Followers

"হ্যাপি হোলি?" "না, হইনি!"


আগের বছর এরকম সময় নাগাদ ফেসবুক খুলে দেখি আমি নাকি – তাও আবার যেখানে-সেখানে নয় – সেই সুদূর মুর্শিদাবাদে ৯৮ জনের সঙ্গে উদ্দাম দোল খেলছি। অর্থাৎ, আমাকে ট্যাগ করা হয়েছে ছবিতে। যিনি করেছেন তাকে তো চিনলামই না, বাকি ৯৬ জনের মধ্যেও খুব চেনা নাম পেলাম না। ছবিতে কি আছে, না একজন মধ্যবয়স্ক লোক পিচকিরি হাতে একটা দেওয়ালের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, আর দেওয়ালে কিছুটা আবির লেগে আছে। অবজেক্টিভ কোরিলেটিভ। ভালো কথা। সেই মানুষটি আমাদের এই কুরুবংশের কেউ, না বাইরের, সে তো আমার বোঝার জো নেই। আমি কাউকেই চিনি না। কোনও এক অপরিচিতের এই মহানুভবতার সাক্ষী হয়ে আমি সেই ট্যাগ ত্যাগ করে বেরিয়ে এলাম। 
                     
এমনিতেই বেশ কিছু বছর হল, দোল খেলাটা আমার আর বিশেষ সুবিধের লাগে না। মানে, আমার হাতে রঙ আছে, আমি তোকে ভূত করলাম। তোর হাতে রঙ আছে, আমায় ভূত করলি। তো? তারপর? কি করবো? একটা ছুটির দিন – তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম আনন্দ উদযাপনের দিন – কিন্তু কিভাবে উদযাপিত হবে, না একে অন্যকে সাধারণ সুস্থ অবস্থা থেকে রঙ মাখাতে মাখাতে প্রায় পার্মানেন্ট ড্যামেজ করে দেওয়ার দশা। আর তারপর এক বেলা ধরে স্নান করে সেই রঙ তোলা। ছুটির দিনে কি করলে বাবু, না চান করলাম! আর সে তো সাবান নয়, সাবানের সন্ত্রাস! ঘষতে ঘষতে চামড়া খুলে হাতে চলে আসে; মাথায় শ্যাম্পু করে নিজের হাতের দিকে লেডি ম্যাকবেথের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়, মাইরি, out, out damned spot! আমাদের বাড়িতে আবার সাদা ফুটফুটে সাবানের খুব চল, যদ্দিন অব্দি দোল খেলতাম, স্নানের সময় কিছুক্ষণ সাবান মেখে তারপর বাবা-বাছা করে সাবানটাকেই চান করাতে হত! আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্নানের পর এসে আয়নার সামনে দাঁড়ানো। জীবনে আপনি মিথ্যে কথা বলে, লোক ঠকিয়ে তবু দাঁড়াতে পারেন আয়নার সামনে, কিন্তু দোল খেলে ওই একটা সময়ে দাঁড়ানো যায় না! কেমন একটা বিভীষিকাময় মিসিং – না হয়েছে স্নান, না খেলেছি দোল! মুখ লাল, কান বেগুনি, কপাল সবুজ, হাত নীল, ভাত নীল, ডাল নীল! 
            
তবে ছোটোবেলায় এতটা অ্যান্টি ছিলাম না। দোল খেলেছি কয়েকবার। শিলিগুড়িতে, তখন খুবই ছোটো, দোলের দিন সকালে উৎসাহের বশে একটা গরুকে হিসি করতে দেখে পিচকিরি-জ্ঞানে আমিও প্রতি-আক্রমণ করে সেদিনের মতো সেই গরুর জৈবিক ক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পিচকিরি খেয়ে তার সে কি দৌড়! এখনও মনে পড়ে, গরুটা ছুটে পালাচ্ছে, আর আমি আত্মশ্লাঘায় খান-খান হয়ে যাচ্ছি। সেদিনই নিজের প্রতিপত্তি বোঝাতে আমার চেয়েও ছোটো একটা ছেলেকে আবির মাখিয়ে পুরো ভুষো করে দিয়ে ফিরে এসেছিলাম। সে বেচারার পিচকিরির তখন পিস্টন জ্যাম, পাগলের মতো দাপাচ্ছে আর টানাটানি করছে! আর যায় কোথায়! কর্ণের রথের চাকা একবার মাটিতে বসেছে! লে আবির! 
        
কলকাতায় এসেও বেশ অনেক বছর দোল খেলেছি, কিন্তু আমার দোল খেলা অত্যন্ত নিরুপদ্রব। ওই পিছন থেকে এসে অ্যাটাক করে রঙ মাখিয়ে দেওয়া আমার কম্মো নয়। আমি টুপটাপ রংভরা বেলুন ছুঁড়তাম। পাশের বাড়ির ছেলেটাকে পোষাতো না, বেলুন মেরে ভাগিয়ে দিলাম। সাদা ধবধবে অ্যাম্বাসেডর গাড়ি যাচ্ছে, তাকে দুরন্ত এক্সপ্রেস করে দিলাম, এইরকম আর কি! কিন্তু তারপর থেকেই সব কেমন বদলে গেল। বন্ধুরা ভুরু নাচিয়ে বলতে শুরু করলো “কিরে কাল তো দোল, দুলবি না?!” কিছু মানুষ বলতে থাকলো, “এই let’s have ffffun n mastiiii nah!” সেই থেকে আমি শুধু ঘরে বসে থাকি, আর শুনি, বাইরে রবীন্দ্রনাথের বসন্ত উপপর্যায়ভুক্ত বিভিন্ন গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীতের গান চালিয়ে পাড়া কে পাড়া রঙের আনন্দে মেতে উঠছে!

ছবি:পিন্টারেস্ট

Comments