সুয়োরানি আর দুয়োরানি
ইতিবাচক ঘটনার চেয়ে নেতিবাচক ঘটনার মধ্যে আমাদের প্রভাবিত করার, মানুষের থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অনেক, অনেক বেশি – অন্তত প্রাথমিকভাবে।
ইতিবাচকতা আমাদের দুয়োরানি। নেতিবাচকতার মতো মনোগ্রাহী ঐশ্বর্য, সর্বগ্রাসী বৈভব তার নেই। তার রূপযৌবন বিলুপ্তপ্রায়। কিছু গুণে ও ভাবে সে শাশ্বত – সব্বাই জানে সে আছে। কোন পথে গেলে তাকে দেখা যায়, জানে। তার কাছে গেলে সে ছায়ায় বসিয়ে মিছরির জল খাওয়ায়, ভরপেট ভাত দেয় দু-বেলা, সেও অজানা নয়।
কিন্তু নেতিবাচকতা হলো স্কুলের গেটের ওপারে অপেক্ষা করে থাকা 'কারেন্ট লবণ'। শক লাগবে, সারা দেহ-মাথা ঝিমঝিমিয়ে উঠবে অথচ কাজের কাজ কিছুই হবে না – তবু হাত বাড়িয়ে দেওয়া। নেতিবাচকতা সুয়োরানি; সে এক এক সাজে, এক এক রূপে উদ্ভিন্নযৌবনা হয়ে আসে – আর সে আড়ম্বরে আবিষ্ট হওয়া আমাদের স্বভাবগত।
ভালো ঘটনা কি ঘটছে না পৃথিবীতে? ঘটছে। আমরা কি জানছি না? জানছি। খুশি হচ্ছি না? হচ্ছি। অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি না? নিচ্ছি। তবে?
তবে, বরাবরই ভালো খবর ভাগ করার চেয়ে খারাপ খবর ভাগ করে নেওয়ার মানুষ বেশি। আজকাল যে-সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে আমরা দীর্ঘ সময় কাটাই প্রত্যেকে, একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকি, কথা বলি, সেইসব প্ল্যাটফর্মেও কি ভালো খবর নেই? আছে। কিন্তু স্ক্রোল করার সময়ে ১০টি পোস্টের মধ্যে আপনি কটি ইতিবাচক পোস্ট দেখতে পেলেন, তা দিয়ে আজ নির্ণীত হয় যুগের হাওয়া। বলাই বাহুল্য, আমাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা সেখানে কিছুটা একরকম – দশটায় একটা; কখনও কখনও তাও নয়।
ফলে সুয়োরানির 'গো অ্যাজ ইউ লাইক' খেলাটি জমে ওঠে। সে বারবার এই নাট্যমঞ্চে আসে; তুমুল হর্ষধ্বনি, করতালি ওঠে। কেউ কেউ তার স্তাবক, কেউ বা নিন্দুক। সুয়োরানির নিন্দুক মানেই যে সে দুয়োরানির পথগামী, এমনও নয়। নিন্দা করতেও তাকে সুয়োরানির কাছে যেতে হয়। তৃষ্ণার্ত, বুভুক্ষু মানুষের আঁজলায় রানি নিজের শরীর থেকে দেয় একফোঁটা রক্তবীজ। তারপর কারো চুম্বনে, কারো বিষোদ্গারে সুয়োরানি দীর্ঘজীবী হয়।
সমস্যা গভীর। যুগের হাওয়া যেখানে সুয়োরানির দরবারগামী, সেখানে আপনি সে আসরের কথা মুখে না আনলে মানুষ রুষ্ট হয়। আপনি যদি ক্রমাগত দুয়োরানির কথা বলে যান, মানুষ খেঁকিয়ে ওঠে "সবই তো বুঝলুম! কিন্তু কেবল ওই কথা বলা কি সুয়োরানিকে অস্বীকার করে থাকা নয়?"
ক্রমশঃ আপনি আপনার দুয়োরানির মতোই জনপ্রিয়তা-বিবর্জিত, বোদা, একঘেয়ে হয়ে ওঠেন। সুয়োরানির স্তাবক-নিন্দুকেরা যতক্ষণ তার লীলাসঙ্গী হতে লালায়িত, ততক্ষণ আপনার 'bogus', 'idiotic' দুয়োরানির ছায়া, জল, অন্নের কথা তারা কেউ বোঝে না।
তবুও, হে পাঠক, যদি আপনি দুয়োরানির সেই আঙিনার সন্ধান পেয়ে থাকেন, যদি একবারও তার দেওয়া ছায়ায় বসে, মিছরির জল খেয়ে শীতল হয়ে থাকেন, যদি তার বেড়ে দেওয়া মোটাচালের ভাতে আপনার পেট ভরে থাকে একবারও, আপনি সেই পথের সন্ধানটুকু বারবার দিয়ে চলুন। কেউ শুনুক, ছাই না শুনুক। সুয়োরানির দরবারের কথা যদি আপনাকে একান্ত বলতেই হয়, বলুন; কিন্তু পরিশেষে সেই দরবার থেকে বেরিয়ে দুয়োরানির আঙিনায় যাওয়ার পথটিও দেখিয়ে দিন। কেউ দেখুক, ছাই না দেখুক। ওই প্রশান্তি আপনি যদি আস্বাদন করে থাকেন, আপনার ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ ভেসে যাক – আপনি সেটুকু ধরে থাকুন।
Comments
Post a Comment