Followers

পড়া-পড়া খেলা



১৯৯৪ সালের মার্চ-এপ্রিল। ক্লাস ওয়ানে ভর্তির পরীক্ষা দেবো কলকাতায়। ৯২ সালে শিলিগুড়িতে নার্সারি ক্লাস, তার পরের বছর এ' শহরে ফিরে কিছুদিন কিন্ডারগার্টেন গ্রেডে পড়াশুনো। অতঃপর 'বড়' স্কুলের চেষ্টায় ৯৪-এর বসন্তকাল। বাড়ি থেকে কোনোদিনই গাদাগুচ্ছের স্কুল বেছে নিয়ে "বাবু রে তোকে পেতেই হবে"-মর্মে আমাকে পরীক্ষায় পাঠানো হয়নি। বাছা হয়েছিল মাত্র তিনটে স্কুল --- সেন্ট লরেন্স, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট, আর যোধপুর পার্ক বয়েজ। এডমিশন টেস্ট দিতে যাওয়াও বেশ খেলা-খেলা লেগেছিল আমার। সেন্ট লরেন্সের মাঠে বড় বড় গাছ দেখে মা-কে 'হীরক রাজার দেশে'র মতো বলেছিলাম, "দ্যাখো, যত আদিম মহা দ্রুম!" বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের পরীক্ষার দিন ঠাঠাপোড়া রোদ উঠেছিল, এটুকু মনে আছে। আর কাঠের বেঞ্চগুলো বার্নিশ করায় চকচক করছিল। রইল বাকি যোধপুর বয়েজ। সেখানে একজন বুড়ো মাস্টারমশাই (কানাই স্যার, বন্ধুদের হয়তো মনে থাকবে) আবৃত্তি করতে বলেছিলেন, আর একটা টেবিলে অনেক রংবেরঙের জিনিস নিয়ে বসে একবার সেগুলো দেখিয়েই কাগজ দিয়ে ঢেকে ফেলে বলছিলেন, বলো তো কি কি দেখলে? আমি সেই কানাই মাস্টারের বেড়ালছানা, আদ্ধেক জিনিস ভুলে মেরে দিয়ে দু-চারটে বলে বেরিয়ে এসেছিলাম। শেষে রেজাল্ট বেরুনোর পর দেখা গেল, অন্য দুটো স্কুলে আমার হয়নি। হয়েছে যোধপুর বয়েজে। বেশ কথা। বাড়ির কাছে স্কুল। যাওয়া যাবে। বড় একটা মাঠও আছে। ...
   
অফিস-ফেরৎ প্রায় এক ঘন্টার পথ পেরোলে, গণ্ডগ্রামের মাঝমধ্যিখানে আমার রোজ চোখে পড়ে অনেকগুলো ইঁটভাটা। বিরাট, বি-রা-ট বড় মাঠ একটা। প্রায় নেড়া। গাছপালা থাকলেও লালচে হয়ে গেছে সব। আর সারি-সারি ইঁটের সহবাস। বিকেল পড়ে আসে তখন মাঠের বুকে। ভাটার চিমনিগুলো থেকে সাদা ধোঁয়া গলগল করে বেরিয়ে বাতাসে ছড়ায়। পাঁচ-ছ'জন মজুর কোনো ইঁটের পাহাড়ে বসে থাকেন আদুল গায়ে, গামছা দিয়ে বাতাস করতে করতে। আকাশ লাল হয়, মনে হয় সুরকি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে মেঘে মেঘে। ট্রেনের গতি কমে আসে, কারণ সামনেই স্টেশন। ট্রেনের হাজার গোলমালের মধ্যেও আমি নিশ্চিত জানি, এই জায়গাটায় কোনোদিন যদি নামি, কোনো আওয়াজ শুনতে পাবো না। কী নিষ্প্রাণ, অথচ অভিমানী! যেন এই মাঠে সারাক্ষণই বিকেল হয়ে থাকে। এ সময়ে আমার স্কুলের কথা মনে পড়ে খুব। কেন, জানি না ঠিক। খুব একা লাগে বলেই হয়তো। এই মাঠটা দেখলে খুব একা লাগে, বন্ধুদের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তারপরেই মনে পড়ে, আমার মতো সেই বন্ধুরাও হয়তো এখন একা একাই আরো দূরের কোনো অফিস থেকে ফিরছে, বা ফিরছে না, হয়তো ফিরে ঘরে বা বারান্দায় বসে আছে, বা সিনেমা দেখবে আজ একটা, বা কেউ দেশ ছেড়েছে, মাথা গুঁজে আছে নিজের ডেস্কে। আমার তাদের সবার হয়ে এক লাগে। ফিরে আসি।
  
একা লাগলে ফিরে আসা যায় সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতির কাছে। আমার স্মৃতি প্রখর নয়। অনেকের অনেক ছোটবেলার ঘটনা গভীরে মনে থাকে, আমার থাকে না। আমার মনে পড়ে হঠাৎ এক-একটা দিন, এক-একটা বিকেলে স্কুলের করিডোরে পায়ের শব্দ, এক-একটা কণ্ঠস্বর, উষ্ণতা বা শৈত্য। আমার স্মৃতি ঘটনার যত, তার চেয়ে বেশি সময়ের, অনুভূতির। তারা আরো ক্ষীণ হয়ে আসার আগে এই লিখে রাখার চেষ্টা। কারণ, তাদের কাছে আজও আছে সাত রাজার ধন এক মাণিক --- আশ্রয়।...
   
নার্সারি বা কিন্ডারগার্টেন গ্রেডে স্কুলে যাওয়া নিয়ে আমার হাজার বায়নাক্কা ছিল, ভয় ছিল। যোধপুর বয়েজে প্রথম দিন থেকেই এমন কোনো জেদ-ঝোলাঝুলির সম্মুখীন হতে হয়নি আমার বাবা-মা'কে। ভালোবেসে স্কুলে যেতাম। সকালে আমাকে ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে তোলাটা একটা ব্যাপার ছিল, এটুকুই যা। মর্নিং স্কুল। এক গ্লাস জল খেয়ে আর দুটো বিস্কুট হাতে নিয়ে রওনা দিতাম মায়ের সঙ্গে। ছাইরঙা হাফ প্যান্ট, সাদা শার্ট, পকেটে সেলাই করা স্কুলের মোনোগ্রাম। বিরাট নীল গেট অল্প ফাঁক করে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিওয়ারিজী। পিছন ফিরে মা'কে টাটা করে ঢুকে যেতাম গেটের ভিতর। দশ বছর সেই দু'পাশে বাগানঘেরা রাস্তা দিয়ে স্কুলে ঢুকেছি-বেরিয়েছি। সেভাবে দেখিনি কখনও। আজ, ঢোকার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক। ক্যামেরা বন্ধ!
  
দু'পাশে সার দিয়ে রঙন-ফুলের গাছ, গাছগুলো মাথায়-মাথায় মেলানো। অর্থাৎ, মাথাগুলো চ্যাপ্টা করে ছেঁটে দেওয়া। লাল ফুলে ভরে আছে। তার ওপারে দুদিকের বাগানেই আরো গাছ ছোট-বড়। যতদূর মনে পড়ে, বাঁ দিকে বাগানের শেষ মাথায় ইউক্যালিপটাস বা এমন বড় এক-দুইখান গাছ ছিল। যে লম্বাটে পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি স্কুল বিল্ডিংয়ের কালো কোল্যাপ্সিবল গেটের দিকে, পথটা সিমেন্টের। দু'ধারে রঙন-গাছের গোড়ায় মাটি থেকে উঠে থাকা তিনকোনা ইঁট দিয়ে ফেন্সিং করা। ঠিক কোল্যাপ্সিবল গেটের মুখে ডাইনে-বাঁয়ে দুটো রাস্তা ভাগ হয়ে গেল। বাঁয়ে রাস্তাটা একটু এগিয়েই শেষ, বিল্ডিং সেটাকে খেয়ে ফেলে। ডানদিকের রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলে যায় মাঠের দিকে। আপাতত মাঠে, তবে খেলতে নয়। ঘড়ির কাঁটায় মর্নিং প্রেয়ারের সময়। হেডমিস আর অন্য দিদিমণিরা অপেক্ষা করছেন। বড় বড় গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে পথে, ভোরের রোদ, ঝিরিঝিরি, বুটজুতোয় ধরা দিয়েই মিলিয়ে যায়। ভাবলে মনে হয়, এমন রোদ শেষ ২৪ বছরে আর দেখিনি...


   
"ধন ধান্য পুষ্প ভরা", "আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে", বা জাতীয় সংগীত -- এই ছিল আমাদের মর্নিং প্রেয়ারে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়ার গান। মাঠের লাগোয়া স্কুলে ঢোকার যে কোল্যাপ্সিবল গেট, তার সংলগ্ন নেড়া হয়ে আসা মাঠের অংশে আমরা দশটা সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়াতাম। দশ, অর্থাৎ, পাঁচটা ক্লাস এবং প্রতিটার দুটো করে সেকশন। আবার যে সে লাইন হলে হবে না, লাইনের শুরুতে আমরা দাঁড়াবো, অর্থাৎ বেঁটে মানুষরা, আর তারপর ক্রমশঃ লম্বা হতে হতে সায়ন, দেবজ্যোতিতে গিয়ে লাইন শেষ হবে। এই হুটোপাটি থিতু হলে স্কুলের সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা হেডমিস, স্বপ্না মিস আর সীমা মিস গান শুরু করবেন। আমরা গলা মেলাবো। তারপর গান শেষ হলেই গোপাল দা ঘন্টা বাজাবেন, আমরা খসখস করে জুতো ঘষে হাঁটা শুরু করবো, হেডমিস চোখ পাকিয়ে তাকাবেন, তখন আবার আমরা লক্ষ্মী হয়ে ক্লাসে যাবো --- আমাদের নিত্যকার ক্লাসের রুটিনের আগের রুটিন এটা।
   
যেমন বলছিলাম, প্রত্যেকটা ক্লাসে দুটো করে সেকশন। স্কুলে ঢুকেই বাঁ দিকে উইং-এ ক্লাস ওয়ান আর টু-এর ঘর। ওয়ানের ঘরে বসলে পাশে বাথরুমের গন্ধ উপরি-পাওনা। এ'সব মিলিয়েই সকাল-সকাল খোলা হতো সহজ পাঠ বা কিশলয়। রোজই প্রথম পিরিয়ড বাংলার, হয় ঊর্মিলা মিস, নয় গায়ত্রী মিস, কখনও কখনও স্বপ্না মিসও। এ' সময়ের স্মৃতি এতদিনে বেশ আবছা হয়ে এসেছে। সব কেমন ঘোরের মতো লাগে। সকালবেলা প্রায় ঘুমোতে ঘুমোতেই স্কুলে পৌঁছনো, তারপর ঘুম কাটতে কাটতে তিন-চারটে ক্লাস পেরিয়ে যেত। তারই মধ্যে দুলেদুলে কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি, চৌকো চৌকো ঘর কাটা খাতায় অঙ্কের প্রথম পাঠ, ইত্যাদি। ক্লাস ওয়ান পাস করে টু-তে ওঠার পরেও আমি একদিন ঘুমের ঘোরে স্কুলে ঢুকে অভ্যেসবশে ক্লাস ওয়ানেই বসে গিয়েছিলাম। তারপর ঊর্মিলা মিসের পড়ানো শুনে হঠাৎ "আমি কি তবে ফেল করে গেছি?"-গোত্রীয় একটা অনুভূতি হওয়ায় বুঝলাম, আমার চারপাশে অন্যান্য ছেলে। তখন আবার বকা খেতে খেতে ক্লাস টু-তে গিয়ে বসা।
   
ক্লাসে আমার প্রথম বন্ধু সম্ভবতঃ অভীক। অভীককে মনে রাখার বেশ কিছু কারণ আছে:
এক, অভীকের চেহারাছবি ক্লাস ওয়ান-টুয়ের বাচ্চাদের তুলনায় বেশ সিনিয়র প্রকৃতির। বিশাল বড় কপাল, যে জন্য আমার প্রায়ই মনে হতো অভীকের টাক পড়ে গেছে। রোগা চেহারা, মাথাটা বড়। চোখগুলো ফোলা ফোলা। সেই পাগলা দাশু মনে পড়ে, "শীর্ণ দেহ, খর্বকায়, মুণ্ড তাহে ভারি"। 
দুই, অভীক বাঁ হাতে লিখতো। সে বয়সে, নিজে ডান হাতে লিখি বলে, বাঁ হাতে যে কেউ লিখতেই পারে, এই ধারণাটা আমার ছিল না। তাই, অভীককে বাঁ হাতে লিখতে দেখে খানিক অভিভূত হয়েই বন্ধুতা করেছিলাম।
তিন, এবং মনে রাখার মতোই বটে, অভীক চক খেতো চিবিয়ে চিবিয়ে। এ একেবারে অভূতপূর্ব আমার কাছে। কানাই স্যার বা দিদিমণিরা ক্লাসের শেষে যে ছোটো ছোটো চকের টুকরো ফেলে রেখে যেতেন, সেগুলো ছিল আমাদের কুড়িয়ে নেওয়া অমূল্য রতন। সুযোগ পেলে ওই চক দিয়ে বোর্ডে একটা দাগ কাটা, বা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালে লিখে লিখে মাষ্টার সাজা, এসব আমাদের ফ্যান্টাসি সে' বয়সের; অন্তত আমার তো বটেই। কাজেই, সেই পড়ে থাকা চক সংগ্রহ করতাম সবাইই। অভীক শুধুমাত্র সেগুলোকে নিয়ে এসে, বেঞ্চে বসে শান্তভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতো। আমি তো অবাক!
"তুই চক খাস কেন?"
"বেশ লাগে তো। খেয়ে দেখিস একবার।"
"চক? বেশ লাগে?"
"হুঁ, বেশ।"
সাহস করে একবার একটা চক জিভে ঠেকালাম। কি যে 'বেশ', কিছুই বুঝলাম না। পুরোটা খাওয়ার আর সাধ জাগলো না। অথচ অভীক নির্বিকার। মেইন কোর্সের মতো চিবুচ্ছে। একবার আমাদের কোনো সম্মিলিত বাঁদরামির জন্য ঊর্মিলা মিস "একটাকেও আজ বাড়ি যেতে দেব না" বলে যখন ক্লাসের দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন, আর আমার চোখ ছলছল হয়ে এলো, অভীক "কিচ্ছু হবে না, ঠিক ছেড়ে দেবে" বলে আমাকে একটা চক অফার করলো খাওয়ার জন্য। 
   
ক্লাসের বাইরে, স্কুলে আমার প্রথম বন্ধু তিওয়ারী জী। পঁচাত্তরের ওপর বয়স। ঘিয়ে রঙের ফতুয়া আর ধবধবে সাদা ধুতি পরে, একটা মোটা লাঠি হাতে স্কুলের মেন গেটে বসে থাকতেন। স্কুলের গেট, সে যে-কোনো স্কুলেরই হোক, ভারি এক মোক্ষম জিনিস। স্কুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বোধ হয় স্কুলের গেট। কলেজের গেটের মতো নয়, যে শুধু ঘেরাও করার সময়ে কাজে লাগে। স্কুল-গেট হলো দুই জগতের মধ্যেকার রেখা। একবার ঢুকে পড়লে ও'পারে বাবা-মা-বাড়ি-ফুচকাওয়ালা-আচারওয়ালা। আর এ'পারে শাসন-ক্লাসওয়ার্ক-থাপ্পড়-নীল ডাউন। আর সেই গেট-রক্ষকেরা সবচেয়ে নিষ্ঠুর! এ' হেন ধারণা পোষণকারী আমার চোখে তিওয়ারী জী ছিলেন একদম আলাদা একটা মানুষ। হতে লাঠি, কিন্তু সে লাঠি দিয়ে কাউকে কোনোদিন মারতে দেখিনি, আর তাঁর ফতুয়া-ধুতি’রও কোনও অন্যথা দেখিনি। তিওয়ারী জী হাসলে কপালে, দু’ চোখের পাশে আর গালে অনেকগুলো ভাঁজ পড়তো। ভুরু নাচিয়ে বলতেন, “কি? কিলাসে একা একা লাগে, বাবু?” ওই ভাঁজ-পড়া মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে, আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়তাম। একদিন লজ্জার মাথা খেয়ে বললামও, “বাবা তোমার গালে কি দাগ পড়ে গো!” সঙ্গে সঙ্গে হো-হো হাসি – “বুঢঢা হয়ে গিচি রে বাবু। চিন্তা নেই, তুঁহার মুখে এতো দাগ পড়বে না!” কখনও ওঁর মুখে “তোমার” শুনিনি। সবসময় “তুঁহার”।
     
তবে আমার এই ক্লাস ওয়ানের বন্ধুত্ব ছ’ মাসের বেশি টিকল না। জানুয়ারীতে একদিন ভোরবেলা স্কুলের হেডমিস ক্লাসে এসে বললেন, “তিওয়ারী জী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।” পুরোটা বুঝতে কিছুটা সময় নিলাম। এভাবে কেউ আগে আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি কিছু না জানিয়ে। গতকালও স্কুল ছুটির সময় দেখে গেছি, আমার বুড়ো বন্ধু চৌকিতে বসে পান চিবোচ্ছেন। আমাকে দেখে চোখ টিপে বলেছেন, ‘টা টা’। এর আগে শুনতাম, মানুষ “আকাশে চলে যায়”, “নদীর ও’পারে চলে যায়”। কিন্তু এবার, ক্লাস ওয়ানে ছ’ মাস না পেরোতেই ছেড়ে চলে যাওয়ার স্বাদ পেলাম। হেডমিসের চোখের পলক পড়ল না, এক মিনিটের নীরবতা পালনের পর সবাই যে যার কাজে চলে গেল। আমিও আরও ১০ বছর পড়লাম স্কুলটায়। অনেক বন্ধু পেলাম। তারা কেউ আমাকে ছেড়ে যায়নি আজও। শুধু আমার প্রথম বন্ধু, চৌকিতে বসে পান খাওয়া, ভাঙা ভাঙা বাংলা বলা তিওয়ারী জী আজ ২৪ বছর পরেও আমাকে একইরকম একা করে রেখেছেন। ছেড়ে, চলে গিয়ে।


   
তখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ি খুব সম্ভব, শুনলাম ইস্কুলমাঠের শেষ প্রান্তের লালবাড়িতে ভূত আছে। কেউ বা কারা যেন এসে খবর দিল, তারা শুনেছিল, অনেকদিন আগে লালবাড়ির পিছনের ঝোপজঙ্গলে স্কুলের একটা ছোট ছেলে গিয়েছিল কোনো অজানা কারণে। আর ফিরে আসেনি। শুনতে শুনতে আমাদের চোখ গোলগোল হয়ে আসে, "তারপর? তার ভূত?"
উত্তরদাতার মুখ এত বছর পর আর একটুও মনে পড়ে না। উত্তরটা মনে পড়ে। "না। আমরা সে জায়গাটা দেখতে গিয়েছিলাম বাড়ির পিছনে, যেখানে ছেলেটা হারিয়ে গিয়েছিল আর (নতুন তথ্য হঠাৎই যুক্ত হয়), কদিন পর তার শুকিয়ে যাওয়া বডিটা পাওয়া গিয়েছিল। সে জায়গার ঠিক ওপরে যে জানলাটা, সেদিকে তাকাতেই ..."
আমাদের আর 'কী' জিজ্ঞেস করারও সাহস নেই।
"...তাকাতেই একটা মুখ সরে গেল জানলা থেকে। আমরা চিৎকার করলাম, কিন্তু আর সাড়া নেই। ওদিকে না যাওয়াই ভালো।"
   
সেই থেকে আমাদের গুড ওল্ড লালবাড়ি, স্কুলের শখের জিমন্যাশিয়াম, হল হানাবাড়ি। এতদিন টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসে বসে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দেওয়ার যে চল, বেশ কমে গেল। "ওদিকে না যাওয়াই ভালো" মান্য করে আমরা দলে দলে 'ওদিকে' এক্সপিডিশনে যাওয়া শুরু করলাম। বলা তো যায় না, হয়তো হঠাৎ দেখলাম, জানলায় মুখ কারও। হয়তো ছোট কোনো খেলনা পেলাম জং ধরা। নিশ্চয়ই ওই ছেলেটার। ছেঁড়া বুট জুতো। সেও তার। যে জায়গাটায় ছেলেটা হারিয়েছিল, সেখানে আর সবুজ ঘাস জন্মায় না। সব কেমন মরে গেছে যেন। কাঁচ ভেঙে যাওয়া জানলার সামনে দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ এসে দাঁড়ায় না। ভেতরের অন্ধকার-চাপা ঘরটা খাঁ খাঁ করে। পায়ে চোরকাঁটা ফোটে, লাল পিঁপড়ে কামড়ায়। তবু নড়ে না কেউ। যেন এই চোরকাঁটা, পিঁপড়ের দল বলতে চাইছে, আর এগোলেই বিপদ।
... এ-ই সেই লালবাড়ি, যেখানে ক্লাস নাইনে সরস্বতী পুজোর আগের দিন সন্ধে, রাত অব্দি আমরা পুজোর গোছগাছ করতে করতে আড্ডা মারবো। দেবজ্যোতি, দীপ্যমান, শুভ, পোদ্দার, রাজেশ, স্নেহাশীষ, আমি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হলে যোধপুর পার্ক মিনিবাস স্ট্যান্ডের মোড় থেকে মুড়ি-চপ কিনে আনা হবে। আট-দশজনের গলার দেমাকে লালবাড়ি গমগম করবে...
  
কিন্তু এখন, এই ক্লাস থ্রি-তে, সকাল ন'টা নাগাদ আমরা ভূতের আশায় দাঁড়িয়ে থাকি জানলার মুখে। কোনো মুখ আসে না। শুধু এই এক অনুভূতি আসে, এই বুঝি একটা মুখ দেখা যাবে। মাথার উপরে গাছের পাতায় পাতায় ঘষা লেগে শিরশির করে। এই বাড়ির পিছনে একটা ছোট্ট অংশে থাকে ইস্কুলের কর্মচারী রাজেন দা। রাজেন দা কে ভূতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে রাজেন দা খুব পেটায়!
   
লালবাড়ির পোশাকি নাম জিমন্যাশিয়াম হলেও আসলে সে একটা বিরাট, ফাঁকা হলঘর, সিমেন্টের স্টেজ-সমেত। প্রতিবছর রবীন্দ্রজয়ন্তী আর শিক্ষকদিবসে সেই ঘর খোলা হতো। ছোটখাটো অনুষ্ঠান হতো সে'সব দিনে সেখানে। মাইক লাগত না, কারণ সে' ঘরে যা-ই বলা হয়, গমগম করে, এবং গমগম ক্রমশই ভনভনে পরিণত হয়। এর ওপর মাইক বসালে বোধ করি হীরক রাজার মগজ-ধোলাই যন্ত্রের এফেক্ট আসতো। আর উল্লেখ্য, এই দিনগুলোতে ভূতের উপদ্রব বিশেষ থাকতো না।
   
ক্লাস থ্রি-র রবীন্দ্রজয়ন্তীতে আমি স্কুলে প্রথম আবৃত্তি করি, "আমি আজ কানাইমাস্টার, পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি"। অডিশনের জন্য একটা ক্লাসরুমে একা বসে আছেন সুনেত্রা মিস। বয়স্কা, দীর্ঘাঙ্গী। এতটাই লম্বা যে সামান্য কুঁজোই হয়ে গে'ছেন। চোখে হাই-পাওয়ারের গোল-গোল চশমা, যে চশমার দিকে তাকালে মনে হয়, ওপারে অনেকগুলো চোখ হয়ে গেছে। ভুরু একটু কুঁচকে আছেন, বয়কাট চুল। মিতভাষী। সামান্য খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কোন কবিতা পড়বে?"
দিদিমণির দায়িত্বশীলতা বা স্নেহপরায়ণতা বোঝার বয়স তখন হয়নি। শুধু বুঝি, দুর্দান্ত পড়ান, আর বকেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, "আমি আজ কানাইমাস্টার"।
  
"কাছে এস।"
এলাম।
"এবার বলো শুনি।"
বললাম প্রথম স্তবক।
"আরেকবার বলো।"
আবার বললাম।
"আরেকবার।"
আবার।
  
এবার ভুরু সাংঘাতিক কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। চশমার ভেতর শতকোটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমি ভাবলাম, এই বুঝি হলো আমার রবীন্দ্রজয়ন্তীর প্রাক্কালে সাত দিনের ফাঁসি। প্রশ্ন করলেন, "অনুষ্ঠানের দিনও কি আমাকেই শুধু শোনাবে?"
"না মিস।"
"তাহলে কাদের শোনাবে?"
আমি প্রায় মিইয়ে যাওয়া বিস্কুটের মতো বললাম, "অনেককে।"
"তাহলে আরও গলার জোরে বলো। মিনমিন কোরো না।"
ব্যাস, এটুকুই। আজ অব্দি ভুলিনি। 
  
সময় আরো এগিয়ে যেতে থাকে। স্মৃতি ঝাপসা হয়। কোনো ছবি মনে পড়ে না। শুধু কিছু রং আর শব্দ। মনে পড়ে, আমার খুব প্রিয় ইংরেজি আর অঙ্কের দিদিমণি কাকলী মিস শনিবার স্কুলের শেষে আমাদের মতো কয়েকজন অত্যুৎসাহী বাচ্চাদের নিয়ে যেতেন যোধপুর পার্কের আরেকটা বাড়ির একতলায়। নিজের খরচেই সেখানে ভ্যালু এডুকেশন গোত্রীয় একটি ক্লাস নিতেন। সেখানে বিভিন্ন স্তোত্র শেখানো, গল্পপাঠ, সব হতো।
...২০১৬-এ বন্ধুদের সঙ্গে বারাণসী গে'লাম। ভোর না হতে বেরিয়ে পড়ে আমি আর বিপ্রদীপ ছবি তোলার আশায় ক্যামেরা হাতে কুয়াশা-মাখা ঘাটগুলোয় ঘুরে বেড়াই। কখনও ছবি পাই, কখনও ক্যামেরা বন্ধ রেখে শুধু বুকের খাঁচায় প্রাচীনতা, ইতিহাসকে ভরে নিই। কেদার ঘাটে এসে আমরা থামি। এবার? সকালের চা এখনও পেটে পড়েনি, ঘড়িতে প্রায় সাতটা। "কি রে, একটু চা-বিস্কুট খাই অন্তত, চল", আমি বলি। বিপ্রদীপের ফটোগ্রাফির নেশার কাছে চা হেরে যায়। ও বলে, "চ, আর পাঁচটা ঘাট কভার করে তারপর।" এগিয়ে যায় ও। অগত্যা, আমিও পিছু নিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। কানে একটা আওয়াজ ভেসে আসে। গুঞ্জন। কেদার ঘাটের পাশে কোনো এক ঘুপচি, সূর্যের আলো না ঢোকা বাড়িতে ভোরবেলার গুরু-শিষ্যদের টোল বসেছে। কচিকাঁচারা গুনগুন করে একজোটে সংস্কৃত শ্লোক পাঠ করছে...
  
...ঘোরের মতো আমার মনে পড়ে, কাকলী মিসের সেই শনিবারের ক্লাস। প্রথম ক্লাসে আমরা সবাই সুর করে করে দিদিমণির কাছে প্রভাত-স্তোত্র শিখছি। তখন ছিলাম সবার ভিড়ে একজন। আজ মনে মনে সেই বাড়ির বাইরে বাবা-মায়েদের দলে দাঁড়িয়ে শিশুকণ্ঠে স্তোত্র শুনি,
"করাগ্রে বসতে লক্ষ্মী
করমধ্যে সরস্বতী
করমূলে তু গোবিন্দ,
প্রভাতে করদর্শনম।"

    
আমার প্রথম 'গার্জেন' কল হয় ক্লাস ফোরে। নমিতা দিদিমণির ক্লাসে। নমিতা দিদিমণি ছিলেন অদ্ভুত রকমের ফর্সা, তার সঙ্গে ছিল তার ধবধবে সাদা শাড়ি, আর কুচকুচে কালো চুল (সম্ভবত রং করা)। চোখে সোনালী ফ্রেমের চৌকো চশমা। ছিপছিপে চেহারা। বয়স্কা। টিকলো নাক। মনে রেখে দেওয়ার মতো চেহারা। দেখে প্রথমবারে বাঙালী বলে মনেই হবে না। তখন ইতিহাস বইতে আর্যদের চেহারাছবি, সভ্যতা নিয়ে পড়ছি। নমিতা মিস আমার কাছে ছিলেন 'আর্য'। স্থিতধী বাংলা- শিক্ষিকা।
    
দিদিমণির আমার বাড়িতে খবর পাঠানোর কারণ ছিল বুক ক্রিকেট। তখন সবে সবে আমাদের মধ্যে এই খেলা বেশ জমে উঠেছে। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ ক'দিন আগেই শেষ হয়েছে। আমার ক্রিকেটে হাতেখড়ির বিশ্বকাপ। ওয়ার্নের ঘূর্ণি দেখেছি, শচীনের মার দেখেছি, ব্যাঙ্গালোরে জাদেজাকে ২১ বলে ৪৫ রান করতে দেখেছি। ওয়ান-ডে ক্রিকেট তখন তার ডালপালা বেশ মেলেছে, আস্তে আস্তে সারাবছর ধরে নানারকম টুর্নামেন্ট হয়ে চলার চল বাড়ছে। আর তার সঙ্গে বিক্রী বাড়ছে 'বিগ ফান' বলে এক চ্যুইং গামের। একটা গাম কিনলেই একটা কার্ড ফ্রী। কোনো না কোনো ক্রিকেটারের ছবি, বা একই ক্রিকেটারের অনেক রকম পোজ-ওয়ালা অনেক কার্ড। পিছনের পিঠে তাঁদের কেরিয়ার স্ট্যাটস দেওয়া। এই কার্ড জমানো, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, ব্যাগ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে বার করে বন্ধুদের দেখানো, এবং তারা একটা কার্ড চাইলে (তার বদলে আমাকে তাদের WWF [এখনের WWE]-এর কার্ড দিতে চাওয়া) কোনো মূল্যেই সেই বিনিময়ে রাজি না হওয়া, আর তারিয়ে তারিয়ে তাদের "ইশশ শুভংকরের কালেকশনে এলান ডোনাল্ডের কার্ডটা কী দারুণ!" শুনে আনন্দে আটখানা হয়ে যাওয়া, এইই ছিল আমার স্কুলে মূল কাজ।
  
আর ছিল বুক ক্রিকেট। বিশেষ কিছুই লাগত না। একটা বই, আর কোনো খাতার শেষ দিকের কিছু পাতা। আমি বরাবরই সব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করি, তাই পড়াশুনার জন্য আলাদা খাতা করার আগেই বুক ক্রিকেটের জন্য একটা আলাদা ডায়রী করে ফেলেছিলাম। সেখানে রীতিমতো ৮টা টিম বানিয়ে মিনি ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা হতো। 
   
...ক্রিকেটের সঙ্গে আমার এই সখ্য স্কুলে আমার বাকি দিনগুলোর সমস্তটা জুড়ে থেকে যাবে। একেবারে সবচেয়ে অবাস্তব স্বপ্ন দেখা যে আমি ইন্ডিয়া টিমে খেলবো একদিন -- সে থেকে শুরু করে টিফিন টাইমে ছুটে খেলতে চলে যাওয়া, আর টিফিনের আগের পিরিয়ডগুলোয় স্যারেদের কথা না শুনে লুকিয়ে টিফিন-টাইম ক্রিকেটের স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা, ক্লাস সেভেন নাগাদ "আমি পারবো ক্রিকেটার হতে" বলে উচ্চগ্রামে বাড়িতে ঝগড়া করে ক্রিকেট শিখতে ভর্তি হয়ে যাওয়া, বন্ধুদের নিয়ে বুক ক্রিকেটেও টিম তৈরি করা, জমানো কার্ডগুলোর এক-একটা কোণ দেখেই বলে দিতে পারা কোন খেলোয়াড়ের ছবি এটা, এ-ই ছিল আমার জীবন। এসব করতে গিয়ে আমার পড়াশুনায় অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে সে' সময়, এতটাই, যে ক্লাস টেনের পর আর এই স্কুলেই পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি, কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি আমার এই প্রেম নিয়ে আমি আজও বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই। সবই ভারি স্বপ্নের মতো লাগে। খাতার পাতায় S.T. (Sachin Tendulkar), M.A. (Mohammad Azharuddin), S.W (Steve Waugh), এই লিখে লিখে ক্রিকেট শুরু আমার। বুক ক্রিকেট ...
   
সেই খাতা গিয়ে পড়লো নমিতা মিসের হাতে। ক্লাস নোট নেওয়ার ভান করে রবিন সিং-কে দিয়ে ব্যাটিং করাচ্ছিলাম, বোলারের দিকে সামান্য মনোনিবেশ করতেই কানে মোচড়। তারপর খাতা ধরে টান। মন দিয়ে দেখলেন অনেকক্ষণ। তারপর বললেন, মাকে ডেকে আনবে। তারপর খাতা ফেরৎ দেব। 
    
সেই আমার 'গার্জেন' কলের দীর্ঘ সিরিজের শুরু। ক্লাস সিক্স অব্দি মায়ের সঙ্গে এই অত্যাচার চলেছে। ফাইভে একবার ক্লাসে কথা বলছিলাম বলে সীমা মিস বললেন, বেরিয়ে যা ক্লাস থেকে। বিনা বাক্যব্যয়ে বেরিয়ে গেলাম। ওমা! ক্লাসের পর বললেন, মা-কে ডাকবি। মা আসায় বললেন, আমি ওকে বেরিয়ে যেতে বললাম, আর ও বেরিয়ে গেল, এত সাহস! একবার সরিও বললো না?
যাহবাবা! বেরুলেও সমস্যা, না বেরুলেও সমস্যা! বড়রা এত জটিল হয় না মাঝেমাঝে! ফিরে এসে বড় বড় করে স্কুল ডায়রীতে লিখে রাখলাম, 'সীমা মিস বাজে মিস।'
   
... অন্ধকার হয়ে আসা বিকেলবাড়ির ঘরে বসে সায়নদীপ আমায় জিজ্ঞেস করে, "কখনও স্কুলের ডায়রীর লেখাগুলো বড় হয়ে দেখেছিস?"
"কত বড় হয়ে?"
"এই, এখন।"
কলেজের সেকন্ড ইয়ার আমরা তখন। স্কুলজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার দুঃখ অশেষ, কিন্তু বড় হয়ে যাওয়ার অনুভূতি সেভাবে জারিত হয়নি দেহেমনে সেভাবে। বলি, "দেখিনি রিসেন্টলি। কেন?"
"লেখাগুলোর বয়স কমে যাচ্ছে কেমন ডায়রীতে। ছোটদের গোটা গোটা অক্ষরে লেখা। হোম ওয়ার্ক। পরীক্ষার ডেট। অসুখের মিথ্যে মিথ্যে চিঠি।"
আমি কথা বলি না। সাম্প্রতিককালে না দেখলেও আমার চোখে ভাসতে থাকে লেখাগুলো, সেশনের প্রথম দিন ডায়রী পেয়ে প্লাস্টিকের কভারের উপর সদ্য হওয়া রঙের গন্ধ নেওয়া। নতুন জামার চেয়েও প্রিয় গন্ধ। ভোলা সহজ নয়...
   
ইস্কুলের ডায়রী। দুটো রঙের হত। কোনও কোনও বছর নীল, মানে সেই ২০০৬ এ চ্যাপেল-সাম্রাজ্যে ভারত যখন একধারসে হেরে চলেছিল, তখন ওদের জার্সির রঙটা যেরকম নীল হয়েছিল, ওরকম। আর কখনও ছাই রঙের, মানে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে U.A.E যেরকম জার্সি পরে খেলেছিল, ওরকম। প্রত্যেক বছর ক্লাস শুরুর দিনে গোপাল দা সুতলি দড়ি দিয়ে বাঁধা খান চল্লিশেক ডায়রী ক্লাস টিচারকে দিয়ে যেত। মনিটর আসত, তারপর সব্বার হাতে হাতে ডায়রি দিত সে। তারপরেই কলম বার করে নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, বাবা-মা’র নাম লিখে ফেলা। বাকি বছরে ক’দিন সে ডায়রী ব্যবহার হত, মনে নেই। যে স্যারের ক্লাস একেবারে অসহ্য হয়ে উঠেছে, অথচ না লিখলে পিঠে ঘা পড়বে, তার ক্লাসে হিজিবিজি কাটার জন্য ডায়রী রাখতাম হাতে। বড় হওয়ার পর কারুর কারুর ডায়রীতে ক্বচিৎ কদাচিৎ আলগোছে লেখা মেয়ের নাম পাওয়া যেত। পাওয়া যেত বললে ভুল বলা হবে, রীতিমত খুঁজে বুঝতে হত নামটা, কারণ ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে প্রেমিক নৃশংসভাবে নামটা কেটে দিয়েছে লিখেই। নামটা বুঝতে পারা গেলে গোটা ক্লাসের 'বৌদি'-আবিষ্কারের সে কি উল্লাস!
   
আর ডায়রী লাগত শরীর খারাপ হলে। খেলা দেখা, ঘুরতে যাওয়া, ইস্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না, ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। সবকিছুর জন্য অভিভাবকের লেখা গম্ভীর চিঠি, “শুভঙ্করের জ্বর (পেটব্যথা/মাথাব্যথা/সর্দিকাশি) হওয়ায় দু’দিন যেতে পারেনি।” ডায়রী নিয়ে ক্যালপল-খাওয়া মুখ করে গিয়ে স্যরের সামনে দাঁড়াতাম। আর একটা বড় সাংঘাতিক কলাম ছিল ডায়রীতে। অভিভাবকের উদ্দেশ্যে ছাত্র সম্বন্ধে শিক্ষকের বক্তব্য। “গুরু কি ছেলে বানিয়েছেন, ক্লাসে তো ফাটিয়ে দিচ্ছে”- এই মর্মে কোনোদিনই সেই বক্তব্য লেখা হয়নি, বলাই বাহুল্য। কড়া শব্দে লেখা হত মাঝেসাঝে, হয় গার্জেন কল, নয়তো সতর্কবাণী। অভিভাবককে দিয়ে সই করিয়ে আনতে হবে। আমার ডায়রিতে একবার মিস লিখেছিলেন, “শুভঙ্কর কোনোদিন ক্লাসে হোম-ওয়ার্ক করে আনে না।” ভেবেছিলেন খুব বকা খাবো বাড়িতে। হি হি।



মর্নিং সেকশন শেষ হয়ে আসে। মর্নিং স্কুলের সবচেয়ে উঁচু দুই ক্লাস হলো ফোর আর ফাইভ, তার ডেস্কে-বেঞ্চে বসে অফ পিরিয়ডে বেঞ্চ বাজানোর শুরু, হাতে হাতে টিনটিনের বই ক্লাসময় ঘোরা। আমার কাছে 'চাঁদে টিনটিন' তো ওর কাছে 'তিব্বতে...', আনন্দ পাবলিশার্সের ৭৫ টাকার বই। ৬৩টা পাতা থাকতো; কোনো-কোনো গল্পে ৬১। গর্বে ফুলে ফেঁপে ক্লাসে সে বই নিয়ে এসে প্রথমে ব্যাগ থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে বন্ধুদের দেখানো, তারপর ডেস্কের ওপরে পাঠ্য বই রেখে, নিচে নিজেদের কোলে টিনটিন রেখে ক্লাসের মাঝেই পড়তে শুরু করা। অতএব, যা ভবিতব্য, তাই! সামনে পাটিগণিতের তৃতীয় অধ্যায়ে অত্যন্ত কঠিন কিছু সমস্যার উত্তরে ক্যাপ্টেন হ্যাডক বলিলেন, "বেল্লিক, ছুঁচো, প্ল্যাটিপাস, টেরাডাকটিল, এসব আমি হতে দেব না! কভি নেহি!", আর আমরা খিলখিলিয়ে গড়াগড়ি। তারপর ধরপাকড় ও শাস্তি। তবে আনন্দের বিষয়, কোনো দিদিমণি কোনোদিন টিনটিন বাজেয়াপ্ত করে রাখেন নি। বড় অমূল্য ছিল সে'সব বই। এখনকার স্মার্টফোন সে মর্ম বুঝবে না। কোনো বন্ধু পড়ার জন্য ক'দিন নিতে চাইলে প্রথমে তাকে দিয়ে 'প্রমিস' করানো হতো, বইতে যেন একটা আঁচড়ও না পড়ে। তারপর ফেরৎ পেয়ে যদি দেখা যেত মলাটের এক কোণে ভাঁজ, বা ৫৯ নম্বর পাতার শেষে একটা কালির দাগ, বই দেওয়ার ব্যাপারে চিরতরে তাকে ত্যায্যবন্ধু করা হতো।
   
এই দু' বছরে স্মৃতি যত স্পষ্ট হয়, শুধু চোখের আড়ালে কথা চালাচালি, আর হাহা-হিহি কানে ভাসে। উপেন্দ্রকিশোরের 'ছোটদের মহাভারত' ছিল পাঠ্য। সেখানে কোন এক শিশু তার আধো আধো বোলে পিসিকে 'পিতি, এই পিতি' বলে ডাকছে, এদিকে rapid reader হিসেবে সে জায়গাটা পড়তে দেওয়া হয়েছে সৌরভ (মুখার্জি)-কে। সৌরভ প্রতিবার ওই অংশে পৌঁছে হাসির ঠেলায় আর পড়তেই পারে না। গোটা ক্লাস হাসে ওর সঙ্গে। আর স্বপ্না মিস ততোধিক গম্ভীর মুখ করে বলেন, আবার পড়ো একটু আগে থেকে। আবার শুরু করে আবার হাসি।
বা সীমা মিস ক্লাসে "ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে" পড়া মাত্র আমরা মুখ দিয়ে শোঁ-শোঁ করে ঝড়ের আওয়াজ করে উঠি। দিদিমণি ধমকে ওঠেন, "একদম আওয়াজ নয়!" সবাই থেমে যায়, আমি গদাইলস্করী চালে তখনও করে চলেছি ঝড়। "গার্জেনকে ডাকবি তুই কাল।"
মায়ের সঙ্গে ফেরার সময় দিব্যি চেপে গিয়েছিলাম ব্যাপারটা, হঠাৎ স্কুলভ্যানের মধ্যে থেকে ছোটু বিভীষণের মতো চিৎকার করে উঠলো, "কী রে, কাকিমাকে বলেছিস তো, কাল দেখা করতে হবে?" এদের ভগবান কেন কথা বলার শক্তি দিয়েছিলেন, কে জানে!
   
শনিবার ফার্স্ট পিরিয়ড কাকলী মিসের। 'শুনে অঙ্ক' ক্লাস। যারা পারে, তাদের কাছে নাকি সে এক ভারি মজার ক্লাস! আমি তো দেখেই পারি না, তার আবার শুনে! সামান্য "ষোলো যুক্ত ষোলো কত হয়" বললেই আমার "ওরেবাবা এবার আমি এই দুটো ষোলো নিয়ে কি করবো হায় হায়" ধরণের অবস্থা হতো। 'শুনে অঙ্ক'র রাজা ছিল কৌস্তভ আর তনজিৎ। কাকলী মিসের প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগে তাদের উত্তর বেরুতো। আমি একবার ওদের মুখের দিকে তাকাতাম, একবার আমার খাতার দিকে! একটা উত্তরও তো মিলছে না। যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ নিয়ে হাতে পায়ে জড়িয়ে পড়ে যাওয়ার দশা, উদ্ভট সব উত্তর বার করা, কিন্তু আমার খাতায় আমার এই সব অরিজিনাল অঙ্কের উত্তরে কাকলী মিস একটাই সংখ্যা ব্যবহার করতেন। 0।
   
মশার জ্বালায় গেলুম বনে, বাঘে দাঁত ঝাড়ে! অর্থাৎ, দিদিমণিদের থেকে পালিয়ে বাঁচতে গিয়ে দেখি, খাতা হাতে মনিটর দাঁড়িয়ে। প্রথমবার শাসন, দ্বিতীয়বার কথা বললে নাম তুলে নেবে খাতায়। তারপর যদি আধঘন্টা চুপ করে থাকতে পারি, নাম কেটে যাবে। কিন্তু তা না করে যদি আরো কথা বলতে শুরু করি, তাহলেই নামের পাশে স্টার। এবং সোজা দিদিমণির হাতে। অথচ, কি মুশকিল! তখনই আরো নতুন নতুন বন্ধু হচ্ছে! একবার একটা অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করে নেমে আসছি, একটা গোলগাল ছেলে এসে হ্যান্ডশেক করে বলে গেল, "দারুণ বলছিস!" নাম জানলাম, সায়নদীপ। এত সামান্য একটা আবৃত্তিতে এমন মনভরানো প্রশংসা -- এ'সব বন্ধুকে কি ছাড়তে আছে? কাজেই, আলাপ শুরু। বাক্য বিনিময়। বাক্যালাপ শুরু। এবং মনিটরের খাতায় নাম। মনিটর বেশির ভাগ সময়েই স্নেহাশীষ। ওকে মনিটরের বদলে ম্যান-ইটারও বলতাম আমরা। কিন্তু বাওয়া, ঘুঁষ তো সর্বত্র! এ' হেন স্নেহাশীষকেও বাগে আনতে অব্যর্থ দাওয়াই ছিল সিগারেট লজেন্স! আমাদের মর্নিং সেকশনের শেষ ম্যাজিক!
   
লাল বাক্স। লম্বা লম্বা দশটা মিন্টের কাঠি। প্রত্যেকটার সামনে লাল রঙ মাখানো। তখন ক্লাস ফোর। টিফিনে আমি যখন সোনামুখে পাঁউরুটি খেতে ব্যস্ত, দেখলাম বন্ধু কি অসামান্য কেতায় ঠোঁটে এই বিচিত্র জিনিসটি ঝুলিয়ে বসে আছে বাইরের দিকে তাকিয়ে। তাকাচ্ছেই না আমাদের দিকে। কয়েকজন ঘিরে ধরে বললাম, কি রে এটা? 
জিনিসটা দু' আঙুলের ফাঁকে ধরে বন্ধু আমাদের দিকে তাকিয়ে ফুরফুরে একটা ফুঁ দিল। একটা বেশ ঠান্ডা, মিষ্টি গন্ধ এল নাকে। ধোঁয়া টোঁয়া নয়। তারপর গলা নামিয়ে বলল, সিগ্রেট। সন্তর্পণে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে লাল বাক্সটা বার করে এনে দেখালো। বাক্সের গায়ে সরল মনে লেখা, "ফ্যান্টম মিন্ট ক্যান্ডিস্টিক", আর অরণ্যদেবের ছবি দেওয়া। বাক্স খুলে দেখতে দিল না কোনোমতেই, বলল সিগ্রেট উবে যাবে। অনেক ঝোলাঝুলি করায় নিজের মুখের স্টিকটাই বার করে আমাদের এগিয়ে দিয়ে বলল, "জাস্ট একটান করে, ওকে?"
    
সিগারেট লজেন্সকে আমরা লজেন্স বলতাম না কখনও। বলতাম সিগ্রেট। বড় হওয়ার ঝাঁঝালো, মিষ্টি স্বাদ। বাবার কাছে যখন আব্দার করতাম, তখন অবশ্য "পেপারমিন্ট লজেন্স" বা "মিষ্টি স্টিক" গোছের সুবোধ-বালক মার্কা নাম বলতাম। অফিস-ফেরৎ বাবা কখনও-সখনও ধর্মতলা গেলে ফেরার পথে নিয়ে আসত সেই লাল বাক্স। তারপর স্কুলে নিয়ে যাওয়া, বন্ধুদের দেখিয়ে আরো তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া, স্নেহাশীষকে বলা, আজ তোর জন্য একটা স্টিক আছে, নামটা কেটে দে প্লিজ! গল্প করি? স্বাদ যত না লজেন্সের, তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি বড় হওয়ার নিষিদ্ধ ইশ্তেহারের আদলে গড়া জিনিস ঠোঁটে ছোঁয়ানো।
       
আমাদের এই সিগ্রেট-জোয়ার চলেছিল বছর খানেক, ডে সেকশনে যাওয়ার আগে অব্দি। তারপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর খেয়াল রাখিনি সিগারেট লজেন্স আর পাওয়া যায় কিনা ধর্মতলায় বা গড়িয়াহাটে। হাতখরচের টাকা পাওয়ার পর এ জিনিস কেনার ইচ্ছে আর হয়নি। তদ্দিনে বড়বেলা এল বলে। সে ভালোই হয়েছে একদিকে। বড়বেলার অনেক কিছুই খারাপ; শুধু প্রথম বড় হওয়ার এই স্বাদটুকু ভালো। সে শুধু ঐ সময় জুড়েই থাকুক না হয়। লাল বাক্স, ফ্যান্টমের প্রোডাক্ট। সিগারেট লজেন্স নয়; সিগ্রেট। হোক না কিটকিটে, হোক না মেকি আগুন, হোক অরণ্যদেব-ছাপ, আসল কথা হল ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে ফেলুদার মতো ভুরু কুঁচকে পাশের লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা বন্ধুকে বলব, "ভালো লাগছে না রে তোপসে! কোথায় যেন একটা খটকা..."


   
মাঝেমাঝে বেশ কিছুদিনের বাধা পড়ে যায়। যে স্মৃতিকথা লিখব বলে শুরু করেছিলাম, সে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বড়বেলার আজেবাজে কাজের ভিড় ছোটবেলাকে শাসিয়ে যায়, সময় নষ্টের বড় একটা সময় নেই! কিন্তু, বেশ কিছুদিন পর, কোনো এক বিকেলে, এই দুত্তোরছাই বড়বেলার হামদো-মামদো কাজেরা যখন জিরোচ্ছে অল্পক্ষণ, আর আমিও একটুখানি সময় পেয়েছি ট্রেনের বাইরে তাকিয়ে দেখার যে একমাঠ রোদ্দুরক্ষেতে কেমন শেষ শ্রাবণের বৃষ্টি পড়ছে, ওমনি সে এসে হাজির। ইস্কুলবেলা। বড়বেলার হুজ্জতিতে সে হারিয়ে যায়নি; গা-ঢাকা দিয়ে বসেছিল কেবল।
   
মর্নিং সেকশন ছাড়ার আগে সীমা মিসের কাছে শেখা শেষ রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল 'আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়'। তখন 'নীল আকাশে কে ভাসালে'-কেই ভারি উঁচু স্কেল ঠাহর হতো, আমাদের সরু গলা ভেঙে যেত 'সাদা মেঘের ভেলা'তে পৌঁছুনোর আগে। অতঃপর, বাঁ হাতে বেলো করতে করতে ডান হাতে স্কেলের এক ঘা।
   
ডে-সেকশনে উঠে মনখারাপ হতো। মর্নিং সেকশনে ক্লাস ফাইভের দাদা হয়ে চরে বেড়ানোর মধ্যে যে একটা ব্যাপক গর্ব ছিল, ক্লাস সিক্সে উঠে পুনর্মুষিক: ভব:! ডে-সেকশনের সবচেয়ে কচি ক্লাস। ক্লাস ৯-১০-১১-১২ এর লোকজনেরা আমাদের কেমন দেখেও দেখছে না। অবজ্ঞার শেষ কথা। তার উপর প্রথম ক্লাস, মা গো মা, ঊজ্জ্বল বাবুর।
এলেন।
রেজিস্টার রাখলেন।
বসলেন।
ঘড়ি আর চশমাটা খুললেন।
প্রথম কথা, "মনে রেখো, দিদিমণিদের চেয়ে দাদামণিদের হাতের জোর অনেক বেশি!"
ফার্স্ট পিরিয়ড, একটু আগেই বাড়ি থেকে সব সেরে এসেছি, তবু আমার প্রচন্ড জোরে হিসি পেতে শুরু করলো, মনে হতে লাগলো, কেউ আমায় ফেল করিয়ে ক্লাস ফাইভে পাঠিয়ে দিক আবার, দাদামণিদের হাতের জোর দেখে আমার কাজ নেই।
   
ঊজ্জ্বল বাবু ক্লাসে মনিটরের দৌরাত্ম্য বাড়িয়ে দিলেন। নাম লিখে তাঁর হাতে একবার দিলে আর ছাড়া নেই। তাঁর চড় ছিল বহুবিদিত, সেই চড়ের শব্দেই আমাদের গাল জ্বালা করতো, যে খেতো, তাকে বন্ধুবাৎসল্যে কখনো জিজ্ঞেস করিনি, "কেমন লাগলো?" ভালোই লাগবে, জানা কথা। 
একবার আমার নাম মনিটর মারফৎ গেল তাঁর হাতে। নাম ধরে ডাকলেন। আঙুলে তখন একটা খেলনা আংটি পরতাম, বাবাকে আংটি পরতে দেখে খুব সাধ হয়েছিল। আমার নাম ডাকামাত্র আমি তো আংটি খুলে রেখে, শেষ মুহূর্তের জন্য তৈরি হচ্ছি। ভাবছি, জিজ্ঞেস করা হবে কিনা, কোনো শেষ ইচ্ছা? কিন্তু তারপর দেখলাম, থাপ্পড় অব্দি না গিয়ে গার্জেন কলের পথে চলে গেলেন। আমিও গালে এন্টিসিপেশনের চিনচিনে ব্যাথা নিয়ে বেঁচে ফিরে এলাম।
   
তবে অভয় দেওয়ার মানুষও ছিলেন। সোমনাথ বাবু। হালিশহরে বাড়ি, তাই স্কুল ছুটি হলেই ছাত্রদেরও আগে হনহন করে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতেন ট্রেন ধরার তাড়ায়। প্রত্যেকদিন হাফশার্ট গুঁজে পরা, একটু খাটো ফরমাল ট্রাউজার, গোড়ালির ওপর অব্দি। চোখে ফটোক্রোম্যাটিক চশমা। ক্লাসে এসে অঙ্ক করতে চক হাতে তুলে নিলে অঙ্ক ছাড়া কিছু জানেন না। প্রতিটা স্টেপ কেন করা হচ্ছে, স্টেপ জাম্প করার কুফল, ক্লাসের অঙ্কে গোল্লা পাওয়া ছেলেদের আলাদা করে বোঝানো, সব সামলাতেন বরফের মতো ঠান্ডা মাথায়। আর চক রেখে দিলে বন্ধু। রোজ কাউকে না কাউকে তুলে তার বাড়ির গল্প শোনা, মজার দু একটা গল্প বলা। এমনকি, ক্লাসে ঝামেলা লাগলেও মিটমাট করতে যাওয়া হতো সোমনাথ বাবু নামক আদালতের কাছে।
   
ভরসার মানুষেরা, পাশে থাকা মানুষেরা আরো আসবেন। চিনবো আস্তে আস্তে। আপাতত এটুকুই। ক্লাস সিক্সে প্রথম দিন তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গিয়েছিল, কারণ তুষার বাবু সেদিন রিটায়ার করলেন। মাঠে একটা ছায়ায় দাঁড়িয়ে তাঁকে ফেয়ারওয়েল দেওয়া হলো। চিনিনা তাঁকে। শুধু দেখলাম, দূরে দাঁড়িয়ে উঁচু ক্লাসের দাদারা কাঁদছে। মনে হলো, এক ভরসা, এক ছায়া বোধ হয় চলে গেলেন। বড় হওয়ার পথে।


২০০০ সাল। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের দায়ে নির্বাসিত হলেন আজহারউদ্দীন। ক্যাপ্টেন হলেন সৌরভ। তখন ক্লাস সেভেন। ইস্কুলে চাপা উত্তেজনা। সৌরভকে ক্যাপ্টেন করে দিল? পারবে তো? যদি না পারে? তাহলে তো শচীনের অন্ধ ভক্তরা মাথা চিবিয়ে খাবে! স্কুলের L-শেপের দুটো উইংয়ের যেদিকে সিক্সের ক্লাস ছিল, অন্যদিকে সেভেন-এইট। ক্লাস থেকে সোজা খেলার মাঠ দেখা যায়। অফ পিরিয়ডে বেঞ্চে বেঞ্চে আলোচনা, সৌরভ দলে কি কি চেঞ্জ আনতে পারে! এবার শালা কাম্বলিকে বসাক। প্রচুর সুযোগ পেয়েছে! আচ্ছা, আবারও কি শ্রীনাথ-প্রসাদ? একে একে উঠে আসছেন যুবরাজ, কাইফ, জাহির, শেহবাগ, হরভজন। ইন্ডিয়া ডাইভ দিতে শিখছে। আমরা শিখছি algebra! এতদিনে প্রথমবার মনে হচ্ছে, ১১টা লোক ওই নীল জার্সিটার জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছে! পারছে না অনেক সময়ই, হেরে যাচ্ছে, চাপের মুখে যা-তা ভাবে ছড়িয়ে ফেলছে, কিন্তু ওই নীলটাকে ভালোবেসে খেলছে! ক্লাসে সুজিতবাবু শুরু করছেন সুলতান যুগ।
   
আমার ছোটবেলার ঘড়ি ছিল ক্রিকেট দিয়ে বাঁধা। ঘড়িতে দুপুর দেড়টা দেখলে মনে হতো, মেলবোর্নে বুঝি একটা দিনের খেলা শেষ হলো, ঠিক দু'ঘন্টা পর এজবাস্টনে শুরু হবে ইংল্যান্ড-সাউথ আফ্রিকা টেস্ট। সন্ধে সাড়ে সাতটায় গায়ানা থেকে দেখানো হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর পাকিস্তানের দ্বৈরথ। সমুদ্রের ফুরফুরে হাওয়া দেবে, সেখানকার মানুষেরা আনন্দে শাঁখ বাজাবে। ভূগোলে দ্রাঘিমারেখা অনুযায়ী সময় বদলে যাওয়ার অঙ্ক আমার এভাবে শেখা। স্কুলের ঠিক পাশে, যেখানে যোধপুর পার্কের পুজো হয়, সেখানে বাকি বছর বৃহঃস্পতি, শনি আর রবিবার করে ক্রিকেট শেখানো হতো। ভর্তি হলাম। ওই নীলের জন্য খেলব। খেলবই।
   
সাগরবাবু থাকতেন পাশেই। খেলা নিয়ে আমার পাগলামি দেখে বাবাকে বললেন, একটু ধরে রাখবেন। পড়াশুনোটা না মার খায়! আর শিক্ষকের মুখের বাণী! না ফলে যাবে কোথায়! হাফ-ইয়ারলিতে অঙ্কে লাল দাগ। বলে রাখা ভালো, ক্লাস সেভেন থেকে টেন, এই যে ক'বছর আমি স্কুলে ছিলাম, একমাত্র টেনের টেস্ট পরীক্ষা আর মাধ্যমিক বাদ দিয়ে, প্রতিবছর নিয়ম করে হাফ-ইয়ারলি আর অ্যানুয়ালে একটা করে বিষয়ে ফেল করে গে'ছি। কখনও অঙ্ক (বেশির ভাগ সময়ই), কখনও ভূগোল (চন্দন বাবুর হাতে), কখনও ফিজিক্যাল সায়েন্স। এমনকি, আমার ক্লাস সেভেন থেকে এইটে ওঠার মার্কশিটে লিখে দেওয়া হয়েছিল, "promoted on consideration"! কে এমনভাবে দয়াপরবশ আমাকে কনসিডার করলেন, জানা হয়নি। কিন্তু এত লাল দাগ, এত খারাপ রেজাল্টের ভয় আমাকে একটা জিনিস থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ক্রিকেট।
   
আমার প্রথম ব্যাট DSC কোম্পানির। সাবা করিম এই কোম্পানির ব্যাট ব্যবহার করতেন; কাজেই খুব লোভনীয় ব্যাট ছিল না। তাই বন্ধুরাও বিশেষ দেখি-দেখি করে টানাটানি করতো না। অন্যদিকে কেউ MRF লেখা ব্যাট নিয়ে এলে "উইশালা শচীন" বলে বলে ব্যাটে হাত বুলিয়ে "দেখি সর আমি ব্যাট করবো, দেখি ইঁট দিয়ে একটা বল কর তো, এটা তো শচীনের ব্যাট, শক্ত ব্যাট" করে প্রথম দিনের শেষে মোটামুটি সেই ব্যাটকে ভেন্টিলেটরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। আমার ব্যাট নিরীহ, সাবা করিম। ক'দিন পরেই কুম্বলে অন্ধ করে দেবেন। কেউ বিশেষ টানাটানি করতো না। তাকে নিয়ে এসে আমি রেখে দিতাম ক্লাসে টিচারদের প্ল্যাটফর্মটার নিচে। তারপর টিফিন পিরিয়ডে সেই ব্যাট বার করে চোঁ দৌড় মাঠে ক'জন মিলে, জায়গা দখলের লড়াই। তারপর দেড়টা থেকে দুটো, আধঘন্টা চুটিয়ে ক্রিকেট। তখন ক্লাস এইট, একদিন প্রদীপ বাবু ক্লাস নিচ্ছেন। টিফিনের আগের পিরিয়ড। আমি বেঞ্চ থেকে এক পা বার করে রেডি। ঘন্টা পড়তেই উঠে, ব্যাট বার করে ছুটতে যাবো, চুলের মুঠি ধরে টান, তারপর ধাঁই-ধাঁই কিল! "স্যার বেরোনোর আগে ক্লাস থেকে বেরোতে নেই, এটুকু জানিস না?"
   
এরকম ছিল আমাদের জানা তখন। ছোটো ছোটো। সিলেবাসের বাইরে জানা, প্রতিদিনের জন্য জানা। ওই চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে, কানে মোচড় দিয়ে, জুলপি রাখলে সেই জুলপি ধরে টেনে, চড় মেরে, ধমকে, স্কেলপেটা করে এই নিত্যকার জানিয়ে দেওয়াগুলো তখন ভারি রাগিয়ে দিত, কিন্তু এই এখন, এতদিন পরেও দেখি, তার মধ্যে কোথাও আমাদের ভালো করে তোলার সদিচ্ছা ছিল বলে, আমাদের জন্য আদর ছিল বলে, কথাগুলো মনে রয়ে গেছে। চাকরিতে ঢুকে একটা কাজ না হলে বাকিদের ওই ঠোঁট চেপে বলা, "জানো তো না, পলিটিক্সটা কি!" আসলে কিছুই জানায় না। শুধু বলে যায় যে, তুমি জানবেও না। স্কুল ছাড়ার পরেও কয়েকবার প্রদীপবাবুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়েছে, পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছি, একইভাবে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছেন, আর প্রতিবার আমার মনে পড়ে গেছে, স্যার না বেরোনো অব্দি বেরোবো না কোনোদিন ক্লাস থেকে...
    
ক্লাস সেভেনে দীপ্যমানের হাত ভাঙল। দিনের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে সবাই খেলছিল আমগাছের ছায়ায়। হঠাৎ হইহই। দীপ্যমান বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল। তারপর উঠে অমরকে (অমরনাথ) বলে, "আমার হাতটা না, একটু ভেঙে গেছে"! সেই 'একটু' ভেঙে কব্জি আর কনুইয়ের মাঝখান থেকে প্রায় ঝুলতে থাকা হাত নিয়ে যাওয়া হলো ডাক্তারের কাছে। ডান হাত। লেখার হাত। সামনে হাফ-ইয়ারলি। টিচাররাই চিন্তা করতে শুরু করলেন, কিভাবে কি করা যায়! তেমন হলে রাইটার নেওয়া যায়, কিন্তু রাইটার হবেটা কে? সবারই তো পরীক্ষা থাকবে! দীপ্যমান এক মাসের ছুটিতে চলে গেল। এই ঘটনা মনে রেখে দেওয়ার কারণ একটাই। এক মাস পর দীপ্য যখন ফিরে এলো, ডান হাতে প্লাস্টার নিয়ে, তখন ওর বাঁ হাত ডান হাতের মতোই চলছে। ঝরঝরে লেখা। লাইন বাঁকছে না। থমকানো নেই। অবাক হয়ে দেখছি। বইয়ের পাতায় তখন 'পথের দাবী'; আর সামনে আমার দেখা প্রথম সব্যসাচী!
    
সাগরবাবু ক্লাসে গন্ডগোল হলে সবজির নামে আমাদের বকাঝকা করতেন, 'লাউ', 'পটল', 'করোলা', সে এক মজার ব্যাপার! বকা খেতে লোকজন আকুল! লাইফ সায়েন্সের সঙ্গে সঙ্গে বোটানিক্যাল গালাগাল খেয়ে হাহাহিহি। সজলবাবুর অঙ্ক ক্লাসও সেভেনেই পেলাম। ক্লাসে দুজনের জন্য তিনি ডাকনাম ব্যবহার করতেন। অয়ন বাগচী, সে বেচারা আমার চেয়েও কম অঙ্ক বুঝতো বলে স্যার তার নাম রেখেছিলেন 'গোবিন্দ', আর আমার সাংঘাতিক অঙ্কবিদ্যার প্রতি ভরসা হারিয়ে শুভংকরকে করে দিয়েছিলেন 'ভয়ঙ্কর'। আজও তা বিদ্যমান। মাস কয়েক আগে সাউথ সিটির পাশের রাস্তায় দেখা। "এ কী, ভয়ঙ্কর, এদিকে কি মনে করে!" আর অতি অবশ্যই বলা দরকার, ক্লাস সেভেনে পেলাম প্রিয়তোষ বাবুকে। বাংলা শিক্ষক এবং শিক্ষকতা, দুয়েরই ধরণ ভেঙে দেওয়া। লম্বা, ছিপছিপে মানুষটি, ডেনিম আর ফুলস্লীভ শার্ট, ফ্রেঞ্চ কাট। প্রথম ক্লাসে ভাব সম্প্রসারণ দিলেন। এতদিন 'সবার উপর মানুষ সত্য' আর 'যে জন দিবসে মনের হরষে' আর 'নদীর এ'পর কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস' করে অভ্যস্ত ছিলাম। এবার চমকালাম। লাইন এল, "আমি চাই পুকুর বোজালে আকাশ ভাসবে চোখের জলে/ আমি চাই সব্বাই যেন দিনবদলের পদ্য বলে"! সুমনের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ প্রিয়তোষ বাবুর হাত ধরে।
     
ফেব্রুয়ারি ২০০১। ক্লাস সেভেন শেষ হয়ে আসছে। স্টিভের অস্ট্রেলিয়া ভারতে এসেছে তিন টেস্টের সিরিজে। বম্বেতে ভারতকে হারিয়ে একটানা ১৬ টেস্টে জয়ী। ইডেনে ফলো অন করছে ইন্ডিয়া। ধুঁকছে। সামনে পরীক্ষা। তাই বাড়িতে কেবল লাইন কাটা। সকালে লঞ্চের আগের সেশনটা, আর বিকেলে পোস্ট-টি সেশনটা দুরদর্শনে দেখা যায়। তাইই দেখি। ঘাম শুষে নেওয়ার কাপড় ঘাড়ে জড়িয়ে লক্ষ্মণ আর দ্রাবিড়ের লড়াই। শেষদিনে রান তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ভেঙে পড়া। অঙ্কের দুটো চ্যাপ্টার এখনও ধরা বাকি, গুলি মারো! সৌরভের ভারত স্টিভকে থামিয়ে দিচ্ছে! ম্যাকগ্রা একচোখ অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে আম্পায়ার সুব্রত পোরেলের দিকে। ফলো অন করে একটা দল ম্যাচ জিতে গেল, বুক চিতিয়ে ক্লাব হাউজের দিকে ওরা সবাই ফিরছে। আবার আমার মনে হচ্ছে, এভাবে দেশকে আগে ক্রিকেট খেলতে দেখিনি। ওই নীলের জন্য খেলছে। ওই নীলকে ঘিরে অসম্ভব ভালোবাসা, অভিমান। আবার আমার মনে হচ্ছে, একদিন আমি খেলবো, ওই নীলের জন্য। আবার সুজিতবাবু ক্লাসে ইতিহাসের পাতা খুলছেন, ইংরেজরা ঢুকে পড়ছে আস্তে আস্তে ভারতে। আমার সেই নীলের জন্য খেলা হয়নি। আমাদের অনেকেরই আর খেলা হয়নি, খেলা হয়ে ওঠে না। যে যার মতো একটা ঘর বেছে নিয়েছি জীবনে, তার মধ্যে কাজ করে চলেছি। নীলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই আত্মাভিমানের ছিটেফোঁটাও এ'সব কাজে নেই। দেশাত্মবোধ থেকে আমরা বহুদূরে। দেশের কাজ থেকে বহুদূরে। কিন্তু ওই যে ভেবেছিলাম! একদিনের জন্য হলেও ভেবেছিলাম, ওই নীলের জন্য খেলবো। ওইটুকু আমার দেশ। সেটা যে ঠিক কেমন অভিমান, ধরতে পারিনি, কি ছিল এই নীলের জন্য খেলার পিছনে, জানি না, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ঢুকে যেতে যেতে চোখে ভাসে, বিরাট জলাভূমিতে বিকেল হয়ে আসছে, ঘোলাটে সূর্য মেঘে মিশে যাচ্ছে, বিসমিলকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে ইংরেজ সেনা, বিসমিল হেরে যেতে যেতেও তুড়ি মেরে জিতে গেলেন, ভালোবাসার জন্য মরছেন বলে! ওইটুকু এখনও জ্বলজ্বল করে। ইতিহাস আর ক্রিকেট এক হয়ে যায়, আমার ইস্কুলে।


ইস্কুলের খুচরো-খাচরা গল্প মনে পড়তেই থাকে। মনে পড়ে, স্কুলজীবনের একটা বিরাট সময় জুড়ে আমাদের কাজ, মানে রীতিমতো সিরিয়াস কাজ ছিল টিচারদের নকল করা। এ' বিষয়ে সায়নদীপ আর আমি বরাবরই অগ্রণী ভূমিকায় থাকতাম। বর্ষাকালীন টিফিন টাইমে, বা অফ পিরিয়ডে ছোট ছোট স্ট্যান্ড-আপ কমেডি আমাদের সেই তখন থেকেই। সজল বাবু ঠিক কিভাবে অয়নকে "গোবিন্দ" বলে বকেন, কেমন হবে প্রিয়তোষ বাবু বা অরূপ বাবুর বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, আবার রেগে গেলে সেই অরূপ বাবুই, সেই ছোটোখাটো মানুষটি, কেমন গলায় এমপ্লিফায়ার বসিয়ে রাগারাগি করতে থাকেন, দীপঙ্কর বাবু কেমন অল্পতেই রেগে গিয়ে দাঁত চেপে চেপে কথা বলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নিয়ে বলতে গেলে আরও অনেক 'পড়া-পড়া খেলা' পেরিয়ে যাবে, কথা শেষ হবে না। তবে, এখন এটাও মনে হয়, স্যরদের খুঁটিনাটি নকল করায় বন্ধুদের মধ্যে যে খিলখিল, হাহাহিহি, সবই খুব ব্যক্তিগত। ফেসবুকে আমার স্কুলের বাইরের যে-সব বন্ধুরা পড়ছেন এই লেখা, তাঁদের হয়তো অপরিচিতির কারণে এত গভীরে এ'সব পড়তে ভালোলাগবে না। তবে এটুকু বলি, একদিন শেষ পিরিয়ড বায়োলজি। স্যর আসেননি। ক্লাসে বন্ধুদের সম্মিলিত অনুরোধে আমি টিচারের প্ল্যাটফর্মে উঠে সেই চেয়ার টেবিলে বসে বাংলার সুরেশ বাবুকে নকল করছি। দরজা ভেজানো ক্লাসের। সাধকেরা যেমন সাধনায় বুঁদ হয়ে যান, বাহ্যজ্ঞান থাকে না, আমিও তেমন সুরেশ বাবুর চরিত্রের মধ্যে বেশ ঢুকে গে'ছি। এমন সময় কি এক নোটিস নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ দীপঙ্কর বাবুর। ভেজানো দরজা ঠেলে তিনি আড়চোখে প্ল্যাটফর্মের ওপর কেউ একজন আছে দেখে "স্যর আসছি" বলে ঢুকে তো পড়েছেন, আর আমিও চরিত্রাভিনয়ের উত্তুঙ্গ পর্যায়ে সুরেশ বাবুর মতো করে বলে দিয়েছি, "এসো"! অতঃপর ক্লাসে প্রথমে পিনপতন নিস্তব্ধতা, তারপর হাসি চাপতে গিয়ে নানা সুরে হাসি, শেষে হাহাহাহা, দীপঙ্কর বাবুর ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখা, এবং আমার গল্পের এখানেই ইতি, কারণ এর পর যা হয়েছিল, তা খুব শৈল্পিক নয়।
    
আমার লেখালিখির শখ ও সূচনা এই সময় থেকেই। অবশ্য একেবারেই সিরিয়াস লেখা নয়। এখন কবিতা লিখতে ভালোলাগে বটে, কিন্তু তখন একদমই কবিতা লিখতাম না। গল্প কোনোকালেই আমার লিখতে ভালোলাগে না, তাই সে প্রশ্ন আসে না। আমি নাটক আকারে প্যারোডি লিখতে শুরু করেছিলাম। ফেলুদা নিয়ে। সজল বাবু ছিলেন আমার ফেলুদা, শিবাজী বাবু তোপসে আর সুরেশ বাবু জটায়ু। সুজিত বাবু, তাঁর উচ্চারণে একটু অবাঙালী টানের জন্যই, হতেন আমার মগনলাল। এঁদের নিয়ে লিখতাম ছোটো ছোটো নাটক; উদ্দেশ্য অবশ্যই বন্ধুদের সামনে তাঁদের নকল করে করে পড়ে শোনানো।
     
ও, নাটক বলতে মনে পড়লো, আমার প্রথম নাটক করা স্কুলে! পাগলা দাশু’র ‘চিনেপটকা’। 
ক্লাস নাইনের সরস্বতী পুজো। বেশ একটা দাদা-দাদা গোছের ব্যাপার এসে গেছে, যত না কাজ করছি তার চেয়ে বেশি কাজের অর্ডার দিচ্ছি ভাইদের। আর তার মধ্যে তুমুল রিহার্সাল চলছে। আমোদের অন্ত নেই। বাকি বন্ধুরা বসে বসে পড়ছে, আর আমাদের ক্লাস থেকে ছাড়। "আহা, নাটক করবে তো ওরা!", অরূপ বাবুর প্রশ্রয়। কিন্তু সব্বাই তো আর অরূপ বাবু নয়। অন্তত চন্দন বাবু তো একদমই নন। একদিন ভূগোল ক্লাস চলছে, আমরা রিহার্সালে। এমন সময় ডাক পড়লো। এলাম ক্লাসে। চন্দন বাবু বললেন, "ম্যাপ পয়েন্টিং কোথায়? খাতা বার করো।" আর ম্যাপ পয়েন্টিং! সে সব খাতা তখন বাড়িতে, শিকেয়! ব্যাগে শুধু স্ক্রিপ্ট, টিফিন, জল আর টু-ডু লিস্ট! বললাম, "আনিনি স্যর।"
"নীল ডাউন।"
দাঁড়িয়ে রইলাম ক্লাসের এক প্রান্তে। নীল ডাউন হলাম না। ইতিমধ্যে সায়নদীপ বেচারা ভালোমানুষ, রিহার্সাল থাকলেও ম্যাপ পয়েন্টিং করে এনেছিল, সে দেখাতে গিয়ে পেটে চিমটি খেয়ে ফিরে এলো। চন্দন বাবুর আমাদের কারুর ম্যাপ পয়েন্টিংই পছন্দ হতো না। গঙ্গার গতিপথ আঁকলেও কেটে দিতেন। উফ! কি চান মানুষটা? গঙ্গা এভাবে বইছে না? বইছে তো, অ্যাট অল?
যা হোক, এরপর দৃষ্টি পড়লো আমার ওপর। নীল ডাউন হইনি। 
"তোমাকে নীল ডাউন হতে বলিনি?"
"হ্যাঁ স্যর।"
"মহা পাকা তো! আবার "হ্যাঁ" বলছো?"
আমার তখন মগজে পার্ট মুখস্থ চলছে। "স্যর রিহার্সাল চলছে। যাবো?“
"লজ্জা করে না, মুখে মুখে কথা বলছো! কোথায় থাকো, মঙ্গলগ্রহে?"
"না স্যর, সেলিমপুরে।"
"শিক্ষা-দীক্ষা, পড়াশুনো নেই? নাটক করো, নাকি?”
“হ্যাঁ স্যর, চিনেপটকা!” 
    
বিশেষ দিনে সবাই সাজ দিয়ে স্টেজে আবির্ভূত হলাম। স্নেহাশিস শ্যামাচরণের ভুমিকায়, সায়নদীপ রামপদ, রঙ্গন দাশু, অন্য আরেকজন ছাত্র, চয়ন স্কুলের দারোয়ান, আর আমি শিক্ষক। প্রথম কাজ স্নেহাশিসের, দাশু আর রামপদকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, আর দাশু সম্বন্ধে দু’ চার কথা বলা। তো স্নেহাশিস শুরুতেই রামপদকে দেখিয়ে দাশু আর দাশুকে দেখিয়ে রামপদ বলে পরিচয় দিল। দিয়ে নিজেই বলল, “হে হে”। এটার দরকার ছিল না। ঠিক আছে, তাও মেনে নেওয়া গেল। তারপরেই একেবারে মাঠ-ময়দান করে দিয়ে “দাশু কিন্তু একদম পাগল। মানে একদমই পাগল। তবে তার এই পাগলামি যে তার পাগলামি... না না, কিরকম শোনাচ্ছে... মিচকেমি কি?... ওহ, না... এই তো... হেহে... ফচকেমি, ঠিক, ফচকেমি... মাপ করবেন, তার এই পাগলামি যে নিছকই এক ফচকেমি, তা বোঝাই দায়।” মনে হল, নাটকটা এখানে শেষ হয়ে গেলেই ভালো হয়, না হলে লজ্জায় স্টেজে কবর খুঁড়তে হবে। কিন্তু শেষ হল না। লজ্জা আরও বাকি ছিল। 
পরের দৃশ্যে রামপদ একটা মিহিদানা’র হাঁড়ি সবার জন্য আনবে, এবং সবাই সে দেখে আনন্দে ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরবে। আসল হাঁড়িতে বালি ভরা ছিল (ধরে নিতে হবে মিহিদানা)। তা আমাদের আরেক ছাত্র (শুভময়) সে’ সব জানত না। সে মিহিদানা শুনে ছুটে এসে বালি দেখে সাংঘাতিক চমৎকৃত হয়ে “কই রে? এটায় তো বালি!” বলে ফেলল স্টেজের মধ্যে। শুভময়কে আবার “তুই ওদিকে চল, ওদিকে চল” করে অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক ঝাড়া হল। এরপর আবার দাশু সেই মিহিদানা ছাগলকে (অফ-স্টেজ, ভাগ্যিস) খাওয়ানোর সময় নিজেই ছাগলের ডাক ম্যানেজ দিতে গিয়ে “আয়, আয়... মিহিহিহ্যাহ্যাদানা খাবি?” বলতে কপালটা আরও খানিকটা পুড়ল।  

পরের দৃশ্যে আমি। ডিরেক্টর বলতে সত্যজিৎ, অ্যাক্টর বলতে উত্তম, অ্যাক্টিং বলতে আন্ডার- অ্যাক্টিং (আন্ডার=তলা, মানে অ্যাক্টিং একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে) বুঝি। ভাবলাম, হাততালির বন্যায় চারদিক থই-থই করবে। শুরুটা করলামও ভালো।  নস্যি টানার ভান করে “বল তো দাশু, পদ কয় প্রকার?” , রঙ্গন উঠে বলল, “আজ্ঞে ছাগলের চার পদ, মানুষের দুই পদ, আর ওই রামপদ’র চার পদ।” এটা শুনে আমার বিষম খাওয়ার কথা। কিন্তু জীবনে প্রথমবার নস্যি টানার অভিনয়ে এতই মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে ভুলে গেলাম বিষম খেতে। একটু পর যখন মনে পড়ল, হাঁচি-কাশি মিলিয়ে “হ্যাঁক্কো” প্রকৃতির একটা বেমক্কা আওয়াজ করে একদম চুপ মেরে গেলাম। 
নাহ, এবার ম্যানেজ দিতেই হবে। ছাত্রদের পড়া করতে বলে চেয়ারে বসে বেশ ঢুলছি। ইতিমধ্যে বলে রাখা দরকার ব্যাপারটা কি হওয়ার ছিল (কারণ তার কিছুই হয়নি)। দাশু এসে শিক্ষকের চেয়ারের নিচে রাখা মিহিদানার হাঁড়িতে রাখা চিনেপটকায় আগুন দেবে, তারপর ধুন্ধুমার শব্দে সেটা ফাটবে (চয়ন অফ-স্টেজে একটা টিনের কৌটোয় লাঠি পিটিয়ে এই শব্দটা করবে), শিক্ষক একেবারে ব্যোমকে গিয়ে চেয়ার থেকে পড়ে যাবেন, আর সবশেষে ছাত্রদের শাস্তি দেওয়ার কথা বলবেন। বেশ। এই ঢুলন্ত আমার ভরসা চয়নের দামামা। কারণ সে শুনেই আমি হাত-পা ছুঁড়ে পড়ে যাব। ঢুলছি। অবশেষে অপেক্ষার অবসান। বিকট শব্দ শোনা গেল। চোখ খুলে সবে চেয়ার থেকে পড়তে যাব, ওমা! দেখি দাশু তখনও চুপ করে বসে বসে আগুন ধরাচ্ছে আমার চেয়ারের তলার হাঁড়িতে। হা ঈশ্বর! চয়ন বোমে আগুন দেওয়ার আগেই ফাটিয়ে দিয়েছে। এরকম অবস্থায় আমি আর রঙ্গন কয়েক সেকেন্ড এর-ওর মুখের দিকে তাকালাম। রঙ্গন আবার মন দিয়ে আগুন দিতে লাগলো। আমি দর্শকদের দিকে তাকিয়ে একবার সৌজন্যের হাসি হেসে আবার ঢুলতে শুরু করলাম। একটু পর আবার শব্দ হওয়ায় কোনোদিকে না তাকিয়ে চেয়ার থেকে পড়লাম। এবার ঠিক হয়েছে। পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছি (এ’ সময়ে দারোয়ানের এসে আমাকে ধরে তোলার কথা), কিন্তু দারোয়ানের দেখা নেই। একটু পর চয়ন (দারোয়ান) হুম-হাম করে বীরদর্পে ঢুকে আমাকে দেখে প্রশ্ন, “কেয়া হুয়া, দারোয়ানজী?” কিহহ?! আমি যে আমি, সেই আমি কিনা দারোয়ানজী?

   
… প্রথম যাঁরা আমাদের বড় হওয়ার সঙ্গী ছিলেন, বড় হয়ে গেলে সরস্বতী পুজো তাঁদের সঙ্গে দেখা করার দিন। স্কুলে যাওয়ার দিন। সরস্বতীকে প্রণাম করার আগেই আমরা তাঁদের পা ছুঁই। ওই তো, দাঁড়িয়ে আছেন নারায়ণ বাবু। শরীর ভেঙেছে, শুনেছিলাম সুগার। কিন্তু এখনও দ্যাখ, পিঠ সোজা, পায়ে স্নিকারস, দাঁত চেপে কথা বলা। আর দূরে, মাঠের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন সজল বাবু। সদ্য পাশ করে যাওয়া ছাত্রদের সঙ্গে গল্প করছেন। আমাদের দেখেই ঠিক হাসলেন, আগেও যেমন হাসতেন। এখন শুধু ফ্রেঞ্চ কাটের ফাঁক দিয়ে। ক্লাসরুমগুলোর দিকে তাকালে একে একে সবার কথা মনে পড়ে যায়, ডালিয়া ম্যাডামের সংস্কৃত ক্লাস, রীতা ম্যাডামের ইংরাজি ক্লাসে নিউ হরাইজন বই নিয়ে আসা বাধ্যতামূলক, শিবাজীবাবুর বোর্ড জুড়ে ইনরগ্যানিক কেমিস্ট্রির ইকুয়েশন, আরও আরও কত কি!  ফিজিক্স স্যার চন্দন বাবু বললেন, “কলেজে পড়াস এখন? তাই বলি, এত চুল পাকলো কিভাবে তোর?” সুজিত বাবু, যাঁর বকুনি খুব ভয় পেতাম, পিঠে হাত রেখে বললেন, “তোমরা কে কি করছ শুনি?” আর শুনেই রাগ করে বললেন, “বাঃ! সব বড় হয়ে চাকরি করছ, ভালো জায়গায় রিসার্চ করছ, আমাদের একটু জানাবেও না এসে? স্যারদের কি মনেই পড়ে না? কত ভালোলাগে আমাদের বোঝো না?” স্বগত ভাবেই আমাদের মাথা নিচু হয়ে আসে। সত্যিই, জানানো হয়নি। আর সে জন্য আমাদের ওপর ওঁদের এই অভিমান – খুব ছোট লাগে নিজেকে। ধন্য লাগে…
           
ক্লাস নাইন পেরিয়ে টেন চলে আসে। একটা কোথাও শেষের আলাপ, আলাপের শেষ হতে থাকে, কিন্তু নাহ! এখনও তো তিন বছর পড়ে আছে এই ঘরেদোরে, করিডোরে, মাঠে, সিঁড়িতে। সময় আছে। ক্রিকেট চলতে থাকুক! এখন মাঠে যাওয়ার ব্যাপারে অত বিধিনিষেধ ছিল না। টিফিন টাইম ছাড়াও অফ পিরিয়ড পেলে দে ছুট! সারাদিন ধরে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে মাঠে গিয়ে একটা ম্যাচ কমপ্লিট করা হতো। ইন্দ্রনীল আর আমি ছিলাম আজহারের ভক্ত, অতএব এক টিম। সঙ্গে সায়ন, সুস্মিত, কখনও আনন্দ। উল্টোদিকে রাজয়, মনন, আরেক সায়ন, দেবাংশু, কখনও ভাদুড়ী। যতদূর মনে পড়ে, ভাদুড়ী, রিজওয়ান, আরো কয়েকজন ফুটবলের দিকেই বেশি থাকতো। রাজেন দা'র কাছ থেকে চেয়েচিন্তে একখানা বল জোগাড় করে ভীমরুলের দল বেঁধে তার পিছনে ছুট! যদিও এটা লিখতেই ভাদুড়ী মনে করিয়ে দিল, এভাবে মর্নিং সেকশনে ফুটবল খেলা হতো। আমার স্মৃতি আর সময়ে একটু ঘেঁটে গিয়েছিল। আসলে জীবনের বেলায় তো স্কুলের পুরোটাই মর্নিং সেকশন!
   
খেলার বাইরে ক্লাস। সিলেবাস গুটিয়ে আনার সময়। সাজেশন। এবিটিএ টেস্ট পেপার ধরে ধরে ক্লাসে প্র্যাকটিস করা। প্রি-টেস্টে মাত্রাতিরিক্ত কঠিন প্রশ্ন। বুঝে যাওয়া যে এর চেয়ে বেশি খারাপ কিছু আর মাধ্যমিকে হবে না! বেশিরভাগ দিনই সোয়া চারটে অব্দি ক্লাস! শুধু যেইদিনগুলোয় শেষ পিরিয়ড সুরেশ বাবুর, ঘুমে চোখ লেগে আসে। মাঠ একেবারে দু-হাতে "আয় আয়" বলে ডাকে। সেদিকে তাকিয়ে থাকি। অমনোযোগ দেখে স্যর ধমক দেন। ক্লাসে ফিরে আসি। কিন্তু মন পড়ে থাকে বাইরে। ইলেভেনেও সরস্বতী পুজো পাবো নিশ্চয়ই?
… এখন সরস্বতী পুজোয় যখন যাই, ছেলেরা শালপাতার বাটিতে ভোগের খিচুড়ি দেয়। স্যার আলাপ করিয়ে দেন, “এরা তোমাদের অনেক বড় দাদারা সব!” ছেলেরা অস্বস্তিতে হাসে এ ওর মুখে চেয়ে। আমরা যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম, তখনও কি এরকম কোনও অনেক বড় দাদা এসে আমাদের হাত থেকে ভোগ নিয়েছিল? স্যার কি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন? দিয়েছিলেন নিশ্চয়ই। আমরাও বোধ হয় এভাবেই হেসে নিজেদের মধ্যে বলেছিলাম, দাদা কি রে! এ তো কাকু! কোন আদ্দিকালে পাশ করেছে?  
                  
সময় কমে আসে। সরস্বতী পুজোয় স্কুলে গেলেই মনে পড়ে কাকলি মিস আর সুনেত্রা মিসের কথা। বাঁদরামি করলে যেমন শাসন, লক্ষ্মী হয়ে থাকলে তেমন আহ্লাদ। রিটায়ার করেছেন বহুদিনই, তবু কতদিন দেখা হয় না! এখন কি একেবারেই আসেন না এদিকটায়? ক্লাস টু তে রবীন্দ্র জয়ন্তীর আগের দিন রিহার্সালে ভয়ে আধমরা হয়ে যখন চিঁচিঁ করে আবৃত্তির রিহার্সাল দিচ্ছি, সুনেত্রা মিস ওই মোটা চশমার ওপার থেকে তাকিয়ে বললেন, “এই গলা নিয়ে আবৃত্তি করবে? তোমার কবিতা কে শুনবে? আমি একা?” আর কাকলি মিস শনিবারের ‘শুনে অঙ্ক’ ক্লাসে একবার দশে পাঁচ পেয়ে আনন্দে জাস্ট পাগল হয়ে যাবো, এমন সময় কানে পাক পড়লো, “ওই দু নম্বরের অঙ্কটায় এত বোকার মতো ভুল তুমি করলে কি করে?” তবুও আমি অঙ্কে সেই দশে পাঁচই রয়ে গেছি।…    
                    
কিছুর মধ্যে কিছু না, হঠাৎ সায়নদীপ একদিন টিফিন টাইমে উনিশ-কুড়ির শেষ পাতাটা খুলে এমা ওয়াটসনের ছবি দেখিয়ে মনটা উদাস করিয়ে দিল! অবাক দৃষ্টিতে দেখছি, আহা এমন নিষ্পাপ সুন্দর মুখ, অহো কন্যা, কে তুমি চাহো সারঙ্গের ন্যায় এই তপোবনে, আমার হাত থেকে ম্যাগাজিনটা ছিনিয়ে নিয়ে বললো, "ব্যাস! অনেক দেখে নিয়েছিস! বৌদি হয় তোর!" যত বলি, চ' শেয়ারে ভালোবাসি, তত বলে "আমাকে কি ক্যালানে পেয়েছিস নাকি রে হারামজাদা?" ইস্কুলের শেষ দিকে আমাদের এইসব গপ্পোগুজবের জায়গা ছিল দোতলায় বায়োলজি ল্যাবের বাইরে যেখানে করিডোর শেষ হচ্ছে, সেই প্রান্তে রাখা একটা টেবিল। হেডস্যর (কলকাতা-খ্যাত শ্রী রবি সোম) থাকাকালীন করিডোরে চরে বেড়ালে বেতের বাড়ি খাওয়ার সমূহ সম্ভবনা ছিল। কিন্তু আমাদের ক্লাস টেনের শেষদিকে হেডস্যর রিটায়ার করলেন, চার্জে এলেন শুভ্রেন্দু বাবু, আর আমাদেরও চরে বেড়ানোয় বিশেষ বাধা রইলো না।
    
মাধ্যমিক এগিয়ে আসে। স্কুলের শেষ দিন, না, ক্লাস টেনের শেষ দিন, ক্লাস আর তেমন হয়নি। আমরা মাত্র সাতজন এসেছিলাম। হয়তো মাথার মধ্যে কোথাও একটা "শেষ ক্লাস" কথাটা ঘুরছিল, তাই এসেছিলাম। এখন ভাবি, ভাগ্যিস গিয়েছিলাম! 
রোল-কল করে ছেড়ে দেওয়া হল। আবার সারাদিন ধরে মাঠে খেললাম। আপাতত, শেষবারের মতো। মাধ্যমিক ভুলে গেলাম। সামনে টেস্ট পরীক্ষা। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সামনে টেস্ট সিরিজ, ইন্ডিয়া-পাকিস্তান। ১৫ বছর পর ভারত পাকিস্তানে খেলতে যাচ্ছে, সৌরভের ভারত। প্রধানমন্ত্রী বাজপায়ীজি, রাষ্ট্রপতি ডঃ কালামের সঙ্গে সৌরভ পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বাকি প্লেয়ারদের। বাজপায়ীজি টিমের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, "জিত লো দিল!" সেই থেকে ওই সিরিজের নাম "জিত লো দিল" সিরিজ। পাকিস্তানের ব্যান্ড স্ট্রিংস সিরিজের আগে তাঁদের 'ধানী' এলব্যামে ক্রিকেটের জন্য গান গাইছেন, "হ্যায় কোই হাম জ্যায়সা!" তাঁদের গানে গলা মেলাচ্ছেন আমাদের হরিহরণ। ৩রা মার্চ প্রথম ওয়ান ডে করাচিতে। ভারত ৩৫০, পাকিস্তান ৩৪৪। চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে আব্দুল রাজ্জাকের ক্যাচ ধরছেন কাইফ, শেষ ওভারে মিয়াঁদাদ ড্রেসিংরুম থেকে ইশারায় মইনকে লেগ সাইডে মারতে বলছেন। ৩রা মার্চ, মাধ্যমিকে বাংলা প্রথম পত্র। পরীক্ষা দিয়ে কোনোক্রমে বাড়ি ফিরে, ইউনিফর্ম না ছেড়েই ম্যাচ দেখতে বসে যাওয়া। ম্যাচ জিতে জাহির বল ছুঁড়ে দিচ্ছেন আকাশে
    
...আর এই এক আকাশই রয়ে যাবে আমাদের। স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে উপরে তাকালে এক আকাশ, যে আকাশে সব্বাইকে খুঁজে পাওয়া যায়, যারা বা যা-কিছু আমাদের হারিয়ে গেছে। তাকানো যাক তবে আকাশের দিকে? না মানতে চাইলেও, তিলে তিলে, প্রতি বছরই যে আকাশ বিশাল হয়ে উঠছে।

১০

মাধ্যমিকের পর আমার আর আমার ইস্কুলে পড়া হয়নি। আমি যে নম্বরটা পেয়েছিলাম, তাকে সাধারণত আমরা বলি "ভালো, কিন্তু ততটা ভালো নয়"। অর্থাৎ, আমাদের তৎকালীন মাধ্যমিকীয় ভাষায়, "স্টার, কিন্তু লেটার নয়।" অগত্যা, লেটার না আসায় ইস্কুলে পুনর্বাসনের চিঠিও পেলাম না। বা বলা ভালো, সায়েন্স নিয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম না। আর্টস নিয়ে পড়তে চাইলে হয়তো হয়ে যেত, কিন্তু পড়াশুনা নিয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আমি তখনও নড়বড়ে। কাজেই সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক করা হয়, আমি বিজ্ঞান নিয়েই সামনের দু' বছর পড়বো। সে যদি অন্য স্কুলে হয়, তো অন্য স্কুলেই।
    
আমার পড়াশুনার এক বিচিত্র ইতিহাস হলো, প্রতিবারই ভর্তির সময় আমি এক জায়গা বই দুটোয় সুযোগ পাই না। ক্লাস ওয়ানেও শুধুমাত্র যোধপুর বয়েজেই পেয়েছিলাম। কলেজেও শুধুমাত্র নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে, আর এ'বেলা, ক্লাস ইলেভেনেও তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। রাসবিহারী এভিনিউয়ের উপর, দেশপ্রিয় পার্কের উল্টোদিকে, বহু পুরোনো স্কুল। 
     
'পড়া-পড়া খেলা'র আগের ৯টা অংশ খুব স্বচ্ছন্দে লিখে এসে, এবার একটু ভাষা 'কম পড়িয়াছে' আমার। বেশ বুঝতে পারছি, ওই সময়ের যে অস্থিরতা, যে না-পাওয়া, যে দম-বন্ধ হয়ে আসা, তা আজও ঠিক গুছিয়ে সাহিত্যরূপে লেখা আমার পক্ষে একটু কঠিন। 
   
মোটকথা এই যে, আমি আমার পুরোনো ইস্কুলকে মানুষ ভাবতাম। আমার শিক্ষকেরা ক্লাসে আমাদের যত বকতেন, যত ভালোবাসতেন, যত পাশে থাকতেন, সেই সব কিছু আমি আবার আরোপ করতাম ওই বাড়িটার ওপর, ওই মাঠটার ওপর। যে সাংঘাতিক অধিকারবোধে সে মাঠে খেলতাম, সেই করিডোরে হেঁটে বেড়াতাম, হাইবেঞ্চে বসে গল্প করতাম, টিচার্স রুমে উঁকি মেরে দেখে আসতাম স্যর ক্লাসে আসার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠলেন কিনা, যে অধিকারবোধে ক্লাসের শেষে সাগর বাবুর থেকে, সজল বাবুর থেকে ভাঙা চক চাইতাম, চেয়ে ব্যাগে রেখে দিতাম, স্যরদের ব্যবহার করা চক আমার সাত-রাজার-ধন-এক-মাণিক মনে করে, উল্টোদিকে মনে করতাম, ইস্কুলও বোধ হয় আমায় এই একই অধিকারবোধে ধারণ করছে। ভাবতাম, আমাকে ভাবতে হবে না, আমার আর আমার এই বন্ধুদের একসঙ্গে রেখে দেওয়ার দায়িত্ব এই বাড়িটার, সে আমাদের সবার চেয়ে আমাদের ভালো বোঝে। আমরা যে সবাই এই বাড়ির ঘরেদোরে, মাঠে সকাল-বিকেল দাপিয়ে বেড়াচ্ছি, এখান থেকে আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়াটা ইস্কুল ঠিক ঠেকিয়ে দেবে।
   
সমস্যা এখানেই! সে বয়সে ইস্কুল এমন একখান স্বপ্নের বাসাবাড়ি ছিল যে এই সহজ কথাটা মাথায় আসেনি, যে আরও অনেক কিছুর মতোই ইস্কুল আসলে একটা 'সিস্টেম'। তারও কিছু নিয়ম আছে, এবং সেই নিয়ম মেনে চলার দায় শিক্ষক-ছাত্র, সবার। হয়তো আমার ইস্কুলের সবচেয়ে বড় দান এটুকুই যে অনুশাসনকে সে কখনও আমাদের শিকল করে তোলেনি। কিন্তু, তাই বলে, এটা ভাবাও তো ভুল, তাই না, যে আমাদের মতো, নিয়মের খেলাপ করাই, স্কুলের কাজ?
   
এখন যত সহজে এই যুক্তিগুলো নিয়ে আসতে পারছি নিজের মনে, বলাই বাহুল্য, তখন পারিনি। বরং, তখন শুধু রাগ হয়েছিল। রাগ নিজের উপর -- যে ইস্কুল আমায় এতকিছু দিল, সে যখন আমার থেকে আর সামান্য কয়েকটা নম্বর চাইলো, কেন দিতে পারলাম না? রাগ স্কুলের ওপর -- দশ বছর ধরে এত ভালোবাসলাম, তার উত্তরে একটুও নিয়মের খেলাপ কেন করলো না? শিক্ষকদের উপর সাংঘাতিক অভিমান -- ক'দিন আগে অব্দি তাঁরা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন আমাদের জন্য, এখন তাহলে কেন শুধু নিয়মের কথা বলছেন? কেন শুধু কাট-অফ মার্কস দিয়ে বিচার করছেন? আমি স্বাধীনতা দিবসে ভোরবেলা যোধপুর পার্ক বাজার থেকে ফুল নিয়ে আসতে পারি, প্রেয়ারের সময় নিচু ক্লাসকে এক লাইনে দাঁড় করানোর দায়িত্ব নিতে পারি, নাটক করতে পারি, স্পোর্টসে গান গাইতে পারি কোরাসে, ক্রিকেট খেলতে পারি, সন্ধে অব্দি থেকে সরস্বতী পুজোর মণ্ডপ সাজাতে পারি, তাও কেন শুধু আমাকে বলা হচ্ছে সায়েন্সে ২৪০ দরকার এখানে থাকার জন্য? 
আর রাগ হতো নতুন স্কুলের ওপর -- সে এক অদ্ভুত অহংকার থেকে রাগ, খুব খুব অনুচিত রাগ। 'আমি ঐ স্কুলে দশ বছর পড়ে এসেছি, এখানে আবার কে কি পড়াবে আমায়?'- গোত্রীয় রাগ। এখন বুঝি, আমার নতুন স্কুল আমাকে ওই দু'বছর আশ্রয় দিয়েছিল, যখন আর কোথাও সুযোগ পাইনি। শুধু এই কারণেই আমি তার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী। নতুন স্কুলে ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকদিন সেখানে না গিয়ে আমি খোঁজ নিতে আসতাম পুরোনো স্কুলে, কোনো সীট ফাঁকা হলো কিনা, বা কাট-অফ আরেকটু নামলো কিনা। নতুন স্কুল আমাকে সেই ছাড়ও দিয়েছে। কিন্তু তখন শুধু না-পাওয়া। শুধু নতুন স্কুলের অন্ধকার ক্লাসরুমে বসে দম বন্ধ হয়ে আসা। মাঠ নেই। চারদিকের উঁচু বাড়িঘর চেপে বসছে স্কুলটার ওপর। মাঝে একফালি সিমেন্টের চাতাল। রাগে আমার সমস্ত শরীর রি-রি করতো।
   
নতুন স্কুলের স্মৃতি আমার নেই প্রায়। দু'বছর সেখানে কাটালেও, বড় আলগা ভাবে কাটিয়েছিলাম। কারুর সঙ্গেই তেমন কথা বলতাম না। দু'বছরে আমার দুটি বন্ধু হয়েছিল সাকুল্যে। সমন্বয় আর সায়ন। এদের মধ্যে সমন্বয় ক্লাস ইলেভেনের শেষ দিকে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে, এবং সায়নের সঙ্গে কোনোক্রমে কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে অব্দি যোগাযোগ রেখেছিলাম। তারপর, সেও হারিয়ে গেছে। আর আমিও বিশেষ কোনো কারণ খুঁজে পাইনি আমার নতুন স্কুলকে মনে রাখার। নতুন স্কুলে ক্লাস করে বাড়ি ফিরেও একটা সময় অব্দি আমি নিয়মিত ফোন করে যেতাম সায়নদীপকে, জানার জন্য যে আজ পুরোনো স্কুলে কি কি হয়েছে। যেন আমার আজকের ক্লাসগুলো পুরোনো স্কুলেই করার কথা ছিল, যাওয়া হয়ে ওঠেনি কোনো কারণে। নতুন স্কুল বরাবর আমার দুয়োরাণী। তাকে যে ভালোবাসা যেত না, এমন নয়। তাকেও যে স্মৃতিতে রাখা যেত না, এমন নয়। কিন্তু আগের দশ বছরের স্মৃতি দু'বছরের মধ্যে ভুলে যাওয়া হয়তো সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে। তাই, আবার নতুন করে ইস্কুলবেলার স্মৃতি গড়ে তোলা, ইস্কুলবেলাকে ভালোবাসা আমার আর হয়ে ওঠেনি। 
    
এবার তাহলে নটেগাছ মুড়োনোর পালা। যাদের সঙ্গে ইস্কুলের শেষ দু'বছর এক বেঞ্চে বসে ক্লাস করতে চেয়েছিলাম, তাদের কারুর সঙ্গেই কারুর আর আজ নিত্য ওঠাবসা নেই। যে যার মতো বেঁচে আছি, নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কাজেকম্মে। কেউ শহরে, কেউ শহরের বাইরে, কেউ দেশের বাইরে। বছরে সামান্য কয়েকবার দেখা হয় কি হয় না! আমাদের সবারই হয়তো কখনও-সখনও মনে পড়ে যায় এত কিছুর ভিড়েও, স্কুল আমাদের ভারি সুন্দর এক বেঁচে থাকা উপহার দিয়েছিল। যে যেমনভাবে ওই ক'বছর বাঁচতে চেয়েছিলাম, বেঁচেছি। আমাদের স্কুল, আমাদের শিক্ষকেরা কখনও আমাদের হাতে পেন ধরিয়ে দিয়ে বলেননি, আমাদের লড়াই করা উচিত একে অন্যের সঙ্গে পরীক্ষায় ভালো নম্বরের জন্য। বরং, আমাদের অফ পিরিয়ডে মক-টেস্ট না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আমরা কেউ মাঠে গিয়ে খেলেছি, কেউ ক্লাসে কয়েকজনকে নিয়ে কুইজ করেছি, কেউ সদ্য পাওয়া ওয়াকম্যানে চন্দ্রবিন্দুর 'চ' শুনেছি। আমাদের ছেড়ে দিয়েও এই যে স্কুলের ধরে রাখা, এর জন্যই বোধ হয় আমরা আজও স্কুলের কাছে, স্কুলের স্মৃতির কাছে ফিরে ফিরে আসি। আজ আমাদের বেঁচে থাকার মূল সুর যখন আস্ফালন, স্কুল আমাদের সেই একফালি আব্দার, সব-পেয়েছির স্মৃতি। এই ভেবে, আমরা আবার ফিরে যাই যে যার জগতে।
   
কিন্তু এখানে শেষ হয়েও সব ঠিক শেষ হয় না। আমরা হয়তো নিজেদেরও গোপনে অপেক্ষা করে থাকি এক একটা সন্ধের, যখন হঠাৎ, অকারণেই আমাদের মনে হবে, মনে হতে বাধ্য, স্কুলের কৌলীন্য কেবল স্মৃতিতে নয়। সে আসলে কোনো বাড়িঘর নয়, বয়সের ভারে বিরাট মাঠের ছোটো হয়ে আসা নয়, আমতলা নয়, লালবাড়ি নয়, করিডোর নয়, ক্লাসরুম নয়। আমাদের ইস্কুলবেলা আসলে এক বেঁচে থাকা, সাংঘাতিক স্পর্ধায় একরোখা, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা অবুঝের মতো, মাথার চুল পরিপাটি না আঁচড়ে ধুলো মেখে নেওয়ার ধক, একমাঠ ছুটে খেলার জায়গা দখল, প্রেয়ারে গলা ছেড়ে গান, শহর পেরিয়ে গ্রাম পেরিয়ে অন্য শহর-রাজ্য-দেশ-মহাদেশের ও'পারে ছড়িয়ে যাওয়া এক জীবন, নিভে আসা আলোর পুঁজি ধরে অন্ধকার পেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে! ইচ্ছে! 

(ছবি: ফেসবুক)

Comments

Post a Comment