'বিশ্বাসের চেয়ে বস্তু নাই'
নরেন্দ্রপুরের থার্ড ইয়ারে সাত্যকি দা পড়াতেন আর কে নারায়ণের লেখা 'The Guide'। সে উপন্যাস পড়তে পড়তে অবাক লাগতো – এত শঠ, এত চতুর রাজু হঠাৎ শেষদিকে এমন আমূল বদলে গেল কেন? কী দরকার ছিল তার মঙ্গলগ্রামে খরা কাটাতে বৃষ্টি আনার জন্য উপবাসের এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার, বিশেষত যেখানে সে আদৌ এই মর্মে কখনও প্রতিশ্রুত হয়নি? গ্রামবাসীদের সম্মিলিত ভুল বোঝাবুঝির দায় যদি রাজু না নিয়ে পালাতো, আবার কোনও একটা গ্রামে গিয়ে একে তাকে ঠকিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতো আরও কিছুদিন, চলতো না কি তার? মানুষের মন জয়ে সে সুপটু; সে কি পারতো না একটা কিছু জুটিয়ে নিতে আবার? কথার জালে জড়াতে, কথা দিয়ে কথা না রাখতে দক্ষ রাজু এত সহজে গলে গেল?
বারবার পড়তাম উপন্যাসের শেষটুকু। পরে মনে হয়েছিল, রাজুর ছলচাতুরি মরেছিল মঙ্গলগ্রামের মানুষদের সরল বিশ্বাসের জোরে – যে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সে বেশ রাজার হালে বেঁচেছিল দীর্ঘদিন, সেই একই বিশ্বাস দংশন করেছিল তার মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা দজ্জাল কুমীরটাকে। সে নিজে ঠগ, তবু এই মানুষগুলো তাকে ভক্তিচ্ছেদ্দা করে 'সাধুপুরুষ' বলে, তাদের সারল্যের প্রতি এই করুণা থেকেই রাজু ভেলানকে নিজের জীবনের গল্প বলা শুরু করে; উদ্দেশ্য – তার স্বরূপ জেনে এই বোকা মানুষগুলো তাকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে নিজেরা বাঁচুক, আর তাদের ঘাড় ভেঙে খাওয়াদাওয়া করার পাপ থেকে সে-ও মুক্তি পাক।
সমস্যা হয় রাজুর গল্পের শেষে, যখন ভেলান জোড়হাতে বলে, "আপনি মহান সন্ন্যাসী। আপনার পূর্বজীবনের কথা আপনি আমাকে বললেন, আজ আমিই ধন্য হলাম।" রাজুর মিথ্যে সাজটাকে সত্যি ধরে, তার অন্ধকার সত্যিটাকে অবিশ্বাস করে রাজুকে আপন করে নিল ভেলান, ও গ্রামবাসীরা। তাদের চোখে রাজু ব্যক্তিগত ইতিহাসহীন এক মহাত্মা। তাঁর দোষ থেকে থাকলেও, আজ তিনি দোষের ঊর্ধ্বে; আর তাঁর শুধু 'আজ' আছে, আছে দূরদৃষ্টি; কিন্তু অতীত তাঁকে ছোঁয় না। সরল বিশ্বাসের জোরে এই মানুষগুলি রাজুর যে সত্যটিকে অবিশ্বাস করলো, তার জোরেই রাজুর এই পরিবর্তন।
উপন্যাসের শেষ লাইনগুলি সাত্যকি দা-র কণ্ঠে শুনতে পাই। শেক্সপিয়ার গ্যালারিতে হেঁটে হেঁটে রিডিং পড়তেন তিনি বইটি থেকে। চলচ্ছক্তিহীন রাজুকে ধরে ধরে নদীর কাছে নিয়ে যাচ্ছে ভেলান; ঘোলা দৃষ্টিতে, অসংলগ্ন উচ্চারণে রাজু বলছে, "ওই বৃষ্টি আসছে, ভেলান। ওই যে দূরের পাহাড়ে মেঘ। আমার পায়ের তলায় ওই বৃষ্টির স্রোত, আমি পাচ্ছি।" এক শনিবার, সেকেন্ড পিরিয়ডে শেষ হয়েছিল আমাদের বইটি পড়া। সাত্যকি দা শেষ লাইনটি পড়লেন, "He sagged down." পড়ে, বইটি বন্ধ করে টেবিলে রাখলেন।
রাজুর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ছেড়ে দিই শরীরের ভার। রাজু কি বেঁচেছিল? সে প্রশ্ন অবান্তর। তবু উত্তর দিতে হলে বলতেই হয়, না। হয়তো সে বাঁচে নি। শেষ লাইনটিই তার প্রমাণ। কিন্তু ততক্ষণে বাঁচা-মরা পেরিয়ে রাজু হয়ে উঠেছে এই মঙ্গলগ্রামের সকলের সম্মিলিত বিশ্বাসের আরেক নাম। বৃষ্টি পড়লো কিনা, খরা কাটলো কিনা – সে সব প্রসঙ্গ 'matters of consequence'; কিন্তু রাজুর নাড়িতে টান পড়েছে সারল্যের, বিশ্বাসের। তার একবারের জন্য মনে হয়েছে, সুখে থাকার চেয়ে মান আর হুঁশে থাকা বেশি প্রয়োজনীয়। তার একবারের জন্য মনে হয়েছে, জীবনের সমস্ত আবর্জনা সরিয়ে যদি সে মরে যেতে পারে এই সুখদুঃখময়, কাতর, স্নেহশীল, আশঙ্কাভরা মানব-মানবীর জন্য, সে স্বয়ং আনন্দ হয়ে উঠবে। কী ভীষণ বিশ্বাস ছিল সেই মানুষগুলির। তার জোরে অনেক কিছু সম্ভব। বৃষ্টি, বা একটি মানুষের বদলে যাওয়া তো বটেই।
Comments
Post a Comment