Followers

উপশম

আলো আসে। 
বাড়ির পুরোনো, মরচে পড়া গ্রিলের গা ঘেঁষে আলো এসে পড়ে। ভোরের লোকাল ট্রেন ঝমঝম করে চলে যায়, পাশের নিঝুম বিলে ফুটে থাকে শালুক; আলো এসে তার পাঁপড়ির কিনার ছোঁয়। বিরাট মাঠে একা একা দৌড়োয় যে খেলাপাগল, আদুল-গা কিশোর, তার তামাটে বুকে, পিঠে সোনার রঙ লাগে। শহরের একটু দূরেই গাছগাছালি ঘেরা বাড়ির ছাদে, বারান্দায়, উঠোনে তিনরকম আলাদা আলাদা সবুজ ছেঁচে এক একরকম রোদ আসে। বাদামপাতা গাঢ় সবুজ ওম দেয়; মাধবীলতা গাঢ় হওয়ার গাম্ভীর্য আনতে গেলেই বাতাস তাকে ওড়ায়। ওমনি সে হেসে ফেলতেই ঘন সবুজ গলে আলো হয়ে পড়ে উঠোনে। একটি শিউলি মাটিতে পড়ার আগে পাতায় বিশ্রাম নেয় কিছুক্ষণ। ইঁট-কাঠ-বরগায় বাঁধা মনের কাছে এই সবই বনদেবী; আলো তাঁর গা বেয়ে চুঁইয়ে এসে মধুকরের খাতায় আশ্রয় নেয়।


বাগানের মাঝ দিয়ে বাঁধানো পথটি গেছে ও' মাথা অব্দি। মাটির গন্ধে, আশপাশের সবুজ, জংলা গন্ধের মধ্যে সে কিছুটা টাই-পরা ফিটফাট বাবুটি -- শক্তপোক্ত, দুদিক মাপা, কোথাও ভাঙা বা ফাটা নেই তার। কিন্তু হঠাৎ আপিসে হাফ-ছুটির খবর এলে যেমন সেই বাবুটিরও আপনা হতে হাত গলায় উঠে টাইটা একটু ঢিলে করে দেয়, ফাইলপত্রে আর মন টেঁকে না, তেমনই ভাদ্রের শেষে আকাশের গুড়গুড়, ঝমঝম এই বাঁধানো পথটির গাম্ভীর্যকে বেচাল করে।
    
দুদিনের বৃষ্টিতে সে নিজের আপাত টানটান শরীরের আনাচে কানাচে জল জমার ব্যবস্থা করে। বাচ্চাদের ছপছপ, পাখিদের ঝটপটি স্নান -- সবই সে জলে কুলোয়। শ্যাওলা মেখে ভালমানুষটি সেজে বসে থাকে সেই পথ, তার সঙ্গে তখন কেউ ব্যস্ততা দেখাতে গেলে ভীষণ মুশকিল। তখন তার ছুটির সময় -- আধফোটা ফ্যাকাসে রঙন তার দুই পাশের ঝুরো মাটিতে লেগে থাকে; ও' মাথায় মাধবীলতাকে জড়িয়ে মধুমালতী গভীর গোলাপী আর সাদার বাতুলতায় পথ ভরিয়ে রাখে অনাগতের জন্য। আশ্চর্য, ফুলেরা ফুটে আর ঝরে একইরকম আনন্দ পায় যেন! তাদের নাম যে এত সুন্দর, আর এমন নাম বারবার উচ্চারণ করার মানুষও যে পৃথিবীতে আছে, এই অহংকার তাদের ঝরতে বাধা দেয় না।
     
এই পথ থেকে কিছুদূরে দীঘির পারে সন্ধে নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। এবড়োখেবড়ো বড় চাঁইপাথরের আড়ালে জড়ো হয়েছে শুকনো, খয়েরি পাতারা; পাথরগুলির গায়ে সবুজ বুনো লতা জড়িয়ে নিয়েছে তাদের। বৃষ্টি ধরেছে এখন, একটুখানি। জলও ধরেছে কিছু কিছু পাতায়, হেলায়, মুক্তোর মতো। যে দীঘিজলে শেষ বিকেলের তাল-সুপুরি গাছের দীর্ঘ ছায়া টাপুর-টুপুর করে কাঁপছিল, এখন সে জলে রাতের প্রথম প্রহরের বাতাস লেগেছে -- যেমন বাতাসে খাতার পাতায় আচমকা 'তরণী' শব্দটি লিখতে ইচ্ছে করে। অনেক সাহস করে মেঘ ছিঁড়ে বেরোনো দ্বিতীয়ার চাঁদ সেই বাতাসে, জলে গলে গলে যায়। পিয়ালতরু না থাকলেও, মাধবীলতা দোলে, সঙ্গে মধুমালতীও। এ বাতাসে পাতা ওড়ে না, শুধু একে অন্যকে বলে "সর্, সর্"! কে গায় "কুঞ্জদুয়ারে অবোধের মতো   রজনীপ্রভাতে বসে রব কত--"। অসীমের আলোয় যে রূপরেখা দেখা যায়, সে কি আকাশের, না পৃথিবীর?

  
সামনে এখন সবুজের চারটি আলাদা আলাদা স্পর্শ। সবার চেয়ে উঁচুতে, ওই দূরে পশ্চিমা পাহাড়ের বন; সূর্য এখন ওর পিছনে, তাই পাতলা ধোঁয়ার মতো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে প্রায় কালচে হয়ে আছে ও। দৃষ্টি একটু নিচে আনলে, আরেকটু ডানদিকে, আরও দূরের কোনো চিত্রপটে বিকেলের আধশোয়া উপত্যকা। সূর্য থেকে এ ততটা বঞ্চিত নয়,মেঘও নেই আশেপাশে, তাই শ্রাবণের শেষে আমগাছের নতুন পাতার মতো সবুজ তার গায়ে। ওই উপত্যকাই হাজারো ঢেউ খেলিয়ে এসে ঠেকেছে আমার পায়ের নিচের এই মাটিতে। যত সে সরে এসেছে পূর্বদিকে, আমার দিকে, শীতের অনাবশ্যক রুক্ষতা এসেছে তার মধ্যে। সেই সবুজ ঘন উদাসীন, নিঃসঙ্গ। আমার পায়ের কাছে এই দৃশ্যের শেষ সবুজ -- বাতাসে এলিয়ে পড়া পাহাড়ি কাশবন। তার কিছুটা ফ্যাকাসে সবুজ, আধো হলুদ শীষ ছোট্ট, পার্বত্য বিকেলের চলে যাওয়া দেখছে, আমারই সঙ্গে।
   
হাঁটাপথে এখনও অব্দি তিনটি অবিন্যস্ত পাইনবন পেরিয়ে এসেছি। দুপুরের রোদে পাথুরে মাটিতে এদিক সেদিক পড়েছিল সেইসব গাছের আঁক-কাটা শুখা ফল। আনকোরা জুতোর মশমশে আওয়াজ পেয়ে খড়মড় করে ছুটে পালিয়েছে গিরগিটি; শেষ বাড়িটিও চোখে পড়েছিল ওর পালানোর পথেই, খাদের ঢালে, এখন থেকে প্রায় ঘন্টা দুই আগে। কাঠবাড়ির জানলা ধরে দোল খাচ্ছিল বছর আটেকের একটি মেয়ে, আর ওদিকে, দেওয়ালের আড়ালে শেষবেলার রান্নার ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছিল সারা উপত্যকায়। 
    
এতক্ষণে সম্পূর্ণ নিশ্চিত, যে পথ হারিয়েছি। সঙ্গে আমার পরিচিত আরেকটি মানুষ থাকলেও তিনি পাহাড়ের পরিচিত নন। পাহাড় অপরিচিতদের টানে, খেলায়, বিপদে ফেলে, কাঁদায়; শেষে একটা ছোট্ট বাঁক দেখিয়ে তাকেও টেনে নেয় নিজের কেন্দ্রাতিগ সংসারে। আমরা সেই বাঁকেরই আশায় এখন, দুরাশাও বলা যায়। দেড় ঘন্টা আগে যে ঠিকানায় পৌঁছনোর কথা ছিল, তার ল্যান্ডমার্ক খুঁজতে খুঁজতে দেড় ঘন্টা গভীরে চলে এসেছি। না পেয়েছি ল্যান্ডমার্ক, না ঠিকানা, না এই দুয়ের বাইরে কোনও বাড়ি। শহরের রাস্তায় চমকে দিয়ে স্ট্রিটল্যাম্প জ্বলে যেমন সন্ধে নিয়ে আসে, তেমনই এখানে অতর্কিতে শুরু হয়েছে ঝিঁঝিঁদের সভা। সূর্য নিস্তেজ হয়ে যায়, সামনের বিরাট পাহাড় শুধুই অন্ধকার এক ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
     
গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রয়োজনীয়তা প্রায় মাথায় উঠেছে, অন্ধকার পড়ার আগে কোনোভাবে কোথায় মাথা গোঁজা যায় -- এই চিন্তায় যখন আচ্ছন্ন আমরা, দূর থেকে আবছা শাঁখ বাজে যেন। কিছু না বুঝেই তাকাই কোনও এক দিকে। দূর আর খুব দূর নয়, বেজে উঠেছে ঘন্টা, কাঁসর, শোনা যাচ্ছে সন্ধ্যারতির গান। পুরোহিত হয়তো প্রদীপ জ্বেলে উপাসনা শুরু করলেন। ওই যে, গাইছেন। ওই তো আমাদের ল্যান্ডমার্ক। পুরোনো লোকমন্দির, ফাটল ধরা দেওয়াল, সন্ধের মুখে যার গেহে শুধু প্রদীপের আলো জ্বলে। ওখানেই পৌঁছতে হবে। জীবনের দুই কাঙাল দশরথ আমরা শব্দভেদ করায় পা বাড়াই। গানটি ভেসে আসে, কখনও স্পষ্ট, কখনও একটু আবছায়া। সূর্য যেন পুরো ডুবে যেতে যেতেও এখনও যায় নি, দুজন মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া বাকি তার। সূর্যের শেষ আলোয়, একান্ত প্রয়োজন না পড়লে যে আলোকে অন্ধকারই বলে থাকি আমরা, সেই আলোয় আমরা এগিয়ে যাই সুরের দিকে। স্ফীত হতে থাকে দীর্ঘাঙ্গী পাহাড়ের ছায়া, ফুটে উঠতে থাকে অনামিকা নক্ষত্র ও তার সঙ্গিনীরা, আকাশ বিষহরী হয়ে আশ্রয় দেয়। শুনতে থাকি সেই অদ্ভুত লোকগান; কার উদ্দেশ্যে সেই আরতি, কে জানে --
    
"এই পথ, এই মুহূর্ত আজ নয়, বারবার এসেছে। তুমি একটি কররেখা শুধু; আবারও এমন সময়ে, এই পথেই তুমি আসবে। আবারও পথ হারাবে। তোমার স্মৃতিটুকু ছাড়া বাকি সবকিছুকে আমি এভাবেই ফিরিয়ে আনি।"


তাকে প্রথম দেখা হরিমতির সেই বাগানে, মাতলার ধারে। তখন কতটুকু আর হবে সে -- বড়জোর আমার কোমর-সমান; দেবদারুর সারি আর বিরাট অশ্বত্থের মাঝে তাকে রাখা হয়েছে সবে। মাটি নরম, শিকড় ভালো করে লাগেনি। সবার ভয়, সামনের বর্ষার ঝড়জলে না ভেসে যায় সে!
  
ক' বছর পরের বসন্তে যখন আবার গেলাম হরিমতিতে, তাকে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু বাগানে ঢুকতে ঢুকতেই চোখে পড়লো, সে তার সবটুকু শক্তি ঢেলে নিজেকে স্মরণীয় করেছে বসন্তে। সেই প্রথমদিনের দুবলা শরীর আর নেই; শিকড় ও মাটির সখ্যও বেশ চমৎকার এক যুগলবন্দী গাইছে যেন। দেবদারু আর অশ্বত্থের ছায়া অমান্য করে সে জেদি, একরোখা কিশোরীর মতো শরীরটা টান করে, বেঁকে, ছড়িয়ে পড়েছে রৌদ্রের অঞ্চলে। থুপো-থুপো ম্যাজেন্টা ফুলের ভারে তার সুঠাম শাখা একেবারে কোনও চৈতীবেলার স্বপ্ন হয়ে আছে। রোদ আর বাতাস বারবার তার আভরণে খেলে গিয়ে যেন জানান দিয়ে যাচ্ছে, এই উৎসবে তারা নিজেদের মনটুকু কাকে দিয়ে বসে আছে! ক' বসন্ত আগে যে মাটি তার শিকড়কে ধরে নিয়েছিল শক্ত হাতে, আজ ঝরে পড়া ফুলের অকুন্ঠ বৈরাগ্যে সে যেন কোনও আটপৌরে গৃহলক্ষ্মী, নিরলস সেই মা যিনি কাজের ফাঁকে মেয়ের ছড়িয়ে ফেলে রেখে যাওয়া সাজে সেজে উঠে হঠাৎই খুব সোহাগী।
   
আজ, কিছুক্ষণ আগে হরিমতির সেই বাগান একেবারে ছারখার হয়ে গেছে ঝড়ে। কলকাতায় ফেরার কথা থাকলেও ফিরতে পারিনি। সেই অশ্বত্থ ভেঙে পড়ে আছে, উপড়ে পড়েছে দেবদারু সারির প্রায় সবাইই। সারা বাগান জুড়ে ছড়িয়ে গেছে আরও কত কী -- নাম, অনুষঙ্গ, সবই। প্রতি বসন্তের সেই রূপবতী ঝড়ের শেষে দাঁড়িয়ে আছে বিহ্বল, স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধার মতো। বাতাসের বেগে তার শাখা বেঁকে কুঁকড়ে গেছে মাটির দিকে, হাওয়ার তেজে পাতাগুলি ঝলসে বাদামী হয়ে গেছে। আদরের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা প্রথম যৌবনের যে উচ্ছলতা, আলো-বাতাসকে নিজের প্রসাধন ভাবার যে অহংকার -- তা কখনই প্রস্তুত ছিল না ঝড়ের জন্য। যে বাতাস খেলায়, সে-ই আবার পোড়ায় -- এ কেমন কথা! 
   
ভেঙে যাওয়া শাখা কাণ্ডে যে ক্ষত করেছে, তা দিয়ে কষ গড়াচ্ছে এখন। ঘন সবুজ গন্ধ তার। আশপাশ থেকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হচ্ছে যখন টুকরো টুকরো করে দেবদারু, অশ্বত্থের দেহগুলি, আমার তাকে তখন আবার সেই প্রথম দিনের মতো মনে হলো -- ন্যুব্জ, শূন্য, শরণাগত। কার শরণে এসেছে সে? অনুমান করতে পারি মাত্র, যা থেকে সে বেড়ে উঠে আলোবাতাসে খেলেছে, ও পুড়েছে, এবং মাঝের এই ঊর্ধ্বমুখী সময়ে ভুলে থেকেছে যেই মাটিকে, সেই মাটির কাছেই ফিরে এসেছে সে। মাটি এখনও শিকড়টিকে ধরে আছে শক্ত, নিরাময়ী হাতে। প্রাণ পাঠাচ্ছে তার অসহায় মেয়েটিকে। যে রস ফুলের বহর দেখিয়েছিল, সেই রসই বুনো গন্ধ হয়ে ক্ষত দিয়ে গড়িয়ে নামছে। আশা করা যায়, কাল আর ঝড় আসবে না এমন সাংঘাতিক। তখন আবার শুরু করা যাবে। শূন্য থেকেই হয়তো; প্রথম থেকেই। তবু, শুরু তো করা যাবে, যেমন আমরা করেই থাকি।


তার পৃথিবীকে জানতে পা বাড়াই যতবার, তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস-খারাপবাসা-ভালোবাসাগুলো বুঝতে যতবার কাঁচাবুদ্ধির প্রশ্নপত্র মনে মনে মকশো করি, ততবার দেখি, তার কোনও পৃথিবীই নেই। সে-ই এই পৃথিবীর। 

গাছের পাতা থেকে টুপটাপ জল ঝরে পড়ে। হয়তো এই বছরের শেষ বৃষ্টি; সামনে রুখো-শুখো কয়েক মাস। কি জানি। তাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাই না এর, কারণ সে তখন দেখে বেড়াতে ব্যস্ত কলাপাতায় জল গড়ায় কেমন করে, কেমন করে ঘাসের আগায় ফড়িং এসে বসলে আকাশে মেঘ ঘন হয়। আবার বিকেল পড়ে আসার ঠিক আগে একবার যখন মেঘ সরে রোদ এসে পড়ে গাছতলায়, হলুদ ফুলের দৈনন্দিন সভায়, সে তখন শুনতে পায় বনদেবীর দ্বারে দ্বারে গভীর শঙ্খধ্বনি। চপলতায় ব্যাঘাত ঘটে একটু, সে দাঁড়িয়ে দু' দন্ড ছোটবেলার কথা ভাবে - কমলা আকাশের কত অগুনতি বিকেলে সে দেখেছে, বড় বড় খয়েরি পাতা ঝরে পড়ছে ওই উঁচু থেকে, কাঠবেড়ালি হুড়মুড়িয়ে পালাচ্ছে সেই পাতা-পড়া শব্দে। স্মৃতিতে ওই প্রতিটা পাতাই, যে মানুষগুলো ছিল, তাদের নিহিত প্রশ্বাস। 

যেই পৃথিবীর সে, সেই পৃথিবী তাকে সবকিছু দু' হাত ভরে দেয় নি মোটেই। প্রিয় মানুষেরা হেমন্তের পাতা হয়ে উড়ে গেছে একদিন। তিলে তিলে তৈরি হওয়া প্রাত্যহিকতার অভ্যাস ফেলে রেখে হঠাৎই একদিন তাকে চলে আসতে হয়েছে মলিন শহরে। রাতপাখি, শিউলি গাছ, পাহাড়, এদেরকে শেষবার "আসি"টুকুও বলে ওঠা হয়নি। স্বভাবতই, এমন অপসৃয়মান চরাচরে তার স্বতন্ত্র পৃথিবীর প্রশ্ন বাতুলতা। ফিরিয়ে দেওয়া তার ধাতে নেই, তাই এ' সব জানতে চাইলে সে ভাবতে বসে। প্রাকৃত মেখলার কাছে, মানুষের কাছে সে আমৃত্যু ঋণী -- এমনটাই বলে। বলতে বলতে কণ্ঠ বুজে আসে, চোখে জল আসে বছরের শেষ বৃষ্টির মতো, অকৃপণ। পৃথিবীর একবার তার হতে সাধ হয়।
  

নীরব হওয়ার, নীরবতা জানান দেওয়ার কত উপায়, কত পথ আছে, না? কথার মাঝে সুনিপুণ এমব্রয়ডারির কাজের মতো বোনা নীরবতা কমা-সেমিকোলন সমেত বসে যায় নিয়মমাফিক; আবার কোনও নীরবতা অনঙ্গ, সম্পূর্ণ, প্রখর; আগুপিছু সাজাতে পারে, কথার এমন সাহস নেই সে তল্লাটে। 

কিন্তু তার এক তৃতীয় নীরবতা। এলোমেলো, অনাহূত। যে সব কথা বিহ্বলতার জট ছাড়িয়ে এখনও তার উচ্চারণে গলে পড়েনি প্রভাতী হিমবাহ হয়ে, তাদের নীরবতার গ্রন্থিতে ভরে সে রেখে দেয় আলাপের আনাচেকানাচে। মুঠোফোনে আসা ভয়েস মেসেজের মাঝে কী এক কথা বলতে বলতে সে একদম চুপ করে যায়। একটি গ্রন্থি আমার জন্য রাখা তখন। আমি তুলে নিয়ে, কান পাতি আরও নিবিষ্ট হয়ে। ও' পার থেকে ভেসে আসে ঘরদোরের প্রাত্যহিকতার বন্দিশ। বাসনে জলের শব্দ, পাখার আওয়াজ, অন্য কারো কণ্ঠস্বর। যে নিবিড় দৈনন্দিনের গল্প সে গাঁথছিল, তার এই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরটি শুনে আমায় বুঝতে হয় উষ্ণতা, বুননের স্থায়িত্ব।

হয়তো বা তার পাঠানো এক মিনিট চল্লিশ সেকেন্ডের পাহাড়পথ-বিবরণে কেটেকুটে এক মিনিটই স্তব্ধতার গান। কখনও সে প্রাচীন গাছের পাশে এসে থামছে, ওই নীরবতায় আমি দেখছি, সে ছুঁয়ে দেখছে বাকলে জমে থাকা পুরু শ্যাওলা। জন্মদিনের ভোরে ছোট্ট পাহাড়ি ফুলের কথা বলতে গিয়ে যখন প্রকৃতির আত্মজবোধ তার ভাষাটুকুও কেড়ে নেয়, সে একেবারে অসহায় হয়ে আমার হাতে সেই নীরব গ্রন্থিটুকু রেখে, সরে গিয়ে একটা পাথরের উপর বসে। চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছুতেই কিচ্ছু বুঝতে দেবে না। একেবারেই না।

শহরতলিতে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাতের মতো চল্লিশ সেকেন্ডের কথার ফাঁকে, সেইই আদর্শ সময় নীরবতার গ্রন্থির বাঁধন আলগা করে দেওয়ার। আমি সেটুকুই করি শুধু। আস্তে আস্তে ভেসে আসে পাখির ডাক, পাতা মাড়িয়ে পায়ের এগিয়ে যাওয়ার আওয়াজ। সে না বলতেই তখন তার পাশে গিয়ে বসতে হয়, ওই পাথরে। সে তেমন কিছু না বলে থাকলেও, নীরবতার উত্তরে তখন তাকে বলি "যাবো"। সামনে দেখি, এক প্রাজ্ঞ অথচ অবাধ্য রোদে ভরে যাচ্ছে বরফচুড়ো। একটা খাড়াই পাথুরে পথ এগিয়ে যেতে যেতে হারিয়ে যাচ্ছে; সে বলে, "যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্ত"। মেঘ কেটে যায় কোথা থেকে, সেই রোদ গ্রন্থি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে তার নিরাভরণ কররেখায়, মুখে।


শরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলে তার খোঁজ পাওয়া যায় রোদে, আকাশে। গ্রীষ্মে যে সূর্য "তবে রে ইস্টুপিড উধো" বলে প্রবল বিক্রম দেখিয়েছিল, এবং পরের দুই মাস যে মেঘ "তবে রে লক্ষ্মীছাড়া বুধো" বলে কড়ায়-গণ্ডায় অনেকটাই বুঝে নিয়েছিল, এখন তাদের মধ্যে আশ্চর্য আপস। দুজনেই দুজনকে বারবার সালাম ঠুকে বলছে "না না, আপনি আগে", আর দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদই সারা আকাশ জুড়ে ফিজিক্সে পড়া বিচ্ছুরণ আর প্রতিসরণের সূত্র মিলেমিশে একাকার। পুজোর শেষে পুরুত তাড়াহুড়োয় দড়াম করে শালপাতায় মেটে সিঁদুর লেপে দিলে যেমন এক জায়গায় খুব অনেকটা একসঙ্গে জমে থাকে, আর অন্য অংশে ঘষটে বেরিয়ে যাওয়া কিছু কমলা আঁচড়, আকাশ প্রায় তেমনই। সিঁদুরদান অবশ্য মেঘের আড়ালে; কিন্তু তা হলেও, কোত্থেকে ওরকমই কমলাপনা এক ফালি রোদ এসে পড়েছে ঘরেও। পুরাকালের বেতের চেয়ার, আজন্ম জং-বাহাদুর জানলার গ্রিল তাতে মোটের উপর একটা ম্লান ছায়া ফেলেছে। একটু পর ঝুপ করে অন্ধকার নেমে যেতেই মনে পড়বে, সূর্য তার দক্ষিণায়নের মাঝপথে প্রায়, মনে পড়বে কাল পঞ্চমী, কাল এমন অন্ধকার নামলে পাড়ার রাস্তায় আলোর মালা জ্বলে উঠবে।

কিন্তু আলো জ্বলেনি আজ, তার দিনে। সমস্ত পক্ষকালেই এমন কিছু তিথি থাকে আমাদের এই দোহারা, গুছিয়ে-নিতে-চাওয়া বেঁচে থাকায়, যে সবার থেকে নিকষ। অমাবস্যার জোয়ার ভাটা খেলে না সেই আঁধারতিথিতে, গ্রহেরা সেই ঠিকুজিতে ঘর বদলায় না। সবই কক্ষভ্রষ্ট সেদিন আমাদের; না সূর্য টানে অক্ষে, না পৃথিবী টানে মাটিতে। তেমন এক দিন আজ তার। সকাল পেরিয়ে বেলা চড়েছে, বেলা পড়েছে। ইতস্তত ভাবে খুচরো বারকয়েক সে আমার ঘরে এসেছে, আমিও গেছি তার ঘরে। প্রাত্যহিক কেজো কথা, উদ্বেগের মাঝে তাকে দেখেছি একেবারে নীরব হয়ে, ঔদাসীন্যে ডুবে আছে। দেবী যখন "কোজাগরী" ডেকে চলেন পথ দিয়ে, হাতের ছড়া থেকে খসে পিছনে পড়ে থাকা ধানের মতো আজ তার কথাগুলো। 

বিকেল হলে, সে যে-চুলোতেই থাকুক না কেন, আকাশের ছবি পাঠায় আমায়। মেঘ-মুখরিত আকাশ, বা স্ট্রিটল্যাম্পের উপরে, উপরে, অনেক উপরে সন্ধে-হওয়া আকাশ। সদ্য পাওয়া সেই রঙে আমি কোনো কোনোদিন কথা বুনে পাঠাই, আর সে সেই কথাগুলো থেকে রঙ নিংড়ে আবার পাঠিয়ে দেয় আকাশে। এই বেশ আমাদের বাঁধা আর ভাঙা খেলা। তবে আজ সে খেলাতেও বিরতি। 

সন্ধের মুখে বারান্দায় এসে দাঁড়াই একবার। বেখাপ্পা একপশলা বৃষ্টির পর আকাশে দিব্যি এক কনে-দেখা রঙ ধরেছে। গ, ল, আর প -এর মতো তিনটে মেঘ যাচ্ছে দক্ষিণে, পশ্চিম থেকে। ডাকবো ওকে? ডেকে দেখাবো এই যাওয়া-আসা? না, এখন থাক। রবীন্দ্রনাথের যেই শীত "শূন্য করে ভরে দেওয়া"র, তার খেলা শীত-বর্ষা-শরৎ নির্বিশেষে আমাদের মনে বহুদিন ধরে চলছে -- এই আমাদের ইঁট-কাঠের জানলা-দরজায় বন্দী মনে। সেই খেলা এখন চলছে তার মনেও; মন উতলা হলেও তাকে চলতে দিই বরং। আমি সেই ফাঁকে লিখে রাখি আজকের এই মেঘের ভেসে যাওয়া, দুপুরের রোদ। কারণ শূন্যের কষ্টে সে যখন ভরাবর্ষার দীঘির মতো টইটুম্বুর হয়ে উঠবে, উপচে পড়বে -- হয়তো আজ রাতেই, হয়তো বা কাল, পরশু, বা আরও পরে কোনোদিন -- সে আবার ফিরে আসবে প্রকৃতির এই বিপুলে। সেই যে তখন সে সমস্ত শূন্যতা উজাড় করে দেবে কালিতে, কলমে বা চোখের জলে, সেই-ই তো তার, আমার, আমাদের অনন্ত শারদোৎসব। আমার মেঘ, রোদ সব তোলা থাক তখনের জন্য; দেরিতে হলেও, সে তাদের দেখে হাসবে। ওই বোধনকালে পাড়ার ছোট্ট ছোট্ট আলোর মালা জ্বলবে বেশ। শক্তির সামনে হাত জোড় করে বলবো, "ওকে ভালো রেখো মা, সব্বাইকে ভালো রেখো"।


সমুদ্রের তীরে বসে আছি, কিছুক্ষণ হলো। এখন সন্ধে পেরিয়ে গেলেও, সন্ধের ঠিক মুখে দক্ষিণের আকাশে নিরেট, কালো একটা রেখার মতো ঝড়ের মেঘ দেখেছিলাম। সে এগিয়ে আসতে আসতে কখন বাকি আকাশের গাঢ় নীলে হারিয়ে গেছে, লক্ষ্যই করিনি। এখন সমুদ্রের ঢেউ আসছে, ফিরে যাচ্ছে। আবার আসছে। কিছুটা দূর থেকে ও এসে পাশে বসলো। 

আরেকদিন, ক্লাস-পালানো ছেলের মতো আশ্বিনের বিকেল হারিয়ে যাচ্ছে শহরের ধরাচুড়োর আড়ালে, পুজোর ভিড়ে। ঘরের দেওয়ালে যে রোদ এসে পড়েছে, সে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে খুবই সন্দিহান। পাঁচ মিনিটে তিনবার মিলিয়ে গিয়ে আবার ফিরে ফিরে এল। প্রতিবারই একটু করে ম্লান হয়ে যাচ্ছে -- যেন নিজের এটুকু উপস্থিতির জন্যই তার যথেষ্ট সংকোচ। এমন সব সময়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাংলা গান গাইতে ইচ্ছে করে; এমন আলোয় তেমনই একটা গান গেয়ে ওকে পাঠালাম।

জঙ্গলকে 'অরণ্য' নামে ডাকলে নির্জনে ধ্বনিত হয়ে চলা তার কথাগুলোয় নিবদ্ধ হতে মন চায়। ইঁট-কাঠের সভ্যতা থেকে এতটা দূরে প্রকৃতিবিরুদ্ধ স্বর শুনতে পাওয়া কঠিন এমনিতে। ভোরের যে পেলব তাপ, সে পেরিয়ে প্রথম রোদ উঠেছে পাতায় পাতায়, ছোট্ট একটা বেগুনি ফুলে, শুকিয়ে যাওয়া গুঁড়িতে। কী প্রচন্ড আনন্দে সে খেলছে আমাদের আঙুলে, কেমন খেলছে ছায়াকে সঙ্গে নিয়ে, প্রজাপতিদের ছুটিয়ে! যেন সেই রোদের জন্মদিন আজ; সকাল থেকে সে ইস্কুলের গরমের ছুটিতে খেলে বেড়ানোর লাইসেন্স পেয়েছে। আমাদের এত পড়াশুনা করে, চশমা এঁটে, পরীক্ষা দিয়ে বড় হওয়া, অথচ এই রোদ আর কয়েক ঘন্টায় প্রাজ্ঞ হয়ে, শান্ত হবে। স্থির হবে। তখন বাতাসকে সে জায়গা দেবে বাকি খেলা সারার; নিজে ধারণ করবে এই চরাচর। তখনও সে দ্বিধাহীন, তার শান্তভাব ক্লান্তি নয়, ধ্যান আসলে। এই সবই তার রাজ্যপাট, অথচ সে এই কারুরই নয় -- এ ভাব তাকে অদীন করেছে। দেখতে দেখতে, ওকে আমি এমনিই বলি, হয়তো রোদের মতোই মানুষের হওয়া উচিত জীবনে -- রাত্রির শেষে আশ্বাসের মতো, অথচ চলে যাওয়ার নিশ্চয়তা, ঔদাসীন্য মাখা।

"কিন্তু", সমুদ্রতীরে ও বলে ওঠে, "এই আমাদের কী হবে?" অপলক তাকিয়ে থাকি ওই চোখে। সত্যিই তো, কী হবে এই আমাদের মতো ছোট ছোট মানুষদের, যারা রোদ হয়ে উঠতে পারিনি, হয়তো পারবোও না? ও বলে চলে, "যারা জড়িয়ে যাচ্ছে কষ্টে, অসহায়তায়, না-পারায়, ভালোবাসায়, উদ্বেগে...? কী হবে এই আমাদের, আমরা যারা...", ওর গলা বুজে আসে। আমি পাশে বসে মনে মনে আবার সাজাই বাকি থেকে যাওয়া, বাকি রেখে দেওয়া কথাগুলো। আমরা যারা সমুদ্রেই কেবল ঢেউয়ের ফিরে যাওয়া দেখতে চাই, আমরা যারা বিরাট, বিশাল আকাশের নিচে নিজেদের ফুলের কুঁড়ির মতো জীবনকে এমন অবিশ্বাস্য মুগ্ধতায় অনুভব করলাম, আমরা যারা ঘরেও ফিরলাম না, ঘাটেও রইলাম না, আমাদের কী হবে?

আমার মনে পড়ে আশ্বিনের সেই পালিয়ে যাওয়া বিকেল। সেদিনের উজ্জ্বল সকাল গাঢ় মেঘ-মুখর হয়েছে দুপুর নাগাদ ওর কাছে, আমার পাঠানো কোনও খবরে। খুব অন্ধকার মন তখন। ও ঘুমিয়ে পড়েছিল, এখন উঠে আমার গেয়ে পাঠানো সেই গান শুনছে। হয়তো ওর ঘরেও তখন এমনই ম্লান রোদ ছিল, বা বিদায় নিচ্ছিল। গান শুনে হয়তো মেঘের আনাগোনা বেড়েছে। তবু, সমস্ত উদ্বেগের মুখে কে জানে কোন আশ্চর্য মায়ায় বুক বাঁধে ও, কোন অস্থিরতার পাঠ যে ওকে এই স্নেহ দিয়েছে! সব শান্ত হলে, সন্ধের মুখে লিখে পাঠায় আমায়, "কিচ্ছু ভেবো না; সব ঠিক হয়ে যাবে।"

অরণ্যের সেই চঞ্চল আলো যে বুদ্ধ হয়ে উঠবে আর কিছুকালে, তার প্রবহমানতা, আশ্বাসের সুর শুনি আমি, সেই আশ্বিনের বিকেলের ছোট্ট একরত্তি কথাটায়। সাগরতীরে ওকেই আমি মনে করাই, যারা রোদ হতে পারিনি, জল মেঘ বৃষ্টি মাটি বাতাস কিছুই যাদের উঠোনে দু দণ্ড বিশ্রাম করে যায় নি, সেই সব ছোট ছোট মানুষেরা -- এই আমরা -- উদ্বেগের মুখে অবুঝ প্রশ্বাসের মতো ভালোবাসার প্রকাশে প্রকৃতি হয়ে থাকি। এই যে বিরাট, বিশাল আকাশ মাথার উপরে, তার নিচে ধুলোর মতো এই মানুষের দল ফুরান মেনে নিয়েও যে বরাভয়ে বারবার শক্ত করে একে অন্যের হাত ধরে, কাঁদে, হাসে, শুধু স্পর্শটুকু আঁকড়ে একজীবন বেঁচে থাকার কথা ভাবে, তাদের সামনে বুঝি প্রকৃতির সন্ন্যাসও ম্লান এক টুকরো আশ্বিনরোদ। তাই না?

সন্ধের মুখে হারিয়ে যাওয়া সেই ঝড়ের মেঘ আমি এতক্ষণে দেখতে পাই, ওর চোখে।


উৎসব, প্রদীপ, আলোর দিনগুলো একে একে বছর পেরিয়ে যায়। যত পেরোয়, অন্ধকার গাঢ় হয়। সন্ধের পর যে সামান্য কিছু আলো জ্বলে, শ্যামাপোকা আর ধোঁয়াশা তাদের উপর বেজায় অধিকারবোধ ফলায়। গতমাসের সমস্ত ফুল ঝরিয়ে দিয়ে আবার কুঁড়ি ধরে ছাতিম, পায়ে-হাঁটা ব্রিজের পাশে, রেলবস্তির পাশে, চারশোচল্লিশ ভোল্টের বিপদসঙ্কেতের পাশে সে নিশ্চিন্তে আমাদের আরেকবার এ' পথে আসার কারণ দেয়, তার গন্ধ নিতে। 

উৎসবশেষের শহরে বিকেল এসে পড়ে, সন্ধেও আসে একটু পর নিজের নিয়মেই। বিকেল ও সন্ধের মাঝের এই যে সময় -- যখন মানুষের চেয়েও বেশি শরীরী তার ছায়া, খুব ভিড় দেখা যায় পথেঘাটে। বাজার এলাকায় দোকান ঘুরে ঘুরে, চেয়ে চেয়ে কিচ্ছু পাওয়া যায় না যা মনমতো; অথচ সব দোকানই ডাকে, যেন সাত রাজার ধন এক মানিক ওখানেই। বন্ধুরা এগিয়ে যায়। গিজগিজে ভিড় ফুটপাথ, রাস্তায় নামলে অটোর আলতো আদর, ডালভাজার পসারের পাশে মাস্কের হোলসেল। বন্ধুরা এগোয়। সাজের দোকানে বনসাই-নরমুণ্ডুওয়ালা ইমিটেশনের হার দোল খায় উপযুক্ত গলার আশায়; এত রঙ এত রঙ তবু রঙের দোকানে আরও নির্দিষ্ট একটা রঙের খোঁজে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে সে দাবিদাওয়া জানায় অনেক; ম্যাগাজিনের স্টলে না-কেনা পূজাবার্ষিকীরা প্লাস্টিকবন্দি হয়ে বসে থাকে, আর নতুন নভেম্বর-সংখ্যারা রোয়াব নিয়ে বেরিয়ে যায় লাইক হট কেকস। বন্ধুরা এগোয়। একে অন্যকে বলে, অফিস-টাইম না ফুরোতেই যা ভিড়, ফুরোলে যে কী হবে!

সন্ধের মুখে এগোনোর পথ অবান্তর হয়ে ওঠে। এবার বাসগাড়ি, মেট্রো, পা-গাড়িই ভরসা। বাড়ি-ফেরার প্রহর। দিন ফুরোয়, সাক্ষাৎও। এমনিতে আরও অনেক কিছুই হয়তো ফুরোয় প্রতিদিন, হয়তো বা অফিস-টাইমও, সে সব আর খেয়াল করি না। মোট কথা উৎসব, প্রদীপ, আলোর দিনগুলো এভাবে পেরিয়ে যেতে থাকে রাসবিহারী এভিনিউ ধরে, এক্সাইড পেরিয়ে আরও দূরে। আমার মনে পড়ে, এই যাহ, 'দেখা হবে' বলতে ভুলে গেলাম, আর অমনি হেমন্তকাল আমার খুবই সমব্যথী হয়ে পড়ে, এবং বিপদ সেখানেই -- কারণ সে আরও নিঝুম, আরও চাপ ধরা হয়; তবু, বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে খেয়াল করি, দূরের এক ছাদে আকাশপ্রদীপ ঠিক জ্বলছে। অন্ধকারে আলোর, আগামীর এর চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠা আর তেমন একটা হয় না এক এক সময়ে।

১০

এবারের হেমন্তে সন্ধের ধোঁয়াশা তেমন গাঢ় নয়। গুগলের পাতায় রোজই এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স দু-এক দাগ করে বেড়ে চলেছে, ভারী হয়ে চলেছে বাতাস, তবু এক এক রাত্রে সিধে উপরে তাকালে আকাশে তারারা চুম্বনের মতো মিটমিট করে। গ্রহেরা আরেকটু গৃহী, স্থির, স্থবির। প্রেমশুরুর আনন্দী উদ্বেগ পেরিয়ে তাদের ঘরে বেশি ওয়াটের আলো লেগেছে। কিন্তু দূরে, ভালোবাসার প্রথম দিনগুলোর মতো কাঁপে নক্ষত্রেরা, চিরন্তন; নিচের এই পৃথিবীর যা কিছু শাশ্বত সুন্দর, শাশ্বত অসমর্থ, তাদের হয়ে এরা অনিঃশেষ জ্বলবে বলে পণ করেছে। যখন আর কেউ আলো জ্বেলে রাখেনি কোথাও, গৌতমকে এরাই পতিতাগৃহের পথ দেখিয়েছিল; রাধার নীলাম্বরী শাড়ি এদের আলোতেই উদ্ভাসিত হতো ঘোর কৃষ্ণে। এরা আমাদের জন্যও জেগে আছে -- আমাদের সামর্থ্য ফুরোলে, পথের পাঁচালীর সেই ঝড়ের দোলা লাগা দীপের মতো এরা কেঁপে ওঠে।

এদের নিচে, বেশ কিছুটা নিচে একপৃথিবী স্বপ্ন আমাদের। একদিন খুব গভীর অরণ্যঘরের চালে ভোররাতে শিশির পড়বে শুকিয়ে যাওয়া শালপাতায়। আমরা ঘুম ভেঙে জানলা থেকে অবাক হয়ে দেখবো, নক্ষত্রেরা ম্লান, যেন একটু অসতর্ক এই পৃথিবীর তত্বাবধানে। আমাদের দেখে ওরা পাহাড়ি ঝোরার মতো কেঁপেটেপেই একসা। না না, আমাদের চোখ মেলা বড়ই অনুচিত কাজ হয়েছে। আহা, ওদের আরও বিপত্তিতে ফেলতে আবার বারান্দায় গেলে কেন! ফিরে এসো। বাঁচুক ওরা বরং; ওরাই বাঁচে। তারপর?

তারপর ধরো সমুদ্র একখান। আচ্ছা বেশ, পুরীই ধরো, তবে লাইটহাউজের দিকটা। আমাদের পা ক্লান্ত, বালিতে মেলা। সমুদ্রবাতাসে ঈষৎ পাক-ধরা চুল নিমেষেই উদ্ভিন্নযৌবন। তবে হাওয়া বুজে এলে কোত্থেকে একটা শিরশিরে ভয় আসে, সুমনের 'কখন তোমার দেখা পাবো'-র সেই ইন্টারলিউডের মতো। কিসের ভয়, বোঝো? আমি তো বুঝি না। আনাড়ির মতো বালি হাতড়ে খুঁজি -- সময়ের চলে যাওয়া? না পৃথিবীর? না এই আমাদের? যে-ই চলে যাক, যে-ই যায়, আসলে কী জানো তো, চলে যাওয়ার বিরুদ্ধে পৃথিবী নিতান্তই অসমর্থ। সে ভাবে, রাখতে পারিনি ঠিকই, তাই বলে যেতে দিতে হবে -- এ'ই বা কেমন কথা! এসব শুনে হঠাৎই তোমার চোখ করকর করে, আমার হাতমুঠো থেকে আঙুল ছাড়িয়ে একাকী হতে চাও যেই, ওই যে আকাশ থেকে তারা খসে। এক আকাশ নিঃসঙ্গ তারার একটি  তোমার মতোই একাকী হতে সাহস করলো। তারপর?

পাহাড়েও আমাদের সাক্ষাৎ হবে, জেনো। পরদিন সকালে দীর্ঘ পথ হাঁটা বাকি, অথচ সে পথের শেষে ঠিক কোথায় পৌঁছতে পারি, এখনও জানা নেই। মাঝপথে ফিরেও আসতে হতে পারে। সন্ধের মুখে রুট ম্যাপ নিয়ে বন্ধুদের তর্কবিতর্ক যখন তুঙ্গে, হয়তো তোমার -- না না, এবার আমার -- মনে পড়বে তখনই, আকাশে কেমন পথ জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ। দিনে তারা হারিয়ে গিয়ে রাতে আবার ফিরে আসে। কম্পমান সোহাগের মাঝে ঝলসে ওঠে লুব্ধক। আর সামান্য এই একটা পথের শেষ যদি আমরা খুঁজে নাও পাই, পথের তাতে কী? সন্ধের আকাশে দেখি, ওরা সব বিশুপাগলের হাসি হাসছে। তারপর?

তারপর, তারপর, তারপর?

সামর্থ্যের অভাবী হাঁড়িতেও এক ভান্ড নক্ষত্র তবু আমাদের। ভয় পেও না।

১১

ভোরের বেলা জলার উপর ধোঁয়া জমে থাকে, কিন্তু সে বিকেলের মতো চাপ-চাপ নয়। বরং আলাদীনের প্রদীপ থেকে দৈত্য বেরিয়ে আসার আগের যে সরু ফিতের মতো ধোঁয়া, সকালের চায়ের কেটলির নল থেকে বেরিয়ে আসা হিম হিম ধোঁয়া, সেরকম। জলার চারধারে শহরের নব্য প্রান্তের ফ্ল্যাটবাড়িরা ঘুমিয়ে থাকে, আর সে'সব বাড়িরও কিছু মানুষ -- যারা তাদের দেড়তলা বাড়ির একান্নবর্তী জীবনের অভ্যাসটুকু এখনও ভুলতে পারে নি, উঠে জানলার পাল্লা ঠেলে দেয়।

বাড়িঘর কমে আসে অপস্রিয়মান শহুরে ফ্রেমে। মাঠের পর মাঠ আশফল ফলে থাকে, পাখির ঠোকর থেকে বাঁচাতে তাকে জড়িয়ে রাখা হয়েছে পলিথিনে। আশফলের শ্বাসে স্বচ্ছ পলিথিনের শরীরে বুটি বুটি জল জমে। দিঘির গায়ে নুয়ে পড়া হিজল গাছের পাতায় রোদ এসে পড়ে; ভোর আর প্রথম বেলার মধ্যিখানে বয়ঃসন্ধির সে রোদ শৃঙ্গারে আকীর্ণ, তার ভারে হিজলপাতা খসে পড়ে জলে। মানুষের ফেলে যাওয়া টালির বাড়ির চালে কুমড়োলতার পোয়াতি জীবন এলিয়ে থাকে বিশ্রামে। ধান কেটে পুড়িয়ে দেওয়া তামাটে মাঠে ঘুঘু ডাকে; দেউড়িয়ার অশ্বত্থতলায় দাঁড়িয়ে-থাকা সাইকেলভ্যানকে অজাবুড়ি জিজ্ঞেস করে, "আমার নিয়ে দি'লোর ঘর নি যাবা?"

এ'সব কথা লিখে পাঠাই তাকে। দৃশ্যগুলির থেকে বহুক্রোশ দূরে তার তে-তলার ছোট্ট বাগান-বারান্দায় কামিনী ফুটেছে আজ, সে জানায়। আমার কাছে তার হাসিটুকু এসে পৌঁছয়, সে'ও তো ফুলের মতোই ফোটা। অঘ্রাণী সূর্য এসে পড়ে খাতায়, রঙে, নিরুদ্বেগ চোখে; তার চন্দ্রপ্রভা-জীবন এই মুহূর্তে অনিঃশেষ হয়।

Comments