Followers

লেগ স্পিন

লেগ স্পিন বোলিংয়ের আমি সিধুজ্যাঠা। আমি অনেক কিছু করলেই অনিল কুম্বলের আর কিচ্ছু করার থাকতো না, তাই আমি কিছুই করিনি। তবে কাঁচাবয়সে অবশ্য এতটা দরাজ ছিলাম না। ক্লাস সিক্সে পড়ি যখন, আমি নিশ্চিত -- ভারতীয় দল থেকে কুম্বলের বাদ যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা; বল ঘোরে না, আবার গালভরা নাম 'লেগ-ব্রেক', হুঁহ! আশেপাশের লোকজন এক দুবার সন্দেহপ্রকাশ করলেও আমাকে টলাতে পারেন নি। ডাক আমি পাবই। তখন আমি কোথায় খেলছি, না বাড়ির পিছনের কংক্রিটের এক চিলতে চাতালে।

অনেক স্বপ্ন নিয়ে ক্লাস সেভেনে বাড়ির চাতাল থেকে বেরিয়ে যোধপুর পার্ক ক্রিকেট ট্রেনিং সেন্টারে নাম লেখালাম। গ্লাভস, প্যাড, হেলমেট, হ্যান ত্যান কত কী কেনাকাটা। আমার নজর যদিও শুধু লাল ডিউজ় বলে; একটু ছড়ে ছড়ে পালিশটা উঠে যাওয়ার অপেক্ষা করি। তদ্দিনে ফুটেজ স্টাডি করার কাজ আমার শেষ, রীতিমতো দেখে-শেখা লেগস্পিনার আমি। জানি, শেন ওয়ার্ন রান-আপে একটু আড়াআড়ি আসেন। প্রথমে সাড়ে তিন পা হাঁটেন, তারপর ছোট্ট দু পা দৌড়ে, জাম্প, রিলিজ। চেষ্টা করি নাচের স্টেপের মতো পুরো অ্যাকশনটা তুলে নিতে। জানি, কুম্বলে রিলিজের আগে তিন লাফে যতটা স্পিন নিজে খান, তত ডিগ্রিতে তাঁর লেগ-ব্রেক ঘোরে না; তার চেয়ে বরং তাঁর ফ্লিপার শিখে নেওয়া যাক। গুগলির গ্রিপ তদ্দিনে রপ্ত করেছি মুস্তাক আহমেদের বোলিং অ্যাকশনের স্লো-মোশন দেখে। উপুল চন্দনা আর পল স্ট্র্যাং-এর থেকে রপ্ত করেছি কুইক-আর্ম অ্যাকশন। আব্দুল কাদেরের পুরোনো ম্যাচের ভিডিও দেখে বুঝেছি, রিলিজের পর ফলো-থ্রুতে দেহের ব্যালেন্স অন্যদিকে করলে বল অনেকটা loopy-ফ্লাইট নেয়। স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের কিছুটা সাইড-আর্ম অ্যাকশন শিখে রেখে দিয়েছি আচমকা ব্যবহারের জন্য। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মহেন্দ্র নাগামুটুর লেগ-স্পিন অব্দি দেখেছি, কেমন বল একেবারেই করবো না, সে বুঝতে।

কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। জীবনে পড়াশুনা শেখা ছাড়া আর সব ক্ষেত্রেই আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -- কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শেখাই শেষ করতে পারিনি। এমনিতে আমার ইচ্ছে ও ভর্তি হওয়ার অন্ত নেই -- সাঁতার, টেবিল টেনিস, ক্ল্যাসিক্যাল গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আঁকা, অ্যানিমেশন, সে বলে শেষ করা যাবে না। ক্রিকেটই বা ব্যতিক্রম হবে কেন। স্কুলে পড়াশুনার চেয়ে বেশি মন দিয়ে ক্রিকেট খেললেও, ক্রিকেট শেখায় বিরতি পড়লো পড়াশুনার প্রতিশোধে। মাধ্যমিক দিয়ে আরেকবার ভর্তি হলাম বিবেকানন্দ পার্কের ক্রিকেট একাডেমিতে। তদ্দিনে অবশ্য অনিল কুম্বলে আমার যথেষ্ট প্রিয় বোলার, সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক আমার ইন্ডিয়া জার্সির স্বপ্ন। মোটামুটি যে স্পিডে এগোচ্ছি, চান্স পেলে কোনোমতে ডেবিউ-ম্যাচটা খেলেই রিটায়ার করে যেতে হবে। সত্যি বলতে, তখন কালীঘাট ক্লাব ডিভিশনে মুখ দেখাতে পারলেই আমি বর্তে যাই। একাডেমিতে বোলিংয়ের আগে ক্যাচিং প্র্যাকটিস হয়। ডাইভ দিয়ে ক্যাচ নিয়ে মাঠে গড়াই, মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ নিই। বন্ধুরা বুঝতেই পারছেন, আমার ক্রিকেট কী কাব্যময়! 

কালের নিয়মে আমার সেই স্বপ্নও মাঝেরপাড়া স্টেশনের ডিস্ট্যান্ট সিগনালখানার মতো অস্পষ্ট হইতে হইতে শেষে মিলাইয়া গেল। গ্লাভস-প্যাড থেকে ফোম বেরিয়ে এল, ব্যাট পড়ে রইল বন্ধুর বাড়ি, হেলমেট কোথায় সে আমার মাথাই জানে। ছিল বাকি আমার বহু সাধের এই ডিউজ় বলটি, আমার ছোটবেলার ইন্ডিয়া-ক্যাপের জমাট বাঁধা স্বপ্ন। সে'ও হারিয়েই ছিল; আজ ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎই পেলাম। নেড়েচেড়ে, বহুদিনের শেখা লেগ-স্পিন, গুগলি আর ফ্লিপারের গ্রিপগুলো ঝালিয়ে নিলাম একবার। তার কাজ ফুরিয়েছে বহুদিন; এখন সে হেমন্তরোদে পোজ় দেয়, আমি ছবি তুলি। তারপর আবার দেরাজ খুলে "যাও বাবা, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও" মর্মে তুলে রাখা। তা হোক। ক্রিকেট খেলতে পারিনি সেভাবে, খেদ আছে; তবে ক্রিকেট নিয়ে লিখবো কোনোদিন, পুষিয়ে নেব।

Comments