Followers

ছোট গল্প: অসম্পূর্ণ দৃশ্যকল্প - ২

বড় রাস্তার ধারের চায়ের দোকান। প্রায় মাঝরাত অবধি খোলা থাকে। এখন অবশ্য মাঝরাত হতে দেরী আছে। অল্প একটু ভিড় আছে দোকানটায়। এক দাদু মোটা মাফলার জড়িয়ে বসেছেন বেঞ্চিতে, সঙ্গে তার বন্ধু। বন্ধুর বয়স হয়তো অপেক্ষাকৃত কম, ঠাণ্ডাও কম লাগে তাঁর। আপিস-ফেরতা দু তিনজন বাইক দাঁড় করিয়ে চা-কফি চেয়েছে। একজনের চা খাওয়া শেষও হয়ে গেছে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগ বার করতে করতে সে বলে, "... আর হল গিয়ে, একটা রেগুলার গোল্ড ফ্লেক।" চায়ের দোকানের পাশে একটা ইনোভা গাড়ি আদি-অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথার উপরে ঝুঁকে আছে সজনে গাছ। তার মাঘী পাতাগুলো হলুদ আলোয় খেলা করছে। সেই আলোছায়ায় দোকান থেকেই কতগুলো বসার টুল রেখে দিয়েছে। তারই মুখোমুখি দুটো টুলে বসে আছে একটা ছেলে আর একটি মেয়ে। 

তাদের বয়স কত হবে আর, বড়জোর চব্বিশ পঁচিশ। তারা বসে আছে চুপচাপ। কথা সরছে না কারো মুখ দিয়েই। ছেলেটার চোখ মাটির দিকে; খুব মন দিয়ে সে পিচরাস্তা পর্যবেক্ষণ করছে। মেয়েটার চোখ অবশ্য মাটিতে আটকে নেই, তবে সে-ও অন্য মানুষটির দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না। মেয়েটি তাকিয়ে আছে দূরে, যেখানে ব্রিজ থেকে গাড়িগুলো নামছে, সেদিকে। আহা, প্রথম দেখা হয়েছে হয়তো ওদের দুজনের। সেই যে কোন একটা কবিতা আছে না – শালিখঠাকুরের কাছে প্রার্থনা, ওদের দেখা হোক? এই হয়তো দেখা হল। কথা জোগাতে সময় লাগে একটু।

দাদু গোপাল বিড়ির খোঁজ করছেন। দোকানের ছেলেটি দাদুকে সাংঘাতিক এক অধিকারবোধে বকছে, "তিরাশি পেরোলে না তুমি? এবার এই বিড়ি-ফিড়ি ছাড়ো না দাদু! শেষ কটা দিন শান্তিতে থাকো না!" দাদু খিঁচিয়ে ওঠেন, "শেষ  বয়সে এসে তোদের দশ টাকা দামের সিগারেট খাই আমি আর কি! বাপ ঠাকুদদা বিড়ি খেয়ে মরল, আর ইনি এসেছেন আমাকে শেখাতে!" দাদুর বন্ধু ফ্যাকফ্যাক করে হাসেন। ধোঁয়া আর কফ জড়ানো সেই হাসিতে। তারপর বলেন, "ম্যাগিটা করে দে এবার, বাবু! আজ এটাই ডিনার!" দোকানের ছেলেটি গজগজ করতে থাকে, "তোমরা দুই বুড়ো এসব করে মরবে, আর কেস খাব আমি!" দাদুর বন্ধু আবার খ্যাখ্যা করে হেসে বলেন, "কে কেস দেবে তোকে? কেস দেওয়ার লোকই তো নেই! ও চলে যাওয়ার পর থেকে রাতের খাওয়াটা আর বাড়িতে খেতে ইচ্ছে করে না।"

টুলে বসা ছেলেটা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কী যেন বলার উদ্যোগ নিয়েও, আবার মাথা নামিয়ে ফেলে। পুরো সময়টা জুড়ে মেয়েটা একবারও তাকায় না ওর দিকে। 

বিশ্রী শব্দে ফোন বেজে ওঠে এক বাইকারোহীর। ফোন ধরে সে বলে, "হ্যাঁ স্যার, না স্যার ... না না স্যার, আমি জাস্ট বাড়িতে ঢুকেই ... একদম স্যার! না না, হঠাৎ জ্যাঠার একটা attack হয়েছে শুনলাম, এই দেখতে এসেছি একটু। আমি পাঠিয়ে দেব স্যার। শিওর স্যার!" ফোন কেটে দেয় সে। পাশ থেকে তার বন্ধু বলে, "বাড়িতে গিয়েও চিল করতে পারে না শুয়ারটা! তোর পোঙা মেরে যাচ্ছে!"

ছেলেটার হাতে নতুন সিগারেটের বাক্সের রাংতা। ও সেটাকে নানা প্যাটার্নে ভাঁজ করছে, খুলছে। আবার ভাঁজ করছে এক মনে। মেয়েটির দৃষ্টি ব্রিজের দিকে বাঁধা। ওদের চায়ের কাপগুলো ফাঁকা।

দাদু মাফলারটা একটু আলগা করে বলেন, "এবারের মতো শীতটা ছাড়ল তাহলে!" তাঁর বন্ধু বলেন, "আভাওয়া দপ্তর এখনও বলচে, নেতাজির জন্মদিনে কলকাতা আবার কাঁপবে!" দাদু তড়িঘড়ি মাফলার ঢেকে বলেন, "আবার?"

সিগারেটের প্যাকেটের রাংতাটুকু ছিঁড়ে ছিঁড়ে টুকরোগুলো দুই হাতে দুই দিকে ফেলে দেয় ছেলেটা। একবার তাকায় মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটার চোখ তখন মাটিতে পড়ে থাকা রাংতার দিকে। ছেলেটা আচমকা মাথায় হুডি ফেলে, সামনের দিকে ঝুঁকে, কনুই দিয়ে দুই হাঁটুতে ভর করে, হাতে নিজের মুখ ঢেকে নেয়। তার পিঠ কেঁপে কেঁপে ওঠে। মেয়েটির চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে আরও, আরও। সে দূরে তাকিয়ে থাকে। আজ হয়তো ওদের শেষ দেখা। কে জানে।

বাইকারোহীরা পাওনা মেটাতে পাঁচশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলে, দোকানের ছেলেটা বলে, "সত্তর টাকার জন্য পাঁচশর খুচরো হবে না দাদা। ওই যে ওদিকে অনলাইন কোড। ওখানে মেরে দাও।"

(ছবি – শ্রীময়ী)

Comments