ভক্ত হৃদয়, প্রণত চিত্ত
ভালো আর মন্দ নিয়ে, শান্তি আর দ্বন্দ্ব নিয়ে, মরণের সম আর জন্মের ফাঁক নিয়ে অনাদি অনন্ত যে ছন্দ স্পন্দিত হচ্ছে ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু – সবেতেই, সেই ছন্দ কে শোনে? সে কার মরমে পশে? কে সেই ছন্দে নেচে ওঠে?
ঐশ্বর্যের ও দৈন্যের, ঊষার ও নিশার, পেলবতার ও রুক্ষতার যে আবহমান সাজে এই বিশ্ব সেজে উঠছে প্রতি মুহূর্তেরও ক্ষণ-খণ্ডে বারবার, সেই সাজ সত্য সত্যই প্রত্যক্ষ করে কে? কে ব্রহ্মাণ্ডের সেই সজ্জায় নিজেও সেজে ওঠে নিরন্তর?
পূজা পর্যায়ের ৩২১তম রচনায় রবীন্দ্রনাথ ভারি সুন্দর উত্তর দিচ্ছেন উপরের দুটি প্রশ্নের; ভক্তের হৃদয়, এবং প্রণত চিত্ত – একমাত্র এঁরাই শোনে সেই অনাহত ছন্দ, এঁরাই সঠিক সেজে ওঠে বিশ্বসাজে।
কে এই ভক্ত? কিসে তাঁর ভক্তি? চিত্তটিই বা কার কাছে প্রণত?
রবীন্দ্রনাথের আশ্চর্য মিলনান্তক বোধের সঙ্গে পরিচিত পাঠক অনুভব করবেন, ভক্ত তিনিই যিনি জন্ম ও মরণ, যুগ ও যুগান্ত, সৃষ্টি ও প্রলয় – সবেতেই নিজের মনটি রেখেছেন, পরমবস্তু লাভের নির্ভেজাল আকাঙ্খায়। তিনি তফাৎ করেন নি সুখ ও দুঃখে; বরং হৃদয় দিয়ে বসে আছেন উভয়েরই মধ্যস্থ বোধলাভের আনন্দকে। সেই আনন্দের প্রতি প্রেমেই তাঁর নৃত্যাভিলাষ।
ভক্তহৃদয় যখনই আনন্দের উৎসে আর বিভেদ না করে, ক্ষণিকের ছলনে না ভুলে ডুব দিচ্ছে সমগ্রের ব্যাপকতায়, তখন সে-ই সম্ভবত হয়ে উঠছে প্রণত চিত্তও। সেই চিত্ত পূর্ণ ও শূন্য, বর্ষা ও শীত – সকলের কাছে সমান ভাবে প্রণত। রাজার বেশ সে চিনেছে বলে দীনদুখিনীর বেশ সে পরিত্যাগ করেছে, এমন নয়। অনাবৃষ্টি দেখলেও, সে আমন ধানের দোল ভুলে যায় নি। সোনার পালঙ্ক সে দেখলেও, ধূলার ভৈরবকে দূরে ঠেলে দেয়নি। সে সদাসর্বদা গ্রহিষ্ণু, শ্রদ্ধাবনত; বিশ্বসজ্জার সেই মাধুকরীই তার সম্বল।
মনে পড়ে, 'আত্মপরিচয়'-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, "হে মৃত্যুঞ্জয়, আমাদের সমস্ত ভালো এবং সমস্ত মন্দের মধ্যে তোমারই জয় হউক।" প্রণত চিত্ত, ভক্ত হৃদয়ই একমাত্র এমন প্রার্থনা করার অধিকারী।
Comments
Post a Comment