Followers

গায়ক

সেবার ফেব্রুয়ারি মাসে বারাণসী গেছি, দ্বিতীয়বার; শীত প্রায় শেষের পথে তখন। আরতির সময় সূর্যাস্ত ধরে সারাবছর বদলে বদলে যায়; ফেব্রুয়ারিতে ওরকম ছটা বা সোয়া ছটা হবে। সাড়ে পাঁচটা থেকে দশাশ্বমেধ ঘাটে গান শুরু হয়, পল্লীনাট্যের প্রথম অঙ্কের মতো। যেতে যেতে ঘাটচলতি লোকজন সেই গান শুনে থমকে যাবে, বুঝবে এর পরেই সন্ধ্যারতি, অনেকেই আর না এগিয়ে এক চিলতে জায়গা খুঁজেপেতে বসে পড়বে। ঘাট-লাগোয়া চারটে ফুল-মালার দোকানে হলুদ বাল্ব জ্বলছে; লাল চেলি আর লাল ফুলের মালায় দোকান ঢলোঢলো। এভাবে গানের সঙ্গে সঙ্গে লোক বাড়তে বাড়তে শেষে আরতি শুরুর মুখে ঘাটে আর তিলধারণের জায়গা থাকবে না। তখন পাঁচ পুরুত (পাশে রাজেন্দ্রপ্রসাদ ঘাটে সাত) মিলে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আরতি শুরু করবেন।
   
তারপর এক সময় আরতি শেষ, সভাও ভেঙে গেল। লোক টানার জন্য যে মাইক, স্পিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সে'সবও ফিরে গেল যথাস্থানে; আবার পরদিন বিকেলে তারা বেরোবে। এমন সময়, লোকজন যে যার মতো আবার এগোতে শুরু করেছে নানা দিকে, দেখি একজন বয়স্ক মানুষ -- চোখে দেখে পঁয়ষট্টি-সত্তর মনে হয় -- ভাঙা আসরে ঘাটের সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে নিজের মনে গান ধরলেন। তাঁর কোলে কালো, পুরোনো হারমোনিয়াম; তেলচিটে স্ট্র্যাপ দিয়ে সে ঝোলানো গায়কের ঘাড় থেকে। 
  
আমরা দু-তিনজন একটু অপেক্ষা করে যাই। কিছুটা দূরে বসি। মানুষটির গানের কোনও ঠিকঠিকানা নেই -- কখনও শিবের স্তোত্র, কখনও মীরার ভজন, গঙ্গাকে নিয়ে একটা ছোট্ট গান, কখনও আচার্য শঙ্করের 'ভজ গোবিন্দম', এমনকি রামপ্রসাদী সুরে একটা হিন্দি গানও শুনলাম তাঁর কণ্ঠে। তিনি সম্ভবত বিশেষ কোথাও ডাক না পাওয়া গায়ক; কিন্তু ডাক পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে তিনি খুব বিচলিত, এমনও মনে হলো না। নিজের গান নিজেকে শুনিয়েই মানুষটি কী খুশি! অদৃশ্য এক তবলচির তালে তালে তিনি বেদম মাথা নাড়ছেন, ভজনের কথা ধরে তারপর হেসে ফেলছেন, গান থামিয়ে কিছুটা হারমোনিয়াম বাজিয়ে আবার ধরছেন। 
   
পরদিন ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ বেরিয়ে পুরুতের দৌরাত্ম্য কম থাকতে থাকতে বিশ্বনাথের ঘরে প্রতি সফরের নিয়মমাফিক সাক্ষাৎটুকু সেরে আবার এসে বসেছি এই ঘাটেই। তখন কটা হবে, বড়জোর চারটে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ। আলো ফুটতে বহু দেরি; গঙ্গার বুকে ভারী কুয়াশা জমে আছে, একটা ঢিমে হাওয়া বইছে। গত সন্ধের ঘাট এখন একদম ফাঁকা, সেই আরতির পাটাতনে পুরুতদের আসন নেই আর। সেখানেই বসলাম। একটু দূরে এক দিদা চায়ের পসার খুলেছেন; উঠে গিয়ে এক কাপ চা নিলাম। দোকানের পাশে ঘাটের শরীরেই বেশ বড়সড় এক কালো, মোটা প্লাস্টিকে আপাদমস্তক মুড়ে এক মানুষ ঘুমোচ্ছে; প্রথমটায় দেখলেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে, যেন শব। তাকিয়ে আছি দেখে দিদা বললেন, "দের সে উঠেগা ইয়ে, রাত তক বৈঠা রেহতা হ্যায়।" ঘুমন্ত মানুষটির মাথার কাছে সেই কালো হারমোনিয়াম রাখা। রাত না জানি কটা অব্দি তিনি বসে বসে নিজেকে গান শুনিয়েছেন, আর কী যে খুশি হয়েছেন, বলে বোঝানো মুশকিল।

Comments