শেষদিন, ২০২১
ওবায়েদ হকের লেখা 'জলেশ্বরী' উপন্যাসে আসাদউদ্দীন বন্যায় ডুবে থাকা একের পর এক গ্রাম পেরিয়ে এগিয়ে চলেন, কলেরারোগীর লাশ দাফন করতে করতে। মৃত্যুরও আগে অকুস্থলে এসে পৌঁছন আসাদউদ্দীন, কারণ তিনি নাকি লাশের গন্ধ পেয়েছেন। পিছন পিছন আসে মৃত্যু। এই করতে করতে এক রাতে নিজের গা থেকেই লাশের গন্ধ পান আসাদ; কিন্তু তখন দেরী হয়ে গেছে, নিজের গোর নিজ হাতে খোঁড়ার সময় আর নেই।
ঠিক এরকমই লাশের গন্ধওয়ালা বছর হলো ২০২১। মানুষ মানুষের মতো মরলে বেশ লাগে। তখন সে দিয়ে সাহিত্য হয়। পেরিয়ে আসা জীবনের যুগপৎ অহং ও করুণায় কড়াপাকের দর্শন তৈরি করা যায়। কিন্তু যখন মানুষ খড়কুটোর মতো মরে, যখন মৃত্যু তার মহিমার সিকিভাগও পাওয়ার বদলে এক সীমাহীন, সংজ্ঞাহীন কোল্যাটেরাল ড্যামেজে পরিণত হয়, তখন মনে হয়, যা কিছু ভাবছি বা করছি, বেশিটাই বাচালতা, বাহুল্য, অর্থহীন।
হয়তো সে কারণেই, এ' বছর আমার নিজের লেখালেখির পরিমাণ বেশ কমেছে। আমন্ত্রিত নিবন্ধ আর অল্প কিছু কবিতা ছাড়া তেমন খুব একটা লেখা হয়নি, বিশেষত বছরের দ্বিতীয় ভাগে। না-হয়ে-ওঠা, অসম্পূর্ণ লেখার খসড়া যে ডায়রিতে বা ডেস্কটপে অনেক, এমনও নয়। লিখিনি; লিখতে ইচ্ছেও করেনি।
কিন্তু তা বলে একবারের জন্যও মনে হয়নি জীবন থমকে আছে। সময়ে সময়ে লিখতে না পারার অস্থিরতা চেপে ধরেছে ঠিকই, কিন্তু প্রিয়জনেরা, ও ভালোবাসার মানুষটি সেই অস্থিরতা পেরিয়ে বারবার আমাকে দু'হাত ভরে দিয়েছেন সাহচর্য, স্নেহ। দুঃসময়ে কেবলমাত্র "আছি" -- এই শব্দটি আমাকে রেখেছে। সেই পথে, জীবনে চলতে চলতে লিখতে না পারার দুঃখকে লিখতে পারার আনন্দের মতোই সাময়িক, নির্ভার মনে হয়।
বরং এবার অন্য বছরের চেয়ে বই কিছু বেশি পড়া হয়েছে। বই পড়ার মধ্যে যে পথ চলা, সন্ধান, সবই আবার করে অনুভব করেছি খুব কাছ থেকে।
নতুন বছরে আমরা যেন কাজের মধ্যে থাকি, যেন নিজেদের শরীরের দিকে নজর দিই -- এইই কামনা করি। বাকিটা তো তেল আর জলের গল্প; কোথাও মিশ খাবে, কোথাও বা খাবে না। কী আর করা যাবে। যা-ই হোক, আছি।
Comments
Post a Comment