবে মরে যাচ্ছে? আপনার ভাষায় ওই 'খেটে খেতে চাওয়া' ছেলেমেয়েরাও মরছে।
যেমন পৃথিবীর আরও হাজারটা মানুষ মরছে। ভালো খারাপ, ঠিক ভুল, ছাত্র শিক্ষক। সবাই
শুধু সব পেয়েছির দেশে ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাচ্ছে না। অনেকে ন্যায্য দাবি করেও
পাচ্ছে না। আমি একবারও বলছি না, তাদের সুইসাইড করাটা খুব ন্যায্য বা জাস্টিফায়েড,
কিন্তু সুইসাইডাল মানুষদের নিয়ে আপনি যে মনোভাবটা দেখাচ্ছেন, সেটা তারা ডিজার্ভ
করেন না কিন্তু।
ভদ্র।।
আপনার ওই মডেল মাইনরিটিও কি বসে আছে নাকি? আজকাল তো ট্রেন্ড হয়েছে, কিছু না পেলে
শিক্ষকদের পিটিয়ে দাও। দিচ্ছে তো পিটিয়ে। থ্রেট করছে। অভব্যতা করছে।
সিদ্ধার্থ।।
আপনি যে ব্যবহারটার কথা বলছেন, ওটা আমার 'মাইনরিটি' করে না, আপনার 'মেজরিটি' করে।
খারাপ এটাই লাগে, যে আপনারা প্রায় কিছু না জেনে শিক্ষাব্যবস্থার ভিতরে কী হচ্ছে,
সে নিয়ে রায় দিতে শুরু করেন। এতে কী হয়, জানেন তো? সত্যিকারের সমস্যাগুলো
recognised হয় না। 'অকারণে সুইসাইড করে' বলে যাদের চরিত্রহীন প্রমাণ করতে আপনি
ব্যস্ত, শিক্ষক পেটায় বলে যাদের একটা ব্র্যাকেটে ফেলে দিতে পারলে আপনি বেঁচে যান,
তাদের বাইরেও একটা পৃথিবী আছে, দাদা। একটু দেখুন ভালো করে তাকিয়ে।
ভদ্র।।
তাদের থাকা না থাকাটা negligible!
সিদ্ধার্থ।।
আমরা negligible ভাবি বলে। না ভাবলে, কিছুই negligible নয়। প্রতিটা স্কুল কলেজ
থেকে যদি দশটা করে এমন ছেলেমেয়ে নিই, যারা পড়তে চাইছে কিন্তু নানা কারণে পারছে না
– যে কারণগুলোর জন্য তারা দায়ী নয় কোনোভাবেই, সেই সংখ্যাটা negligible? আপনার
ধারণায় যারা 'শখের সুইসাইড' করে, তাদের মধ্যে তো বটেই, এমনকি তাদের বাইরেও অসংখ্য
এমন ছেলেমেয়ে আছে যারা প্রাণান্তকর অপমান, অপ্রাপ্তি, লাঞ্ছনা সহ্য করে এখনও আছে।
টিকে আছে। বেঁচে আছে। মরে যাওয়া তাদের পক্ষে হয়তো সত্যিই সহজ হতো, ঠিকই বলেছেন
আপনি। কিন্তু তারা মরে নি। একটা নতুন পৃথিবী দেখবে বলে, বাঁচবে বলে আছে এখনও।
ভদ্র।।
আছে না ঘন্টা! এখন নতুন পৃথিবীর সংজ্ঞা হলো চাকরির জন্য ভিক্ষে করা, টাকা মারা।
এলিট, সব পাওয়া প্রিভিলেজ বাচ্চাকাচ্চা বাদে সবকটা এই কটা দিন গেলেই হাত পাতবে।
এদের চেনা হয়ে গেছে।
সিদ্ধার্থ।।
কী হলে আপনি খুশি হতেন?
ভদ্র।।
টেনাসিটি দেখলে। জীবনে একটা purpose আছে, এটা খুঁজে পেতে দেখলে। আমরা কি বাঁচিনি
নাকি? আমাদের সময়ের আদর্শ আঁকড়ে ঠিক থেকে গেছি। অসুবিধে ছিল না আমাদের? হাত
পাতিনি, হাল ছেড়ে লাইনে গলাও দিই নি।
সিদ্ধার্থ।।
কত বছর হলো আপনি এই চাকরিতে?
ভদ্র।।
অলমোস্ট ১৭ বছর। গ্র্যাজুয়ালি, ধাপে ধাপে আজকের এই জায়গায় এসেছি।
সিদ্ধার্থ।।
বাহ। ক্রমবিবর্তন। এখন আপনার রোজকার রুটিনটা কেমন?
ভদ্র।।
শার্প সাতটায় উঠি। আধ ঘন্টা ট্রেডমিল। তারপর স্নান খাওয়া সেরে ব্যাঙ্ক। যেতে
ঘন্টাখানেক সময় লাগে। সারাদিনের ঝক্কি তো বুঝতে পারছেন। তারপর এই ছটার দিকে কাজ
গুছিয়ে বেরিয়ে বাড়ি, বা এক একদিন পাড়ার কমিউনিটি হলে। ঘরে এসে ছেলের পড়ায় একটু নাক
গলানোর বৃথা চেষ্টা, হে হে। খবরের চ্যানেলগুলো সার্ফ করি অল্পবিস্তর। তারপর খেয়ে
দেয়ে, অফ।
সিদ্ধার্থ।।
একদম এটাই ফিক্সড?
ভদ্র।।
ফিক্সড, মোর অর লেস।
সিদ্ধার্থ।।
ব্যাঙ্কে লিঙ্ক ফেলিওর হয় না?
ভদ্র।।
হা হা হা হা হা! মোক্ষম জায়গায় আঘাত করেছেন!
সিদ্ধার্থ।।
মজা করলাম না কিন্তু। সত্যিই জিজ্ঞেস করলাম। যাক গে, উত্তর পেয়ে গেছি। লোকজন না
বুঝে তাদের বেশি লোন দেওয়ার চাপ দেয় না?
ভদ্র।।
উফ আর বলবেন না!
সিদ্ধার্থ।।
লাঞ্চের ঠিক আগ দিয়ে দুজন কলিগ একটু ব্রেক নিতে বেরিয়ে যায় না?
ভদ্র।।
আপনি কি আগে ব্যাঙ্কে ছিলেন নাকি?
সিদ্ধার্থ।।
যখন গোছাচ্ছেন বেরোবেন বলে, ম্যানেজিং ডিরেক্টরের ফোন আসে না হঠাৎ – হেভিওয়েট
ক্লায়েন্টের আপীল, আজ কাজটা সেরে দিতেই হবে, যত দেরী হোক?
ভদ্র।।
হে হে। হুম।
সিদ্ধার্থ।।
বাড়ি ফিরে এক একদিন স্ত্রীর, ছেলের মুখ দেখে মনে হয় না, ওঁদের নিয়ে একটা জীবন
কাটানোর কথা আপনি এককালে ভাবতেন বেশ?
(ম্যানেজারের
মুখের হাসি কমছে।)
সিদ্ধার্থ।।
ছেলের পড়াশুনায় নাক গলালে বিরক্ত হয় ও, না? … হবেই তো। কারণ ওই আচমকা পাঁচ মিনিট
সময়টুকু ছাড়া আপনি ওর পড়াশুনার সঙ্গে কানেক্টেড নন। আপনার নিজস্ব পড়াশুনার ধারণা
ওর উপর চাপিয়ে দিতে চান পাঁচ মিনিটে। ও বুঝতে পারে না। ক্ষেপে ওঠে। আপনিও ভুল
বোঝেন। দূরত্ব বাড়ে।
ভদ্র।।
আগে এরকম মনোমালিন্য, সে যার সঙ্গেই হোক, হলে – সোজা নিজের ঘরে গিয়ে একটা গল্পের
বই খুলে বসে যেতাম। বা বাইরে গিয়ে জমিয়ে একটা এগরোল সাঁটিয়ে আসতাম।
সিদ্ধার্থ।।
বিউটিফুল। বই-টই তো এখন শিকেয় উঠেছে? আর এগরোল? যেভাবে তাকাচ্ছেন, ধরে নিচ্ছি
কোলেস্টেরল।
ভদ্র।।
বসে বসে কাজ তো। তেমন একটা…
সিদ্ধার্থ।।
এক একদিন শুয়ে জাস্ট চোখটা লেগে আসার সময় মনে হয় না, কাল যদি ঘুমটা না ভাঙে, এত
চাপ নিতে না হয় আর?
ভদ্র।।
হয় তো!
সিদ্ধার্থ।।
And that is your suicidal thought, Mr. Manager! এই আপনার ন-বগির ট্রেনের মতো
লম্বা দৈনন্দিন সমস্যার লিস্টি, আর ওই আপনার সুইসাইডাল থট! যদি আর ঘুমটা না ভাঙে,
বেঁচে যাই! চুলোয় যাক বউ বাচ্চা! জীবনটা বড় চাপের, তাই না?
ভদ্র।।
কিন্তু … কিন্তু …
সিদ্ধার্থ।।
এখন উত্তর দেবেন না। সবকিছুর রেডিমেড উত্তর, রেডিমেড কনক্লুশন হয় না, দাদা। আজ
বাড়ি ফিরে ভাবুন। আপনি আর আপনার ন বগির সমস্যা। এর কোন সমস্যাটার জন্য আপনি দায়ী?
এই চাকরি, এই পজিশন চেয়েছিলেন, সেটা দোষের?
ভদ্র।।
না।
সিদ্ধার্থ।।
সমস্যাটা হয় পরিস্থিতির। আপনার পরিস্থিতি এমন এক একটা জায়গায় আপনাকে নিয়ে গিয়ে
ফ্যালে, আপনি পালাতে পারেন না, মানতেও পারেন না। কারণ ততক্ষণে আপনার ট্রেন স্পিড
নিয়ে নিয়েছে। থামলে লেট হয়ে যাবে। আর ওই ট্রেনের চাকার তলায় তাল পাকিয়ে যাচ্ছে,
দলা পাকিয়ে যাচ্ছে আপনার স্বপ্নের উড়ান। আপনার টেনাসিটির গর্ব। আপনার লেখাপড়ার
সারবত্তা।
(ম্যানেজার
নিশ্চুপ।)
সিদ্ধার্থ।।
সত্যি বলুন তো, ম্যানেজার বাবু – আত্মহনন কি শুধু বুকের ধুকপুকুনি থামিয়ে দিলেই
হয়? অন্য পথ নেই? উপায় নেই?
(চুপ।)
সিদ্ধার্থ।।
আছে। তাই না? নিজেকে না মেরে, নিজেকে মরতে দেখার অজস্র পথ আছে। আর আমরা প্রত্যেকে
হচ্ছি সেই পথের এক একজন নমুনা।
ভদ্র।।
আমরা বাঁচতে গিয়ে –
সিদ্ধার্থ।।
বড্ড বেশি মরে গেছি। যতটা মরলে মনে হয়, দিব্যি বেঁচে আছি। আপনি আপনার পড়াশুনা
দিয়ে, আপনাকে ছাত্রজীবনের সমাজে, রাজনীতির ময়দান বুঝে চেষ্টা করেছিলেন, ম্যানেজার
বাবু। তার দাম আছে। ঠিক যেমন দাম আছে আজকের এরকম কিছু ছেলেমেয়ের চেষ্টার, ইচ্ছের।
যারা মরছে না, পালাচ্ছেও না। বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। যারা তাদের বাঁচতে দিচ্ছে
না, তাদের কাছে গিয়ে বোঝাচ্ছে, তর্ক করছে। কার পক্ষে তর্ক করছে?
ভদ্র।।
বাঁচার পক্ষে।
সিদ্ধার্থ।।
রাইট। বাঁচার পক্ষে। আর আমরা চতুর্দিকে বাঁচতে গিয়ে ফসিল হয়ে যাওয়া কিছু মানুষ –
আমাদের হতাশা ওগরাতে ওই ছেলেমেয়েগুলোকে বলেই দিতে পারি, কিস্যু হবে না। যাও, গিয়ে
ট্রেনের তলায় তাল পাকিয়ে বসে থাকো। তবু বলছি না। কেন জানেন?
(চুপ।)
কারণ
আমাদের এই চাকার মতো ঘুরতে থাকা, সুইসাইডাল জীবনযাত্রায় ওদের এই স্বপ্নটুকু দেখতে
বাধা না দেওয়া, সেই স্বপ্নের পথটা পরিষ্কার রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করা – this is a
bare minimum and the best we can do to save ourselves! হেরে যাওয়ার কথা বলা সহজ।
'হবে না' বলা সহজ। তাই না? চারদিকে তাই এত্ত, এত্ত এসব শুনতে পান। কিন্তু ক জন
আপনাকে আজ অব্দি বলেছে বলুন তো, 'তুমি ঠিক পারবে'?
(চুপ।
ঘোষণা হয়, "দমদম লাইনে ট্রেন চলাচল আবার শুরু হতে চলেছে।")
তৃতীয় দৃশ্য
(মনোতোষ
রায়ের ঘর। চেয়ারে বসে আছে কুন্তলা – সে চিন্তিত, মাথা হেঁট। পায়চারি করছেন
মনোতোষ।)
রায়।।
খরচটা কত বললি?
কুন্তলা।।
এই ইঞ্জেকশনটার বারো হাজার মতো।
রায়।।
না না, সব মিলিয়ে বলছি।
কুন্তলা।।
এই মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ছুঁইছুঁই। (একটু চুপ থেকে) আমি যে কী করবো, বুঝতে পারি
না দাদা … তোমার কাছে বারবার এভাবে আসতে… লজ্জা করে আমার …
রায়।।
(কুন্তলার কাছে এসে, ওর মাথায় হাত রেখে) এতে লজ্জার তো কিছু নেই, কুন্তলা! তুই তো
আমার কাছে ফুর্তি করার জন্য টাকার আব্দার করতে আসছিস না!
কুন্তলা।।
সে আসছি না। তাও দাদা… ভালো লাগে না। এসব বলেও শেষে হাত পাতি, হয়তো আমাকে দুমুখো
ভাবো। কিন্তু আমি মন থেকেই এরকম ভাবি … সত্যি।
রায়।।
আমি কী ভাবি, সে নিয়ে তো তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। জীবনে তোর দুশ্চিন্তার অভাব
ঘটেছে, যে নতুন একটা বোঝা বাড়াচ্ছিস?
কুন্তলা।।
শোধও যে কবে করতে পারবো!
রায়।।
তোর কী হয়েছে বল তো? আমাকে তুই কী বলে ডাকিস যেন?
কুন্তলা।।
দাদা।
রায়।।
তা সেটা কি শুধু মুখেই দাদা? না মনে মনেও বিশ্বাস করিস?
কুন্তলা।।
কী বলছো!
রায়।।
তাইই যদি বিশ্বাস করিস, তাহলে আজ এই চিন্তা কেন তোর? তন্ময়ের কন্ডিশনটা কি আমার
কাছে নতুন?
(কুন্তলা
নীরবে ঘাড় নাড়ে।)
রায়।।
আমার সঙ্গে কি তোর সেই সম্পর্ক যে আমার অসুবিধা থাকলে আমি তোকে জানাতে পারবো না সে
কথা?
কুন্তলা।।
আমার খালি সাত বছর আগের ওই দিনটার কথা মনে হয়, জানো! আর শিউরে উঠি। সবসময় বলতাম,
সবসময় বলতাম – নিজের কথা ভেবে যা করার করো! আমার কথা ভাবো! বয়স্ক বাবা-মায়ের কথা
ভাবো অন্তত! তোমার ঐ রিস্কের ঠেলায় আমাদের মতো সাতে নেই পাঁচে নেই মানুষের জীবনে
কী না কী চলে আসবে! না! কিছু মানুষের রোখ থাকে সৎ হওয়ার! বোকা রোখ! যা হওয়ার, তা
হলো…
রায়।।
রিপেন্ট করে লাভ নেই কুন্তলা। সাত বছর হলো তুই অনেক কিছু হারিয়েছিস, তার সঙ্গে
রিপেন্ট করার অবকাশও। যা আছে হাতে, সে নিয়ে লড়ে যেতে হবে আমাদের। তন্ময়ের হেল্থ
একটু হলেও তো improve করছে, বল?
কুন্তলা।।
বলতে নেই দাদা, শেষ দুটো সিটি স্ক্যান সামান্য হলেও বেটার। মাঝে তো বছর চারেক এক
জায়গায় stand still হয়ে গিয়েছিল। এখন সে থেকে একটু হলেও তো আলাদা।
রায়।।
তবে? হার মানলে, লজ্জা পেলে এখন চলবে? … জল খা। (একটু থেমে) তোর কাজটা কেমন চলছে
এখন?
কুন্তলা।।
চলছে একরকম। এতে তো কোনও বাড়তি পাওয়ার জায়গা নেই। আর একটা প্রজেক্ট যে অনেকদিন
থাকবে, তারও গ্যারান্টি নেই। কন্টেন্ট রাইটিং তো, বুঝতেই পারছো। এরা সব ছোট ছোট
স্টার্ট আপ। নিজেরা কদিন টানতে পারে, তার নেই ঠিক। তবে সারাদিনই টুকটাক লিখে
পাঠাতে থাকি বলে একরকম উঠে আসে।
রায়।।
যতই কম হোক, ওইটুকু ছাড়িস না কুন্তলা। আমার অত ধারণা নেই, তাও ধরেই নিচ্ছি –
আপাতভাবে তেমন বেশি একটা কিছু না। কিন্তু তন্ময়ের এই প্রায় ভেজিটেবল স্টেট ভেবে
দেখলে, এবং সেটা এত বছর ধরে চলছে – এটা মাথায় রাখলে, this is huge!
কুন্তলা।।
বলছো? একটু হলেও পারছি contribute করতে?
রায়।।
ওটা 'একটু' নয় কুন্তলা। সবকিছুর মূল্য সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। তোর
পরিস্থিতিতে, তোর মনের অবস্থায় এটা gigantic! ইউ আর এ ফাইটার!
কুন্তলা।।
জানো, তুমি ছাড়া আর কেউ …
রায়।।
বলে না এই কথা? লড়াই কাকে বলে, জানলে নিশ্চয়ই বলতো। তোর পড়াশুনা যা, কত স্কোপ ছিল কুন্তলা!
তুই পিএসসির জন্য পড়ছিলি না?
কুন্তলা।।
হুঁ…
রায়।।
তন্ময়টা বসে যাওয়ায় সেইসব তো তোর মাথায় উঠলো। তবু, হাল ছেড়ে তো দিস নি। রোজ দেখছি
চোখের সামনে, তুই লড়ে যাচ্ছিস। যেভাবে পারিস, যতটুকু পারিস। পরিস্থিতির দায়
দায়িত্ব নিজের উপর নিয়েছিস। অপেক্ষা করিস নি কারো।
কুন্তলা।।
তুমি না থাকলে আমার এই চেষ্টাটুকুও বিফলে যেত দাদা। পাড়ায় নতুন এসেছিলে, এসে আলাপ
করেছিলাম। তখন কী জানতাম, যে তুমি নিজের দাদার চেয়েও…
রায়।।
জানিস কুন্তলা … আমি ছোটবেলায় আমার দাদাকে … দাদাকে হেরে যেতে দেখেছি।
কুন্তলা।।
হেরে যেতে?
রায়।।
হুঁ। তোকে বলিনি, না? সত্যিকারের ব্রাইট স্টুডেন্ট বলতে যা বোঝায়, দাদা ছিল তাই।
ক্লাস নাইনের আগে মনে হয় না কোনোবার ফার্স্ট ছেড়ে সেকেন্ড হয়েছিল ও।
কুন্তলা।।
তোমার দাদা আছেন, প্রথম শুনছি এই।
রায়।।
'আছেন' না, 'ছিলেন'। … নাইনে দাদা প্রথমবার ফার্স্ট পজিশন থেকে নীচে পড়ে। সোজা ফেল
– দুটো সাবজেক্টে।
কুন্তলা।।
কেন?
রায়।।
কেন, কিভাবে, আমরা কেউ জানতে পারিনি। Just out of nowhere, he took a slump. And
he never recovered from that. জানিস তো, ভালো হতে হতে, প্রশংসা পেতে পেতে, ফুলতে
ফুলতে, ফাঁপতে ফাঁপতে মানুষ বোধ হয় নিজের লিমিট সম্বন্ধে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক
ধারণা করা বন্ধ করে দেয়।
কুন্তলা।।
এবং তখন একটা failure এর চেয়েও বোধ হয় ওই ignorance-টাই বেশি বড় ধাক্কাটা দেয়।
রায়।।
Absolutely! ওই একবার ফেল করার ধাক্কা – সে যে কোনও কারণেই হোক – দাদা সামলে উঠতে
পারলো না। এতদিন ধরে যাদের প্রশংসা পেয়ে নিজের পেট ভরাতো, এখন তারাই চুপ মেরে
গেলেন। নিজেকে দুষতে দুষতে, আর ওকে কেন ফেল-করা একটা ছেলে হিসেবেও লোকে ভালোবাসলো
না, এই ভাবতে ভাবতে দাদা নিজেও নিজেকে ভালোবাসা বন্ধ করে দিল। ফেল করা, so called
খারাপ ছেলেদের আরও যে যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে সমাজ tag করে, দাদা নিজে সেগুলো হয়ে উঠতে
উঠতে যেন নিজেকে টর্চার করা শুরু করলো।
কুন্তলা।।
যেমন? নেশা?
রায়।।
যা যা কিছু ভাবতে পারিস, ভেবে নে। … তারপর একদিন, আমি তখন সেভেন, বা এইট – বাড়ি
থেকে বেরিয়ে গেল দুপুরের পর।
কুন্তলা।।
কোথায়?
(কাঁধ
ঝাঁকিয়ে মনোতোষ জানান, তিনি জানেন না।)
রায়।।
ব্যাস! That's it. End of the story. আজ অব্দি আর একবারও যোগাযোগ হয়নি। হয়তো নেই।
হয়তো আছে কোথাও। জানি না। ঠিকই বলেছিস; 'ছিলেন' না, 'আছেন'। হয়তো আছে কোথাও। তোকে
দেখে মনে হয়, মানুষের হারিয়ে যাওয়া উচিৎ নয়।
কুন্তলা।।
এ কথা জানতাম না।
রায়।।
বলতামও না। কিন্তু তোকে দেখে মনে পড়ে। ওই আরেকজন খুব প্রমিসিং মানুষ দেখেছিলাম, যে
একবার হেরে অর্বিট থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। আর তোকে দেখলাম, সমস্ত প্রমিস বিসর্জন
দিয়েও কীভাবে টিকে আছিস।
কুন্তলা।।
জানো, মানুষের সবসময় নিজেকে একটু ছোট, একটু সামান্য ভাবা উচিৎ। ব্যর্থ হওয়ার জন্যও
একটু জায়গা থাকা ভালো। তাতে কারো ক্ষতি হয় না।
(দুজনেই
চুপ। এমন সময় কিছুটা হড়বড় করে ঘরে একটি ছেলে এসে ঢোকে – ডোডো। ঢুকে দুজনকে এরকম
চুপ করে থাকতে দেখে একটু থতমত খেয়ে পিছিয়ে যায়। মনোতোষ তাকে দেখে, দরজার ওখানেই
অপেক্ষা করতে বলেন। কুন্তলাও খেয়াল করে, এবং যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ওঠার তোড়জোড়
করে। মনোতোষ কুন্তলার হাতটি চেপে ধরে ওকে বসতে বলেন। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে একটি
মাঝারি সাইজের খাম এনে কুন্তলার হাতে দেন।)
রায়।।
আমি জানি মা, ক্যাশ এভাবে বাড়ির আলমারিতে রাখা risky, তোর পক্ষে অসুবিধেও। কিন্তু
এ জায়গাটায় কিছু মনে করিস না কুন্তলা। আমার আসলে এভাবে দিলে একটু সুবিধা হয়। আপাতত
কটা দিন কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো কিছুটা আছে।
(কুন্তলা
খামটা হাতে নিয়ে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। একবার মনোতোষের দিকে
তাকায়। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়।)
কুন্তলা।।
আশা করি, তন্ময় তোমার এই চেষ্টা বৃথা যেতে দেবে না। জানি না দাদা, কী হবে। জানি
না।
রায়।।
আমরা কেউই জানি না, কুন্তলা। তাও, চেষ্টা তো করি আজও। বাকি তাঁর খেলা, তিনি
বুঝবেন।
কুন্তলা।।
(শুকনো হেসে) সেই! তাঁর খেলা, আর আমরা মরি! আসি দাদা।
(সে
বেরিয়ে যায়। ধীর, স্তিমিত পায়ে ডোডো এসে ঢোকে। মনোতোষ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা
সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দেন। ইশারায় ডোডোকে বসতে বলেন আরেকটা চেয়ারে – যেখানে
এতক্ষণ কুন্তলা বসেছিল।)
রায়।।
(কুন্তলার বেরিয়ে যাওয়ার দিকটা ইঙ্গিত করে) তোদের টাকা জনসেবায় লাগছে, দ্যাখ! ছবি
তুলে রাখ!
(ডোডো
একটু অন্যমনস্ক ভাবে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর যেন হুঁশ ফিরে পেয়ে বলে –)
ডোডো।।
হুঁ? আমাদের টাকা?
রায়।।
(ডোডোর মুখের উপর ধোঁয়া ছেড়ে) ইয়েস মিস্টার ডোডো! তোমাদের টাকা! যে টাকা তোমরা
আমাকে মাগনা দিচ্ছ মনে করে প্রতি মাসে বেজার মুখে পাঠাও, সেই টাকা!
ডোডো।।
সেই টাকা উনি নিলেন কেন?
রায়।।
দরকার আছে, তাই দিয়েছি। তাই নিয়েছে। তোর কী? তুই শুধু দেখে রাখ, জেনে রাখ। ফিরে
গিয়ে তোর ওয়ার্ডের দাদা, আরও যত কানেকশনতুতো কাজিন আছে, সবাইকে বলিস – মনোতোষ রায়
একা খায় না, অকারণেও খায় না।
(ডোডো
নিজের বাইকের চাবিটা দিয়ে টেবিলে তাল ঠুকতে ঠুকতে এদিক ওদিক দ্যাখে। সিলিং,
দেওয়াল, উঁকি মারে ওদিকে।)
রায়।।
দেখে নে, মনের সুখে দেখে আশ মিটিয়ে নে। যা ঘুরে দেখে আয়, ওদিকটায় মডিউলার কিচেন।
ফলস সিলিং। চারটে ঘরের তিনটেয় এসি। জায়ান্ট স্ক্রিন। কী? একটা কলেজের
কন্ট্র্যাকচুয়াল টিচারের জন্য একটু বেশিই, না?
ডোডো।।
শিক্ষকের মাইনে জিজ্ঞেস করতে নেই, সেটুকু আমি জানি।
রায়।।
তাও বুঝতে তো অসুবিধে হয় না! ন্যাকা রে আমার! তোর চাউনি বলে দিচ্ছে, তুই আর তোর
পার্টি কী ভাবিস আমাকে!
ডোডো।।
আমরা কী ভাবি, সে নিয়ে আপনার এত ফাট…– চাপ লাগছে কেন? আছেন তো নিজের মতো!
রায়।।
যতটা সহজে 'নিজের মতো' থাকার কথাটা বললি, ততটা স্পষ্ট যদি বুঝতিস রে! এসব পেটি
ইউনিয়নবাজি করে ফেমাস হতে হতো না তোকে!
(ডোডো
তাল ঠোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা গানের সুর শিস দিয়ে বাজায়। মনোতোষ তার হাতটা শক্ত
মুঠিতে চেপে ধরেন। শিস আচমকা থেমে যায়।)
রায়।।
আজ তোকে দুটো কারণে আমি ডেকেছি আমার বাড়িতে, ডোডো! একটা কারণ নিশ্চয়ই বুঝতেই
পারছিস।
ডোডো।।
আমাকে কথা শোনাতে। অপমান করতে।
রায়।।
রাইট। তবে না, পুরোপুরি ঠিক না। তোকে কথা শোনানো আমার উদ্দেশ্য নয়। তুই তো
চুনোপুঁটি। তবে হ্যাঁ, তোর মধ্যে দিয়ে কিছু কথা আমি কিছু জায়গায় পৌঁছে দিতে চাই।
(ডোডো
ভুরু নাচায়।)
রায়।।
আসলে আমি দেখছি, ক্রমাগতই আমাকে নিয়ে কয়েকজনের, এবং তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তোর
কৌতূহল বেড়ে চলেছে! যে পোস্টে চাকরি করি, তাতে আমার এতটা খুল্লমখুল্লা জীবনযাপন
বেশ চোখে পড়ার মতো, না? ঠিকই তো।
ডোডো।।
আপনি নিজে সমস্যা তৈরি করছেন, আর তার হাবড়জাবড় উত্তর সাজাচ্ছেন।
রায়।।
তাই বুঝি? তাহলে তোদের দক্ষিণা শেষ পাঁচ মাস কি ভুল করেই একটু কম চলে আসছে? না
আমাকে পরখ করতে?
ডোডো।।
যা নিয়ে আমি জানি না কিছু, তা নিয়ে আমাকে বলে কী লাভ?
রায়।।
ওই যে বললাম, তুই তো একটা মিডিয়াম জাস্ট। চুনোপুঁটি। হাফ টিকিট। তোর থেকে যারা
জানার, ঠিক জেনে যাবে। এই চারদিকে যা কিছু দেখছিস না, এর একটাও তোদের চাঁদায়
বানাতে হয়নি আমায়! কী বুঝলি? যা মাইনে, তাকে এখানে সেখানে জমিয়ে, শেয়ারে লাগিয়ে
যেটুকু যা বাড়ানো যায়, বাড়িয়ে একে একে সব হয়েছে, ডোডোবাবু! গপ্পো হলেও সত্যি!
তোদের দলকে, বা কাউকেই এটা বলার সুযোগ দিই নি, যে তোদের দক্ষিণ্যে আমি ঠাণ্ডাঘরে
রোজ ঘুমোই। আমি একটা কারো মুখাপেক্ষী হয়ে নিজের জীবন বাঁচি নি ডোডো। আজও বাঁচছি
না।
ডোডো।।
তৌফিক দা, কমলেশ বসু এরা সবাই বলে – কন্ট্র্যাকচুয়াল চাকরিতে না আছে বেসিক স্কেল,
না আছে ডিএ, না কিছু! সে তুলনায় … আপনার বাড়িটা – যাক গে! হলেও বা কী, না হলেও বা
কী!
রায়।।
ঠিক! হলেই বা কী, না হলেই বা কী! কিন্তু কী জানিস তো, ঠেকায় পড়ে যাদের সঙ্গ করতে
হয়, তারা যখন আমাকে নিয়েই সন্ধের চা আর চপের আসরে গল্প বানায়, আমারও কিছু দায়
বর্তায় সেখানে। তোদের সন্দেহটা কোথায় হয়, বুঝি আমি।
(ডোডো
একটু বিস্মিত হয়ে তাকায়।)
রায়।।
আসলে টাকা পেলে তোরা শিখেছিস ওড়াতে, আর আমি শিখেছি খরচ করতে! বল, শিখিস নি?
সোশ্যাল আর নবীন বরণের দিন অডিটোরিয়ামের সাউন্ড বক্সের সঙ্গে বাইরে আরও বারোটা
বক্স বসিয়ে এলাকাকে শোনানোর জন্য ওড়াস তোরা। তোদের একটা কাজের খোরাকি হলো চার বোতল
বিয়ার। অনুষ্ঠান শেষ হলে, মেয়ে নিয়ে ডায়মন্ড হারবারের হোটেলে গিয়ে ঘরভাড়া করে শুলে
তোদের ঘ্যাম বাড়ে। পার্টির চ্যানেলে মাথা তুলতে পার্টির থেকে টাকা নিয়ে পার্টিকেই
দিস, হাস্যকর! না?
ডোডো।।
যেভাবেই, যা-ই করি, ওটা আমাদের পাওয়া টাকায়! চাওয়া টাকায় নয়!
রায়।।
এইই তোদের আছে! কথার ফুলঝুরি! নিজের ভালোতেও লাগাস না টাকাগুলো! আর অন্যের ভালো তো
বাদ দিলাম!
ডোডো।।
আর আপনি কোন 'অন্যের ভালো'তে লাগান, বলুন।
রায়।।
তোর চোখেই সামনে প্রমাণ ছিল কয়েক মিনিট আগে।
ডোডো।।
ওহ, ওই ম্যাডামটা!
রায়।।
এই পাড়ায় তো তোর কম যাতায়াত নয়। চিনিস না ওকে? … চিনবিই বা কী করে! তোদের নজরে ও
তো ঠিক 'মাল' নয়, তাই চোখে পড়ে না।
ডোডো।।
ওই ম্যাডামটার কী কাজে আপনি আমাদের টাকা দেন?
রায়।।
আহা রে! 'আমাদের টাকা'! তোমাদের টাকা ওকে দিই, কারণ ওর স্বামী খুব সৎ একটা পুলিশ
অফিসার ছিল, জানো?
ডোডো।।
ছিল মানে?
রায়।।
এখনও আছে, তবে তোমাদের বিপদে ফেলার অবস্থায় ও ঠিক নেই। বেশি সততা দেখাতে গেলে,
তোমাদের জোচ্চুরি ধরতে গেলে তোমরা যা উপহার দাও, আজ থেকে সাত বছর আগে ওকে সেটাই
দেওয়া হয়েছিল! তুই অবশ্য তখন শিশু।
ডোডো।।
কী?
রায়।।
মাথার পিছনে দু কেজির দুটো বাটখারা দিয়ে বারবার মেরে থেঁতলে দিয়েছিল তোর দল।
দিনদুপুরে। শ্যামবাজারের পাশের একটা ডেড এন্ডে। রক্ত বেরোয় নি খুব একটা, সবটাই
ইন্টার্নাল ইনজুরি।
(ডোডো
নিজে একবার শিউরে ওঠে।)
রায়।।
বেচারার তখন চাকরির দশ বছরটাও হয়নি যে পেনশন আসবে ঘরে। জাস্ট ইনভ্যালিড একটা
সব্জির মতো ঘরে পড়ে রইল। এখনও পড়ে আছে। ওই মেয়েটা ওর বউ, জানিস?
ডোডো।।
ও এখন চাকরি করে?
রায়।।
চাকরি তোরা রেখেছিস, যে করবে? ব্রাইট মাইন্ড মেয়েটা! চাকরি থাকলে লিখে দিতে পারি,
পেয়ে যেত। কিন্তু তোরা তো সে সব রাখিস নি। রেখেছিস বলতে, ছুটি আর উৎসব। চাকরিই
নেই, তার ছুটি! আর মেয়েটার শেষ সাত বছর ধরে উৎসব হলো, ওর বরের পায়খানা নিজের হাতে
পরিষ্কার করা। সাত বছর ধরে একটা মানুষ অপেক্ষা করে আছে, আরেকটা মানুষ একদিন
নিশ্চয়ই কথা বলবে!
(ডোডো
নিশ্চুপ।)
রায়।।
আমাকে দাদা বলে ডাকে। একদম শুরুতে একবার কিন্তু-কিন্তু করে সাহায্য চেয়েছিল! তোদের
দেওয়া চাঁদার প্রায় সবটা যায় ওর কাছে। কেমন? এটা শুনে নে। বুঝিয়ে দিস। শালা প্রতি
মাসে হুইস্কির দুটো পাঁইট আমার লাগে, তাও নিজের পয়সায়। তোদের পয়সায় গলাও ভেজাবো
না।
ডোডো।।
(বিদ্রূপ করে) এতই চোখের বিষ যখন, টাকাটা হাত পেতে নেন কেন তবে আমাদের দল থেকে?
রায়।।
দায়, ডোডো, দায়। বুঝবি না এসব। একটা মানুষ আমাকে দাদা বলে ডেকেছে, চেয়েছে পাশে
থাকি, তার প্রতি দায়। আর এই, হাত পেতে নিই মানে? মাগনা নিই না রে। গিভ এন্ড টেক!
তোর ইউনিয়নবাজি চলছে, কারণ চালাতে দেওয়া হচ্ছে!
ডোডো।।
তাই নাকি? এত জোর? আমার ইউনিয়নবাজি চালাতে 'দেওয়া' হচ্ছে?
রায়।।
টেস্ট করে দেখবি নাকি? দেখতে পারিস! রাজনীতি আমিও করেছি ডোডো! অনেকদিন থেকে। তখন
রাজনীতির শিক্ষাই দেওয়া হতো নীতিটুকুকে ঘিরে। ওইটা তো তোদের নেই – না শিক্ষা, না
নীতি। এখন সময় বদলেছে, দুর্নীতির এডভান্টেজ নেওয়াজ সময় এখন। তোরা আছিস, থাক! কী আর
বলবো! এখন তোদের কাউন্টার করে নীতি এনে বসাবো মসনদে, সে জোর নেই আমার এ মুহূর্তে,
সত্যি কথা!
ডোডো।।
তাই নিজেও দুর্নীতিতে সেঁধিয়ে গেলেন, তাই না? বেশ ভালোই শিক্ষা ছিল আপনাদের!
রায়।।
আলবাৎ! কলেজের সবকটা মাল তলায় তলায় জানে, আমি টাকা নিয়ে হাত নোংরা করি! তোরা মনে
করিস, আমি তোদের পোষা ভিখিরি! এই নোংরামিতে নামলাম কেন জানিস? কেন অসৎ হলাম? কারণ
একটা, অন্তত একটা সৎ লোককে বাঁচানোর ইচ্ছে আমার হয়েছিল! ওই মেয়েটার বরকে! কী দিন
পড়লো, বল ডোডো! সৎকে বাঁচাতে অসৎ হতে হয়! অসতের সঙ্গে লড়তে গেলে, এক পক্ষে থেকে
লড়তে হয়! আমি যদি সৎ হতাম আজ, নীতি ঠুসে ওই সিদ্ধার্থ মিত্রের মতো মন জয়ের চেষ্টা
চালাতাম, ওই তোরা যাকে আধমরা করে দিয়েছিলি, সেই লোকটা জাস্ট মরে যেত!
ডোডো।।
এই কাজটা তাহলে সৎ থেকে করা যেত না, স্বীকার করছেন?
রায়।।
সেটাই তোদের নৈতিক জয়, বল? অবশ্য তোদের দলকে খুব বেশি গালি দিতে পারি না। আমার দল
মোটামুটি শিখিয়েছিল মানুষের ভালো করতে। যে কন্সেপ্ট তোদের নেই। আবার তোদের আছে
কুবেরের হাঁড়ি; সেই সব সংগতি আমাদের দলের অতটাও ছিল না। একজনের থেকে শিখলাম কাজ,
আরেকজনের থেকে পেলাম কাজের জন্য মালকড়ি। এ আমার বাপ, তো ও আমার মা। কার নিন্দে
করি? কাকে মন্দ বলি? দুদিকের পাল্লাই ভারি!
ডোডো।।
আপনার বাণীর ঝুড়ি হালকা হলে, এবার তাহলে বলবেন দ্বিতীয় কোন কারণে ডেকেছিলেন।
রায়।।
ওহ, ওটা মাইনর! আলমের ব্যাপারটা শুনেছিস তুই?
ডোডো।।
হ্যাঁ, জানোয়ারটা লোকজন জড়ো করে আন্দোলনে নেমেছিল নাকি!
রায়।।
'নেমেছিল' নয়, নেমে ওদের দাবিগুলোর কথা ভালোই ভাসিয়ে দিয়েছে। তোদের মতো কামকাজ
নেই, এসে সারাদিন তো গলাবাজি করে না। কিন্তু কলেজের প্রশাসন নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা,
আর ওই সিদ্ধার্থ মিত্রের মতো কিছু লোকজন বেশি কথা বলতে শুরু করেছে।
ডোডো।।
আপনি কী চান?
রায়।।
আজ অব্দি এই কলেজে একাডেমিক বিষয় নিয়ে কোনও কথা ওঠেনি ডোডো। আমি উঠতে দিইনি। এমন
একটা পরিবেশ কলেজে তৈরি করে রাখি তোদের দিয়ে, যে দিনে একটা ক্লাস করতে পারলেই
ছাত্র-শিক্ষক সবার মনে হয়, বিশ্বজয় হলো! কলেজে যে যার ইচ্ছে মতো যা করতে চায়, করার
সুযোগ দিয়েছি। কেউ তাড়াতাড়ি বেরোতে চাইলে, বেরোক। বসে পড়তে চাইলে পড়ুক। ক্লাস তুলে
দেবে মনে করলে দিক। কলেজে বসে টিউশন করতে চাইলে করুক। পড়াশুনার সময় এলেই ড্রাগ
ফিক্স আছে এই কলেজে। আজ অব্দি পড়া হচ্ছে না বলে কেউ গলা তোলে নি, বরং হালকা মেজাজে
খুশিই থেকেছে। কিন্তু এই আলমরা বিগড়ে দিচ্ছে।
ডোডো।।
কী বলেছে কী ও?
রায়।।
যা বলেছে, খুব বুঝে বলেছে। প্রতিটা পয়েন্ট, অন্তত বেশিরভাগ পয়েন্ট এমন তুলেছে,
যেখানে খরচ না করে আমরা ফান্ড বাঁচাই আর সেটা তোদের পেটে যায় এ ঘাট সে ঘাট ঘুরে।
অল্প কদিনেই এমন হইচই ফেলেছে স্কাউন্ড্রেলগুলো, যে স্টুডেন্ট ছাড়, টিচাররা অব্দি
বেসুরে গাইছে।
ডোডো।।
এবার?
রায়।।
ফিল্ডে নামতে হবে তোকে, ডোডো। তোদের এতদিনের 'শিক্ষা'র ব্যবহার করবি একটু!
ডোডো।।
Attack করতে হবে তো?
রায়।।
যতটা ভাবছিস, ততটা নয়। একটু ধমক চমকের ব্যাপার। আলম ছেলেটাকে ডেকে, একটু ধমকাবি।
লিমিটে থেকে উড়তে বলবি! আর ওই সিদ্ধার্থ মিত্র মালটাকে ফোনে একবার চমকাবি। উড়ো,
ভুয়ো চমকানো। বহুদিনের প্র্যাক্টিস। ওটাই করবি। নম্বর আছে ওর?
ডোডো।।
আছে।
রায়।।
গুড বয়! কী করবি তাহলে – আলমকে?
ডোডো।।
ধমকাবো, যেন রেঞ্জে থাকে।
রায়।।
সিদ্ধার্থকে –
ডোডো।।
চমকাবো, যেন লাই না দেয়।
(মনোতোষ
আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়েন। তারপর খুব মেপে মেপে, শান্ত ভাবে বলেন –)
রায়।।
সময় কিন্তু কম, ডোডো। কেমন? কাজটা যেন হয়। না হলে কী হবে, বুঝতেই পারছিস! তুই নাকি
এই তল্লাটের নেক্সট বিগ থিং, তোর দলের তরফ থেকে? … তা বাবা ডোডো, ওতে তোমার দলের
যা অবদান, আমারও কিন্তু খুব কম নয়।
ডোডো।।
চেষ্টা করবো।
রায়।।
উঁহু। চেষ্টা নয়। আমি একদিনও তোদের বলিনি, এখানে তোরা যাতে রেলা ফলাতে পারিস, আমি
সেই চেষ্টা করবো। আমি তোদের রেলা ফলাতে দিয়েছি। দিয়েছি, তাই পেরেছিস। ভুলে যাস না।
সব্বাইকে সামলেছি একা। এবার প্রতিদান দাও তো, হিরো! যদি কলেজের প্রশাসনে বা খরচে
টান পড়ে ডোডো, লিখে রাখ, আমার যোগাযোগ কিন্তু দু পক্ষেই। খুব বেশি দূর না হলেও, এই
অঞ্চলের নেক্সট বিগ থিংয়ের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট লিঙ্ক আছে আমার। কেমন?
আমি তোদের দেখছি, তোরা আমাদের দেখবি। আমাকে দেখবি। এদিক সেদিক হলে, আমি ছাড়ি না
ডোডো। টাকা দিয়ে আমাকে কিনেছিস, ভাবিস না।
(আঙুলের
ইশারায় ডোডোকে বেরিয়ে যেতে বলেন। ডোডো বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এগোয়। মনোতোষ ডাকেন
আবার।)
রায়।।
ডোডো …
(ডোডো
দাঁড়ায়।)
রায়।।
একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলি না, সৎ হয়ে কাজটা করতে পারিনি কেন? … আমার এই কাজটা মিটে
গেলে, পারলে একবার নিজেকে, আর নিজের দলের ভেড়াগুলোকে এই প্রশ্নটা করিস, আর দেখিস,
করা যায় কিনা কিছু সৎভাবে।
(এগিয়ে
ডোডোর কাছে এসে দাঁড়ান। কাঁধে হাত রাখেন।)
রায়।।
তবে, আমার এই কাজটা হয়ে গেলে।
চতুর্থ দৃশ্য
(তিনটি
ছেলে। এরা কেউ পাঁচ বছর ধরে কলেজে আছে, কেউ ছ বছর, কেউ আট বছর। ছাত্র হিসেবে এদের
বয়সের গাছপাথর নেই। পৃথিবী এদের জন্য এই কলেজে এসে থেমে গেছে। এরা কোনোদিন
পড়াশুনাও করেনি, পার্টিও করেনি। কলেজের তথাকথিত ফেল্টুশ এরা। কলেজের রেজিস্টারে
এদের নাম নেই, কলেজের ঐতিহ্য ও প্রোফাইলের উন্নতিকল্পে এদের কোনও অবদান নেই। ওরা
একসঙ্গে ফোঁকে, টেবিল বাজায়, লেডিজ টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসা মেয়েদের জামা ঠিক করতে
দ্যাখে আড়চোখে। কারো প্রতি তেমন একটা বিষ নেই এদের মনে; কলেজের কাছে এরা নামহীন,
পরিচয়হীন, নিরবয়ব। কিন্তু কলেজ এদের কাছে দিব্যি আছে। এরা কলেজে কিছু ঘটায় না,
কিন্তু যা ঘটছে সব দ্যাখে। দ্যাখে, আর দেখে একে অন্যের মধ্যে কঁকিয়ে ওঠা মুরগির
মতো বা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে হেসে ওঠে।)
১,
২, ৩।। আমরা চনমনে ফেল্টুশ ফর অল!
আমরা
নির্দল, আমরা খলবল
আমরা
চনমনে ফেল্টুশ ফর অল!
২।।
আ-আ-আমরা …
১,
৩।। উফফ! ধুত্তোর!
৩।।
বারবার, বারবার বলেছি, এটা আমাদের থিম সং; ভালো করে প্র্যাকটিস করে আসবি! দুটো বিট
ছেড়ে! দুটো বিট ছেড়ে! কতবার বলেছি! প্রতিবার (ভেঙিয়ে) "আ-আ-আমরা"!
২।।
আরে প্রতিদিন ভাবি আজ রেওয়াজটা করবো, কিন্তু …
১।।
তোমার হবেও না! চাদ্দিকে কান পেতে কলেজের গুজবগুলো শুনে নিজের মাথায় রান্না চাপালে
আর গান হয়?!
৩।।
কী করিস মাইরি, পড়াশুনা তো করিস না! কীসে যায় সময়টা?
২।।
আমি না থাকলে কলেজের জিকে-টা কার কাছ থেকে আসতো শুনি! (হঠাৎ কাছে ডেকে) নতুন খবর
আছে, শোন শোন শোন!
(তিনজনে
জড়ো হয়ে বসে। ২ শুরু করতে যায়, এমন সময়ে ২-কে থামিয়ে ৩ দর্শকদের দিকে ফিরে –)
৩।।
একে বলে কমিক রিলিফ। বিশেষভাবে আপনাদের কথা ভেবে এটা রাখা। কথামতো, এতে আপনার
কমেডি পাবেন, রিলিফ পাবেন, আবার একটু একটু টেনশনও পাবেন পরের সিনের জন্য।
২।।
টেনশন, কারণ ওদিকে তো এখন নিশ্চয়ই ডোডো আলমকে ধমকাচ্ছে, সিদ্ধার্থ স্যারকে
চমকাচ্ছে! তাই না? এদিকে আপনাদের সেটা না দেখিয়ে পাঠানো হয়েছে আমাদের।
১।।
(দর্শকদের দিকে আঙুল তুলে) গল্প শুনবে ভেবে এসেছিল! (Slow motion-এ মুরগির ডাকের
মতো হাসে তিনজন।)
২।।
আমাদের সংগিরি দেখতে দেখতে হেবি চাপ খাবেন আপনারা, ওদিকে কী হয়ে চলেছে – সেই নিয়ে!
(গম্ভীর হয়ে) মজা করছি না। চাপ খাবেন। না খেলে এই সিনটার কোনও মানে থাকে না।
৩।।
কাতুকুতু আর চাপ একসঙ্গে দেওয়াই কমিক রিলিফের বৈশিষ্ট্য। সেই শেক্সপিয়র থেকে শুরু
করে এই রীতি চলছে। আমাদেরও করতে হয়! এই দলের বেশিরভাগ লোকই ইংলিশ লিটারেচারের, তাই
এসব রাখা এদের একটা মুদ্রাদোষের মতো। এসব করলে ওরা একটা sense of purpose পায়!
১।।
আর আমরা স্টেজে চড়ার সুযোগ পাই।
৩।।
চড়ে আপনাদের রিলিফ দিই।
১।।
আজকের দিনে কজন রিলিফ দেয় বলুন তো?
২।।
আর বুঝতেই পারছেন, আমরা তো বাসারকারি, তাই পারিসাবা ভালাই পাবা।
১।।
হা হা হা হ্যাঁ খুব সুন্দর হয়েছে, এবার খবরটা বলবি তুই?
২।।
কী খবর?
১।।
কীরকম ধমক দিলেন মিস্টা: ডোডো?
৩।।
কাকে যেন চমকে দিলেন মিস্টা: ডোডো?
২।।
ধমক খেয়েছে বটে আলম আলি মোল্লা!
চমকে
গিয়েছে খুব বাবু সিদ্ধার্থ!
১।।
তার মানে পড়াশুনা পুরোপুরি ব্যর্থ?
২।।
কলেজের ওই কোণে, রাস্তার টিউকল – তার পিছনেই
ডেকেছিল
ডোডোস্যার দলবল!
৩।।
আহা! আলমের চোখে জল!
১,৩।।
আহা! আলমের চোখে জল!
২।।
মোটেই না! আলম কি অত সহজে ছাড়ার পাত্র?
১।।
মাত্রাজ্ঞান কিছুটা কম
৩।।
হলেই বা। পড়াশুনার জন্য যান কবুল!
২।।
তোর কোন সেমিস্টার অব্দি ক্লিয়ার করা যেন?
৩।।
সেকেন্ড।
২।।
এ তো হাওড়া ছেড়ে লিলুয়াতে গিয়ে ট্রেনের দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো।
১।।
বিন্দুসারের দিব্যি, এত থামলে কিন্তু মজা হয় না!
৩।।
সহি বাত!
২।।
সিদ্ধার্থ বাবু ফোনটা পেলেন কলেজ থেকে সেদিন বেরোনোর সময়! পাশে ছিলেন নবনীতা
ম্যাম!
(বাকি
দুজন নীচু গলায় আওয়াজ দেয়।)
২।।
ফোনের ওপারে ফ্যাসফ্যাসে গলাটা স্যারকে কী বলেছিল কে জানে, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন
সিদ্ধার্থ স্যর।
৩।।
আর নবনীতা সেন?
১।।
আহ! ডক্টর নবনীতা সেন। রিসার্চ তুই করবি না বলে কি কাউকে গুরুত্ব দিবি না?
২।।
রাইট! ডক্টর নবনীতা সেন তখন পাশ কাটিয়ে গিয়ে প্রিন্সিপালের গাড়িতে উঠে পড়লেন।
১।।
বিন্দুসারের দিব্যি, ডাবল স্ট্যান্ডার্ড!
৩।।
ও বড় বড় কলেজে এসব একটু হয়েই থাকে। অত গায়ে মাখলে চলে?
২।।
মনে নেই, সেবার অফিসের বরুণ সোরেন কেমন টাকা মেরে কেস খেলো, আর মুখার্জিবাবু কেমন
প্রিন্সিপালের ইয়েটা ধরে রেখে বেরিয়ে গেলেন?
১।।
আহ! ডক্টর মুখার্জি। সম্মানীয় ব্যক্তি, তবে না এমন হয়েছে।
২।।
উত্থান পতন রোজকার জীবনের!
৩।।
ডাটা গুঁড়ো মশলা।
১।।
বিন্দুসারের দিব্যি!
২।।
শালা ইতিহাসে এত সব থাকতে তুই বিন্দুসার নিয়ে পড়ে থাকিস কেন বল তো? এত তো বড় একটা
ইতিহাসের সিলেবাস রে শালা!
১।।
আমি তো সিলেবাসের ওই অংশ অব্দি পড়ে আটকে গেছি রে জানোয়ার!
২।।
ধিক ধিক ধিক্কার!
৩।।
কলেজ জুড়ে খালি টাকার খেলা, বল? এ ওরটা মারছে, সে তারটা মারছে!
১।।
আর আমরা বছর বছর ঢেলে চলেছি সেই মারামারিতে!
২।।
টাকা তো তোরা দেখিস নি রে পাগলা! টাকা ছিল সাত বছর আগে একদিন!
১।।
তখন কোন যুগ, দাদু?
২।।
বিন্দুসার সবে সিংহাসন ছেড়েছে, আমিও এডমিশন নিয়েছি। এমন সময়ে কলেজে ইনস্পেকশন হলো।
ভাই রে ভাই! সেন্ট্রাল, সরকারি ইনস্পেকশন! কী টাকার খেলা! যেখান সেখান থেকে ফান্ড
আসছে। ল্যাবগুলো সেজে গেল সায়েন্সের। ওই যে লেডিজ হস্টেলটা, ও তো তখন উঠলো! একতলা,
দোতলা, তিনতলা, চারতলা, পাঁচতলা! বাইরে রঙের পালিশ, ভিতরে মার্বেল, ঘরে ঘরে টাইলস…
৩।।
তুই ঢুকেছিলি?
২।।
ঢুকেছিলাম?? আরে রঙের মিস্ত্রীদের সঙ্গে লাঞ্চ করতাম, আর আড়ি পাতার, চোখ রাখার
ফুটোগুলো দেখে রাখতাম।
১।।
(অভিমান করে) আমায় চেনাস নি তো!
২।।
পেটেন্ট ছাড়তে নেই। শেয়ার দিতে পারি।
৩।।
না পেলাম পড়াশুনা, না পেলাম টাকার শেয়ার, না পেলাম হোস্টেলের মেয়ে।
২।।
আমরা টাকার শেয়ার না পেলেও, ও টাকার প্রচুর চিকেন রোল পেয়েছি।
১।।
কেমন? কেমন?
২।।
মনোতোষ স্যার একা হাতে ওই হোস্টেল তুলেছিলেন।
১,
৩।। একা হাতে?
২।।
কলেজের দেওয়ালগুলো তাই বলে। তখন বিকেলগুলোয় উনি দাঁড়িয়ে তদারকি করতেন, মিস্ত্রীদের
মাল খাওয়ার টাকা দিতেন রাতেরবেলার জন্য। মাঝেমাঝে নিজেও থেকে যেতেন। আর আমরা হাতে
হাতে স্যারের সিগারেট, এই সেই বাজার করে দিলে রোল খেতে দিতেন।
১।।
লোকটা নোংরা, কিন্তু ফেলা যায় না, দ্যাখ!
২।।
ওই পাঁচতলা হোস্টেল দেখেই তো সালা ইনস্পেকশন টিম খাল্লাস! এ প্লাস প্লাস গ্রেড
পেয়ে গেল কলেজ!
৩।।
দা গ্রেটেস্ট অফ ক্যালকাটা!
২।।
তারপর কলকল করে কত কথা! মেয়েদের ভিড়! সিকিউরিটিকে বিড়ি কিনে দিলে ঢুকতেও পারা যেত!
একতলা, দোতলা, তিনতলা, চারতলা, পাঁচতলা, ছাদ …
১,৩।।
(লোলুপ দৃষ্টিতে) তারপর?
২।।
অনেকটা শহর! জলছবির মতো! … একদিন ওই ছাদ থেকে একটা মেয়ে ঝাঁপ দিল।
১,
৩।। কী?!
২।।
ওই যে জায়গাটা দেখছিস, ভিখিরিমা শুয়ে আছে বাচ্চাটাকে নিয়ে, ওখানে একটা ভোঁতা শব্দ
করে এসে পড়েছিল বডিটা।
১।।
কী হয়েছিল?
২।।
নতুন ফার্স্ট ইয়ার ছিল। আমাদের পরের ব্যাচ। কয়েকটা ফাইনাল ইয়ারের মেয়ে নিয়ে এসেছিল
তাদের ছেলে বন্ধুদের। তারপর সবাই মিলে –
৩।।
কিন্তু ছেলেরা কেন ঢুকবে? মানে?
২।।
পথটা আমারই দেখানো। বুঝছিস না? সিকিউরিটির অভ্যেস খারাপ করে ঝাড়ি মারতে ঢুকতাম।
সালা একদিনও কারো গায়ে টাচ করিনি। আর আমার পিছন পিছন রেপিস্টগুলো ঢুকলো।
১।।
হয়তো গ্রাম থেকে এসেছিল মেয়েটা …
৩।।
হয়তো বাবা-মাকে টাটা করেছিল এই বলে, যে এতদিনে এত বড় একটা কলেজে পড়ার সুযোগ হলো!
তোমরা খুশি তো?
২।।
ও খুশি। বাবা মা খুশি। টিচাররা খুশি। নতুন ব্যাচ। নতুন আশা। নতুন মুখ।
১।।
তারপর কি দিন সাতেকও গেছিল? হয়তো না…
৩।।
কলেজ থেকে ফিরে সবে হাত মুখ ধুয়েছে হয়তো …
২।।
দরজাটা ভিতর থেকে দিয়ে –
১।।
বুক মুচড়ে দিয়েছিল কি ওর?
৩।।
ঘাড়ে কামড়ের দাগ ছিল?
২।।
ছেলেদুটোর হাত বারবার নেমে যাচ্ছিল নীচের দিকে
৩।।
মেয়েটা চিৎকার করায় সিনিয়র দিদিগুলো মুখ বেঁধে দিয়েছিল
২।।
আর ছেলেদুটো বলেছিল –
১।।
কী রে মাগি, লেসবো নাকি তুই? ওদের সঙ্গে করবি, দিদিদের সঙ্গে?
(মুরগির
মতো শব্দ করে হাসে ওরা। আবার থমকে গিয়ে –)
২।।
দোষ ছিল ওর, নদীয়ার মেয়ে হয়ে বেশি স্বপ্ন দেখে ফেলা –
৩।।
ক্লাসে শহুরে মেয়েদের না পারা উত্তর বলে দেওয়া –
১।।
রেপ করতে না দেওয়া …
২।।
তখন অনেক রাত – মেয়েটা ছাদে উঠেছিল …
৩।।
কে দেখেছিল উঠতে?
১।।
দেখলেও, ভেবেছিল কি …?
২।।
দেওয়াল দ্যাখে, শোনে সব …
৩।।
বাড়িতে লিখে পাঠিয়ে রেখেছিল, "আমি আর পারছি না" …
১।।
তখন বেশিরভাগই ঘুমে অচেতন।
২।।
ছেলেগুলো কাল আবার আসবে।
৩।।
আবার –
(২
খুব জোরে হাত দিয়ে মেঝেতে শব্দ করে।)
২।।
এরকম একটা শব্দ হয়েছিল সেদিন। আমি তখন ওদিকের গলিতে বসে জয়েন্ট ধরাচ্ছি দুটো
বেফালতু লোকের সঙ্গে। প্রিন্সিপাল এসেছিলেন, অনেক রাতে।
১।।
গাড়িতে, সঙ্গে নবনীতা সেন। ডক্টর নবনীতা সেন। গাড়ি থেকে তিনি একবার বললেন,
"বডির কাছে যাবো না। রক্তের গন্ধে গা গুলোয়।"
৩।।
রক্তের গন্ধে গা গুলোয়।
২।।
সায়েন্স বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে ওঠার সময় খুব খেয়াল করলে দেখা যায়, পাশে একটা ছোট্ট
ছাই ছাই ফলকে লেখা "আনন্দী সোম, তোমার স্মৃতির উদ্দেশ্যে।"
১।।
ব্যাস। ওটুকুই ওর চিহ্ন। বাবা মায়ের করে দেওয়া।
৩।।
ওঁরা চেয়েছিলেন, সাদা ফলকে কালো দিয়ে লিখতে।
২।।
কিন্তু চোখে পড়তে পারে সবার, তাই মনোতোষ রায় বলেছিলেন, ছাই রঙের ফলকটা দিন। শোক
বেশি বোঝা যায়।
১।।
মনোতোষ রায়, প্রতি বছর ফার্স্ট ইয়ারের শুরুর দিন ভুল ইংরাজিতে গর্জন করে ওঠেন
কোটেশন, "Arised, be awakening, not stop till goal is scored" …
৩।।
আর বক্তৃতা শেষে বলেন, "মানুষ হওয়ার বার্তাটা ঠিকমতো পৌঁছে দেওয়া গেল
তো?"
২।।
মানুষ হতে এসে ফেল্টুশ হয়ে গেলাম। জীবনটা সায়ানাইড হয়ে গেল।
৩।।
সব দেখে গেলাম –
১।।
শুনে গেলাম –
২।।
বুঝে গেলাম বছরের পর বছর –
১।।
কার সঙ্গে কার ইকুয়েশন মেলে, মেলে না – সব জানি।
৩।।
কিন্তু বলতে পারি না সবাইকে …
১।।
কলেজে থাকি, কিন্তু কলেজ জানে –
২।।
আমরা বলি না।
৩।।
শুনি না।
১।।
দেখি না।
৩।।
দেওয়াল হয়ে থাকি।
১।।
তবে, দেওয়ালের প্রাণ আছে। সে মনে রাখে –
২।।
ছোটখাটো আত্মহত্যা, রেপ, খুন – এসব তো বড় বড় কলেজে আসবে যাবে।
৩।।
আসল কথা হলো, গ্রেডটা আসছে কি?
১।।
ফান্ডিং চলছে তো?
২।।
বাকি সব একটা ফলক দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায় … কারণ –
৩।।
রক্তের গন্ধে গা গুলোয়।
(কিছুক্ষণ
চুপ।)
২।।
হ্যাঁ রে ভাই, মানুষ হতে গেলে পাশ ফেল লাগে?
৩।।
তুই হবি?
২।।
কিছু একটা হলে, ভালো লাগতো।
১।।
হাঃ! কমিক রিলিফ!
৩।।
তাহলে? … আবার আমাদের তিনজনের দেখা হবে কবে?
২।।
ঝড়ে? মেঘে? অন্ধকার নেমে আসা শীতে?
১।।
কখন?
৩।।
যখন এই আলম, ডোডো, আরও সবার রাজা-রাজা খেলাগুলো ভেসে যাবে অন্য কারো হাতে। আজকের
যুদ্ধ থেমে আরেক যুদ্ধ শুরু হবে ঠিক মুখে –
১।।
আমরা দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো।
২।।
দেওয়াল কথা বলে না।
৩।।
কিছু দেখে না।
১।।
কিছু শোনে না।
২।।
কিন্তু দেওয়াল কখনও কখনও মানুষ হতে চায়।
৩।।
আমরা চাইবো।
১।।
পাশ ফেলের বাইরে, ওটুকু ছেড়ে দেবো না। হারজিতের কথা বলতে বলতে আমরা একদিন মানুষ
হয়ে উঠবো, বল?
(তিনজনে
কাছাকাছি এসে একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে, প্রায় কিছুটা জড়িয়ে, আশঙ্কায় অথচ দৃঢ়
দৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে থাকে।)
পঞ্চম দৃশ্য
(প্রিন্সিপালের
চেম্বার। দুই হাতের পাতায় মাথার ভার রেখে, মাথা নিচু করে বসে আছে সিদ্ধার্থ। একটু
দূরে, আরেকটা চেয়ারে মনোতোষ রায় গা এলিয়ে বসা। চেম্বারের দরজার দিকের একটি চেয়ারের
উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিন্সিপাল।)
প্রিন্সিপাল।।
এই ঝামেলাটা পাকিয়ে কী পেলে সিদ্ধার্থ, শেষ অব্দি নিজের সার্ভিস বুকে একটা poor
reflection নিয়ে আসা ছাড়া? তুমি ভাবছো, আমি তোমার এগেন্সটে এসব করে খুব মজা
পেয়েছি? তোমায় সত্যিই বলছি সিদ্ধার্থ, জানি না তুমি বিশ্বাস করবে কিনা – as the
head of the institution and the guardian of this college, তোমার নামে জিবি
মিটিংয়ে একটা এজেন্ডা তৈরি করা এবং সেটা নিয়ে বিচারসভা বসানো আমার কাছে খুব
যন্ত্রণাদায়ক একটা অভিজ্ঞতা।
(সিদ্ধার্থ
নিশ্চুপ, একই পজিশনে।)
প্রিন্সিপাল।।
জিবির কথা না হয় বাদ দিলাম, সেখানে external member রা থাকেন। কলেজের টিচারদের
সঙ্গে স্টুডেন্টদের বন্ডিং তারা সবসময় বুঝবেন, এমন নয়। কিন্তু ইন্টার্নাল কমপ্লেন
কমিটির কাছেই বা তোমার কী ইমেজটা দাঁড়ালো সিদ্ধার্থ? তুমি যদি সত্যিই backing
পাওয়ার মতো কাজ করতে, অন্তত সেখান থেকে পেতে, তাই না?
(সিদ্ধার্থ
আগের মতোই।)
রায়।।
সিদ্ধার্থ, whatever be the case, you are like a brother to us. বহু জায়গায় তুমি
আমাদের চেয়ে অনেক বেশি sensible, অনেক বেশি সংবেদনশীল মন তোমার। তবে এটাও তো ঠিক,
তোমার বয়সটা আমাদের চেয়ে কিছুটা কম। তাই আবেগ, অভিমানের জায়গাটা তোমার বেশি এখনও।
কিন্তু ভাই, একদম বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলছি, প্রতিষ্ঠানের উপর যাওয়া,
প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করা – কারো পক্ষে সম্ভব নয় গো। আমার একশবার অপছন্দ হতে
পারে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, but so long as I am there, I must abide by it.
সিদ্ধার্থ।।
কোন আইনে এটা আছে?
রায়।।
(মৃদু হেসে) আমি ইতিহাসের ছাত্র ভাই। আইনের রীতিনীতি অতটা জানি না। কিন্তু সরকারি
চাকরিতে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি loyal থাকা যে একটা mandate, অবশ্যপালনীয় কর্তব্য – এ
কি বলার অপেক্ষা রাখে?
সিদ্ধার্থ।।
একটা কথা জিজ্ঞেস করছি – আপনাদের কাছে কি গণতন্ত্রটা শুধু সংবিধানের পাতাতেই থাকার
জন্য?
প্রিন্সিপাল।।
গণতন্ত্র থাকবে না কেন। আলবাৎ আছে। অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রে সেটাকে লাগু
করতে গেলে যে কাজগুলোই আর এগোবে না ভাই। ন্যূনতম একটা সমমতের জায়গা তো আমাদের
বাছতে হয়।
সিদ্ধার্থ।।
তাই আপনারা গণতন্ত্রকে ক্ষমতার গল্পে বদলে দিলেন। মানে, আমার একটা কিছু আপনাদের
খারাপ লাগলে আপনারা নিশ্চয়ই বলতে পারেন, এবং সেটা আটকে দিতে পারেন। কিন্তু উল্টোটা
হলে, গণতন্ত্র খাটে না। তাই তো?
রায়।।
সিদ্ধার্থ, শেষ কদিন তোমার উপর দিয়ে যথেষ্ট ধকল গেছে। আমাদেরও তোমার বিরুদ্ধে
স্টেপ নিতে আনন্দ হয়নি। এখন বাড়ি যাও ভাই। গিয়ে বিশ্রাম নাও। পরে, যখন সুযোগ পাবে,
ইচ্ছে করবে, একটু ভেবো এই –
সিদ্ধার্থ।।
আমি subordinate বলে কি আমার বাড়ি যাওয়াটাও আপনারা ঠিক করে দিলেন?
প্রিন্সিপাল।।
যেখানে যাবে, যাও না। কে না করেছে? মোটকথা, এই জিনিসটা নিয়ে আর brood কোরো না।
আপাতত যে দু সপ্তাহের suspension দেওয়া হয়েছে তোমায়, নিজেকে একটু unwind করো,
বিশ্রাম নাও। সময় দাও নিজেকে, সিদ্ধার্থ। তুমি মানুষ; ভুল সকলের হয়।
রায়।।
দু সপ্তাহ পর তো তুমি join করছোই, in any case. তখন জাস্ট একটা ছোট্ট কাজ করো।
একটা চিঠি করো, addressed to জিবি প্রেসিডেন্ট। ওই unconditional apology letter
টা, যেটা জিবি থেকে recommend করা হয়েছে। ওটা তুমি দিলেই নেক্সট জিবিতে আমরা ওটা
প্লেস করে, এই সার্ভিস বুকের ব্যাপারটা বাঁচিয়ে নিতে পারবো।
সিদ্ধার্থ।।
আর না দিলে?
রায়।।
কেন ভাই? চাকরিটা কি বড় নয় তোমার কাছে? আমাদের মতোই মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে তো তুমি।
সার্ভিস বুকে একটা দাগ থাকলে সেটা গিয়ে পরে কত ট্রাবল দেয় বলো তো! তুমি কি সেটা
ডিজার্ভ করো?
প্রিন্সিপাল।।
তুমি ছাত্রছাত্রীদের পছন্দের শিক্ষক, সিদ্ধার্থ। হতে পারে অফিশিয়াল জায়গাগুলো তুমি
স্পষ্ট বোঝো না। সে জায়গায় নিজের ভুলটার জন্য ক্ষমা চাওয়া তো দোষের নয়।
সিদ্ধার্থ।।
তখনই দোষের নয়, যখন আপনি যেটাকে ভুল বলছেন, আমিও সেটাকে ভুল বলে মানছি।
প্রিন্সিপাল।।
আচ্ছা আমার কথা বাদ দাও। জিবি তো বলছে দোষ। একটা থার্ড পার্টি –
সিদ্ধার্থ।।
যার এক্স-অফিশিও মেম্বার আপনি।
রায়।।
জিবির সিদ্ধান্ত হয় নিরপেক্ষ ভাবে, সিদ্ধার্থ। এ নিয়ে আজ অব্দি আমরা দ্বিমত পোষণ
করিনি। তুমি চিন্তা কোরো না। আমরা তোমার ভালোর জন্যই বলছি…
সিদ্ধার্থ।।
জিবি যে আমার থেকে চিঠিটা চেয়েছে, সেই রেজলুশনের কপিটা একবার দেখতে পারি?
প্রিন্সিপাল।।
আমার কথাকে সন্দেহ হচ্ছে?
সিদ্ধার্থ।।
হলে, সেটাও আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। আমি একটা চিঠি দেবো, সেটা কি আপনার মুখের
কথায়?
প্রিন্সিপাল।।
জিবি রেজলুশনের মতো confidential জিনিস আমি তোমাকে দেখাতে বাধ্য নই।
সিদ্ধার্থ।।
ঠিক এটাই জানতে চাইছিলাম।
রায়।।
ভুল করছো, সিদ্ধার্থ। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলো না।
সিদ্ধার্থ।।
খুব unfortunate, যে আমি এখনও বুঝতে পারছি না, আমার ভুল কোথায় ছিল!
রায়।।
যে প্রতিষ্ঠানের টাকায় খাও, তার বিরুদ্ধে যাওয়া কি দোষের নয়?
সিদ্ধার্থ।।
এটাই তো আমারও প্রশ্ন! আমার বিরোধিতাগুলো যদি একটুও ভেবে দেখেন আপনারা, দেখবেন আমি
প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে নয়, তার advancement-এর পক্ষে বলেছি প্রতিটি কথা। আমি
বিরোধিতা করেছি প্রশাসনের; প্রতিষ্ঠানের নয়।
প্রিন্সিপাল।।
এই তফাৎ করার জায়গা এটা নয়। তোমার থেকে যা চাওয়া হয়েছে, তুমি দেবে। দিলে, ভালো
থাকবে।
সিদ্ধার্থ।।
(একটু চুপ থেকে) দেবো না।
প্রিন্সিপাল।।
ক্ষমতা দেখাতে চাইলে, আমি কিন্তু দেখাতে পারি।
সিদ্ধার্থ।।
প্লিজ দেখান। আমি শেষ সাত বছর আপনার শাসানি শুনছি। এবার দেখান। দেখি, কতদূর দৌড়
আপনাদের।
রায়।।
নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারছ সিদ্ধার্থ! সময় থাকতে না বুঝলে, পরে বেরোনোর পথ পাবে
না। বড় দাদার মতো বলছি, কথা শোনো।
সিদ্ধার্থ।।
আমাকে আপনারা শুধু একটাবার বোঝান, আমি কোন কথাটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলেছিলাম? এখানে
রুটিনে জেনারেলদের ক্লাস নেই, ক্লাস দিতে হবে – এটা বলা অন্যায়? ব্যবহারযোগ্য
বাথরুম নেই, এটা মনে করিয়ে দেওয়া ভুল? জলের অসুবিধের কথা বলা দোষের? ফার্স্ট এড
বক্স expire করে গেছে, সেটা বলা ভুল? এই বিষয়গুলো নিয়ে যদি ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ
করে, সেটাকে সাপোর্ট করাটা দোষের?
প্রিন্সিপাল।।
এই প্রতিটা কথা প্রতিষ্ঠান বিরোধী।
সিদ্ধার্থ।।
না, প্রশাসন-বিরোধী। আমি শুধু এটুকু চাই, প্রশাসন ভালো কাজ করুক। এর জন্য আমি
ক্ষমা চাইবো?
রায়।।
কাদের জন্য এসব করছো, সিদ্ধার্থ? আলম, সব্যসাচী, সোহিনী – যাদের গুরু তুমি, তারাই
কি তোমার আদর্শে চলে? বা চলবে? প্রত্যেকে নিজের সুবিধে দেখে ও বোঝে, সিদ্ধার্থ।
মাঝেমাঝে পথগুলো এক হয়ে যাওয়া মানে এই নয় যে এটাই সত্যি।
সিদ্ধার্থ।।
ক্ষমা করবেন মনোতোষ বাবু। আমার কাছে শিক্ষার একটা পাঠ আছে, একটা ধারণা আছে। সেই
ধারণায় শিক্ষা কখনও প্রশাসনিক অক্ষমতার কাছে মাথা নোয়ায় না। যা দরকার, যেটুকু
দরকার, বলে। সেটা আমি নিজে যথাসম্ভব পালন করি, এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেখলে
খুশি হই।
রায়।।
তুমি এ যুগের ছাত্রদের চেনো না, ব্রাদার। আজ যাদের জন্য আদর্শের কথা বলছো, কাল
তারা সুবিধে দেখলে সটকে পড়বে। তখন?
সিদ্ধার্থ।।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, কেউ সটকে পড়বে না। পড়লেও, আমি একা আছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
শিক্ষার পক্ষে বললে যদি ক্ষমা চাইতে হয়, I am not going to give into this! একা
লড়বো, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে লড়বো। তারা যদি ভুল দিকে যায়, তাদের বোঝাবো কোন পথ ঠিক,
তাতে কতটা ধৈর্য্য লাগে। আজ আলম হোক বা –
(দরজা
খুলে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে উশকোখুশকো চুলের একটি ছেলে। তার চোখের চাহনি তীব্র,
অস্থির, উগ্র।)
প্রিন্সিপাল।।
(চমকে গিয়ে) এ কী! তুমি কে?
রায়।।
(কিছু আশাই করছিলেন, এই সুরে) আলম!
সিদ্ধার্থ।।
(অবিশ্বাস, আশঙ্কার সুরে) আলম!
প্রিন্সিপাল।।
ওহ! তুমিই আলম!
আলম।।
হ্যাঁ স্যর। সালাম জানাতে এলাম। পরীক্ষায় ফেল করেছি স্যর। আধ ঘন্টা আগে রেজাল্ট
বেরোলো।
সিদ্ধার্থ।।
কোথায় আটকালো? কিসে?
আলম।।
যে ল্যাবগুলো reagent-এর অভাবের কারণে হয়নি, সেগুলো তো পরীক্ষাতেও হয়নি। পাশ আর
হবে কী করে!
সিদ্ধার্থ।।
যতই যা হোক, সামনের বার ল্যাবগুলো ক্লিয়ার হয়ে যাবে। যাবেই, দেখিস।
আলম।।
'পরের বছর'? পরের বছর অব্দি কে অপেক্ষা করবে স্যর?
সিদ্ধার্থ।।
মানে? কী করবি তুই?
আলম।।
আপনাদের মতো টাকাপয়সাওয়ালা মানুষেরা পরের বছর নিয়ে ভাবতে পারেন স্যর। আমরা পারি
না। আমার সময় নেই। এই মুহূর্তে, পারলে এখনই একটা পথ খুঁজে বার করতে হবে টিকে
থাকার, সার্ভাইভ করার।
সিদ্ধার্থ।।
আমরা সেটা সামলে নেবো আলম। ভাবিস না।
আলম।।
আমার আব্বু রুগী। কোভিডের পর স্ট্রোক হয়ে বাড়িতে পড়ে আছে। একটা বছর চলে যাওয়ার ভার
আব্বু বুঝবে। আমার সময় নেই।
সিদ্ধার্থ।।
তার মানে?
আলম।।
রোজ দু বেলা এসে ডোডো শাসিয়ে যাচ্ছে, ওর 'বাজার' যেন আমি নষ্ট না করি। তাই একটা পথ
বাছতে হবে। আব্বুকেও রাখতে হবে, ডোডোকেও সামলাতে হবে। (প্রিন্সিপালের দিকে এগিয়ে
এসে একটা লম্বাটে চৌকো জিনিস পকেট থেকে বার করে দেখিয়ে বলে–) এটা কি জানেন স্যর?
প্রিন্সিপাল।।
কী?
(আলম
চাপ দিতে একটা ছুরি বেরিয়ে আসে।)
রায়।।
এটা তো ডোডোর!
সিদ্ধার্থ।।
সেটা আপনি জানলেন কী করে?
আলম।।
এটা পরশুদিন ডোডোর থেকে ছিনিয়েছি। সব্যসাচী হেল্প করেছে অবশ্য। নাহলে পারতাম না।
ছুরি দেখিয়েছিল। ছুরির উত্তর ছুরিই হবে – টিকে থাকতে হলে!
সিদ্ধার্থ।।
(অসহায় ভাবে চিৎকার করে) না আলম! তোকে, সব্যকে, সোহিনীকে এই ভাবে দেখার জন্য আমি
পড়াই নি! ছেড়ে দিস না। আমরা লড়াইটা বুঝে নেবো আলম। তোর এই পথটা পথ নয়। এটা ডোডোর
দেখানো একটা eye wash!
আলম।।
তা হলেও স্যর, এতে ইমিডিয়েট রেজাল্ট আছে। বুকে বসিয়ে দেওয়া যায়, ভয় দেখিয়ে টাকা
পাওয়া যায়! বাড়িটা চলে যাবে এটুকু হলে।
সিদ্ধার্থ।।
আলম!!
আলম।।
আপনার সঙ্গে বেঈমানি করবো না স্যর! আপনাকে সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই। এখনও
ঈমানদারের মতোই বলছি, আপনার শিক্ষার পথ আপনার জন্য সত্যি।
সিদ্ধার্থ।।
শিক্ষার পথ সবার জন্য সত্যি।
আলম।।
আমার জন্য নয়। আসুন, থাকুন আমার বাড়িতে, আমার এলাকায়। থেকে দেখুন, কীভাবে বাঁচতে
হয়।
সিদ্ধার্থ।।
প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রতিবাদের বস্তু হয়ে উঠো না আলম।
আলম।।
স্যর, আমরা ততক্ষণ ভালো, যতক্ষণ আমাদের বেঁচে থাকায় টান পড়ছে না, আমাদের হিসেব
গুলিয়ে যাচ্ছে না। প্রতিবাদ হবে আপনার জন্য! আপনার মোটা মাইনের চাকরিতে কলেজের
ভালো খারাপ চেয়ে আদর্শগত প্রতিবাদ সম্ভব! আমার রিয়ালিটি আমায় বেঁচে থাকতে বলে
স্যর, যেভাবে সম্ভব! জমি বুঝে বেঁচে থাকা! তার জন্য যদি হাতে ছুরি তুলে থ্রেট করে
বাঁচতে হয়, বাঁচবো। ভালো স্টুডেন্ট থেকে সোজা ফেল করলে সততা মাড়ানোর বান্দা নই
আমি। অসৎ হতে হয়, হবো। (বাকি দুজনের দিকে তাকিয়ে) আপনাদের অসততার সঙ্গে অসৎ হয়ে
হিসসা বুঝে নেবো!
প্রিন্সিপাল।।
তুমি ভালো ছেলে ছিলে, আলম। আমাদের আশা ছিল তোমায় নিয়ে …
আলম।।
হা হা হা হা হা! যেমন ছিলাম, ছিলাম স্যর। ভালো ছেলেকে ভালো করে যদি রাখতেন, সে
ছেলে সোনার টুকরো হয়ে ভালোই থাকতো, ভালোই রাখত। বিষ দিয়েছেন, তাই বিষ দিয়েই আপনার
খাতিরদারি করি আজ থেকে, প্রভু!
প্রিন্সিপাল।।
তোমাকে তোমার ভালো অবস্থায় দেখতে পেলাম না তেমন! আর আজ এই অবস্থায় …
আলম।।
ওটাই বোধ হয় ঠিক আছে স্যর। পড়াশুনার ইচ্ছে, চেষ্টা আমাদের যতদিন থাকে, আমাদের দেখা
যায় না। আপনারা দেখেও দেখেন না। তারপর যখন একদিন না পেরে হাতে ছোরা তুলে নিই,
আপনাদের দিব্যি চোখে পড়ে। দিব্যি আঙুল তুলে বলেন, "মোল্লাটার হাতে
ছুরি!" আমাদের মতো 'মোল্লা'দের জন্য এই ছুরিটাই ভালো বলুন? আপনাদের চিনতে
একটু সুবিধে হয়। আমাদের হাতে তো আপনারা ছুরিই দেখতে চান, শিক্ষা নয়।
রায়।।
ব্যাপারটা এত সহজ নয়, আলম।
আলম।।
আমাকে ডোডো ভাববেন না যেন! আমাকে ডোডোর মতো দেখালেও, আমি ডোডোর দলে নাম লেখাই নি।
একই পথে খেলবো, তবে নিজের নিয়মে। কেরিয়ার তো আমার আর জুটলো না স্যার। আপনারা ভাতে
মারছেন, আর এর পরে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা জাতে মারবে। ঠিকই আছে! জাতেই মরবো!
অন্তত লোকে জানবে, কে মরলো, আর কে-ই বা এতদিন বেঁচে ছিল!
(আলম
যেভাবে ঢুকেছিল, সেভাবেই ঝড়ের মতো বেরিয়ে যায়। সিদ্ধার্থ ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসে
পড়ে।)
রায়।।
যাক! ডোডোর আরেকটা ভার্শন এল! সামলানো সহজ হবে!
প্রিন্সিপাল।।
কিন্তু মিস্টার সিদ্ধার্থ মিত্র! তোমার কী হবে? এত বড় বড় কথা! বড় বড় স্বপ্ন!
ছাত্রদের শিখিয়ে পড়িয়ে কী করবে যেন!
রায়।।
লায়েক করবে তাদের। কচি কচি বিদ্রোহী গড়ে তুলবে। সমাজ গড়বে। শিক্ষা মাড়াবে।
(দুজনে
এগিয়ে আসতে থাকে সিদ্ধার্থের চেয়ারের দু পাশ দিয়ে।)
প্রিন্সিপাল।।
তোমার মতো অসংখ্য শিক্ষক এসেছে আর গেছে, সিদ্ধার্থ মিত্র। আবার আসবে, আবার যাবে।
রায়।।
এবং মাঝের এই সময়টায় হেভিওয়েট আদর্শের জালে জড়িয়ে পড়ে পড়ে ডিসিলিউশনড হবে।
প্রিন্সিপাল।।
তুমি আর তোমার মতো অসংখ্য এরকম অর্বাচীন পাকাদের মুখে থুতু দিই আমি। You have cast
your own dice, সিদ্ধার্থ!
রায়।।
পালাতে পারতে। পালাওনি। হাত মেলাতে পারতে, মেলাও নি। ক্ষমাও চাও নি। আদর্শ দিয়ে
বদলাতে চেয়েছো আমাদের।
প্রিন্সিপাল।।
একটু একটু করে, তিলে তিলে হ্যারাস করতে করতে এমন অবস্থা করবো তোমার, এবং তোমার মতো
আদর্শের বেশ্যাদের, পালানোর পথ পেলেও তখন পড়ে পড়ে মারই খাবে।
(সিদ্ধার্থ
চিৎকার করে ওঠে। সব আলো নিভে একমাত্র ওর উপর আলো এসে পড়ে। দর্শকদের উদ্দেশ্যে –)
সিদ্ধার্থ।।
না, না, না! সে হবে না। আমি হতে দেবো না। আমি! আমি! আজ অব্দি প্রাণপাত করে যা
শিখেছি, যা জেনেছি, সেটুকু নিয়ে লড়ে যাবো সবকিছুর বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে নিজের আজকের
এই নীরবতার বিরুদ্ধেও। লড়বো, লড়ে যাবো ভবিষ্যতে। আজ আলম গেছে, কাল আলতাফ আসবে,
অসীম আসবে, আমিনা আসবে। আজ যদি এরা বোমা তুলে নেয় হাতে, কাল ওরা বই তুলবে, এবং
তুলবেই। আজ যদি ঘুষ আসে, কাল দান আসবে। আসবেই। আমি সে দিন দেখার জন্য থাকব।
ভবিষ্যতে। অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে। কিন্তু আজ? আজ তো আমি নীরব। অন্তত নীরবই তো
ছিলাম এতক্ষণ, কথা তো বলতে পারিনি। নাট্যকার এই সংলাপ দিলেন, নির্দেশক আলো ফেললেন,
বাকিদের ফ্রিজ করে দিলেন, তাই বলতে পারলাম। আপনাদের জীবনে কোনও নাট্যকার লিখে দেবে
না সংলাপ, নির্দেশক স্পটলাইট দেবে না। কিন্তু দোহাই, আমার মতো চুপ করে থাকবেন না
আপনারা। আজ যদি কিছু বলার মনে হয়, আজই বলুন। যা অসৎ, ভুল, তাকে গলা তুলতে দেবেন
না। একবারের জন্যও না। মানুষ হিসেবে, বোধ ও বুদ্ধির দাস হিসেবে, এইই আমাদের এখনকার
একমাত্র কাজ।
(এই
কথাগুলি বদলে বদলে যেতে পারে অভিনেতার স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী। কথাগুলি বলা হতে হতেই
মিউজিক্যাল ক্রেসেন্ডো, এবং পর্দার নেমে আসা।)
— শেষ —
.jpg)
Comments
Post a Comment