সাইক্লোন
সাইক্লোন আসছে। বিভিন্ন মাধ্যম মারফৎ জানতে পেরেছি, একে বলে 'এক্সট্রিমলি সিভিয়ার সাইক্লোন'। আরো জেনেছি, বাইরে এরই নাম কখনও হারিকেন, কখনও টাইফুন। বাজারে ভোটের প্রচার মিইয়ে গেছে। কোনো চিহ্নে কেউ ভোট দিতে বলছেই না। খবরের কাগজ, খবরের চ্যানেল -- সমস্ত কিছুর ফ্রন্টলাইন থেকে লোকসভা স্রেফ উধাও! কলকাতায় ঢুকতে ঢুকতে ঝড়ের গতিবেগ অনেকটাই কমে আসবে, আর বাড়ি ভেঙে পড়ার বিশেষ সম্ভাবনা নেই, তাই বেশ আশ্বস্ত, মজা দুইই লাগছে, কারণ রাজনীতি তাহলে এখনও অপরাজেয় নয়। দুর্যোগ আমাদের বাঁচাতে পারে রাজনীতি থেকে।
সেট-টপ বক্সের রিমোটটাকে খাটের গায়ে বাড়ি মেরে মেরে এখনও অব্দি তিনটে চ্যানেল পাল্টানো গেছে। জানি, সমস্যাটা ব্যাটারির এবং বহুদিনের। কিন্তু এও জানি, পুরোনো ব্যাটারি সমেত যন্ত্রকে মারধোর করলে ব্যাটারি এক্সটেনশনে চলে আরো কিছুদিন; কে বলতে পারে, বেশি পেটালে মৃত্যুঞ্জয়ীও হয়ে যেতে পারে। অনেক কষ্টে একটা খবরের চ্যানেল পাওয়া গেল। আয়লায় কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার ফুটেজ দেখানো হচ্ছে। সব ভেঙে পড়ছে, লাইক এ প্যাক অফ কার্ডস। নীচে নিউজ বারে আসছে, জল-ওষুধ-খাবার সব জমা করে রাখতে ঘরে। কী হতে পারে, কেউ জানে না। ক'দিন আগেই মাসের বাজার করা হয়েছে, বাড়িতে কেউই তেমন অসুস্থ নয় যে মারকাটারি সব ওষুধ লাগবে। নিয়মিত প্রেসার-পেটখারাপ-সর্দিকাশির ওষুধ আছে। জল নিয়ে কোনোদিনই বেশি ভাবতে হয়নি; হেমা মালিনী হেসে এক-দু'বার বলতেই আমরা কেন্ট কিনে নিয়েছিলাম। তাই বেশ আশ্বস্ত, মজা দুইই লাগলো, কারণ কী হতে পারে কেউ জানে না। যাক। শেষ কিছুদিন ধরে সবাই দেখছি সব জানে। মাইক ধরেই একে অন্যকে বলছে, "দোব নাকি তোর জালিয়াতি ধরিয়ে? সব জানি! ভেবেছিস টা কী!" দুর্যোগের জালিয়াতি বা ওয়েলফেয়ার, কিছুই কেউ জানে না তাহলে।
ফোন বেজে ওঠে।
"হ্যালো!"
"স্যার আপনার পাঁচ মিনিট সময় পেতে পারি?"
"পারেন।"
"স্যার আমি লিভিং লাইন থেকে কথা বলছি। আপনি কোন ইনশিওরেন্স এই মুহূর্তে ইউজ করেন জানতে পারি?"
"পারেন না।"
জম্পেশ অপমান করা গেছে, যা হোক! লাইনটা কেটে দিলাম। ঠিক সময়ে মাইনে ঢোকে না, তার আবার ইনশিওরেন্স, তার আবার প্রিমিয়াম!
তাহলে, সাত দুগুণে চোদ্দোর চার, রইল বাকি মাইনে। এক তারিখ পেরিয়ে গেছে, এখনও আসেনি। কাজেই নিয়মমাফিক আমার একটু বিরক্ত হওয়া উচিত। জীবনে আরো যা কিছু ঠিক হচ্ছে না, মাইনের রাগের সঙ্গে সেগুলোকে জুড়ে দেওয়া উচিত। এই যেমন, কালকের পাড়ার দোকানের বেগুনে পোকা ছিল, ঠিক সময়ে মাইনে পেলে গড়িয়াহাট বাজারে গিয়ে আরো ভালো বেগুন কিনতে পারতাম। যেমন, রিমোটের ব্যাটারি কাজ করছে না, মাইনে ঢুকেছে শুনলে ব্যাটারি নিজে থেকেই টাট্টুঘোড়ার মতো ছুটতো। যেমন, জিও টাকা চাইছে। এদিকে স্টেট মাইনে দিচ্ছে না, ওদিকে অম্বানির খুব ইয়ে। রাগে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ঝড় আসার আগে পাড়ার দোকানে প্রেসার মাপিয়ে আসি। ১৪০/৯০। দুধওয়ালা, কাগজওয়ালা এসে বিল ধরাবে। ঝামেলার গাছ যত!
হর্ষ ভোগলে একবার বলেছিলেন, ১৯৯ রানে ৪ উইকেট আর ২০০ রানে ৪ উইকেটের মধ্যে অনেক তফাৎ। ২০০ সংখ্যাটাই এমন যে ব্যাটিং টিমের মনে হতে থাকে, মোটামুটি তাও একটা রান হয়েছে। আমার সেই অবস্থা। ৩০ তারিখের যে ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স মলয়পবন, ২ তারিখের সেই ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সই সাইক্লোন।
আর, সাইক্লোন আসছে। আর এক ঘন্টার মধ্যে উড়িষ্যার ওপর আছড়াবে। কোস্টাল এরিয়ায় রেড এলার্ট। জনজীবন বিপর্যস্ত। গ্রাম-কে-গ্রাম ইভ্যাকুয়েটেড। তাও ঘরবাড়ি ভাসবে। চাল উড়বে, চুলো উড়বে। টুরিস্টরা ফিরবে স্পেশ্যাল ট্রেনে। যাঁদের পয়লা তারিখ মাইনে হয় না, যাঁরা দিন-আনি-দিন-খাই-এর দলে, তাদের জীবিকা ভণ্ডুল। সে'সব সেরে সাইক্লোন কলকাতায় আসবে মধ্যরাতে। সমস্ত কিছু আনপ্লাগ করে রাখতে হবে। সব সেরে রাখতে হবে। বড় আদরের ৯০কিমি প্রতি ঘন্টার ঝড় আমার। সমস্ত জানলা বন্ধ। মেন-গেটে ডবল তালা। রাত পৌনে বারোটা থেকে ব্লু-টুথ স্পিকারে বাজবে 'কে দিল আবার আঘাত'...
©৫.৫.১৯
Comments
Post a Comment