পাহাড়পথের ফেরেশতারা: একটি আলোচনা
বই: পাহাড়পথের ফেরেশতারা
লেখক: রবীন্দ্রনাথ হালদার
প্রকাশক: সুচেতনা (কলকাতা বইমেলায় স্টল নং ২৮২)
মূল্য: ২৫০/-
========
⏩ গতকালও পাহাড়পথের ফেরেশতারা বিষয়ে সংক্ষেপে কয়েকটা কথা লিখেছিলাম। বই পড়া শেষ হয়নি তখনও। কিন্তু গতকাল রাত আর আজ সারাদিন মিলিয়ে পড়ে ফেললাম। 'পড়ে ফেললাম' কথাটা ভুল বলা হল। একটা প্রবল শক্তি যেন আমায় দিয়ে পড়িয়ে নিল বইটা। স্টেশনে বসে বসে, ট্রেনে যেতে যেতে, কলেজে বসে – রুদ্ধশ্বাসে পাতা উলটে গেছি।
⏩ হিমালয়-অন্তঃপ্রাণ মানুষ রবীন্দ্রনাথ হালদার। তিনি অভিযাত্রী, শৃঙ্গজয়ী, পর্বতারোহণ-প্রশিক্ষক। বর্ণময় তাঁর অভিযানগুলো, হিরেমানিক লুকিয়ে আছে তাঁর অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে। আরোহণের স্মৃতি খুঁড়ে রবীন্দ্রনাথ হালদার তুলে এনেছেন দশজন মানুষের কথা, যাঁদের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ আলাপ ও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল কখনও না কখনও। এক এক মানুষ – এক এক নাম, এক এক জায়গায় তাদের ভিটেমাটি, এক একরকম তাঁদের চেহারাছবি। তবু এক জায়গায় তাঁদের সবার সুতো বাঁধা। সেটা কী? তাঁরা প্রত্যেকেই আরোহণের আখ্যানে আড়ালে থেকে যাওয়া কিছু মানুষ। এঁরা প্রায় সবাইই হয় এক্সপিডিশনের 'গাইড', অথবা 'পোর্টার'। অভিযান ফুরোলে, শৃঙ্গজয় হলে নেমে আসে যে বিজয়ীদের দল, তাদের হাসিকথার মাঝে, এমনকি অফিসিয়াল রিপোর্টের পাতাতেও এই গাইড ও পোর্টাররা ব্রাত্য। অথচ, তাঁদের ছাড়া অভিযান শেষ হওয়া তো দূরস্থান, শুরুই হত না। তাই, কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ সব পার্বত্য অভিযানে অভিযাত্রীদের 'কুশন' হিসেবে নিরলস কাজ করে চলা এই মানুষেরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রান্তিক, ও বিস্মৃতপ্রায়। তাঁদের সাহসের, সততার, সারল্যের এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দলিল এই বই।
⏩ কী পাব এই বইতে?
🟡 রুদ্ধশ্বাস কিছু অ্যাডভেঞ্চারের মুহূর্ত।
🔴 শৃঙ্গ অভিযানের নানা খুঁটিনাটি।
🟠 বিপর্যয়ের মুখে আশ্চর্য কিছু উপস্থিতবুদ্ধির বর্ণনা।
আরও একটা জিনিস থরে বিথরে এই বইতে উপস্থিত, কিন্তু বুলেট পয়েন্টে তাকে বাঁধা সম্ভব নয়। তা হল স্মৃতিমন্থিত সেই দশজন তথাকথিত 'সাধারণ' মানুষের অসাধারণ ভালোবাসা, কর্তব্যবোধ এবং ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ। এরাই পাহাড়পথের ফেরেশতা। আমাদের মতো শখে বা উন্মাদনায় নয়, তাঁরা বিপজ্জনক সব পার্বত্যপথে পাড়ি দেন তাঁদের রুজিরুটির সন্ধানে। কোনও অচেনা অজানা কুয়াশাবৃত গ্রামে অপেক্ষা করছে তাঁদের পরিবার। অভিযান থেকে সাফল্য নিয়ে ফেরেন অভিযাত্রীরা, ফেরেশতারা ফেরেন তাঁদের বাড়ির সামনের কদিনের পেট চালানোর খরচটুকু জুটিয়ে। দারিদ্র তাঁদের কাছে করুণার পাত্র, ভয় তাঁদের অভিধানে নেই। ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে, বা দুর্ঘটনার কিনারে দাঁড়িয়ে যখন বিহ্বল অভিযাত্রীর দল, তখন এই ফেরেশতাদেরই কেউ তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ বুদ্ধি বিবেচনায় ত্রাতা হয়ে ওঠেন – সে কূটবুদ্ধি নয়, মানবিক বুদ্ধি।
⏩ স্মৃতিকথনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ হালদার আমাদের যে যে জায়গায় নিয়ে গেলেন, তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই সেই জায়গা, যেখানে এই বই আমাকে আপনাকে নিয়ে যেতে পারে। মানুষের মন, ভারতীয় সমাজ – সর্বত্রগামী এইসব স্মৃতি। বইটি পড়তে পড়তে কতবার যে চোখ ভিজে গেছে দুঃখে, আনন্দে, গর্বে – সে আর গুনিনি। এ বই এক প্রকট সমাজভাষ্য। পড়তে পড়তে মনে হয় – আজও এই কষ্ট নিয়ে, অবহেলা নিয়ে মানুষকে বাঁচতে হয়? আজও এভাবে নিঃস্বার্থপরতা দেখা যায় আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে? এইসব মানুষেরা যে দেশের মাটিতে হেঁটেছেন, জীবন কাটিয়েছেন, আমিও সে মাটির সন্তান – এ কি কম গর্বের!
⏩ বইয়ের আলোচনা থেকে একটু সরে এসে বলি, স্বামী বিবেকানন্দকে যে আমি কতবার খুঁজে পেয়েছি এই বইতে! একটি কথা স্বামীজী জীবনভর বলে গেছেন, "ভারতের জাতীয় জীবনের মূল সুর হল ধর্ম। তাকে লঙ্ঘন করে কিছু করা ভুল পদক্ষেপ।" স্বামীজীর এই কথাটির প্রভাব পপুলার মিডিয়ায় বহুবিধ। প্রাতিষ্ঠানিক হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাধারীরা কথাটিকে সুচারুভাবে ব্যবহার করেন তাদের প্রচারে। আবার নাস্তিক প্রগতিশীলেরা স্বামীজীর প্রতি শ্লেষ নিয়ে বলেন, "এই তো তাঁর প্রগতিশীলতার দৌড়! জাতীয় জীবনের মূল সুর নাকি ধর্ম! মরি আর কি!" অথচ তাঁরা কেমন তাঁদের বিরোধী হিন্দুত্ববাদের ভাষ্যকেই প্রামাণ্য হিসেবে ধরে নিয়ে বিরুদ্ধতা করেন, অবাক লাগে! কথা বলার আগে সত্যিকারের কথাগুলো একটু পড়ে নেওয়ার ধৈর্য্য ও উদারতাটুকুও তাঁদের নেই আজ আর। আবার এই উক্তির পাশাপাশি স্বামীজী নানা জায়গায় বলছেন, "গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দে তোদের ঘন্টা চামর, আর মানুষের মধ্যে যে দেবতা প্রকট, তাঁর পূজা কর।" বা "আমি সেই দেবতার পূজারী, যাকে তোমরা ভ্রমবশত মানুষ বলে থাকো।" এসবে বিভ্রান্ত হয়ে আবার আরেকদল মানুষ বলেন – যে মানুষের মধ্যে এত স্ব-বিরোধিতা, আজ বলছেন মূল সুর ধর্ম, কাল বলছেন ঘন্টা চামর ভাসিয়ে দিতে, তাঁকে আবার আদর্শ হিসেবে কী মানব?
⏩ স্বামীজীর ধর্ম কী ছিল, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ হালদারের এই বই। যে ভারতবর্ষের প্রেমে বিবেকানন্দ পড়েছিলেন, যে ভারতবর্ষের কথা ভেবে নিজের ঘরে তিনি একা একা চোখের জল ফেলতেন, সেই ভারতকে আমি খুঁজে পেলাম এই বইতে। স্বামীজীর লেখায় এই ভারতের কথা, এই পবিত্র সরলতার কথা, মানুষের দেবত্বের কথা পড়তে পড়তে মনে হত – এও কি সম্ভব! চোখে দেখলে না হয় বিশ্বাস করতাম! চোখে দেখা – এই আমাদের বড় একটা জোরের জায়গা। তত্ত্বও হার মেনে যায় সেখানে। যেমন দাদু দিদা মামা জ্যাঠার কাছে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে আমরা জিজ্ঞেস করি, "সত্যি বলছো, তোমার নিজের চোখে দেখা?", যেমন সন্দিগ্ধ, তার্কিক যুবক নরেন্দ্রনাথ দক্ষিণেশ্বরের পাগলা বামুনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন "আপনি নিজের চোখে ঈশ্বরকে দেখেছেন?" চোখে দেখাই শেষ কথা। সেখানে সব তর্কের, দ্বন্দ্বের ইতি। বিশ্বাসের শুরু। রবীন্দ্রনাথ হালদারের স্মৃতি ভেঙে উঠে আসা এই দশজন মানুষের কথা পড়তে পড়তে মনে হয়, এঁদের নিজের চোখে দেখেছেন লেখক। তাহলে বিবেকানন্দের সেই মানুষেরা, সেই ভারতবর্ষ – সব সত্যি! সব আছে। নাহলে এই এত কুটিল, দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষের ভিড়েও ভারতবর্ষের কথা ভাবলেও চোখে জল আসে কেন!
⏩ বারোই জানুয়ারি বা এগারোই সেপ্টেম্বর নানা ইস্কুলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঘুম জড়ানো গলায় শোনা যায় স্বামীজীর লেখা স্বদেশমন্ত্রের পাঠ। "হে ভারত, এই পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরামুখাপেক্ষা, এই দাসসুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা – এইমাত্র সম্বলে তুমি উচ্চাধিকার লাভ করিবে?" দুঃখের বিষয়, ছোটদের বছরের বাকি দিনগুলোয় যে সমাজের বাসিন্দা হয়ে থাকতে হয়, সে সমাজ তাদের এই পরানুবাদ আর পরানুকরণের ছবিই বারবার দেখায়। তাই বছরে দু দিন সেই স্বদেশমন্ত্র তাদের কাছে কোনও ছবি তৈরি করার আগেই মিলিয়ে যায়। ঘুম জড়ানো গলায় নয়, বিবেকানন্দের স্বদেশমন্ত্র মনে আসে গর্জনের মতো। "ভুলিও না―তোমার সমাজ বিরাট মহামায়ার ছায়ামাত্র; ভুলিও না—নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মূচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই! হে বীর, সাহস অবলম্বন কর; সদর্পে বল—আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই।" পাহাড়পথের ফেরেশতারা সেইসব ভারতবাসী। তাঁরা কেউ ছুটে আসা বিরাট পাথরের সামনে পিঠ পেতে দেন শিশুকে বাঁচাতে, কেউ বরফে তলিয়ে যাওয়া মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে নিয়ে আসেন হাসিমুখে, কেউ নিজে অভুক্ত থেকে অভিযাত্রীদের খাবার জুগিয়ে যান। এঁদের কাজে ও যাপনে বজ্রের মতো আছড়ে পড়ে সেই কথা – "বল—মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই; তুমিও কটিমাত্র-বস্ত্রাবৃত হইয়া, সদর্পে ডাকিয়া বল―ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ।" ছোটদের যদি রবীন্দ্রনাথ হালদারের এই বই পড়ানো যায়, তবে হয়তো তাঁরা দেশকে আরও কিছুটা চিনবে।
⏩ লেখকের স্মৃতিতে এমন আরও কত, কত গল্প লুকিয়ে ছিল, কে জানে। আরও কত ফতেচাঁদ, মানবাহাদুর, দুলেরাম, লক্ষ্মণ সিং রানার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হওয়া বাকি রয়ে গেল। বাকি রয়ে গেল, কারণ 'পাহাড়পথের ফেরেশতারা' প্রকাশিত হওয়ার মাত্র কদিন আগেই রবীন্দ্রনাথ হালদার শরীর ত্যাগ করলেন। তিনি যে আজ আমাদের মতো করে আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, এ কথা অস্বীকার করে কী করে! আবার তিনি যে নেই, এ কথা বলারই বা ধৃষ্টতা দেখাই কীভাবে! কে আছে, আর কে নেই – সে কি মানুষ ঠিক করে দেবে? দিব্যি আছেন রবীন্দ্রনাথ হালদার, তাঁর বইতে। যদি তাঁর নশ্বরতার একশো প্রমাণ আমি নিজেকে দিই, এই বইয়ের ১২০ পাতার প্রতিটি পাতায় তিনি অসংখ্যবার ভাস্বর, জীবন্ত। মহাকাশবিজ্ঞানী যেমন আমাদের চিনিয়ে দেন সপ্তর্ষিমন্ডল, কালপুরুষ, আর আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি, তেমনই এই বইতে রবীন্দ্রনাথ হালদার আমাদের চিনিয়ে দিতে থাকেন সত্যিকারের মানুষদের। মানব-ইতিহাসের আকাশের নক্ষত্র এঁরা।
Comments
Post a Comment