Followers

সর্বভূতে সেই প্রেমময়

কলেজ থেকে অল্প দূরে একটি স্কুল – বাড়ীভাঙ্গা বামচরণ বিদ্যাপীঠ – সেখানে আজ 'স্বামী বিবেকানন্দ ভাবানুরাগী যুব সম্মেলন' ছিল; আয়োজক নিবোধত গ্রাম উন্নয়ন কেন্দ্র আর গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অফ কালচার। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে কলেজ থেকে আমরা প্রত্যক্ষভাবে একেবারেই যুক্ত ছিলাম না; আয়োজক হিসেবে ওই স্কুলের একজন মাস্টারমশাই বলেছিলেন, স্থানীয় কলেজ থেকে ক'জন ছাত্রছাত্রী থাকলে ভালোই হয়। তাদের মধ্যে কেউ চাইলে কবিতা/গান ইত্যাদিও করতে পারে।

কলেজ থেকে আজ চতুর্থ ও ষষ্ঠ সেমিস্টারের পাঁচজন ছাত্রছাত্রী সেখানে উপস্থিত ছিল – বিশ্বজিৎ, নবমিতা, বিট্টু, শ্রাবণী আর অপসানা। এদের মধ্যে অপসানা ভারি সুন্দর আবৃত্তি করে; ওকে আমরা বলেছিলাম এই অনুষ্ঠানের উপযোগী কোনও কবিতা যেন আবৃত্তি করে। অপসানা নিজে থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের 'স্বদেশ মন্ত্র'টি আবৃত্তি করবে বলে জানায়। একটি রেকর্ডিং ওকে পাঠাতে হয় আয়োজকদের কাছে। সেটি তাঁদের এত ভালো লাগে যে আজকের অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা অপসানার এই আবৃত্তির মাধ্যমেই তাঁরা করবেন, ঠিক করেন।

কিছুক্ষণ আগেই সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও দেখছিলাম। নানা শব্দের মাঝে অপসানার কণ্ঠস্বর ভিডিওতে হয়তো একটু ম্লান, কিন্তু আমার তারও চেয়ে ভালো লেগেছে শুনতে অপসানার সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে স্বদেশমন্ত্র উচ্চারণ করে চলা কচিকাঁচাদের কণ্ঠস্বর। তারা কী ভাবে, কী ভেবে করছে, কতটা বুঝে করছে আর কতটা যান্ত্রিক, সে প্রসঙ্গ অবান্তর। বহুপঠিত এই 'মন্ত্র' আজ আবার উচ্চারিত হলো, এবং সচেতনভাবে না হলেও এই ছোটরা হয়ে উঠলো তার 'human agent', এইই আমার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি।

আজকের এই ভিডিও দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল শ্যামলাতাল বিবেকানন্দ আশ্রমের কথা। গত অক্টোবরে গিয়েছিলাম। রবিবার সকালবেলা। গ্রামের জনা ত্রিশ বাচ্চাকাচ্চা (বয়স ৪ থেকে ১০-এর মধ্যে) আশ্রমে এসেছে, পাঠশালায়। সেদিনের মতো পাঠ শেষ হচ্ছে; মহারাজ উচ্চারণ করছেন মন্ত্র – সঙ্গে সঙ্গে তারাও। সে মন্ত্রে কী আছে? না, এই জীবজগতের প্রতিটি কণায় ঈশ্বরের উপস্থিতি – তাঁকে খুঁজতে মানুষ যেন নিজের চারপাশে তাকায়। বাচ্চারা মন্ত্রের প্রতিটি কথা মহারাজকে অনুসরণ করে প্রবল গায়ের জোরে উচ্চারণ করছে। চার বছরের সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটিও পা ছড়িয়ে বসে, ছোট ছোট হাতে তার দু'পাশের মেঝে থুপ-থুপ করতে করতে বলছে, এই জীবজগতের প্রতিটি কণায় ঈশ্বরের উপস্থিতি – তাঁকে খুঁজতে মানুষ যেন নিজের চারপাশে তাকায়। পাহাড়ঘেরা উত্তরাখণ্ডের ছোট্ট এক গ্রাম – চারদিকে গাছপালা, পাখি, হ্রদ, পাহাড়ি নদী। তাদের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এই কথা।

তখনও মনে হয়েছিল, আমরা বুঝি বা না বুঝি – এটুকু কথা উচ্চারণ করতে পারার ভাগ্য বহু, বহু জন্মের সাধনালব্ধ ধন।

"ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়"

Comments