Followers

সন্মাত্রানন্দের সিদ্ধার্থ

#তোমাকে_আমি_ছুঁতে_পারিনি
  
এই অসহ সময়ে নান্দনিকতার শুশ্রূষার পাশাপাশি, সময়োপযোগী হয়ে ওঠার চেয়ে বৃহত্তর দায় সাহিত্যের, শিল্পের নেই বললেই চলে। 
  
কথক সিদ্ধার্থ, সুজাতা, সৌদাস -- সকলেই বলে চলে পথের কথা, পরিচয়ের কথা, মানুষের কথা। সন্মাত্রানন্দের 'তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি'র আত্মা তৈরি এ'সব কথাতেই। যুগপুরুষ বুদ্ধের রূপায়ণে উৎসাহী নন লেখক, তাই তাঁর আশ্রয় সিদ্ধার্থচরিত -- অনেক বেশি গভীর, মানবিক ও পূর্ণ। তবে সিদ্ধার্থের সাধনার আখ্যান স্বয়ং তাঁর মুখেই শুনি, কি তাঁরই অনুগামী সহজতার ছায়া সুজাতা বা সৌদাসের মধ্যে পাই, এই কাহিনীর রশির অন্য প্রান্ত টানটান করে ধরে আছে 'মার'। শাক্যপুরুষ সিদ্ধার্থের 'বন্ধু' সে, ভিক্ষু সিদ্ধার্থের সে শত্রু, আর বুদ্ধের পদাবনত পরাজেয় ছায়া। 'নাট্য' যাকে বলি আমরা, তার অমোঘ উপস্থিতি সিদ্ধার্থ আর মারের কথোপকথনে। সমগ্র জীবনজুড়ে এই যে আমার ও আরেক আমার উত্তর-প্রত্যুত্তরের দীর্ঘ খেলা, সত্য-মিথ্যার টাগ অফ ওয়ার, তারই কিয়দংশ এই উপন্যাস ব্যক্ত করে।
  
গল্পের নাট্য, গল্পকারের মুন্সিয়ানা -- সবই বুঝলাম। কিন্তু পড়ে থাকে শেষ প্রশ্ন: সিদ্ধার্থের বোধিলাভের আড়াই হাজার বছর পর (কথক, জাতিস্মর ময়ূখ বার বার সময়ের এই ব্যবধান দেখায়) সেই কাহিনী আবার পড়বো কেন? 
  
পড়বো, কারণ বইয়ের শেষ দু' পাতা। অধ্যায়ের নাম 'মহামারগর্জন'। মারের মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে সিদ্ধার্থের প্রতি একের পর এক হিংসার, ভয়ের কথা। সে শেষবারের মতো চেষ্টা করছে সিদ্ধার্থকে পথভ্রষ্ট করার। যে কথাগুলি মার বলছে, তা আজকের, এই মুহূর্তের, ২০২০-র ব
ঘোর অন্ধকার কথা। কিন্তু ততক্ষণে সন্মাত্রানন্দ ভাষার কারিগরিতে এবং ন্যারেশনের বহমানতায় আমার willing suspension of disbelief-কে এমন জায়গায় নিয়ে চলে গেছেন, যে আমার মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যায়, লেখক ওই সময়ের, না সিদ্ধার্থ এই সময়ের! 
  
ঈশ্বরের আখ্যান নয় 'তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি'। ধর্মের আখ্যান নয়। বুদ্ধের প্রবোধবাক্যে এই বইয়ের পাতা সেজে ওঠে না। এই বই মানুষের। এই সিদ্ধার্থ মানবিক। দুঃখের অতীত জানতে সে দুঃখ পায়। মারের হুঙ্কারের সামনে দাঁড়িয়ে বুকটান করে বলতে পারে, মানুষে তাঁর ভরসা আছে। মানুষ একদিন ফিরে আসবে অন্ধকার থেকে, আলোর কথা শুনতে, দিবাস্বপ্নে নয়, প্রয়োজনে। একদিন প্রেম উচ্চারিত হবে সবার মুখে, সবার জন্য, কারণ দ্বিতীয় কোনো পথ নেই আর। অনুমান নয়, ভয় নয়, দ্বিধা নয়, এই নিতান্ত ছোট, নীরব, পরাধীন মানুষ নির্বেদকে জানার চেষ্টায় উদ্যম -- এটুকুই প্রত্যেকের সিদ্ধার্থ হয়ে থেকে যায়। মারও থাকে। কিন্তু যতদিন মার আছে, অভয়ও আছে। ওই শোনা যায়, "এহি পশ্য … নিজে পরীক্ষা করে দ্যাখো, কী পাও।"

Comments