Followers

দেয়ালা - ২


কেন এরকম জড়িয়ে যায় সব স্বাদ, রঙ, গন্ধ, আলো, সাজ আমার স্মৃতিতে? কেন স্মৃতির চেয়েও বেশি ভাস্বর হয়ে ওঠে গ্রন্থি ছুঁয়ে থাকা এক-একটি সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া সুতো?
  
প্রথম গরমের ফুল গন্ধরাজ, সন্ধেবেলা ফোটে। হালকা সবুজ বোঁটায় ল্যাতপ্যাতে, থুপকো মতো সাদা পাঁপড়ি; ক'দিন ঘরে রাখলে কলকে ফুলের মতো হলুদ হয়ে ওঠে। মাঝে বহু, বহু বছর এই ফুলের গন্ধ পাই নি, এতদিনই যে ফুলটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। পরশু বাড়ির পিছনের এক চিলতে মাটিতে গন্ধরাজ ফুটেছে; সে থেকে একটা ফুল নিয়ে আজ, এখন অব্দি গন্ধ নিচ্ছি। প্রতিবারই মনে হচ্ছে, আমি একটা ঘরে গিয়ে ঢুকছি যে ঘরে সব জিনিসই আমার চাই, কিন্তু কোনটা আগে চাই বা বেশি চাই, বুঝতে পারছি না। এর মধ্যে আছে গোলাপ খাস আমের বোঁটা ছুলে খোসা ছাড়ানোর পরের গন্ধটা, আছে গরমের সন্ধে পৌনে ছটা, মশা, আছে আমাদের পুরোনো তুলসীতলা, তার মাথায় ঝাঁকড়া হয়ে থাকা পুরোনো গন্ধরাজ গাছ, বাড়ির পিছনের দেওয়ালে রাবারের বল মারার ভোঁতা শব্দ, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে জবাগাছে ফুটে থাকা গোলাপি জবা দেখে বিড়বিড় করে নেওয়া "হিবিস্কাস রোজাসাইনেন্সিস", কালবৈশাখীর বৃষ্টির শেষে ছুটে যাওয়া পাশের বাড়ির গাছ থেকে পড়া আম কুড়োনোর জন্য, আমাদের সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল থেকে তখনও ভেজা, গরম ভাপ উঠছে, আর তুলসীতলা ভরে আছে সাদা থুপো থুপো গন্ধরাজ ফুলে। 

এই লেখা থামিয়ে শুকিয়ে যাওয়া হলুদ ফুলটা আবার শুঁকলাম। এবারেও বুঝলাম না, কোন সুতোটা সবার আগে মনে পড়লো, বা ধরে রইলাম। কারণ পথের দেবতা যেমন অপুকে বলেছিলেন পথ কি তোমার শেষ হয়েছে কেবল এটুকুতেই, আমার স্মৃতির পথ আসলে এই সবকিছু পেরিয়ে হয়তো একটা সময়ে ছড়িয়ে গেছে, যে সময়ে দাদু ছিলেন আর বিকেল পেরিয়ে গেলেই জানলায় এসে আমাকে ডাকতেন খেলা থামিয়ে পড়তে বসার জন্য, যে সময়ে সপ্তাহে দু'বার করে বড়পিসি আসতো রিকশায় চেপে মনসা মিষ্টির দোকানের রসগোল্লা নিয়ে, আর পুরোটা সময়েই একটা ছাই রঙা চৌকো ঝোলাব্যাগ কাঁধ থেকে ঝুলিয়ে কেমন জড়িয়ে বসে থাকতো, যে সময়ে কালবৈশাখী বেশি রাতে এলে প্রার্থনা করতাম কাল যেন রেনি ডে হয়ে যায়, যে সময়ে বড়দের "ভাওয়েল ছাড়া কোনও শব্দ হয় না"-র উত্তরে "sky" বলে মজা পেতাম, যে সময়ে দু' সপ্তাহে একবার করে বাবা বাইরে থেকে ফিরতো যখন, গেট খুলে ঢুকে কাঁচের জানালায় দু'বার টোকা মেরে আমার ডাকনামে ডেকে তারপর বেল দিত দরজায়। 
 
গরমের বিকেল শেষ হয়ে আসছে; আজ কিছু কাজে যে জায়গায় গিয়েছিলাম, ফিরছি তখন। হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম এমন এক রাস্তায় যে পথে শেষ এসেছিলাম আট বছর আগে, আমার এক মাস্টারমশায়ের বাড়িতে। তার দিন দুয়েক আগে প্রয়াত হয়েছিলেন মাস্টারমশাই, দেখা করতে এসেছিলাম জেঠিমা (তাঁর স্ত্রী) ও তাঁদের মেয়ের সঙ্গে। তারপর আর যাওয়া হয়নি। আজও অমনোযোগে হাঁটতে হাঁটতে যখন বুঝলাম এটা সেই রাস্তাই, খুঁজে-পেতে এপার্টমেন্টটা বার করে, গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিওরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করলাম, ও বাড়িতে কেউ আছেন এখন? অনেক ভেবে সে আরেকজনকে ডাকলো। তিনি হয়তো এপার্টমেন্টের পুরোনো বাসিন্দা। এসে বললেন, জেঠিমা, দিদি --- দুজনেই প্রয়াত হয়েছেন এই আট বছরের মধ্যে। সি ব্লকের ওই ফ্ল্যাটটি এখন বন্ধ। 
   
আচ্ছা। আবার হাঁটা শুরু করলাম বড় রাস্তার দিকে। একটু এগিয়েই একটা আড়াআড়ি রাস্তা পেরোতে গিয়ে মনে পড়লো, বৃদ্ধ মাস্টারমশাই প্রতিদিন আমাকে উনার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বলতেন, এই রাস্তাটা দেখে পেরোই যেন। হঠাৎ করে গাড়ি এসে পড়ে। দেখেই পেরোলাম। বড় রাস্তার কাছে দোকানঘরগুলো বদলে বদলে গেছে, দুটো নতুন এপার্টমেন্ট উঠেছে। একটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এরই মধ্যে দেওয়ালে নোনাও ধরেছে। অসংখ্য ছোট ছোট জানলা, গ্রিলে ঢাকা বারান্দা, অনেক জামা কাপড়, অল্প মানুষ। এঁরা কেউ চিনতেন আমার মাস্টারমশাইকে? না বোধ হয়। তাঁর স্ত্রী বা মেয়েকেও নয়, স্বাভাবিকভাবেই। মাস্টারমশাই এখানে দীর্ঘ বহুকাল কাটিয়েছেন। কিন্তু এখন বোধ হয় আর কেউই কিছু চেনে না --- পরিচয়, শরীর কিছুই চিনে রাখার মতো দীর্ঘদিন কারো থাকে না।

Comments