Followers

হাওয়াগাড়ি : চার-চাকায় ইতিহাস

'হাওয়াগাড়ি' বইটি হাতে আসে আচমকাই, কলেজস্ট্রিটে ঘুরতে ঘুরতে, ধ্যানবিন্দুর বইঘরে। গাড়ি নিয়ে যে আমার দীর্ঘদিনের উৎসাহ, এমন নয়; তাই প্রথম দর্শনে বইটির বিষয়বস্তু যে আমাকে আকর্ষণ করেছিল এমন বলতে পারি না। কিন্তু হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে চোখ টানলো লেখকের সুতো জুড়ে জুড়ে ইতিহাসকে জ্যান্ত করে তোলার স্বভাব।

সব মিলিয়ে ২৭টি ছোট ছোট লেখার সংকলন হাওয়াগাড়ি। প্রতিটি লেখাই কলকাতার, বা বৃহদর্থে বাংলার, কতগুলি ভিন্টেজ গাড়িকে নিয়ে। প্রবীণ সাংবাদিক তরুণ গোস্বামী সর্ব অর্থেই 'Polymath' – আজকের দিনে এত বিচিত্র বিষয় নিয়ে এমন উৎসাহ ও এতো গভীর পাঠ আমাদের শহরে আর কতজনের আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তাঁর সঙ্গে এখনও অব্দি হওয়া অল্পকিছু আলাপেই তাঁর পড়াশুনার বিরাট ব্যাপ্তির আভাস পেয়েছিলাম। হাওয়াগাড়ি বইটি যেন সেই ব্যাপ্তিরই আরেকটি নিদর্শন।

সাধারণ জনমানসে সংস্কৃতি বলতে যে সীমিত, ক্ষুদ্র পরিসরকে বোঝানো হয় থাকে অনেক সময়, সংস্কৃতি তার চেয়ে অনেক, অনেক ব্যাপ্ত। ইতিহাসের পাতায় পাতায় জড়িয়ে থাকে সে, চলমান সময়ের সঙ্গে এগোতে এগোতে তাতে বদল আসে; তার কিছু অংশ হারিয়ে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে, কিছু নতুন সাজে সেজে ওঠে। তরুণ গোস্বামীর হাওয়াগাড়ি যত না গাড়ি-বিষয়ক, তারও চেয়ে বেশি পালটে যাওয়া, বদলে যাওয়া সময়ের সেই ইতিহাসের দলিল, সেই সংস্কৃতির বাহক।


গাড়ির কথা, কাজেই চলমানতা যে সেখানে অবশ্যম্ভাবী! তবে সেই চলিষ্ণু স্বভাব গাড়ির চার চাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে, লেখক চারিয়ে দিয়েছেন আমাদের মনে। এক একটি অধ্যায়ের এক একটি গাড়িতে চেপে আমরা চলে যাই নানা সময়খণ্ডে। কিছুটা পিছনে ফিরে গিয়ে সামনে এগিয়ে আসার যাত্রাপথ শুরু হয় প্রায় প্রতিটি অধ্যায়েই। চোখের সামনে গাড়ির গড়ে ওঠার কারখানাটি দেখি, সেকালে কীভাবে কাজ হতো, কীভাবে গাড়িটি এসে পৌঁছত মালিকের ঠিকানায়, আর তাকে দেখতে কেমন ভিড় হতো বা এখনও হয় – সব জানতে পারি। চোখের সামনে বদলে যেতে দেখি বাঙালি সমাজকে, তার আভিজাত্যের রূপরেখাকে। অনেক সময় বুড়ো হয়ে যাওয়া গাড়িগুলিকে আবার উজ্জীবিত করে তোলার কাজটিকে বাঙালির চিরাচরিত নস্টালজিয়াকে ছাড়তে না পারা বলে দাগাতে পারেন অনেকে, কিন্তু আসলে তা আমাদের সামাজিক ইতিহাসকে সংরক্ষণ করার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নেতাজির অন্তর্ধানের সেই বাহনের কথাই বলি, হেমন্ত মুখার্জির 'নীলু'র কথাই বলি, লাহাবাবুদের ল্যাঞ্চেস্টারের কথাই বলি, বা রোলস রয়েসের একদা ময়লা ফেলার গাড়ি হয়ে ওঠার আশ্চর্য কাহিনীই বলি, প্রায় সবকটি লেখাই তথ্যসমৃদ্ধ, এবং আশ্চর্য সাবলীল কথনভঙ্গি দ্বারা পাঠককে বসিয়ে রাখে তাদের কাছে। বই জুড়ে প্রতিটি গাড়ির রঙিন ছবি আমাকে নিয়ে যায় ইতিহাসের আরও কাছে – যেন ছুঁয়ে দেখা যায় সব। 

'তবুও প্রয়াস'-এর এই প্রয়াসটি বাংলার পাঠকজগতে নিঃসন্দেহে একটি নতুন স্বাদ নিয়ে এসেছে, এবং বলাই বাহুল্য, তা ক্ষণিকের স্বাদবদল হয়ে থেমে নেই। আর্কাইভিং-কে কোনোদিন গুরুত্ব না দেওয়া বাঙালি সমাজে এই কাজ এক বিচক্ষণ আর্কাইভ – গাড়ির, সময়ের, সংস্কৃতির।

Comments