বনস্পতির ছায়া
সাত্যকি দা অবশেষে 'অবসরপ্রাপ্ত' হবেন আজ, খাতায়-কলমে। তাঁর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের শিক্ষক-জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে যখন তাঁর কাছে পড়ার সুযোগ পাই, তদ্দিনে, হয়তো বা তারও অনেক আগে থেকেই, তিনি 'লেজেন্ড'।
বন্ধুদের মধ্যে ইয়ার্কি চালু ছিল, সাত্যকি দা-র সাদা চুলের বেশিটাই আসলে চকের গুঁড়ো। তাঁর মতো এমন নিরলস ও নিয়মিতভাবে 'chalk-&-talk' শিক্ষণপদ্ধতির ব্যবহার আর দ্বিতীয় কাউকে করতে দেখি নি। নরেন্দ্রপুরে প্রথমদিকে এটুকুই ছিল আমার কাছে তাঁর পরিচয়। এক-একটি পাঠ্য কবিতাকে, উপন্যাসকে, নাটককে জলের মতো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে করতে, সেই ব্যাখ্যার 'keywords'গুলি বোর্ডে লিখতে লিখতে, লিখে তাদের 'দাগিয়ে' দিতে দিতে, মৌখিক ব্যাখ্যা ও বোর্ডে লেখা শব্দগুলির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে ঘটাতে সাত্যকি দা এক-একটি ক্লাসকে করে তুলেছেন স্বয়ংসম্পূর্ণ এক-একটি উত্তর – পরীক্ষার প্রশ্নের, এবং আমাদের সম্মুখীন হওয়া বা না-হওয়া সম্ভাব্য সকল সমস্যার।
কাদের উদ্দেশ্যে ক্লাসে পড়িয়েছেন সাত্যকি দা? ফার্স্ট-বেঞ্চার বা টপ-স্কোরারদের মুখ চেয়ে তিনি ব্যাখ্যা সাজাতেন বলে মনে করি না। তাঁর পাঠের লব্জগুলি ডাকসাইটে পাণ্ডিত্যের 'jargon'-বর্জিত; পরিমিতিবোধ ও সহজগম্যতা তাঁর পড়ানোর প্রধান অলংকার। বহু কষ্টে ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলা, ক্লাসে কথা বলতে না-পারা, মুখচোরা, রেজাল্ট-খারাপ-করে-ফেলা ছেলেটিও যাতে পাঠ্যবইয়ের বক্তব্য বুঝে, পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে নিজেকে কোথাও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সাত্যকি দা পড়িয়েছেন সেই উদ্দেশ্যে। তবু, তাঁর সেই পাঠ কোনোদিন অতি-সরলীকরণের দোষে দুষ্ট হয় নি; ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে লাস্ট বেঞ্চ, টপ-স্কোরার থেকে বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্র হয়ে-যাওয়া 'ফেল্টুশ', ইংরাজি বা বাংলা মিডিয়াম থেকে আসা ছাত্র নির্বিশেষে সকলেই তাঁর কাছে প্রণত।
যে তাঁর থেকে যতটুকু গ্রহণ করতে পেরেছে, তিনি তার কাছে তেমনই। যে ছেলেটি কোনোভাবে গ্র্যাজুয়েট হয়ে যে-কোনও একটি চাকরি করে পরিবারকে সাহায্য করবে ভেবেছে, সাত্যকি দা তাকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার লক্ষ্যে পাঠ দিয়েছেন; যারা বেছে নিয়েছে স্নাতকোত্তর শিক্ষার পথ, মাস্টারমশাইয়ের সেই একই পাঠ তাদের কাছেও অনুকূল মনে হয়েছে। Advanced Learner এবং Slow Learner-এর ভিন্ন চাহিদা বুঝেও, তাদের প্রতি ভেদদৃষ্টি না রেখে কী ম্যাজিকে এমন শিক্ষকতা সম্ভব, কে জানে! হোস্টেলে সামান্য অর্থ নিয়ে তাঁর ছাত্রেরা থাকে, তাই কোনও বইয়ের কিছু পাতা 'ফটোকপি' করার থাকলে, প্রায়শই নিজেই সবার জন্য ফটোকপি করে আনতেন। থার্ড ইয়ার – আমরা পড়ছি Ted Hughes-এর লেখা 'The Thought Fox'। কবিতাটির সূত্রে কবির লেখা আরও কিছু 'animal poems' আমাদের পড়া দরকার। তখন কথায় কথায় ইন্টারনেটের এত বহুল ব্যবহার ছিল না। তাঁর ছাত্রেরা কিভাবে গাদাখানেক বই ঘেঁটে একজোট করবে এতগুলো কবিতা? একটি বড়, সাদা পাতায় সাত্যকি দা নিজে কপি করেছিলেন ওই সাতটি কবিতা, খুদে-খুদে কিন্তু সুস্পষ্ট হস্তাক্ষরে; সেইটি ফটোকপি করে এনেছিলেন সবার জন্য। তাঁর কাছে এমন আদরে বেড়ে ওঠার দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হয়েছে কলেজের পর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে; সেই সব বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ঘাড়ে ধরে প্রতিটি কাজ করিয়ে নিয়ে সাত্যকি দা-র স্নেহচ্ছায়াকে সুদে-আসলে বুঝে নিয়েছে।
ছাত্রাবস্থা পেরিয়ে একসময় কিছুদিন সেই বিভাগেই পড়িয়েছিলাম। তখনও মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র-প্রীতি, বাৎসল্য, ছাত্রদের সমস্ত ভাবনা একা বওয়ার প্রবণতা দেখেছি – শুধু অন্য প্রান্ত থেকে, আরও কাছ থেকে। সারাদিন ক্লাসের শেষে তিনি গভীর সন্ধ্যা অব্দি বসে থাকতেন ছাত্রদের জন্য। যারা উত্তর লিখে খাতা জমা দিয়ে যেত, তাদের সেইসব উত্তরের মার্জিনে বা শেষে তিনি লিখে চলতেন তাঁর মতামত। পরীক্ষা কাছে এসে গেছে, কারো উত্তরে বড় বেশি ভুল। 'Rewrite' করানোর সময় নেই। সাত্যকি দা নিজেই লিখে দিচ্ছেন তিন-চার পাতার সঠিক উত্তর তার খাতায়। কেউ বা এসে বলছে, লাইব্রেরির বই নিয়ে বসে রেফারেন্স ওয়ার্ক করবে; তিনি নিজের নামে তিন-চারটি বই তুলে তাকে ক্লাসরুমে গিয়ে দিয়ে আসছেন। যত সন্ধ্যা অব্দি সে কাজ করতে চায়, করুক। সাত্যকি দা আছেন।
বিভাগের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে, আপাত-তুচ্ছ বিষয়ে তাঁর অবধান অবাক করে। কার কত কী জমানোর অভ্যাস থাকে; সাত্যকি দা বিভাগে জমিয়ে রাখতেন পুরোনো বছরের সব প্রশ্নপত্র আলাদা আলাদা ফোল্ডারে, প্রতিটি সেমিস্টারের জন্য; এনে রেখেছিলেন একটি রুলটানা হলদেটে পাতার খাতা, সেটি বিভাগে আমাদের সবার 'Question Bank'। যে যা-ই পড়াই না কেন, সম্ভাব্য প্রশ্ন ওখানে লিখে রাখতাম। পরীক্ষার আগে যদি কোনও শিক্ষক অনুপস্থিতও থাকেন, paper set করতে ওই Question Bank এবং পুরোনো প্রশ্নপত্র ঠিক কাজে লেগে যাবে। এমনকি ছাত্রদের 'লাস্ট-মিনিট সাজেশন' দিতেও এই দুটি ডকুমেন্ট অপরিহার্য।
সাত্যকি দা-র পৃথিবীতে তিনি প্রকৃত অর্থেই সব্বার, তাইই হয়তো তাঁকে অতিমানবিক মনে হয় সময়ে সময়ে। দৈনন্দিন গতে, অভ্যাসবশে করে চলা তাঁর পর্বতপ্রমাণ কর্মযজ্ঞ আমাদেরও বহু সময়ে প্রাণিত করতো নিখুঁত কাজ করতে। তাঁর মতো, প্রতিদিন সাড়ে দশটার ক্লাস সাড়ে দশটাতেই শুরু করতে ইচ্ছে করতো। তিনি সন্ধ্যা অব্দি বিভাগে থেকে নানা কাজ করবেন, তাই আমিও করবো। আমাদের করার মতো কাজ কিন্তু নেই তেমন; সন্ধ্যা অব্দি বসে বসে মাস্টারমশাইকে কাজ করতে দেখছি কেবল। লাইব্রেরির জন্য নতুন বই এসেছে; দিনের শেষে এক কাপ চা আর বইগুলি নিয়ে বসেছেন সাত্যকি দা। একের পর এক বইগুলির ডিটেলস বলে চলেছেন তিনি, আর আমরা কেউ উল্টোদিকে Accession Register নিয়ে বসে লিখে রাখছি সব।
এরকম নানা টুকরো-টুকরো ঘটনা জুড়ে তৈরি করি সাত্যকি দা-র সঙ্গে কাটানো সময়ের ছবি; একটু পর আরও অজস্র ঘটনা এসে ভেঙে দেয় আগের ফ্রেমটি। তৈরি হতে থাকে অসংখ্য মুহূর্ত-জমা একটি চালচিত্র। আর মনে হতে থাকে – শিক্ষকের, সাত্যকি দা-র মতো শিক্ষকের অবসর নেই। বহুদিন আগে নরেন্দ্রপুরে ইংরাজি বিভাগেই কোনও একটি আড্ডায় আমার এক অগ্রজপ্রতিম বলেছিলেন, "কারো ছাত্র যখন হয়েছো একবার, বলতে নেই 'আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম'। তুমি সবসময়ই তাঁর ছাত্র।" সাত্যকি দা-র ছাত্র আমরা যারা, তারা আজীবন তাঁর ছাত্র, তাঁর স্নেহধন্য। তাঁর কাছে নেওয়া সাহিত্যের, সমদর্শিতার, মনুষ্যত্বের পাঠ ধারণ করতে আমি ব্যক্তিগতভাবে অসমর্থ, অক্ষম। তবু, পাঠ তো নিয়েই চলেছি, নিয়েই চলবো, অনিঃশেষ। কাজেই, তাঁরই বা আর অবসর কোথায়?
Comments
Post a Comment