Followers

ভালোবাসার দিন, রাত

বছর সতেরো আঠারো আগে আমার এই ঘরে প্রথম আসি যখন, বসন্তকাল ছিল। মার্চ মাস। তার আগের ঘরে খোলা জানলা ছিল না; এই ঘরে তিনদিক খোলা জানলা, একফালি বারান্দা। আঠারো বছর ধরে দেখে গেছি শুধু, সারা বছর ধরে হাওয়া কেমন ঘরের চতুর্দিকে ঘোরে। 

এখন শীত চলে যাওয়ার কাল। সপ্তাহ দুয়েক আগের উত্তুরে হাওয়া এখন দিক বদল করছে; উত্তর থেকে সে পশ্চিমে সরে এসেছে। বিকেলের পরে আমার পশ্চিমের জানলার পর্দা আলুথালু ওড়ে, লাগোয়া পড়ার টেবিলের বইয়ের পাতা আকাশের ঘুড়ির মতো উড়তে চেষ্টা করে। সরস্বতী পুজোর কাল পেরিয়ে বসন্ত গাঢ় হবে আরও, চৈত্র আসতে আসতে সে হাওয়া দিক পাল্টে চলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমে।

সারা গ্রীষ্ম দক্ষিণের জানলায় খেলবে সন্ধের বাতাস। কখনও সখনও কালবৈশাখী এলে সে ১৬০° ঘুরে উত্তর-পশ্চিম থেকে বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে আসবে নাকে। সারা সন্ধে তান্ডব হবে, হার্ডরক ব্যান্ডের গীটারিস্টের মতো বৃষ্টি মাথা ঝাঁকাবে কোঁকড়া চুলের বাঁধন খুলে দিয়ে। রাতে, এসব মিটে যাওয়ার পর যখন কালো, চকচকে রাস্তায় লেপ্টে থাকবে কদম পাতা, আবার চুপিচুপি মেঘকে পশ্চিমে ঠেলে ফিরে আসবে দক্ষিণী। আষাঢ় থেকে আবার সে-ই হবে পূবালী। সমস্ত কালো মেঘকে পথ দেখিয়ে শহরে আনার দায়িত্ব তার। শরতে আজকাল বাতাস একটু জিরোয়, তারপর কার্তিক পড়লে উত্তরা হয়ে ওঠার আগে অনিশ্চিত, ইতস্তত সে বয়ে চলে যত না বাইরে, তার চেয়ে বেশি আমাদের মনে। পাতায় রঙ ধরে, ঝরে যায় আস্তে আস্তে; বসতবাড়ির পাড়াগুলো ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমান করে বসে থাকে কার উপর। খালি মনে হয়, সময় চলে যাচ্ছে। কোথায়, কে জানে...
এখন শীত চলে যাওয়ার কাল। বাতাস কাল রাতে বইছিল পশ্চিম থেকে আমার ঘরে। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো ততক্ষণে। আমিও মশারি টাঙাবো, শোবো। কিন্তু আমার খালি মনে হয় সেই সময় দাঁড়িয়ে, আঠারো বছর ধরে বাতাসের ঘূর্ণি দেখে গেলাম শুধু। সারা বছর ধরে সে চতুর্দিকে ঘোরে বলে তার কোমল ছোঁয়া বুঝি; এক মিনিটে এমন ঘুরলে তাকে মনে হতো ঘূর্ণিঝড়। আর মনে পড়ে, সারা বছর ধরে, বছর পেরিয়ে দশক ধরে বাতাস ঘোরে ঘরের চারপাশে। বাড়ির চারপাশে সারাবছরের নানা গাছে নানা সময় ফুল ফুটে ওঠে, চিরদিন থাকবে ভেবে। তারপর, ঝরে যায়। ফোটার সময় জানে না, সে ঝরবে। ঝরার সময় জানে না, আবার ফুটবে। কী হাস্যকর, কী করুণ! আমার ওদের আদর করতে ইচ্ছে করে।

এখন শীত চলে যাওয়ার কাল। তুমি ঘুমিয়ে আছো। আমিও এই শোবো। মানুষ আসে, মানুষ যায়। আসার সময় ভাবে, যাবে না। যাওয়ার সময় জানে না, আবার আসতে হবে। 

বাতাসের ঘূর্ণি আমার ঘরের চারপাশে আজ আঠারো বছর ধরে ঘুরছে। তাকে আমি রোজ অনুভব করি। যে থেকে আমার মুক্তি নেই। আমি প্রতিদিন বুঝি, এই ঘূর্ণি বুঝতেই আমাকে শান্ত থাকতে হবে।

তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোও। আমি শান্তির কথা লিখবো প্রতিদিন। আমি ওটুকুই পারি।

Comments