লাশ-পলাশের পলিটিক্স
২০১৮ সালে অন্তর-রঙ্গ থিয়েটার গ্ৰুপ একটি নাটক মঞ্চস্থ (ইন্টিমেটস্থ) করে, নাম 'হেরো রাজার কলন্দর'। দেশ-কাল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বেড়ানো এক কলন্দর এসে পড়েছে আজকের শহর কলকাতায়; এই কলকাতার এক 'রাজা'র সঙ্গে তার মোলাকাত-আলাপ-তর্ক -- সে নিয়েই এক সোয়া এক ঘন্টার নাটক।
নাটকের মাঝে একটি অংশে কলকাতার বাঙালি বিদ্বজ্জনদের নিয়ে রাজার সঙ্গে বেজায় ঝগড়া হচ্ছে কলন্দরের। রাজা যতই এঁদের বিদ্যবুদ্ধির তারিফ করে যান, কলন্দর তত প্রশ্নবাণ ছোঁড়ে, "এরাই তোমার সংস্কৃতির ধারক ও বাহক?" প্রসঙ্গক্রমে কলন্দর বলে, এ শহরের বুদ্ধিজীবী এমনই আদর্শহীন, অগভীর ও স্তাবকলোলুপ যে এক সন্ধেয় মানববোমা বিস্ফোরণের প্রতিবাদে ফেসবুকে চুটকি-কবিতা লিখে গর্জে উঠে পরদিন সকালে আমূল স্বর বদলে ভেজা-ভেজা, মনকেমনিয়া লব্জে লিখতে পারেন কিশোরবয়সে সরস্বতী পুজোয় বয়ে চলা প্রেমের বাতাস বিষয়ে।
নাটক থেকে বেরিয়ে এবার আজকের কথা বলি। আসুন, একবার দেখে নেওয়া যাক, আজকের খবরের কাগজ খুললে কী বিশেষ বিশেষ খবর পাচ্ছি আমরা।
◆ মায়ন্মারে গণতন্ত্রের সমর্থনে যে প্রতিবাদ, তা রুখতে 'রায়ট পুলিশবাহিনী' রাবার বুলেট ছুঁড়ছে প্রতিবাদীদের দিকে। সিভিল ডিসবিডিয়েন্স মুভমেন্ট রোখার জন্য এমনকি মোনাস্ট্রিতেও detain করছে প্রতিবাদীদের।
◆ ইজরায়েলে, জর্ডান ভ্যালিতে যে ধ্বংসলীলা চলছে, তাতে শুধুমাত্র বেদুইন কমিউনিটিরই সত্তরের উপর মানুষ গৃহহীন; তার মধ্যে শিশুই একচল্লিশ জন। পৃথিবীর জনসংখ্যার সংখ্যাতত্ত্বে বোধ হয় একচল্লিশ খুব বড় সংখ্যা নয়, তবু ইউরোপের কিছু দেশ এতে 'শোকপ্রকাশ' করায় এটি খবরে এসেছে।
◆ নাইজেরিয়ার জামফারা প্রদেশে ৩১৭ জন স্কুলপড়ুয়া মেয়ে অপহৃত হয়েছে বন্দুকধারী একটি দল দ্বারা। দলটিকে শনাক্ত করা যায় নি। অপহরণের কারণ এখনও অজানা।
এ তো বিশ্বের খবর। বাদ দিন। দেশের কথায় আসি।
◆ কৃষক আন্দোলনে প্রবীণ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এখনও নিয়মিত FIR হয়ে চলেছে, 'হিংসা' ছড়ানোর দোষে।
◆ কবি ভারভরা রাওয়ের অসুস্থতার কথা মাথায় রেখে আদালত 'দয়াপরবশ' হয়ে ৬ মাসের জামিন দিয়েছেন তাকে। বলা হয়েছে, ৬ মাস পর যেন তিনি সোজা জেলে এসে রিপোর্ট করেন।
◆ কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক ওপেন প্ল্যাটফর্মে এম. এস. গোলওয়ালকরের জন্মদিন উদযাপন করছেন, বিখ্যাত 'দার্শনিক' বলে।
বাদ দিলাম। রাজ্যের কথায় আসি।
◆ মার্চের শেষে ভোট, তাই ফেব্রুয়ারির শেষে দিনমজুরের পারিশ্রমিক বাড়ছে।
◆ চারিদিকে ন্যক্কারজনক, ন্যক্কারজনক 'খেলা' হচ্ছে ভোট ব্যাঙ্ক তৈরি করার। অথচ বিরোধীদের সমস্ত ঘোষণা, সমস্ত হবু প্রকল্পের মধ্যে একবারের জন্যও স্থান পাচ্ছে না দূষণরোধের কথা। না ডান, না বাম। কেউ না।
◆ ২০১৭ থেকে ১৯ এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সতেরো শ' স্কুলে ডিএলএড স্টাডি সেন্টার চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাপ্য অর্থ না দেওয়ায় পথে নামতে হয়েছে প্রধান শিক্ষকদের।
◆ পুরুলিয়ার গ্রামে ডাইনি সন্দেহে একজনের পরিবারের উপর আক্রমণ, গুলি চালানো, ইত্যাদি।
বিষয়ের খামতি নেই। খামতি নেই 'খেলা'রও। বাঙালির 'স্টার'দের, বুদ্ধিজীবীদের এ দল - ও দল ঘোরাফেরা চলছে। তারই মধ্যে, বাংলার এই সময়ের 'শ্রেষ্ঠ' কবি, যুব প্রজন্মের মুখ শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করলেন তাঁর নতুন ধারাবাহিক 'হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্টাল'।
এই কথাটি পাড়ার জন্য আগের ওই বিশেষ বিশেষ সংবাদগুলির দরকার হয়তো ছিল না, আবার ছিলও। কেন ছিল, আগে সেটা বলি। এ কথা অনস্বীকার্য যে শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় আধুনিক বাংলায় একটি স্বাধীন, স্বতন্ত্র স্বর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন বহুদিন; মূলত একজন দক্ষ, সাবলীল ছান্দসিক হিসেবে, এবং পরবর্তীতে তাঁর কবিতাকে হাতিয়ার করে কিছু কিছু রাজনৈতিক-সামাজিক সমস্যায় নিজের অভিমত ব্যক্ত করে। শ্রীজাতবাবু নেহাৎ ছেলেমানুষ তরুণ-কবি নন। শঙ্খ ঘোষ বা সুনীলের মতো প্রবীণ বটবৃক্ষ না হলেও, তিনি এবং তাঁর খ্যাতি -- দুইই মধ্যবয়সী। অর্থাৎ তিনি লেখা শুরু করার পর তাঁকে ঘিরে আমাদের যে প্রাথমিক হইচই, সে সব পেরিয়ে তিনি আজ এমন একটি জায়গা করে নিয়েছেন আমাদের সাংস্কৃতিক জগতে, যে প্রয়োজনীয় কথা শোনানোর জোর তিনি ধরেন।
একটি মননশীল সমাজে --- বিশেষত যে সমাজ এককালে নিজের বৌদ্ধিক জীবন নিয়ে গর্ব করতো এবং ইদানীংকালে তার ভাঁড়ারঘরে 'আদর্শ', পিঠ-সোজা বুদ্ধিজীবীর বিশেষ টান পড়েছে --- তাঁর ভূমিকা ঠিক কী হতে পারে, এবং কেন তা হওয়া প্রয়োজন, শ্রীজাতবাবু নিশ্চয়ই বোঝেন। ফি-সন্ধেয় ফেসবুকে চুটকি কবিতা লিখে হাততালি পাওয়া, মাঝেসাঝে কর্পোরেট ক্লাবের ইভনিং পার্টিতে গিয়ে গজল গাওয়া, বিতর্কে অংশ নিয়ে "আমার আসলে বিতর্ক ভালো লাগে না" বলা, যে কোনও বিতর্কিত অবস্থায় 'মহাপুরুষ'-এর রবি ঘোষের মতো মিহি গলায় "আমি কেউই নই, কিছুই নই" মর্মে আবেগের তুর্কিনাচন দেখানো নিশ্চিত তাঁর যথোচিত কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।
তাই, আবারও, আগের মতোই বলছি --- বিশ্ব বাদ দিলাম, দেশ বাদ দিলাম। শুধু, এবং শুধুমাত্র রাজ্যের কথাও যদি ধরি, এই সময়ে বিদ্বজ্জনের আসন থেকে কিছু কথা বলার দায় থেকে যায় শ্রীজাতবাবুর। একে সময়ের চাহিদা, সময়ের দাবি বলে। ট্রাপিজের দড়ির উপর দিয়ে চলছে বাংলা। প্রতিদিন নিত্যনতুন চটক, চমক, বিক্ষোভ, দমন, অসভ্যতা। উদ্দেশ্যের আট দফার নির্ঘন্ট গতকালই ঘোষিত হয়েছে। এত রংবেরঙের কথার মধ্যে যাঁদের সাদা কথা বলার সাহস, সদিচ্ছা আছে বলে আমরা মনে করতাম, তাঁরাও ভিড়ছেন এই-ওই ঘাটে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, স্বতন্ত্র স্বর হিসেবে শ্রীজাতবাবু কী করলেন, না একটি ধারাবাহিক (one-off লেখাও নয়, ধারাবাহিক!) শুরু করলেন এক বাংলা ওয়েব-পোর্টালে। নাম দিলেন, 'হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্টাল'!
এই মুহূর্তে বাংলা এক মারাত্মক transition-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। আসছে দিনে শাসক হিসেবে যিনিই আসুন, বা থাকুন, আর আগের মতো থাকবে না অনেক কিছুই। আর ঠিক দু মাস পর থেকে পরবর্তীতে যা কিছু হতে চলেছে, তার সবটাই ভোগ করবো এই আমরা, এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমরাই দায়ী থাকবো। এমতবস্থায় আমাদের এই ভগ্নপ্রায় সমাজের ভবিষ্যৎ যখন ইতিহাসের কথা বলবে, তাতে লেখা থাকবে, অসামান্য দোলাচলের এক সময়ে বাংলার তৎকালীন কবিশ্ৰেষ্ঠ লিখেছিলেন --
"ঠিক এই কারণেই দেবী সরস্বতী ছিলেন আমাদের কাছের জন, আপনার মানুষ। প্রেমিকাকে বলতে না পারি, তাঁর পায়ের কাছে অঙ্ক আর ইতিহাস বই নামাতে নামাতে বলতেই পারতাম 'দেখো মা, ও যেন হ্যাঁ বলে।' "
অথবা
"বাসন্তী আঁচলের মোড়কে তার সেই করিডোর ধরে হেঁটে আসার যে-মহাসমারোহ, তেমন রাজকীয়ভাবে প্রেমকেও আর আসতে দেখি না। ট্র্যাফিকের ভিড়ে আটকে গেছে হয়তো, বা নেমে পড়েছে ভুল স্টপেজে।"
কী প্রাপ্তি আমাদের এখান থেকে, শ্রীজাতবাবু? যারা আজকের এই দিনে সামান্য প্রাসঙ্গিক কথা শুনতে চাই আপনার মুখে, যাঁকে বাংলার মূলস্রোতের পাঠক সেই কথা বলার ক্ষমতা ও আসন দিয়েছে, সেই আমরা কী পেলাম? নিতান্ত নিজের বোধ, বুদ্ধি উচ্ছন্নে যেতে দিয়ে বসে থাকা মানুষ-ভিন্ন কে এই মুহূর্তে কৈশোরের বসন্ত পঞ্চমী ঘিরে উৎসাহী? আপনি কাদের জন্য লিখছেন? কোন সময়ে লিখছেন?
উপরের বিশেষ বিশেষ সংবাদ না দেখিয়েও এই প্রশ্ন কেন করা যেত, এবার বলি। কথা উঠতেই পারে, একজন তাঁর পছন্দমতো যা খুশিই লিখতে পারেন --- বসন্ত পঞ্চমী, ডিমের ডালনা --- বাধা তো নেই কিছুতে! রাজ্যে, দেশে, পৃথিবীতে যত কোটি ঘটনাই ঘটে চলুক, একজন লেখক এতটুকু বাধ্য নন সে নিয়ে লিখতে, যদি তিনি না চান। হয়তো বা এই ধারাবাহিক নিয়ে এত হইচই করাই ভুল। হয়তো তিনি স্মৃতিতাড়িত হয়ে এই বিষয়ে দু' কথা লিখবেন ভেবেছেন। নিশ্চয়ই।
কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। শ্রীজাতবাবু যে দুই মেরুতে ক্রমাগত চারণ করে বেড়ান, তাদের মেলানো পাঠক হিসেবে ভারী মুশকিল। তিনি যে কোনোদিনই প্রতিবাদী স্বর হয়ে ওঠেন নি, তা আদপেও নয়। সোচ্চার প্রতিবাদ তাঁর কলম থেকে বিলক্ষণ বেরিয়েছে এক এক সময়। সে সব ঘটনায় তিনি বিচলিত, বিব্রত, ক্ষুব্ধ। অথচ তার পরেই তিনি চলাফেরা করছেন সেই বৃত্তে, যে বৃত্তের বিরুদ্ধে তাঁর আগের প্রতিবাদটি ছিল। একই বিষয়ে নিয়ে বারবার নাই লিখতে পারেন, কিন্তু প্রাত্যহিক শৈল্পিক প্রকাশে তার কিছুমাত্র প্রভাব থাকবে না? আমরা কি এতটাই ফ্লুইড একটি সময় বাস করছি, যাতে এমন দুই মেরুর মধ্যে সাবলীল চারণ হদ্দ স্বাভাবিক? স্থির আদর্শ বলে তবে কিছুই নেই? আমি যদি প্রতিদিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে শপিং মলে ঢুকে দিন কাটাই, আর ফেরার পথে রাস্তার দোকান দেখে বলি, "আমার ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য মনকেমন করে", এর দুটিই কি সত্যি একসঙ্গে চলা সম্ভব একজন শিল্পীর পক্ষে? যে প্রান্তিকতার জন্য দরদ কলমের আগায় থাকে শ্রীজাতবাবুর এক এক লেখায়, সেই একই কলমে কিভাবে সমসাময়িক দুর্দশা ও অসহায়তার প্রতি এমন অসংবেদী ঔদাসীন্য দেখা যেতে পারে? এমনকি মানুষের অতিব্যক্তিগত যাপনের লেখনীতেও যে কালের শোক ধরা পড়ে, তা-ই বা কোথায়? প্রফেশনাল লেখক, ফরমায়েশি লেখা --- প্রভৃতি যুক্তি ধরেও এই বিরাট বৈপরীত্যের উত্তর পাই না।
লাশের স্তূপে দাঁড়িয়ে পলাশের কথা বলা প্রশংসনীয়। কাম্যও বটে। কিন্তু লাশকে অগ্রাহ্য করে আমি পলাশ বলবো? বলতে পারবো? এমন মেরুকরণ?
(উদ্ধৃতিসূত্র: www.daakbangla.com)
(ছবি: ফেসবুক)
গা রি রি করে। আর কিছুই না।
ReplyDeleteবড্ড, বড্ড ভালো লেগেছে
ReplyDelete