Followers

জন্মদিন: সায়নদীপ, ২০১৮

আজকাল নিজেদের জন্মদিনে একে অন্যকে ফোন করে বিশেষ কিছু আর বলার থাকে না আমার আর সায়নদীপের। "শুভ জন্মদিন" বললে সেটা শুনে দুজনেই এত বাজে ভাবে হাসি, যে জন্মদিনেরই বোধ হয় অপ্রস্তুত লাগে। তাই, এখন যার জন্মদিন, সে ফোন তুলে হ্যালোর বদলে "ধন্যবাদ" বলে দিই। অন্যজন বলি, "রাখি তাহলে"। আইডিয়ালি এরকম হলে দেখাতো, কল টাইম: 00:00:03 hrs, কল কস্ট: 00.00, কিন্তু এতটা অভদ্রতা করলে যদি রাতে ট্রিট-টা না পাওয়া যায়, তাই আমরা আরো খানিকটা কথা বলি। এই যেমন, আজ ফোন করে বললাম, "বহুবছর পর তোর জন্মদিনে এত সুন্দর ঠাণ্ডা পড়লো।" সায়নদীপও খুব খুশি মনে বললো, কাল রাত থেকে এমন জাঁকিয়ে পড়েছে! আমিও আশ্বস্ত হলাম, রাতে খেতে পাবো।
  
সত্যি বলতে কি, বড়দিনেও আমার কিসু না। নিউ ইয়ারেও না। কিন্তু, বড়দিনের আর নিউ ইয়ারের মাঝে আমার এই একটা দিন সবচেয়ে প্রিয়, উদযাপন করার মতো, সন্ধের উদ্দেশ পাওয়া। 
  
বছর-বছর নিত্যনতুন বন্ধু যেমন হয়, তেমন উইকেটও পড়ে। অদ্ভুত সব কারণে, এমনকি অকারণে ভরসার খুঁটি একটু-আধটু নড়ে যায়। এসব সময়েই ২৯শে ডিসেম্বরগুলোর প্রয়োজন ফিরে ফিরে আসার। যতই মুখে আমরা বলি, দিন-মাস-বছর তুচ্ছ, আসল হলো থাকা, কিন্তু ২০১৭-র এই দিনের শেষে আমি অপেক্ষা করেইছিলাম আজকের। এই দিনগুলোয় ঘোষণা করে স্মৃতিচারণ করা যায় বন্ধুতার লং-স্ট্যান্ডিং পার্টনারশিপের। "কাজের ফাঁকে হঠাৎ মনে পড়লো" বলাটা বাধ্যতামূলক নয়।
   
সায়নদীপ আর আমার স্কুলজীবনের কীর্তি, বা পরবর্তীতে ইচ্ছেডানা প্রকাশ, সব নিয়েই বেশ বিস্তারিত বলেছি ফেবু-তে। যা নিয়ে বলি নি, বা বলা হয় না, তা হলো আমাদের পুরাতন-বিলাস। শুধুমাত্র সহপাঠী হওয়া, শুধুমাত্র এক পত্রিকার সম্পাদক হওয়া নয়, আমাদের এই পুরাতন-বিলাস আমাদের দিশা দিয়েছে। যখন আমাদের মাথা কিনে নিচ্ছে ওয়াকম্যান, আইপড, ফ্যাশন টিভির আলোচনা, আমরা নির্দ্বিধায় স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফেলুদা আর টিনটিনকে বাঁচিয়ে রেখেছি। যখন বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন বার করার সবচেয়ে গর্বের জায়গা হয়ে উঠেছে ইংরাজি লেখা ছাপানো, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছি বাংলা ছোটপত্রিকাকে বাঙালী করতে; বাংলা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধের স্বাদে। 
   
একটা গল্প বলি। ঠিক যেভাবে গন্ডা-গন্ডা টাকা খরচ করে হালদার-পার্টিকে দিয়ে নাটক করিয়ে হাততালি কুড়োনোকে গ্রূপ থিয়েটার বলে না, তেমনই, মোটা টাকার বিনিময়ে নামজাদা লেখকদের লেখা কিনে চালানো পত্রিকাকেও লিটল ম্যাগাজিন বলে না। গণ্যমান্য লেখকরা ছোটপত্রিকায় লেখা দিতেন, সে বহুদিনের ট্র্যাডিশন। পরে লেখা কেনা শুরু হলো। যার ফান্ড যত বেশি, সে তত বড় ছোটপত্রিকা। একবার কার যেন আশ্বাস পেয়ে সায়নদীপ লেখা চাইতে ফোন করলো এই সময়ের এক সুপরিচিত লেখিকাকে। আশ্বাসটা ছিল যে তাঁর থেকে লেখা কিনতে হবে না, এবং তিনি খুবই সহমর্মী, সহজেই লেখা দিয়ে দেবেন। সে উৎসাহে আমাদের পত্রিকার সূচীতে নতুন বিভাগ সংযোজিত হয়ে গেছে, শুধু লেখা পাওয়ার অপেক্ষা। সায়নদীপের ফোনের জবাবে তিনি বললেন, "নতুন লেখা তো দিতে পারবো না, খুব ব্যস্ত। আমার পুরোনো একটা লেখা, অমুক জায়গায় প্রকাশিত, তোমরা ছাপাতে পারো। ২৫০০ টাকা লাগবে।" ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে সায়নদীপের ফোন আমাকে, "সেকশনটা তুলে দে। লেখা কিনে ইচ্ছেডানা চালাবো না। স্বেচ্ছায় কেউ লেখা দিলে দেবে, নাহলে নিজেরা লিখে ছাপাবো।"
   
এছাড়াও, যখন বেড়াতে গিয়ে একমাত্র পন্থা হয়ে উঠছে পায়ে চাকা লাগিয়ে ঘোরা, বা ঘরবন্দী থেকে মৌজ করা, আমরা সেই বিরল প্রজাতির কিছু মানুষ, যারা মূর্তি নদীর রিভারবেডে  পাথরের ওপর বসে গান গেয়েছি, কবিতা পড়েছি। যখন শব্দের জগঝম্পে গানের কথা হারিয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন, আমরা লিরিক্স মুখস্থ করা মানুষ। 
   
আমাদের এই পুরাতন-বিলাস কলকাতায়, এবং তার চেয়েও বেশি বাঙালীয়ানায়। আমাদের বাঙালীয়ানা ষোলো আনা না হলেও, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা তো বটেই। অনেক বছর আগেও নিশ্চয়ই আজকের দিনে এমন ঠাণ্ডা পড়েছিল। সামান্য কথা ততটা সামান্য নয় কখনই। আবার তেমন শীতকাল, আবার সূর্যের দিকে না চাইতেই ঝিলমিল, আবার একটা সময়ের বয়ে যাওয়া, গড়িয়াহাট মোড়ে ক্যারম, দাবা, চায়ের আড্ডার সাক্ষী। এত অব্দি আমাদের চলন সেয়ানে সেয়ানে। শুধু যে জায়গাটায় গিয়ে আমি এক্কেবারে হেরো, তা হলো সায়নদীপের মতো মানুষ হওয়ায়, বন্ধু হওয়ায়, মেরুদণ্ডে। এইজন্য ২৯শে ডিসেম্বরের আসা প্রয়োজন। মনে করিয়ে দিতে যে 'আমি'র আরো নামা দরকার। আর সব জেনেশুনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যে দরকার নেই ভাই আমার তোর মতো মানুষ হয়ে! অমূল্যনিধিকে বর্তমানে লাভ করবারও লোক থাকা চাই!
   
রাত্তিরে ভালোমন্দ খেতে পেলেই হলো।

Comments