Followers

যশোর রোডের গাছেরা

পরিবেশের কথা উঠলে (বা না উঠলেও) Inclusive মনোভাব আমাদের মধ্যে তেমন একটা নেই। Exclusivity-র অসুখ আমাদের বুঝিয়েছে, nature হলো culture/nurture-এর বিপরীত; একে থাকতে হলে ওকে যেতে হবে। এই বাইনারি অবশ্য নতুন নয়। বহুযুগ আগে মানুষের 'enlightenment'-কে ত্বরান্বিত করা ইতিহাসসমূহ আজ আমাদের সম্পদ। সেইসব ইতিহাসের জোরে আজ আমরা বাড়িঘর, রাস্তাঘাট তৈরি করতে অসংখ্য গাছ কেটে ফেলি, পিছপা হই না। নিজেদেরকে কাঠঠোকরা অপেক্ষা উন্নততর প্রজাতি বলে দাবি করি – কারণ কাঠঠোকরা-র ঘরও কাঠেরই, যদিও একটিও গাছকে প্রাণে না মেরেই সে ঘর তৈরি। 

যশোর রোডে রেলওয়ে ওভারব্রিজ তৈরি করা, এবং ন্যাশনাল হাইওয়ে প্রশস্ত করার লক্ষ্যে সংলগ্ন প্রায় ৩৫৬টি গাছ কাটার পক্ষে কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে সমর্থন জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট –
https://legal.economictimes.indiatimes.com/amp/news/industry/sc-upholds-calcutta-hc-order-allowing-felling-of-over-300-trees-for-construction-of-5-robs/97752947

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অবাক-করা নয় বিষয়টি। এরকম রায়, এবং তার সমর্থন যে কী ভীষণ সচেতনতার অভাব থেকে আসে, তার শিকড় যে কতদূর বিস্তৃত, এক কথায় বলে শেষ করা যাবে না।

কোর্টের রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিটি কাটা গাছ পিছু পাঁচটি করে নতুন গাছ রোপন করতে 'রাজি' হয়েছে রাজ্য। 

প্রথমত, এমন ঘটনায় 'রাজি' একমাত্র তখনই হওয়া সম্ভব, যখন বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে কেউ একেবারে অন্ধ-অসচেতন। 

দ্বিতীয়ত, প্রতি গাছ-পিছু এই পাঁচটি করে গাছ কোথায় লাগানো হবে? স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে? তাদের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে জানানো বিশদ প্ল্যান দেওয়া হয়েছে কি? দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলির কাটা পড়া যতটা নিশ্চিত, যে গাছগুলি লাগাতে সম্মত হয়েছে প্রশাসন, তাদের ভবিষ্যৎ ততটাই অন্ধকার।

তৃতীয়ত, যে গাছগুলি এখন দাঁড়িয়ে আছে কাটা পড়ার অপেক্ষায়, তাদের বয়স আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ বছর। প্রায় ২৫০টি গাছ লাগিয়েছিলেন তৎকালীন যশোরের জমিদার কালী পোদ্দার ১৮৪০ সালের আশেপাশে। পরবর্তীতে আরও বহু গাছ রোপিত হয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দীজুড়ে এই গাছগুলি পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্রকে কী কী ভাবে রক্ষা করে চলেছে, তার পূর্ণ অবয়ব আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা সম্ভব নয়। নিজেদের স্বার্থ দিয়েই আমরা সবকিছু বুঝতে অভ্যস্ত; তাই সে দিয়ে বুঝতে গেলে বলতে হয়, গাছগুলি এতদিন এত মানুষকে ছায়া দিয়েছে। সে ব্যতীত এত অসংখ্য পাখির বাসা তাদের ডালে ডালে; এত পোকামাকড়, জীববৈচিত্র্য ওই গাছগুলিকে ঘিরে। তাদের কাটা মানে তো শুধু তাদের কাটা নয়; সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত জীবন, জীবনযাত্রা ও সম্ভাবনাকে ব্যাহত করা। একেবারে সমূলে উৎপাটিত করা। এর উত্তর কি প্রতি গাছপিছু ওই পাঁচটি করে চারাগাছ (তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে লাগানো হবে) হয়ে উঠতে পারবে? পারলে, কবে পারবে? ততদিন কী হবে? পরিবেশ দূষণের এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যে জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তাতে বাস্তুতন্ত্রের এত বড় ক্ষতির কোনও উত্তর হতে পারে না। এই মুহূর্তে আর একটি গাছও না কেটে যদি কেবল গাছ লাগিয়েও যাওয়া হয়, তাতেও জলবায়ু-সমস্যার সমাধান হবে না। সেখানে ৩৫৬টি গাছ কাটা (গাছপিছু পাঁচটি চারাগাছ লাগাতে 'প্রতিশ্রুত' হয়ে) যে কী অভাবনীয় absurd!

চতুর্থত যে কথাটি মনে পড়ছে, তা বোঝানোর নয়। তা অনুভব করার অবস্থায় আমরা সমষ্টিগতভাবে আজ আর নেই। হয়তো বা এককালে ছিলাম, যখন 'পশু'র সঙ্গে মিল বেশি ছিল আমাদের। 'আলোকিত' হওয়ার পর, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে জ্ঞানী হওয়ার পর সেই বোধ আমাদের গেছে। তা হলো, ওই শুরুর কথা – exclusive civilisation এর বদলে inclusive environment-এর ধারণায় বিশ্বাসী হওয়া। আমরা প্রকৃতি বা পরিবেশ-বিচ্ছিন্ন নই, তার অংশ। সেই পরিবেশের নিজস্ব জ্ঞানভাণ্ডার আছে, দীর্ঘজীবী বৃক্ষেরা এবং তাদের সংস্পর্শে বেঁচে থাকা প্রাণীজগৎ সেই জ্ঞানের আকর। সেই জ্ঞান অধীত হয় যৌথভাবে বেঁচে থাকায়; সেই জ্ঞানে 'তাত্ত্বিক' আর 'ব্যবহারিক'-এর ভেদ নেই। যেভাবে সমস্ত দেশ থেকেই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে লোককথা-প্রচারিত, বেঁচে থেকে প্রমাণ করা জীবনবোধ, তেমনই হারিয়ে যাবে এটিও। নিজেদের ড্রয়িংরুমকে 'spacious' করে তুলতে বাপ-মা-ঠাকুরদাকে মেরে ফেলবো আমরা।


যদিও সুবুদ্ধি ও প্রাণভয় থাকলে এসব কথা বলে দিতে হয় না, তবু বর্তমান সময়ে এই দুয়ের অনুপস্থিতি অনুমান করে, কর গুনে বলে দেওয়া যেতে পারে, যশোর রোডের প্রায় চারশোটি বৃক্ষ কেন রক্ষা করা প্রয়োজন। 

১. ছোটবয়সে জীবনবিজ্ঞানে পড়া গাছেদের কাজকর্মের মধ্যে যা কিছু পড়তো – বাতাসে উপস্থিত কার্বন ডাই অক্সাইড কাজে লাগানো, অক্সিজেন তৈরি করা, এসবের বাইরেও পুরোনো গাছেদের একজোট হয়ে থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আজ যাকে আমরা মাইক্রো-ক্লাইমেট বলে থাকি, তার রক্ষার্থে। কয়েক মিটার বা মাইল বিস্তৃত অঞ্চলে canopy দিয়ে ঘেরা micro-climate এর গুরুত্ব এখন প্রতিদিন বেড়ে চলেছে যখন ম্যাক্রো-ক্লাইমেটের ভবিষ্যৎ মুখ থুবড়ে পড়ছে আমাদেরই কল্যাণে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বিভিন্ন প্রাণীপ্রজাতির বৈচিত্র্যময় বেঁচে থাকার জন্য বিস্তৃত বনাঞ্চল secure করা দুঃসাধ্য আজকের দিনে; কিন্তু কয়েক মাইল ব্যাপী বৃক্ষ-মণ্ডিত এই ছোট ছোট এলাকাগুলি খুব সামান্য হলেও গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের এক একটি সদুত্তর। 

২. ২০২২ সালে দেখা যাচ্ছে, বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১২% – কবে থেকে, না ২০০০ সাল! এমতবস্থায় যে গাছ যত বৃদ্ধ, তার কার্বন-শোষণের ক্ষমতা তত বেশি। শুধু তো সালোকসংশ্লেষের সময়টুকু নয়, গাছেরা কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে জমা করছে নিজের গায়ে, শিকড়ে, সেই অঞ্চলের মাটির ফেনোলিক অ্যাসিডে। আর সব ছেড়ে যদি কেবলমাত্র বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য আর মানুষের সুবিধাটুকুও দেখি, এই ধরনের soil-organic কার্বনের উপযোগিতা অপরিসীম। 

৩. এনডেঞ্জার্ড স্পিশিজ বলে যে-সব জীবেদের চিহ্নিত করে থাকি আমরা, তাদের সবাইকে 'বাঘ বাঁচান' প্রকল্পে ফেলা যায় না। খাদ্য-শৃঙ্খলের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত অসংখ্য জীব (উদ্ভিদ ও প্রাণী, উভয়ই) তাদের জীবন ধারণ করে আছে পুরোনো, বুড়ো গাছ-ঘেরা অঞ্চলে। আপাতভাবে আমাদের চোখে পড়ে না হয়তো তারা, ঠিক যেভাবে আমাদের সমাজেও যাদেরকে আমরা দেখতে চাই না, তারাও 'চোখে পড়েন না' আমাদের। তা বলে তাদের 'নেই' করে দেওয়া উচিৎ নয় বলেই মনে করি।

৪. আবারও ফিরে যাই সকালের সেই কথায় – রাজ্য বলেছে, একটি গাছ পিছু পাঁচটি চারাগাছ লাগাবে।গাছগুলি কোথায় লাগানো হবে? তাদের বড় করার দায়িত্ব কে নেবে? কংক্রিট দিয়ে ঘিরে রোজ জল দিলে তারা বড় হবে? বাপ-মা মরা সন্তানকে একটা তোষক আর দু বেলা ভাত দিলে সে মানুষ হবে? যাদের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে এই ছোট চারাদের, তারাই আসলে এই চারাদের বড় করে তোলার সবচেয়ে বড় কাণ্ডারী। বড়, পুরোনো গাছ মারফৎ মাটিতে জমা হওয়া কার্বন ও নাইট্রোজেন ছোট গাছেদের সুষম আহারে অবশ্য-প্রয়োজনীয়। ছোট গাছেদের একটি নির্দিষ্ট পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রয়োজন হয়। ছোট থাকাকালীন তারা সবসময় একইভাবে, বা বড়দের মতো সূর্যালোকের সংস্পর্শ পায় না, কার্বন সংশ্লেষে অসুবিধে হয়। সেই না-মেটা চাহিদা অনেক ক্ষেত্রেই পুষিয়ে দেয় বড় গাছগুলির সৃষ্ট মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্ক। ফলত, বড় গাছেদের উপস্থিতিতে ছোটদের বড় করে তোলা আবশ্যিক। তাদের বিকল্প হিসেবে নেড়া জমিতে চারাগাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকরী ও আশাব্যঞ্জক, এ থেকেই কিছুটা অনুমান করে নিতে পারি আমরা।

এছাড়াও, বড় গাছ ও তাদের আশ্রয় করে থাকা অজস্র ছোট গাছ, ছত্রাক ইত্যাদির ভেষজ উপকারিতার কথা কেবল মানুষের সুবিধার্থেই বলা যায় বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রের কথা বাদ দিয়ে। বহু কারণ এ মুহূর্তে বাদ দিয়েও গেলাম। সময়ান্তরে আরও বলা যাবে।

সবশেষে, আবারও পুনরাবৃত্তি। অধিকন্তু ন দোষায় – আমরা পরিবেশের অংশ; আমরা পরিবেশের কর্তা নই। Gaia hypothesis এর সঙ্গে পরিচিত থাকলে দেখবেন, সে বলে – পৃথিবীর বিপুল বৈচিত্র্যময় biological system আসলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব। কেউ তার বাইরে নয়; সবাই বেঁচে আছে কথোপকথনের মাধ্যমে, বোঝাপড়ার মাধ্যমে। মানুষ তার বাইরে নয়। যতই বুদ্ধি আসুক, বিজ্ঞান আসুক, পুঁজি আসুক, এই বিরাট জীবজগতের একটি ক্ষুদ্র প্রজাতিভিন্ন মানুষের আর কোনও বৃহত্তর পরিচয় নেই বেঁচে থাকার পথে। সব জেনেও, বুঝেও অনেক ক্ষতি করছি আমরা। আরও করবো, এও বুঝতে পারছি। কিন্তু একমুখী আগ্রাসন নিয়ে জিততে আমরা পারবো না। এই শুভবুদ্ধিটুকুর উদয় হোক।

Comments