Followers

বিদায়ী সিম্ফোনি

বেলগাছের সবচেয়ে উঁচু ডালটিতে দোয়েল বসে। কালোর পর ছাই, ছাইয়ের পর সাদা, সাদার পর যেই আলগা নীল বোঝা যায় আকাশে, দোয়েল ডেকে ওঠে। টু-টু-টুই-টু। একবার। আরেকটু জোরে দ্বিতীয়বার। তারপর, আরও একবার। আশপাশের চড়াইরা ততক্ষণে জেগে ওঠে। থেকে থেকে 'ঝির্ক', 'ঝির্ক' শব্দে ওরা দোয়েলের ডাকের উত্তর দেয়। তখন ঘড়িতে কটা হবে, বড়জোর পৌনে পাঁচ। ঘুমিয়ে থাকা শহরতলির এই পাড়ায় কাকেরা বেশ আলসে; সোয়া পাঁচটার আগে বিশেষ একটা গলা বেরোয় না তাদের। ততক্ষণ ভোরের আলাপ চালায় দোয়েল আর চড়াইরা। চড়াইদের ডাকে দোয়েলের বিশেষ কিছু যায় আসে না; সে প্রতিদিন নিজেকে একটা সুরে বাঁধে। সেই সুর নিয়ে নাড়াচাড়া করে যায় বেলা অব্দি। টু-টু-টুই-টু। গানের এই একটিই তান, সে বেলগাছের মাথায় বসে ডাকে। আলো পষ্ট হলে বেলের উড়ো-ঝুরো পাতার ভিড়ে দেখা যায় তাকে, গাছের মুকুট হয়ে যেন বসে আছে। নীল আকাশের গায়ে ছোট্ট এক রূপরেখা। চড়াইরা দোয়েলকে উত্তর দিতে দিতে কখন যেন নিজেরা কথা বলা শিখে যায় প্রতিদিন। বাগানের নিচু জবাগাছে, টবের গাঁদা গাছে, ঝুপড়ি হয়ে থাকা টগরের পাতা চিবুতে চিবুতে, ও'মাথার আমগাছের কালচে সবুজ আড়াল থেকে 'ঝির্ক', 'ঝির্ক' করে তারা বলে, অনেক কথা আমাদের। অনেক, অনেক কথা।

কাকেদের আলসে সর্দার আধ ঘন্টা বাদে, ডানা ঝেড়ে, আম গাছের ঘন ছায়া থেকে তীক্ষ্ণ স্বরে চড়াইদের উদ্দেশ্যে একবার বলে ওঠে, "এটা কি মাছের বাজার?" হঠাৎ সব চুপ। দোয়েল ডানা ছাড়ায়। চড়াইরা বকুনি খেয়ে ডাক ছাড়ার অদম্য ইচ্ছা চাপতে চাপতে এ বাড়ি-সে বাড়ির ছাদে বেজায় লাফাতে থাকে। একজন দুজনের ইতস্তত 'ঝির্ক' 'ঝির্ক' কানে আসে – 'সত্যিই নাকি?' 'এই, এটা মাছের বাজার রে?'

সর্দারের সাড়ায় অসংখ্য ক্যাডার ক্যা-ক্যা বলে এবার রোদের প্রথম ফালি নিয়ে আসে। সাড়ে পাঁচটা। দোয়েল নতুন উদ্যমে সেই সুর আবার ধরে; চড়াইরা 'মাছের বাজার, তো কী' বলে দোয়েলের আলাপকে জোড়ে নিয়ে যায় এবার। আমগাছের সবচেয়ে মোটা ডালে কাঠবিড়ালিদুটি রুদ্ধশ্বাস খেলছে, ছুটছে। ওদের মধ্যে একজন ছুটতে ছুটতে পাতার আড়ালে চড়াই দেখে অসম্ভব ভয় পেয়ে কোটরে পালালো। এমন সময় শোনা গেল, 'নোই-নো'।

কোথা থেকে আসে এই নতুন ডাক? 'নোই-নো'। ওই যে পাঁচিলের এক ধার দিয়ে সার-সার সুপুরি আর নারকেল গাছ, তাদেরই একজনের পাতায় বসে দোল খাচ্ছে বুলবুলি। 'নোই' বলার সময়ে মাথার ঝুঁটি ফুলে উঠছে, আর 'নো'-তে বেশ ভদ্রসভ্য অফিসের বাবুটি হয়ে যাচ্ছে আবার সে। অসমসাহসী কাঠবিড়ালিটি আবার কোটর থেকে মুখ বার করেছে। বুলবুলির গান সে অবাক হয়ে শোনে। গ্রীষ্মের সকালের পূবালী হাওয়ায় নারকেলের ঝিরিঝিরি পাতা দোলে। তিনটি চড়াই আমের মুকুল স্বাদ পেয়ে একেবারে পাগল হয়ে গেছে। প্রতিটি 'ঝির্ক'-এর সঙ্গে একগাছি বোল লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। ছেড়ে যাওয়া বসতবাড়ির রান্নাঘরের বন্ধ জানলার গায়ে যে নীমগাছটি, তার ডালে লাফ দিয়ে এল দুটি শালিক। 'ট্রক ট্র, ট্রক।' 

জোড় এগোয় ঝালার দিকে। আগাম দাবদাহের ছোঁয়াটুকু বোঝা যায় না এদের কন্ঠে। কীসের দুঃখ চারদিকে? কোথায়? এদের নিরন্তর আলাপে ভেসে যায় গাছপালা, পূবালী বাতাস, ঝরে পড়া পাতার রাশি, আকাশ। বেলা বাড়ে। চারদিকে নানা টুকরো টাকরা আওয়াজ বাড়ে। সেই ভোর থেকে ডেকে ডেকে, ওরাও ক্লান্ত। খিদে পেয়েছে। শেষ একবার ডাকে দোয়েলটি – টু-টু-টুই-টু। বাকিরা সবাই রোজকার ঘরোয়া কথাবার্তায় ফিরে যায়, আরও নানাদিকে যেতে হবে এবার। কাল ভোরে তাহলে আবার? এই সময়েই? বেশ, বেশ। কাল একটা অন্য সুর, কেমন? ওরা চলে যায় একে একে। কাঠবিড়ালি দুজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে; কত কী পারে পাখিরা। ওরা গাইলেই, এদের দুজনের বড় খেলা পায়।

বেলা একটা নাগাদ বসতবাড়ির ভারী গেট ঠেলে একটি ট্রাক ঢোকে। তার পিঠে বসানো জটিল এক যন্ত্র। বেলা সোয়া তিনটে। ট্রাকটি বেরিয়ে যায়। পিঠে শোয়ানো বেল, আম, সুপুরি, নারকেল, নিমের কাটা গুঁড়ি। কিছু এখনও পড়ে আছে এদিক ওদিক। আরেকবার আসবে ট্রাক, পুরো সাফ করতে। সঙ্গের লোকটি গেট আটকে দিতে দিতে দিতে ফোনে একজনকে বলে, আজকাল সব নতুন মেশিন। মোটা কাঠ কাটতেও আধ ঘন্টার বেশি লাগে না। এপার্টমেন্ট ঝটপট উঠে যাবে জমিতে।

Comments