Followers

বাঘমারি

১: বাঘমারি বৃত্তান্ত

প্রতিদিন চাকরি করতে যাওয়ার পথে ট্রেনে আমাদের এক সহযাত্রী ওঠেন সোনারপুর স্টেশন থেকে। নাম প্রিয়নাথ বাবু। 'বাবু' বললাম, কারণ তাঁর পদবি জানি না; আমি রেখেছি 'বাঘমারি'। প্রিয়নাথ বাবু "মুখেন মারিতং শার্দূল"। মানে, এখনও অব্দি বাঘ মারার কথা না বললেও তিনি যে উচ্চতায় এই মুহূর্তে আছেন, তা-ও বিশেষ ভয়ানক।

মাথায় থাক-থাক ঘন চুল, অল্প কিছুতে পাক ধরেছে। ডানদিকটা সুন্দর করে ছেঁটে বাঁ দিকে ছাঁটতে গিয়ে ঘড়ি দেখে ট্রেন ধরতে দেরী হয়ে যাবে ভেবে অসমাপ্ত রেখে দেওয়া একটি লম্বাটে গোঁফ আছে তাঁর। রেলে চাকরি করেন; বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। যদিও তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমার হিসেব বলে, উনি চাকরিতে আছেন লর্ড কর্নওয়ালিশের সময় থেকে।

আমার এরকম মনে হওয়ার পিছনে সঙ্গত যুক্তি আছে। সোনারপুর থেকে উঠে প্রিয়নাথ বাবু আমাদের মতো সহযাত্রীদের তাঁর অভিজ্ঞতার ঝাঁপি থেকে একটি দুটি করে 'সত্যিকারের ঘটনা' বলতে শুরু করেন। তাঁর বেশিরভাগ 'সত্যিকারের ঘটনা'তেই তিনি কোথাও না কোথাও 'প্রথমবার লাইন পাতার' কাজে নিযুক্ত হয়েছেন, এবং 'তখন সেখানে দুর্ভেদ্য জঙ্গল, এসব শহর টহর হয়নি'। প্রথম কারণ এটি।

ট্রেন ঝমঝমিয়ে ছুটে চলেছে সোনারপুর ছাড়িয়ে আরও দক্ষিণে। ততক্ষণে প্রিয়নাথ বাঘমারি তাঁর কোনও এক 'সত্যিকারের ঘটনা'য় গভীর বনে ঢুকছেন সপাৎ সপাৎ করে এক মানুষ সমান নালীঘাস কেটে। তখন, গাছের শাখা থেকে 'লিকলিকে' ময়াল সাপ তার 'হিলহিলে' জিভ বার করে 'হিসহিস' শব্দ করতে করতে নেমে আসছে। জীবজগতে বিবর্তনের কোন স্তরে ময়াল সাপ 'লিকলিকে' ছিল, সে-ও আমার স্পষ্ট জানা নেই। প্রজাতিটি সম্বন্ধে 'না-জানা' এবং প্রজাতিটির 'না-থাকা'র মাঝে একটি বিশ্বাসযোগ্য সময় বাছতে গিয়ে আমি লর্ড কর্নওয়ালিশের সময়টিকেই বেছে নিয়েছি। তাই, এটি দ্বিতীয় কারণ। 

ট্রেন যখন বারুইপুর পেরোয়, সুদূর অতীতের জঙ্গলে কুলিরা কাঁধ থেকে পাত, স্ল্যাব নামিয়ে রেখে চলে গেছেন। বাঘমারি একা লাইন পাতছেন। একা। রেলে তখনও রিক্রুটমেন্ট হতো না। ট্রেন কৃষ্ণমোহনে ঢুকছে; বাঘমারির পাশের জংলাটা সরসর করে যেন কেঁপে উঠলো। এরপর একে একে আসে ধপধপি, সূর্যপুর, গোচরণ স্টেশন। জংলা থেকে নানা প্রাণী বেরিয়ে আসে। কখনও ধেয়ে আসে বিষাক্ত তীর। আশেপাশের আমরা ক্রমশ এগিয়ে বসতে বসতে সিটের কানায় উঠে আসি, আর বাঘমারি ততই ইজিচেয়ারে বসার মতো হাত-পা ছড়িয়ে এলিয়ে যেতে থাকেন আমাদের ছেড়ে দেওয়া জায়গায়। 

পশুদের মধ্যে শেয়াল টেয়াল তো আকছার বেরোচ্ছে। গত বুধবার প্রিয়নাথ ঝোপ থেকে কোমোডো ড্রাগন বার করেছিলেন। এখনও মনে আছে, ২রা আগস্ট যাওয়ার পথে শুনেছিলাম, বাঘের বোঁটকা গন্ধ পাওয়া গেছে। সে জন্য তাঁর বাঁ হাতে শক্ত করে শাবল ধরা ছিল সবসময়। তারপর সময় বদলালো। শহর গড়ে উঠলো। কিন্তু লাইন পাতার কাজ শেষ হলো না। ওই শাবল হাতেই বাঘমারি এবার লড়লেন সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেসকে। কাউকে ছেড়ে কথা বলেন নি তিনি। বলতে বলতে তিনি নিজের টিফিন বাক্স থেকে মুসম্বি, শসা এসব বার করে নিজে খান, হাতে হাতে আমাদের প্রসাদ দেন। আমি শুধু ভাবি, মুসম্বি-শসা এত অল্প পরিমাণে খেয়ে, এত বিলিয়ে, এত বড় লড়াই শতাব্দীকাল পেরিয়ে চালিয়ে যাওয়া কি কম কথা? যে স্থানে লাইনই পাতা হয় নি, সেখানে কি আর তেমন কিছু খেতেই বা পান তিনি? পরম ভক্তিতে হাত পেতে প্রসাদ নিই। তাঁর নরম আঙুলের ডগাগুলি আমার হাতে লাগে। খুবই নরম। অতিসেদ্ধ ভুট্টাদানার মতো।

এমন নেশা ধরে গেছে, শেষ কদিন ট্রেনে ওঠার সময় থেকে ঠাকুরকে বলছি, "প্রভু, আজকে একটা বুনিপ দিও। চাই না আমার সেপ্টেম্বরের ইনক্রিমেন্ট, চাই না নাম যশ, কাম কাঞ্চন। একদিন একটা বুনিপ দিও শুধু।" এখনও পাই নি। যা পাই, তাতেই খুশি থাকি। আমার অপ্রাপ্তি বলতে একটাই – 'সত্যিকারের ঘটনা'গুলো বলার সময়ে বাঘমারি বাবু আমাদের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে এতবার "এ ভাগ্য তো সকলের হয় না" বলতে থাকেন, এবং তাতে এত সময় নষ্ট হয় যে, প্রতিবারই এক হাতে শাবল আর অন্য হাতে বাঘের ঘেঁটি ধরে তাঁর পোষ মানানোর দৃশ্যটি আসার আগেই আমার স্টেশন এসে যায়।


২: অ্যাকুয়া-লাইফ

শ্রী বাঘমারি ট্রেনে আমার নিত্য সহযাত্রী। আমার সঙ্গে তাঁর চলার পথ তেরোটি স্টেশন জুড়ে; আমার দুটি স্টেশন পর তিনি ট্রেনে চাপেন, আবার তাঁর গন্তব্য আসার দুটি স্টেশন আগে আমি নেমে যাই। রেলের চাকরি বাঘমারি-র। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কাহিনি তিনি যাওয়া-আসার পথটি জুড়ে আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেন হরির লুঠের বাতাসার মতো, আমরাও সেই প্রসাদলাভ করে কৃতার্থ হই। আমার প্রতি স্নেহপরায়ণ পাঠকের হয়তো এ-ও মনে থাকবে, 'বাঘমারি' নামটি এসেছে তাঁর 'মুখেন মারিতং ব্যাঘ্র'-মেজাজ থেকে।

আজ ট্রেনে খুব ভিড়। তার মাঝে যখন বাঘমারি-র গলা পেলাম, তখন আমি তাঁর থেকে বেশ কিছুটাই দূরে। ওই তিনি বলছেন, "মানুষ আজ কোথায় না পৌঁছে যাচ্ছে!" এই কথাগুলি সাধারণত চাঁদ বা মঙ্গলে পৌঁছনোর কথা বলতে গিয়ে বলা হয় আজকাল। এস্ট্রনমি নিয়ে আমার চিরদিনের উৎসাহ, মহাকাশের রহস্য জানতে ইচ্ছে করে। ইস্কুলবেলায় সায়েন্সে সড়গড় ছিলাম না বলে প্রিয় অনেক বিষয়ের কিছুই পড়া হয়নি। তবু, যেখান থেকে পারি শুনি। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যাপারে শ্রী বাঘমারিকে ভরসা করা কতটা উচিত হবে – এ নিয়ে মনে সন্দেহ এলেও ভাবলাম, হতেই পারে এর মধ্যে মহাকাশে লাইন পাততে গিয়ে অনেক কিছু জেনেছেন। বিশ্বাসের বিকল্প নেই। নিজের সিট আরেকজনকে ছেড়ে, ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম তাঁর দিকে।

"মানুষ আজ কোথায় না পৌঁছে যাচ্ছে। আর তেমনই ভক্তি।" না, মহাকাশ নয়। বুঝলাম, বাঘমারি বলছেন দ্বারকার সাগরে ক্যামেরাম্যান নিয়ে মানুষের কৃষ্ণ ধরতে নামার কথা। ফিরে যাওয়ার পথ নেই আমার। শেষে কিনা এই শুনতে সিট ছেড়ে এলাম? যে ভিড় আমাকে আসার জায়গা করে দিয়েছিল, কচুরিপানার মতো ঢেকে দিয়েছে ফেরার রাস্তাটি। উঁকি মেরে দেখলাম, আমার ছাড়া সিটে বসে একজন পনেরো টাকায় পাঁচটা পেয়ারা কিনে সহযাত্রীদের মধ্যে বিলোচ্ছেন। আমি পেয়ারা বেশি ভালোবাসি।

তবে একটু সময় যেতেই বুঝলাম, বাঘমারি আসলে দ্বারকার সমুদ্র নিয়ে ভাবিত নন। তিনি নিজের একটি এডভেঞ্চারের স্মৃতিতে ল্যান্ড করার জমি তৈরি করছেন মাত্র। বললেন, "তবে এর চেয়েও নীচে নেমেছিলাম আমি। মাতলায়।"

আচমকা সব চুপ। আমাদের ক্যুপে শিহরণের একটা চোরাস্রোত চলছে। বাঘমারি-র পাশে এক বৈষ্ণব যুবক বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য না করেই 'পরমার্থ' বোঝাচ্ছিলেন, তিনি "চৈতন্য চরিতামৃত –" বলে থমকে গিয়ে বাঘমারি-র কথায় বলে ফেললেন, "বাবা খুব গভীর তো!"

এই প্রথম শিকার। বাঘ যেমন এক ঝলকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বাঘমারিও কেবল ওই "মাতলায়" কথাটি দিয়ে এঁর পরমার্থের টুঁটি চিপে ধরেছেন। ফোর্থ সিটে এক বেয়াদপ বাচ্চা কেবলই তার মায়ের কাছে "টিক টক খাবো", "দিলখুশ খাবো", "চিপ্স খাবো", "মুগডাল খাবো" আব্দার করছিল, সে একদম শান্ত হয়ে চতুর্থ সিটের ওই একফালি জায়গায় নিজনিতম্ব প্রতিষ্ঠা করে বসেছে।

বাঘমারি বাঁকা হাসি দিয়ে বললেন, "হুঁহ!তাহলে আর বলছি কী! দ্বারকার গভীরতা এর কাছে কিসুই না।" বাঁকা হাসিটা একটু বেশি বেঁকে যাওয়ায়, শুরুতেই ক্লাইম্যাক্সের জোর পড়ে যাওয়ায়, শেষে আরেকবার, WhatsApp text এডিট করার মতো বাঘমারি বললেন, "হুঁহ!" এবারেরটা বেশ হয়েছে। 

এরপর জলজীবনের বর্ণনা শুরু হল। আমি জানি এটাই বাঘমারি-র হোম টার্ফ, আসল দাঁওটা তিনি এখানেই মারেন। মানুষকে তার চোখে-দেখা পরিসরের একটু বাইরে নিয়ে যেতে পারলে, তারপর বাঘমারি বিভূতিভূষণের খুড়ো। আজও সেই পথে আছি আমরা। Underwater life যে এত বৈচিত্র্যময়, কে জানত! বড় বড় গাছ, হাঙর, সব মাতলায় খেলে বেড়ায়। সেই বাচ্চাটি বারবার নিতম্বোত্থিত ভঙ্গিমায় "নীলগাই?" "বেবুন?" "বাজপাখি?" নানারকম জিজ্ঞেস করে চলেছে, আর বাঘমারি তাকে আশ্বাস দিয়ে চলেছেন, "আসছি, আসছি।" আমি ভাবছি, গল্পের কোনও মুহূর্তে এরা যদি  জলের তলায় চলে আসে, তাহলে আমিও উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্কে ২০০-এ ১৯৮ পেয়েছি। ২ নম্বর কাটা গিয়েছিল, কারণ জলের তলায় উট পাওয়া যায় কিনা – বাচ্চাটির এই প্রশ্নের কোনও উত্তর বাঘমারি দেন নি।

দুটি ব্যাপারে বাঘমারি ভারি শিশুসুলভ। এক, তিনি যে দূর্লঙ্ঘ পরিবেশেই যান না কেন, সবসময়ই রেলওয়ে ট্র্যাকের একটা হারিয়ে যাওয়া পাত খুঁজতে যান মূলত। সিলেবাসের বাইরে বেরোনোর স্বভাব মানুষটির একেবারে নেই। আর দুই, তাঁর গল্পের বিচরণক্ষেত্র প্রধানত জীবজগৎ। যে বাচ্চারা "তাপ্পর আমরা একটা ঘন জঙ্গলে গিয়ে পড়লাম, আর অমনি শুনলাম ঘ্র্যাঁও" বলে, বাঘমারি তাদেরই বড় বয়সের ভার্শন।

কিন্তু আজ কিছুতেই বাঘমারি-র আসর জমছে না। তিনি যেন স্টেপ আউট করেও শেষ অব্দি বলটি ঠুকে আবার ক্রিজে ফিরে যাচ্ছেন। কী কারণ? একটু পর বোঝা গেল। গল্প বলতে বলতে বাঘমারি বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছেন তাঁর মুখোমুখি বসে থাকা যে মানুষটির দিকে, তিনি জয়ন্ত বৈদ্য, মোহিনীপুর ইস্কুলের বায়োলজি শিক্ষক। বাঘমারি-র জীবজগতের সাক্ষাৎ রিয়ালিটি চেক। তিনি একদৃষ্টে বাঘমারি-র দিকে তাকিয়ে আছেন, এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাচ্ছেন না। আর বাঘমারি-ও তাই ঠিক খুলে খেলছেন না। বাচ্চাটির বেশিরভাগ প্রশ্নেই "আসছি আসছি", "হবে হবে" করে যাচ্ছেন। কিন্তু আমি জানি হবে না, কারণ জয়ন্ত বাবু বাঘমারি-র পরে নামেন ট্রেন থেকে।

বাচ্চাটি আবার জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা পিরানহা দেখেছিলে?" স্পষ্ট বুঝতে পারছি, বাঘমারি-র জিভ নিশপিশ করছে মাংসখেকো মাছকে তিনি যে একা হাতে শায়েস্তা করেছিলেন, সেই পৌরাণিক কাহিনি বলতে। কিন্তু বিধি জয়ন্ত। ঠাকুর কতভাবে পরীক্ষা নেন। চোখমুখ সরু করে, দু বার শত্রুপক্ষের দিকে কটাক্ষনিক্ষেপ করে, বাঘমারি বললেন, "উউম, ঠিক পিরানহা নয়, তবে –"

বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো জয়ন্ত বাবুর দাঁতে দাঁত চাপা, হিসহিসে কন্ঠস্বর এল, "পিরানহা-র হাইব্রিড বোধ হয়।"

"তাইই হবে", হতাশ কন্ঠে বিরল একটি হার স্বীকার করে বাঘমারি এতক্ষণ শক্ত করে রাখা শরীরটি ছেড়ে দিয়ে এলিয়ে গেলেন। "চ্যাঁ চ্যাঁ" করে বাচ্চাটি চতুর্থ সিট থেকে খসে পড়ে গেল।

Comments