আমার সরস্বতী
ব্লাঁশ মনিয়েরের কথা হয়তো অনেকেই শুনেছেন --- যিনি নিজের বাড়িতে থেকেও পঁচিশ বছরের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন?
বিশ শতকের একদম শুরুতে প্যারিসের এটর্নি জেনারেলের কাছে একটি বেনামী চিঠি আসে --- পঁচিশ বছর আগে যে যুবতী ব্লাঁশ মনিয়েরের নিরুদ্দেশ রিপোর্ট করেছিলেন স্বয়ং তাঁর মা মাদাম মনিয়ের, তিনি আসলে আছেন নিজেরই বাড়িতে -- মনিয়ের প্যালেসে। বিষয়টি যেন খতিয়ে দেখা হয়।
উদ্বিগ্ন এটর্নি জেনারেল সরকারি সহায়তায় পুলিশ বাহিনী পাঠান মনিয়ের প্যালেসে। বৃদ্ধা মা ও ব্লাঁশের ভাইয়ের মিইয়ে যাওয়া মুখ ও অসহিষ্ণুতা দেখে সবে পুলিশদের মনে সন্দেহ একটু দানা বাঁধছে, এমন সময় একটা গন্ধ --- পচা, বোঁটকা। আসছে উপরতলা থেকে। বাধা উপেক্ষা করে পুলিশরা ওঠেন চিলেকোঠার ঘরের কাছে। বোঁটকা গন্ধ বেশ কড়া এখন। একটা ছোট্ট ঘর, দরজায় তালা, বাইরে থেকে ভারী পর্দা দিয়ে ঘরটা মুড়ে রাখা যেন। পর্দা সরিয়ে কাঁচ ভেঙে ঘরে ঢোকেন পুলিশকর্মী। আলো না ঢোকা ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে হঠাৎ আলো সমেত কিছু মানুষ ঢুকে পড়ে।
ঘরের এক কোণে একটা ছেঁড়া জাজিমে একজন উলঙ্গ মানুষ (মানুষের অস্থিসার বললেও ভুল হবে না) বসে ভয়ে কাঁপছে। মানুষ দেখে, তার এলিয়ে পড়া দীর্ঘ চুলে সে কোনোমতে লজ্জা নিবারণ করতে ঢেকে রেখেছে তার স্তন আর যোনি। তিনি --- ব্লাঁশ মনিয়ের, পঁচিশ বছর আগের প্যারিস শহরের এক অসমাসুন্দরী যুবতী। ঘরের দুর্গন্ধে বমি করে ফেলেন কিছু পুলিশকর্মী। কিসের দুর্গন্ধ? ব্লাঁশের নিজের বিষ্ঠার, এই পঁচিশ বছরে যা তাঁর ভোজ্য হয়ে উঠেছিল।
ব্লাঁশকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তাঁর ওজন ২৪ কেজি, মানসিক ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে নষ্ট, সূর্যের আলো সহ্য করতে পারেন না আর। তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় হাসপাতালে। প্রবল জনরোষ আর আইনের মুখে পড়ে মাদাম মনিয়ের স্বীকার করেন, মেয়ের এই দশার মূল রূপকার তিনি নিজে। পঁচিশ বছর আগে, ব্লাঁশ যখন ফিরে ফিরে দেখার মতো যুবতী, সম্ভ্রান্ত মনিয়ের পরিবারের একাধিপতি মাদাম মনিয়ের মেয়ের বিয়ের জন্য 'হাই সোসাইটি'র এক এডভোকেটের সঙ্গে সম্বন্ধ করার পথে এগোন। এদিকে ব্লাঁশ ভালোবাসেন আরেক পুরুষকে, ব্লাঁশের চেয়ে বয়সে বেশ অনেকটা বড়, আর 'অকুলীন'। পরিবারের সম্মান রক্ষা মায়ের কাছে প্রাধান্য পায়, আর মেয়ের কাছে একটি মানুষকে ভালোবাসা। বাবা-বাছা করে বোঝানো, ধমকানি, শাসানি, হুমকি --- কিছু দিয়েই মেয়েকে পারিবারিক 'প্রেস্টিজ'-এর ন্যারেটিভ বোঝাতে পারেন নি মাদাম মনিয়ের। শেষে বলেন, বেছে নাও এর যে কোনও একটা পথ --- পরিবারের পছন্দে বিয়ে, অথবা আজীবন বন্দীদশা।
ব্লাঁশ বেছেছিলেন দ্বিতীয়টি। ১৮৭৫ থেকে টানা দশ বছর ব্লাঁশের প্রেমিক তাঁর নিরুদ্দেশে যাওয়া প্রেমিকাকে খুঁজতে খুঁজতে ১৮৮৫-তে মারা যান। সে খবর আসে না ব্লাঁশের কাছে। উদ্ধার হওয়ার পরেও ব্লাঁশ তাঁর মানসিক ভারসাম্য আর ফিরে পান নি। যে ক' বছর বেঁচেছিলেন, হাসপাতালেই। বেশির ভাগ সময়ই তাঁর প্রাক্তন প্রেম ও প্রেমিকের ঘোরেই বাঁচতেন।
আজ থেকে দেড়শো বছর আগে এক যুবতী সামাজিক মানরক্ষার চেয়ে প্রাধান্য দিয়েছিলেন ভালোবাসাকে। ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে থাকতে না পারলেও, তিনি নিঃশর্ত ভালোবাসার পক্ষে থেকেছিলেন। তাঁর কঙ্কালসার, অসুস্থ, মৃতপ্রায় চেহারার ছবি দিয়ে মানুষকে ভালোবাসার কথা আজও মনে করাতে পারেন ব্লাঁশ। তাঁর সহজাত, মানবিক, হৃদয়ের শিক্ষা তাঁকে সেই শক্তি দিয়েছিল।
ভারতেরই এক প্রদেশের গ্রামে এক কিশোরী ইস্কুল ফেরৎ দ্যাখে বাড়িতে বাবা আর মা জমানো টাকা গুনছে, তার বিয়ের পণের জন্য। যে টাকা বাবার কাছে 'নেই' বলে তার পরের ক্লাসে ওঠার পরীক্ষার ফি সে জমা দিতে পারে নি মাসখানেক আগে। অথচ বিয়ে নয়; এই মুখপোড়া গ্রামে, এই দিনে পাঁচ ঘন্টার বিজলিবাতি আর দু ঘন্টার কলের জলের জগতে মেয়েটি আর একটা ক্লাস পড়তে চায় শুধু। একবারে ইস্কুল পাশ করার স্বপ্ন সে দেখতে পারে না। একটা করে ক্লাস পেরোনো তার কাছে মহাভারতের এক এক অধ্যায়ের মতো। বাড়িতে সেই টাকা দিয়ে কেন তাকে পড়ানো হচ্ছে না, এ নিয়ে তর্ক করলে তার সামনে পুড়িয়ে ফেলা হয় তার এই ক্লাসের যাবতীয় বই, খাতা। বাড়ির সবাই যখন ঘরে ফিরে দরজা দিয়ে দিয়েছে, মেয়েটি নিভে আসা আগুনের স্তুপ থেকে তুলে নেয় অবশিষ্ট আধপোড়া একটি খাতা, তার শেখা অঙ্কের শেষ চ্যাপ্টার। বিয়েই করতে হয় তাকে, ইস্কুল আর পাশ করা হয় না; কিন্তু সে কাকে ভালোবেসেছিল, আজও লেখা আছে তার ওই পোড়া খাতা বুকে তুলে নেওয়ার ছবিতে।
যে ছেলেটি প্রত্যন্ত গ্রামের কলেজে সাহিত্য পড়ে, আর সিলেবাসের বাইরের বই পড়তে চায়, কিন্তু অবসর সময় তাকে বাড়ির খিদের কথা ভেবে ক্ষেত থেকে ধান কেটে বিক্রি করতে যেতে হয়, তার ওই বইপড়ার ইচ্ছেটুকু লিখে রাখি আমি। যে ছেলেটি কোনোমতে গ্র্যাজুয়েশন করার পর তার বাড়ি আর উচ্চশিক্ষার জন্য টাকা দিতে চায় না বলে সে সারাদিন কুমোরটুলিতে মূর্তি তৈরি করে উপার্জন করে, সে টাকা দিয়ে ডিস্ট্যান্সে মাস্টার্স করে, তার সেই মৃৎশিল্পীর পরিচয়কে মণিকোঠায় ধরে রাখি আমি। যে মানুষ আজও 'বর্ণ' বলতে তার পরের শব্দ 'পরিচয়' বোঝে, 'বিদ্বেষ' নয় --- রূপকথা হতে পারে, সিনেমার সাবজেক্ট মনে হতে পারে --- কিন্তু সত্যি। আমার নিজের চোখে দেখা, কানে শোনা।
চাই না আমার মা সরস্বতীর কাছে পাস-মার্ক; চাই না A+ গ্রেড বা হাই SGPA! উপরের মানুষেরা, এবং এঁদের মতো আরও অনেকে নিজেদের স্বভাবে, শিক্ষায় বিন্দু বিন্দু করে হলেও, দেখিয়েছেন, দেখিয়ে চলেছেন --- কেমন হওয়া উচিত সমাজের; কোনটি সার, এবং কোনটি বাতুলতা। যা হবার, তা হবে; কিন্তু তদ্দিন যেন এঁদের ইচ্ছে, সাহস ও দৃঢ়তা আমাদের আর একটা দিন বাঁচার শক্তি দেয়। এঁরাই আমার সরস্বতী।
ছবির ঋণ: https://lekharpata.com/bangla/blanche-monnier-a-love-story-locked-in-an-attic/
Comments
Post a Comment