কী নিয়ে লিখলে?
প্রতিবছর আমার নতুন বই বেরুনো মাত্র আমাকে কারুর না কারুর কাছে শুনতে হয়, কী নিয়ে লিখলে?
এর চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমার কাছে আর হতে পারে না। বিয়ে, বাচ্চা, প্রমোশন, পি.এইচ.ডি -- সব প্রশ্নের উত্তর হয়, অন্ততঃ হাতড়ালে ঠিকই একটা কিছু বলার মতো পাওয়া যায়। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে আমার একদম ল্যাজে-গোবরে অবস্থা হয়। উত্তর দেওয়াই যায়, যে যা নিয়ে মূলতঃ ভাবনা চিন্তা করি, তাইই লিখলাম। কিন্তু সেখানে বিপদ হলো, তারপর ঠিক জিজ্ঞেস করে বসবে, কি নিয়ে ভাবলে?
এরপর খাদ। মুখ খুললেই পতন। আমার, নয়তো তার। প্রয়োজনমতো মূর্ছাও চলতে পারে।
তাই, 'কি নিয়ে লিখলে'র জবাবে আমি বেশির ভাগ সময়েই "এ...ই" বলে হাতটা একবার ঘুরিয়ে চারদিকে ইঙ্গিত করি। বোধ হয় তাতে এরকম একটা মুদ্রা হয়, যাতে স্পষ্ট কিছু বোঝা যায় না। তাই কেউ আর আমার বই বিশেষ কেনেন না। শুধু "সত্যি তুমি যা গম্ভীর, সারাক্ষণ ভাবো, ওসব চিন্তা আমরা বুঝবোই না" বলে চলে যান। আরো সমস্যা হলো, যেতে যেতে বলে যান, "তুমি একদিন খুব বড় লেখক হবে"।
অতএব, হাতে রইলো পেন্সিল।
এখন কথা হলো, আমি গম্ভীর হয়ে থাকি অনেক সময়, সে-ও ঠিক। আমি ভাবি, সে-ও ঠিক। কিন্তু তার সঙ্গে আমার বইগুলোর দুর্বোধ্য হওয়ার যোগ কোথায়, বুঝতে পারি নি। সুপাঠ্য লেখালেখি করার জন্য অকারণে হাসা বা কম ভাবা যে প্রয়োজনীয়, আমার মনে হয় নি কোনোদিন। কিন্তু সরল পাঠকমস্তিষ্কের যদি বোধ হয়, আমার লেখাগুলি পড়লে সে-ও এরকমই রামগড়ুরের ছানা ও ভাবুক হয়ে যাবে, সে বিষয়ে কিছু করতে আমি সত্যিই অপারগ।
আমি মূলতঃ কবিতা লিখেছি এতদিন, সে-ও ভারি অন্যায় হয়েছে। কারণ, কবিতা বোঝা নাকি আরো কঠিন। আরো সময়-সাপেক্ষ। কবিতা বোধ হয় মানুষকে খুশি থাকতেই ভুলিয়ে দেবে। গদ্য লিখেছি কিছু। পরে আরো লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু আজ থেকে তিরিশ বছর পরে যদি আমি আদৌ লিখি, এবং গদ্য লিখি, তবুও আমার প্রাথমিক ভাষা হবে কাব্য। কারণ? ওই একটি জিনিস আমাকে কোনো 'বোঝা'য় আটকে দেয় না। কবিতা বুঝতে চাইলেই কেলেঙ্কারি। তেরো নম্বর লাইনে কবি কী বলতে চাইলেন, সে দিয়ে আপনার কী? তেরো নম্বর লাইনে আপনার যা মনে হলো পড়ে, সেটুকুই বোধ। বোধ। বোঝা নয়। বোঝা নেই। বোঝা যায় না।
কবিতা ছড়ি ঘোরায় না পাঠকের ওপর। আমার লেখা -- গদ্য, পদ্য -- পাঠকের ঘেঁটি ধরে বলে না, ওইটা অর্থ, ওর কাছে যা। আমি বড়জোর কিছু স্থির ছবির কোলাজ তৈরি করি, কিছু মুহূর্তে উপস্থিত থাকার অনুভূতি লিখি মাত্র। অর্থ উদ্ধার নয়, সংযোগ স্থাপন করলেই সে লেখা 'বোঝা' যাবে।
আর না হলে, ভুল বোঝা। যেমন এই লেখাটাকেও অনেকেরই হাসির লেখা বলে মনে হবে।
ছবি: শুভংকর
Comments
Post a Comment