প্রহ্লাদ দা
আমাদের স্কুলের প্রহ্লাদ দা গতকাল চলে গেলেন। শিক্ষকদের সঙ্গে যেটুকু বা দেখাসাক্ষাৎ, যোগাযোগ হয়, প্রহ্লাদ দা'র সঙ্গে যোগাযোগ সেই কবে থেমে গেছে; স্কুল ছাড়ার পরই। তবে প্রতিবছরই সরস্বতী পুজোয় স্কুলে গেলে তাঁকে দেখতাম, নানা কাজে এদিক ওদিক। বছরে ওই একবার করে "প্রহ্লাদ দা, ভালো আছো তো?"-র উত্তরে "হাঁ বাবু, তোরা ঠিক তো?", এটুকুই ছিল শেষ সতেরো বছরের আলাপ।
প্রহ্লাদ দা অনেক কিছুতে থাকতেন -- ডে সেকশনে ক্লাস শুরুর ঘন্টা থেকে শুরু করে ছুটির ঘন্টা বাজানো, গেটে দাঁড়িয়ে খোক্কসদের বরণ করা সকালবেলা, স্কুলশেষে মা বা বাবার নিতে আসতে দেরি হলে যখন কোনও একলা খোক্কস কাঁদতো, তাকে শান্ত করা, সঙ্গ দেওয়া। ভাঙা বাংলা বলা, শান্ত স্বভাবের মানুষটি সবসময়ই ছুটছেন -- হয় হেডমাস্টারের ডাকে, নয়তো অমুক নোটিশ বোর্ডের তালা খুলতে, নয়তো কোনও ছেলে ভালোরকম চোট পেলে তাকে ধরে ধরে আপিসঘরে ফার্স্ট এডের জন্য নিয়ে আসতে। স্কুলমাঠের শেষের ভাঙা, প্রায় dilapidated কোয়ার্টারে থাকতেন; সকালে ক্লাস শুরুর ঘন্টা দেওয়ার জন্য মাঠ পেরিয়ে যাওয়ার সময় আমাদেরও ক্রিকেট খেলা থেকে ডেকে নিতেন।
কোনও দীর্ঘ গদ্য প্রহ্লাদ দা'র মতো মানুষকে ধরতে পারবে না। এরকম ছোট লেখাতেই বলা যায় আমাদের দৃষ্টিগোচর যা কিছু স্মৃতি তাঁর; তবে মূর্ত এইসবের আড়ালে, অলক্ষ্যে একটি স্থিরতা থেকে যায় -- যা আমাদের অনেকের স্কুলবাড়ির স্মৃতিতে প্রহ্লাদ দা'কে ধ্রুব করে তুলেছে। বলা বাহুল্য, সেই স্থিরতা গদ্যের শব্দ-অক্ষরেরও অলক্ষ্যেই থাকে।
১৯৯৪ সালে, আমরা ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়ার অল্প কদিনের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন তিওয়ারি জী, আমাদের স্কুলগেটের দাদাঠাকুর। শীতের সকাল সেদিন, যা মনে পড়ে; নিজের প্রিয় বন্ধুর জন্য প্রহ্লাদ দা অঝোরে কাঁদছিলেন। সেই থেকে প্রায় ত্রিশ বছর পেরিয়ে, আজ শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সাগর বাবুর কাছে খবর পেলাম, প্রহ্লাদ দা'ও চলে গেছেন কিছুদূর, আমাদের ইস্কুলবেলার আরও কিছুটা সঙ্গে করে নিয়ে।
Comments
Post a Comment