Followers

সিলেবাসের বাইরে

শিক্ষকতা কি শুধুই সিলেবাস শেষ করার আরেক নাম? শুধুই প্রশ্নপত্র তৈরি? শুধুই খাতা দেখা আর নম্বর আপলোড? শুধুই পাশ আর ফেলের বিচারে ছেলেমেয়েদের খুপরিবদ্ধ করা? 

কলেজে পড়তাম যখন, আমাদের অজান্তেই মাস্টারমশায়েরা আমাদের মনের দরজা জানালা দিয়ে পোস্টম্যানের মতো ফেলে যেতেন তাঁদের নিজ-নিজ ভালোলাগার বিষয়ের চিঠিপত্র। তার অনেক কিছুর সঙ্গেই পাঠক্রমের যোগ ছিল না কোনও। আর যোগ ছিল না বলেই, সে সবের সন্ধান পেলে যেন অনেকটা অক্সিজেনের জোগাড় হতো। কেউ কথা বলতেন সিনেমা নিয়ে, কেউ বলতেন প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে, কেউ তাঁর কলেজজীবনের শিক্ষক, তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ, এসব নিয়ে বলতেন। সতীপ্রসাদ দা তাঁর অননুকরণীয় উচ্চারণে বিশুদ্ধ সংস্কৃতে চণ্ডী ও গীতা থেকে শ্লোক মুখস্থ বলতেন। এক নিমেষে প্যারাডাইস লস্টের সেটান থেকে আমরা ঢুকে পড়তাম ভারতীয় বীর-রসের আখ্যানে। তাঁর কাছে গল্পের পর গল্প শুনতে শুনতে অজ্ঞাতসারেই শিখে ফেলেছিলাম – গল্প কীভাবে বলতে হয়। এর আগেও বহুবারই হয়তো বলেছি, আমাদের মাস্টারমশায়েরা আমাদের লাইব্রেরি ব্যবহার করতে শিখিয়েছিলেন। একঘেয়ে পড়াশোনা না করে নানারকম বই পড়তে শিখিয়েছিলেন। সব বই সবার ভালো লাগত না, কিন্তু সব বইই চেখে দেখতে দেখতে আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের একটা করে ভালোলাগার জায়গা পেয়ে যেতাম। সে কি কম কথা?

শিক্ষকতাকে জীবিকা করলাম যখন, মাস্টারমশায়েদের এই পাঠক্রম-বহির্ভূত শিক্ষাকে একইভাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব, আশা ছিল। কিন্তু সময় বদলালো। পঠনপাঠনের ধরণ বদলালো। তারপর এখন এসেছে থার্ড ওয়েভ – পঠনপাঠন উঠে যাওয়ার উপক্রম। বেশিরভাগ সময়েই আমরা ক্লাসরুমে যন্ত্রস্বরূপ। এই তোমাদের পাঠ্য টেক্সট। ইনি লেখক। অমুক যুগে এটি লেখা হয়েছিল। এই সেই যুগের বৈশিষ্ট্য – ১, ২, ৩, ৪, ৫। এই সেই লেখকের আর দুয়েকটা লেখা। এই টেক্সটের বিষয়বস্তু। এই ইমেজ, এই মোটিফ, এই সিম্বল। এই হল সম্ভাব্য প্রশ্ন। আর এই নাও স্টাডি মেটেরিয়াল। এভাবে চাকা বারকয়েক ঘুরতে ঘুরতেই ক্লাস, দিন, মাস, সেমিস্টার সব শেষ হয়ে যায়। যন্ত্রবৎ পড়াই, যন্ত্রবৎ উত্তর লেখাই। যন্ত্রবৎ প্রশ্ন করি। যন্ত্রবৎ খাতা দেখি। রিপিট মোডে। 

মাস্টারমশায়েদের যে সব গল্পে, তথ্যে মেতে থাকত আমাদের ক্লাসরুম, আজকাল সেই গল্পটুকু করার সময় থাকে না। ক্লাসে ঢোকার তাড়া, বেরোনোর তাড়া, প্রিন্সিপালের তাড়া, অফিসের তাড়া, ইউনিভার্সিটির তাড়া, ইউজিসির তাড়া, ট্রেন ধরবার তাড়া, বাড়ি ফেরার তাড়া, ঘুমানোর তাড়া, পরেরদিন এই সব কাজগুলো আবার তাড়াতাড়ি সেরে ফেলার তাড়া। আমরা নিজেরা কলেজে ক্লাসের বাইরে যে একটা জীবন পেতাম মাস্টারমশাইদের সঙ্গে, তার কিছুমাত্র আমি শিক্ষকতা করতে এসে আমাদের ছেলেমেয়েদের দিতে পারি নি, এবং পারি না – এ আমার খুব আফসোস। 

তাই, এখানে বা অন্যত্র – যা কিছু লিখি, বলি একা একা, তা মূলত আমার ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে লিখতে থাকি। কিছু নিজে লিখি, কিছু অন্যের কথা আর কাজ শেয়ার করি। কত ভাল ভাল লেখা পড়ি চারদিকে, কত ভাল কাজ করছেন মানুষজন – দেখি। মানবজীবনের সেইসব শিক্ষকদের কথা ছেলেমেয়েদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। যে সব মানুষ, বই, ভাবনা, ঘটনা আমাকে প্রভাবিত করেছে, আনন্দ দিয়েছে, সেই সব কথা ওদের জানলা দরজায় চিঠিবন্দি করে ছেড়ে দিয়ে যাই। সবার সব কথা, সব লেখা ভালো লাগবে না – এমনটাই তো স্বাভাবিক। তবু, কেউ যদি নিজের জন্য একটা আধটা ভালোলাগার দিগন্ত খুঁজে পায়, তাতে আমার খুব আনন্দ হয়।

বিরাট বড় জগৎ আমাদের। ছেলেমেয়েরা যত বড় হয়, ততই জগতের ভাল খারাপ, দুয়ের সঙ্গেই পরিচিত হতে থাকে। আমি আমার মতাদর্শগত জায়গা থেকে – জগতের হতাশার খবর, নৃশংসতার খবর, বৈষম্যের খবর যতটা পারা যায় কম শেয়ার করার চেষ্টা করি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। তার মানে এগুলির অস্তিত্ব যে আমি অস্বীকার করে মূর্খের স্বর্গে বাস করতে বলছি, এমন নয়। মন্দ বরাবরই ভালোর চেয়ে দ্রুত সংক্রমিত হয়; কাজেই সে সব কথা ওরা জেনেই যাবে। কিন্তু নিজের এই কদিনের জীবন দিয়ে আমার এটুকু মনে হয়, কোনও একটা ভাবকে অবলম্বন করে ভালোবাসতে পারা খুব বড় কথা। পরচর্চা না করে নিজেকে উন্নত করা, বড় কথা। অন্ধকার কী কী ভাবে আমাদের ক্ষতি করতে পারে, তা বারবার জানান দেওয়ার চেয়ে ঘরের এক কোণে একটি প্রদীপ জ্বালতে পারা – খুব বড় কথা। ছোট থেকে আমার মা এসব কথা আমায় এত বলেছেন, এবং খাতায় কলমে এতবার নিজে করে দেখিয়েছেন, যে ভাব, ভক্তি, ভালোবাসার উপর আমার স্বাভাবিক ভাবেই একটা খুব জোর বিশ্বাস এসে গেছে। তাই, যেটুকু বিশ্বাস করি, এখন সেটুকুই বলি। এটুকুই এখন আমার কাজ বলে বোধ হয়। 

(উপরের ছবিটি শ্রীময়ীর আঁকা)

Comments