Followers

একটি মৃত্যুদিনের বর্ণনা

সেদিন খবরটি এসেছিল সকাল ন'টার আশেপাশে, খুব সন্তর্পণে। একতলা, দোতলা পেরিয়ে তিনতলার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল ব্যথাতুর, সহনশীল মুখে। তিনি আর নেই। 
   
এমন খবরের আগমনী নানা জায়গায় নানা সুরে বাজে, কিন্তু বস্তুত তার শরীরটি এই তিন শব্দেই গড়া, সর্বত্র - তিনি আর নেই। জানান দিয়ে, সে ইতস্তত করে একটু, দাঁড়ায়। চারদিক দ্যাখে, মাটি দ্যাখে, আর সবশেষে মানুষ দ্যাখে। ওই, দূরে দাঁড়িয়েই। কাছে এসে, ঝুঁকে পড়ে খবরের চ্যানেলের মতো জিজ্ঞেস করে না, "আপনার প্রতিক্রিয়া কী এতে?" প্রতিক্রিয়ায় তার ভারী বয়েই গেল। সে এসেছিল নৈর্ব্যক্তিক খবর হয়ে, স্বভাবগত নিয়মেই সে সংবেদনে শূন্য হয়ে শেষে মিলিয়ে গেল। বাড়ির কেউ শেষ অব্দি আর খেয়ালও করলাম না, তার ফিরে যাওয়াটা কেমন।
  
খবরটি যে অপ্রত্যাশিত, বলতে পারি না। দীর্ঘ রোগভোগের ইতিহাস এই খবরের পিছনে, স্মৃতিভ্রংশের ইতিহাস, বাকশক্তি লোপের ইতিহাস। যে-ধরণের ভোগান্ত কামনা আমরা সচরাচর করি না, শেষ কিছুদিন যে যার আড়ালে আড়ালে তা-ই করছিলাম, এমনও বলতে দ্বিধা নেই। তখনও নতুন বছরের গ্রীষ্ম আসে নি, পুড়ে যাওয়া বছরের শেষ একফালি কাপড় হু-হু করে বসন্তবাতাসে উড়ছে। সে বাড়িতে গেলাম।
   
শোবার ঘরের সার্থকতা কানায় কানায় পূর্ণ সেদিন। মানুষেরা এত অভাগা -- এমন নিরাময়ী, চিন্তাহীন, ক্লান্তিহীন ঘুম আমাদের কপালে জীবনকালে জোটে না। তাঁকে দেখছি; সিধু জ্যাঠার মতো তিনিও জীবনে অনেক কিছু করতে পারতেন বলে শেষ অব্দি কিছুই করেন নি আর আলাদা করে। রান্নার তদারকি করেছেন, রান্না করেছেন, উপাসনাঘর সামলেছেন, অতিথি এলে চা-জলখাবার সাজিয়ে এনে সামনে রেখেছেন, কেউ এত খেতে আপত্তি করলে আরও অনেকের মতোই বলেছেন, "এমন কিচ্ছু না এটা; সামান্য একটু, বাড়িতে যা ছিল।" তাঁর এই শেষ ঘুমটিও সেই অনুচ্চকিত জীবনের মতো, সকালে আমাদের দরজায় এসে দাঁড়ানো খবরটির মতো। খেলায় শেষ বাঁশি বাজার পর খেটে-খাওয়া, ক্লান্ত মিডফিল্ডার যেমন হার-জিতকে কাঁচকলা দেখিয়ে সাইডলাইনে এসে গা এলিয়ে দেয়, মুখে জল ঢালে, আকাশের দিকে চোখ মেলে ভাবে "উঃ, বাঁচলাম!", তেমনই শেষ গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ার স্বস্তিটুকু বাদে আর কিছুই লক্ষণীয় নয় সেই ঘুমে। বাইরে দোলনচাঁপা গাছের বেয়াদব শাখায় ফোটা ফুল জানলা দিয়ে উঁকি মারছে ঘরে, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া বছর চারেকের বাচ্চার মতো।
  
কয়েক ঘন্টার মধ্যেই একেবারে, পুরোপুরি নেই হয়ে গেল তাঁর শান্ত, নিদ্রিত শরীরটি। আগুনের লকলকে আঁচ গায়ে লাগলো না, আমরা ন্যাজামুড়োহীন কিছু আহা-উহু করলাম বটে, কিন্তু সে-সব এতই অপ্রাসঙ্গিক, কাঠ ফাটার শব্দ তার চাইতে জোরে শোনালো।
   
দাহের অতীত যা, সেটুকুও যখন বিকেলের গঙ্গায় ভেসে গেছে, তখন ফিরবো আমরা। ডাবল-বেড বিছানার মতো চওড়া চওড়া ঘাটসিঁড়িতে দিশি আইসক্রিমের গাড়ি, একটু দূরে খোলা-না-ছাড়ানো-বাদামভাজার গাড়ি। দুটি ছেলেমেয়ে -- একটি মৃত্যুদিনের শেষে তাদের প্রেমিক-প্রেমিকাই ভাবতে ইচ্ছে করলো আমার -- বাদাম কিনে এগিয়ে আসছে ঘাটের সিঁড়িতে বসবে বলে। কিছু মানুষ কোনো কারণে ঝগড়া করছেন একটু দূরে, আর তারও দূরে ভিড় জমেছে একটা ছেলেকে ঘিরে -- সে খালি হাতে একটা সাপ ধরে নাচাচ্ছে। এই বুড়োকদমতলা ঘাটের ও তার বাইরের আরও কত বড় পৃথিবী নিজের মতো অনর্থক খেলে চলেছে।
  
ইতিমধ্যে মেঘও করে এসেছে আকাশে। কিছুটা এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে, বসন্তে যেমনটা হয়েই থাকে। আমার খুব মনে পড়ছে সেই অতি-কৌতূহলী চাঁপা ফুলটিকে, সে কি এখনও ঘরে উঁকি মারছে? নাকি এই হাওয়ায় ঝরে গেছে, সকালে যে ঘুম দেখতে তার সাধ হয়েছিল, এবেলা কি নিজেই একজীবন বেঁচে নিয়ে ঘুম দিয়েছে? পৃথিবীতে এক একদিন এমন এক হাওয়া ওঠে, এমন মেঘ করে, জন্ম-মৃত্যু-জীবন সবই উড়ে যায়। তাদের থাকা বা না-থাকায় আমাদের এই বেঁচে থাকা আর নির্ভর করে না তখন।



ছবি: শ্রীময়ী

Comments

  1. প্রথম যখন "সে আর নেই" এই phrase ta শুনি, আমার মুখ থেকে automatically বেরিয়েছিল, "নেই মানে কি?"।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমি মুখে না বললেও, এই কথাই ভেবেছিলাম...

      Delete

Post a Comment