মহীন
মাস ছয়েক আগের কথা; শীতের শুরুর দিক তখন। অরণীর একতলার ঘরে আমাদের আড্ডায় সেদিন মহীন এসে আমার হাতে পুরোনো হয়ে প্রায় ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া এক গোছা আলগা পাতা, খানকতক ডায়রি আর একটা বিশাল গাবদা খাতা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, "পড়ে দেখিস, মাল-মশলা আছে।"
সে লেখা কার, আমাকেই বা কেন দিল মহীন, জানি না। হাতের লেখা ওর মতো নয় তেমন। জিজ্ঞেস করায় বললো, "দাবী করবে না কেউ। আরাম সে রাখ। আমিও চাইব না আর হয়তো।"
- কিন্তু পেলি কোথায়? তোর?
মহীন চোখ টিপে বেরিয়ে যায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। যাওয়ার সময় অরণীর কাঁধের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে অর্ধেক সিঙাড়া খাবলে নিয়ে বলে, "সে সব কথা আরেকদিন।" ঢলঢলে ট্রাউজার উড়িয়ে ও ছোটে বাসরাস্তার দিকে।
- পুরো উন্মাদ! কী দিয়ে গেল তোকে?
- এই তো কিসব ঝড়তি-পড়তি পাতা! যত্তসব।
এরপর এই ছ' মাসে মহীনের সঙ্গে দু'বার দেখা হয়েছে। দু'বারই এই-সেই কথায় আমি এগুলোর কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি ওকে। আর তাছাড়া ওর সঙ্গে দেখাও হয় খুব আচমকা, এবং অল্পক্ষণের জন্য। তখন এত খেয়াল থাকে না।
সেই নোংরা পাতার-ডায়রির বান্ডিল আমি তাকে তুলে রেখে দিয়েছিলাম এতদিন। কলেজের কাজ, রিসার্চের কাজ, এসবে ভুলেই গিয়েছিলাম। এখন দীর্ঘ এই বন্দীদশায় সব নামিয়েছি। একে একে উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। অদ্ভুত কিছু চিঠি। কে লিখছে, কাকে লিখছে, কবে, কিছুই লেখা নেই। চিঠি নয়, যেন চিঠির খসড়া। চিঠির আবার খসড়া হয় নাকি? জড়িয়ে পেঁচিয়ে অনেককিছু লেখা। কতকটা উদ্ধার করতে পারছি না। কিছুটা পারছি।
মহীন কেন দিল এসব মরতে আমাকে! না ফেলতে পারি, যদি একদিন চেয়ে বসে আবার। না পারি গিলতে, শুরু শেষ ছিরিছাঁদ কিছুই বোধগম্য হয় না।
সেদিন ফোনে শাসালাম, সত্যি করে বল এসব কার লেখা, নয়তো নিয়ে যা। নইলে ফেসবুকে ছেড়ে দেব তোর নামে! মরবি তখন!
ও হা-হা করে হেসে বলে, মরলে আমি মরবো! তোর কী রে? আর শোন, কিছু লেখা এমন হয়, আমার-তোর কারুর নয়। সেগুলো লেখা হয়ে থাকে এমনি।
- কে লেখে? হাওয়া?
- আবার বলে "কে"! বললাম না, কেউ না। ঠিকানাছাড়া মানুষকে কোনোদিন জিজ্ঞেস করতে আছে "তুমি থাকো কোথায়?" এগুলোও সেরকম।
Comments
Post a Comment