Followers

শ্মশানলিপি: কিছু অনুভূতি, কিছু উপলব্ধি

[২৫/১২/২০২৫ এবং ২৬/১২/২০২৫ তারিখে আমার দিনলিপি থেকে কিছু অংশ নিচে প্রকাশ করলাম। একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি, পাছে পার্থিব ঘটনার ভিড়ে মুছে যায়, তাই লিখে রাখলাম। এর চেয়ে বেশি আর কোনও দাবি নেই এই লেখার।]


২৫/১২/২৫, রাত

আজ দুপুরে ছোটমামার যন্ত্রণার অবসান হল। ১:৪০ নাগাদ। বোড়ালে, গড়িয়া আদি মহাশ্মশানে দাহকাজ হল।

*

শ্মশান অপূর্ব পবিত্র, dignified একটা জায়গা – আমার মনে হয়। If one is paying enough attention, শ্মশান তাঁর মনকে উচ্চস্তরে তুলবেই। জীবনের সারসত্যের কথা মনে করাবেই।

*

আজ শ্মশানে অদ্ভুত একটা vibration পেলাম। সব তো আর লিখে রাখা যায় না। মনে থেকে যায়। অনেকরকম গতির, ছন্দের জলের তরঙ্গ একসঙ্গে শরীরে অনুভব করলে যেমন হয়, তেমন।

*

বড়দিনের শীতসন্ধে। নিঝুম বট অশ্বত্থ। শ্মশানকুকুরের দল। সবাই চলে যাওয়ার পর জনশূন্য শ্মশান। আলো। চাঁদ। জলাশয়। দাহের ধোঁয়া। শ্মশান ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মানুষের জীবিকা।

*

আর এই সব কিছুর উপরে একটা তরঙ্গ – কিছুটা মুক্তির, কিছুটা বন্ধনের।

বলা মুশকিল।


২৬/১২/২৫, সকাল

যে নদী মজে গেছে, তাতে নৌকা বাওয়ার অর্থ কী?

যে রথ ভেঙে গেছে, তার রথী হয়ে কোথাও পৌঁছানো যায় না।

*

গতকাল শ্মশানে শবস্পর্শ করে বসেছিলাম যখন, বারবার নিজেকে বলছিলাম – যাঁকে ছুঁয়ে আছি, তিনি আধার মাত্র। কেবল বস্ত্রটুকু। যাঁকে চিনেছিলাম, একটি নাম ও একটি রূপে চিনেছিলাম। এইই আমার চোখের সামনে তাঁর জড় রূপটি কেবল। 

মৃত্যুতে আমাদের এসব শেখানো হয় না। দুঃখ শেখানো হয়। তাই নিজেকে বারবার বলা প্রয়োজন। If death comes, we must let it teach us the Truth. We must unlearn to be free. 

*

বারবার ছোটমামার দিকে তাকাচ্ছি, আর মনে হচ্ছে – তিনিই তো 'নেই' হয়ে গেলেন। অথচ সহজ সত্য কী বিপরীত! তিনি প্রশ্নাতীত বিদ্যমান। এই খোলটুকু ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন আরেকদিকে। বারবার এ কথা নিজেদের বলা প্রয়োজন। আমি ভুল ভাবলেও, সত্য তাতে বদলায় না। আলো নিভিয়ে দিলে, বিদ্যুৎ নিভে যায় না। সে তখন অন্য খাতে বয়। 

*

যাঁকে চিনেছিলাম, তিনি কি এখানে আছেন? এই রূপের মধ্যে আর নেই। কিন্তু এই স্থানে কি তিনি এসেছেন? এসে থাকতেও পারেন। হয়তো এসেছেন, আছেন। হয়তো দেখছেন নিজের আধারের শেষকৃত্য। এরপর তাঁর অপেক্ষা শুরু হবে, আরেকটি দেহের, বা মুক্তির। বাসনা থাকলে, দেহ। নির্বাসনায় মুক্তি।

*

তাঁর মতো এমন আরও কত কত জন আছেন এখানে?

কাল মনে হল, অনেকে আছেন। আশেপাশেই। যাঁর যত বেশি টান, তাঁর তত বেশি মায়া, তিনি তত বেশি ঘন হয়ে আছেন এই শ্মশানে।

*

দাহকাজের প্রাত্যহিকতার মাঝে একটা অন্য জগৎ, অন্য অনুভব উঁকি দিচ্ছে।

*

চারটি কুকুর। একটি নেতা, অন্যেরা সঙ্গী। দাহকাজ শুরু হলে নেতা বাইরে প্রহরীর মতো বসে থাকে। বাকিরা চুল্লীর কাছে/চুল্লীর দিকে ফিরে মুখটি মাটিতে ঠেকিয়ে বসে থাকে শান্ত হয়ে। দাহকাজ হলে, উঠে চলে যায়। আমি নিশ্চিত, ওরা প্রয়াত আত্মার উপস্থিতি, তাঁর শক্তি অনুভব করে। নিজের বাসস্থান ছিল এতদিন যে দেহ, তাকে দাহ হতে দেখে সকলেই হয়তো কমবেশি কষ্ট পান। তাঁদেরই কষ্টে হয়তো কুকুরগুলো ঐভাবে দুঃখী হয়ে থাকে।

*

বড় মায়াময় শ্মশানটি। অনেক, অনেক বন্ধন অনুভব করা যায়।আবার নির্মোহ শেষ কথাটাও অনুভব করা যায়। কাল যেন একটা আলাদা ইন্দ্রিয় গজিয়েছিল আমার। কী যে হচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম না। ভিতরে বুকে যেন কিছু একটা বদলে বদলে যাচ্ছে। ঘাড়ের কাছে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে। এ মৃতদেহ দেখার প্রভাব নয়; মৃতদেহ আমায় বিচলিত করে না কখনোই। অবাক করে কিছুটা। কিন্তু এ একেবারে ওই পরিবেশের প্রভাব। দাহকাজ শুরু হওয়ার পর ঠাণ্ডা ভাব একদম কেটে গেল। গরম। আবার শ্মশান থেকে বেরোনোর ঠিক আগে মারাত্মক ঠাণ্ডা।

কাল অনেকের কষ্ট যেন একেবারে ছুঁয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম। তাঁদের রয়ে যাওয়া বন্ধন, বাসনা অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এখানে অনেকেই জানেন না, এবার কী। একটা জন্ম শেষ হয়েছে, পরের জন্মের হয়তো দেরী আছে। মাঝের সময়টায় তাঁরা যেন কিছুটা উদ্দেশ্যহীন ভাবে নিজেদের শরীর শেষবার যেখানে দেখা গিয়েছিল, তারই আশেপাশে বাস করছেন। কাল শ্মশানে প্রায় পুরো সময় জুড়ে দীক্ষামন্ত্র জপ করে গেছি। আমার মন, দৃষ্টি আর কতটুকু। ছোটমামার জন্যই করেছি। তবে মনে মনে চেয়েছি, আমার এই মন্ত্র উচ্চারণের জোর যদি থাকে কিছুমাত্র, আরও যাঁরা আছেন – যাঁদের আমি চিনি না, কিন্তু আজ অনুভব করছি – তাঁরা সবাই এতে শান্তি পান, সকলের ঊর্ধ্বগতি হোক।

*

কাল শ্মশান থেকে ওঁরা বেরিয়ে যাওয়ার পরেও ইচ্ছে করে আরও দশ মিনিট একা ছিলাম। এই অনুভূতিগুলো, যোগাযোগগুলো যেন একেবারে জড়িয়ে আস্বাদ করে নিতে চাইছিলাম। তখন, আমি ছাড়া গোটা শ্মশান চত্বরে আর মাত্র এক জন। আহা, সেই নির্জনতা, সেই মায়া, সেই নির্মোহ সত্য!

Comments