তোমায় গান শোনাবো
আজ নয়; বহু দিন পর যখন আমরা কাজের মধ্যেকার ফুরসতে পূর্বঘাট পর্বতমালার সমুদ্রঢালে বসার সুযোগ পাবো, গান শোনাবো তোমায়। তখন অকারণে মাথার উপর মেঘ করে এসেছে, কোনও পূর্বাভাস না দিয়েই। একদিকে ভালোই হয়েছে --- কারণ তার দিকে তুমি তাকালে সেই বহুকাল আগের প্রেমে।
সমুদ্রঢালে শনশন বাতাস আসে। সাগর দেখা যায় না; সে কিছুটা দূরে। কিন্তু প্রতিনিয়ত বারুণীগতি ভাসিয়ে নিয়ে যায় ওড়না, চুল। এমন সময়, যতই অদ্ভুত লাগুক না কেন, আমি একবার তোমায় 'দুখজাগানিয়া' বলে ডাকবো। তোমায় গান শোনাবো।
ঘরেও যেমন কেবলই এটা সেটা গুনগুন করে চলি আজকাল --- কখনও হেমন্ত, কখনও দেবব্রত, কখনও ফরিদা খানুম --- তখনও সেভাবেই শুরু করবো গান। বেশিটাই হবে 'হুঁ হুঁ হুঁ' আর মাঝেসাঝে দুয়েকটা কথা। আকাশে মেঘ ঘন হয়, জমাট বাঁধে, তারপর মাঝখান দিয়ে কেমন ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায়।
এই স্বপ্ন আমার সারাজীবনের, একদিন আমি বিবাগী হয়ে যাবো, সন্ন্যাসী হয়ে যাবো। যখনই নিজেকে সন্ন্যাসীর জীবনে ভাবি, আমার সারা শরীর আনন্দে সাড়া দেয়, কেঁপে ওঠে। ওসব পাহাড়ের গুহায় চলে যেতে ইচ্ছে হয় না; কিন্তু সন্ন্যাসের একটা সুর আছে, সেটা প্রতিদিন আজকাল একবার করে শুনতে পাই --- কানে, না, বুকের এইখানে, না, আরও ভিতরে কোথাও একটা। নিজেকে এত পূর্ণভাবে অনুভব সন্ন্যাসের এই দৃশ্যপট ছাড়া আর কোথাও করি না। সেই সুর, শব্দ ছাড়া, উচ্চারণ ছাড়া সেই সুর আমি শোনাবো তোমায়। কিছু না হয়ে থাকার গান শোনাবো।
সমুদ্রের সেই বাতাস মুখে মেখে সেইদিন গান শোনাবো তোমায়। আজ নয়। এখন শুধু বুঝতে পারি, পূর্বঘাটের সমুদ্রঢালে বাতাস বয়। আমার শোনার বলতে ওটুকুই আছে শুধু। সারাদিন মাথার মধ্যে, বা কান ঘেঁষে, বা শীতশেষের ফুটিফাটা ঠোঁটে শনশন, শনশন ... আমার পরণের কাপড় আলুথালু উড়ছে, ছিঁড়ে যাচ্ছে, জুড়ে জুড়ে একবস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। চোখ খুলে রাখি, কি বুজি, সেই এক শব্দ। অক্লান্ত। অবিরাম। আর তার মধ্য থেকে এক সুর --- না মৃত্যু, না মৃত্যুভয়, না জন্ম --- আমি শুনি।
তোমায় গান শোনাবো। সেই গান। আকাশের মেঘ যখন বুঝে পাবে না কী করা উচিত --- নিজেকে সংযত রাখা, না বৃষ্টি হয়ে লুটিয়ে পড়া --- তখন আমি সুর দিয়ে তোমায় বলবো, আমাদেরও আসল প্রশ্ন এটুকুই --- বন্ধন, না মুক্তি। সন্ন্যাসের গানও আসলে বিপ্লবের।
Aha 💛
ReplyDelete