ছোট গল্প : অসম্পূর্ণ দৃশ্যকল্প
মুখ কালো করে বসে আছে আমিনা। তিন মরশুম হয়ে গেল, জমিতে ফসল নেই। শেষ শ্রাবণে নদীর বাঁধ ভেঙেছিল একবার, ভেসেছিল শাকের মাঠ। এই আশ্বিনের বৃষ্টিতে ফিরে দাঁড়ানোর আশাটুকুও মরে গেল।
হাসান ঘরের ছেঁড়া ছাওয়া থেকে বেরিয়ে আসে।
আসবে না?
কই আসব?
যা হয় দুটো খাও এসে।
ইচ্ছা নাই।
আমাদের যেন বড় ইচ্ছা আছে। আসো।
ছাড়ো না আমায়। তোমরা খেয়ে শুয়া যাও।
শুয়াবার জাগা কই? ভিজা, ভিজা। রাখো নি কিছুই।
নদীকে আমি ঘরে ঢুকতে বলছিলাম?
এখন মরার মুখে এসব কথা ভাল দেয় না। ও ঢালে বাড়ি নিয়ে গেলে আজ এটা হত না!
বাপ-দাদার জমি চাইলেই
এ কথা আগেও বলছ। নতুন বলবার কিছু নাই।
তো কী বলব? তোমার কথার উত্তর না দিলেও সমস্যা, দিলেও।
কাজের কথা না বললে, কাজের কাজ না করলে ওই হয়।
আমি চেষ্টা করি নাই? তোদের ভালো রাখার? বাঁচানোর?
বাঁচানোর দৌড় তো দেখলাম। না পারলে মানুষকে লড়তে, না নদীকে। এখন মেজাজ? এই তোমার সহ্য?
তুমি পারলে না একটু লড়তে? মরদ মানুষ!
হাসান ফিরে চলে যায়। দু বছরের ছেলেটা ভিতরের ঘর থেকে ষাঁড়ের মতো চেল্লাচ্ছে। বাড়ির চাল যেটুকু আছে, সেটুকু ফুরোলে, আর নতুন চাল কেনার টাকাটুকুও গেলে বাঁচা যায়। বাচ্চাটা মরবে। হাসান যদি বেঁচে থাকে, তো পালাবে ও ঢালের রোকেয়ার সঙ্গে। তাই তো ও ঢালে বাসা করার শখ এত। আর না বাঁচলে তো ল্যাঠা চলেই গেল।
ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিল আমিনা শেষ পাঁচ মিনিট ধরে। হাসানের মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ার। আর যাওয়ার আগে এমন একটা কিছু বলে যাওয়ার, যাতে ওর সেই ইচ্ছেটা এস্কেপ ভেলোসিটিতে বেরিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন। হাসান বলে গেছে, 'বাঁচানোর দৌড় তো দেখলাম। না পারলে মানুষকে লড়তে, না নদীকে।'
আমিনা এখন যাবে অলিবাগানের পিছনদিকটায়। যাচ্ছে ও। বাগানের পিছনে জঞ্জালের ভিড়ে পড়ে আছে গত রাতে ওর আর রোকেয়ার খাওয়া বাংলার ফাঁকা বোতল তিনটে। একটা বোতল হাতে তুলে নেয় আমিনা। মনে ভয়টা আবার ফিরে আসার সুযোগ না দিয়েই সামনের একটা ইঁটের উপর আছড়ে বোতলটা ভেঙে, হাতে ধরে থাকা বোতলের মাথার অংশটা নিজের হাতে গেঁথে দেয় ও। হাত এমন কাজ করবে, মন বোঝার আগেই কাজ হয়ে যাবে। এটাই এতদিন চেষ্টা করে করে হচ্ছিল না। আগেকার দিনে টিকে দেওয়ার যন্ত্র দিয়ে যেমন মোচড় দেওয়া হত হাতে, তেমন করতে থাকল আমিনা। বারবার। রক্তও চমকে চমকে বেরিয়ে আসছে।
শাড়িটা কোমর অব্দি তুলে উরুতে, কুঁচকিতে ধারালো কাঁচের কোপ বসায় আমিনা। সহ্যশক্তি কম ওর? মাংস খুঁটে খুঁটে, খুঁচিয়ে তোলে কোমরের কাছ থেকে। হালকা, নোংরা গোলাপি শাড়ি গাঢ় লাল হয়। হাসান এই উরুতে শাদির রাতে হাত রেখে বলেছিল, "ও আমিনা, এই সবটা আমার?" আমিনা বলেছিল, "সব, সব।" মনে যাতে এটুকু স্মৃতিও না ফিরে আসে, কাঁচের কোনা শরীরে চেপে বসিয়ে দেয় আরেকবার ও। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ছটফট করে। মুখে ঝুরো ঝুরো মাটি ভরে নেয়, কাল রাতেই কুপিয়ে রেখে গেছিল। যাতে গোঙানির শব্দ কোথাও না পৌঁছায়। কাঁচের সবচেয়ে ধারালো দিকটা দিয়ে অতর্কিতে ওর হাত এবার আক্রমণ করে চোখকে। ডান চোখ। ইন্দ্রিয়ের শেষ বিন্দু দিয়ে আমিনা শোনে, মাংসে কাঁচ ঢুকলে যে আওয়াজ হয়, চোখে ঢুকলে ঠিক সেই আওয়াজ হয় না। কেমন একটা জল ভর্তি বেলুন ফাটিয়ে দেওয়ার শব্দ। অবশিষ্ট বাঁ চোখ দিয়ে আমিনা দেখেছিল, ডান চোখ দিয়ে রক্তেরও আগে বেরিয়ে এসেছিল স্বচ্ছ, আঠালো তরল, ওর হাতে। উন্মাদের মতো বাঁধ অবধি নিজেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় আমিনা।
পরদিন মাঝদুপুরে ও পারের গুপ্তিপাড়ার তীরে ভাসতে ভাসতে গিয়ে ঠেকে আমিনার দেহটা। ফুলে ঢোল। এক বেলা, দু বেলা যায়। কাকে ঠোকর মারে। ঘেয়ো দুটো কুকুরও এক আধবার কামড়ে দেখে। কিন্তু কোনও মানুষ এগিয়ে এসে সে দেহ পোড়ায় নি, কারণ ও তীরের মোল্লার বউয়ের দেহ ওটা।
অবশেষে তৃতীয় দিন সকালে নদীতীরের ঝুপড়ির নেংটা মুচি গন্ধে আর টিকতে না পেরে কোত্থেকে একটা বাঁশ জোগাড় করে আনে। দেহটাকে ঠেলতে থাকে জলের দিকে। ফেরত পাঠিয়ে দেয় জলে। পচা, নরম মাংস কিছুটা লেগে থাকে কাদামাটিতেই। যতটুকু অবশিষ্ট দেহের, তা নিয়ে নদী আবার বয়ে চলে দূরে, অন্য অন্য গ্রামে।
Comments
Post a Comment