মা আর মেয়ে
মেয়েটার ভারি ইচ্ছে ছিল, হয় পাইলট হবে, নয় তো পর্বতারোহী। হয় সে বরফশৃঙ্গের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাবে প্লেন, নয় তো নিজে উঠবে সেই শৃঙ্গে। বেস ক্যাম্প, সামিট, রেডপয়েন্ট -- শব্দগুলো তার মাথায় সুরের মতো বাজত। রাত্রে ঘুমের মধ্যে গায়ে এসে লাগত কনকনে হাওয়া। মাউন্টেনিয়রিং ইন্সটিটিউটের আশপাশ দিয়ে ঘুরেও এসেছিল। বা ভেবেছিল, প্লেনযাত্রীদের জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার গর্ব সে ছুঁয়ে দেখবে। কারাকোরাম, গডউইন অস্টিন -- কারা যায় সে চুড়োয়? পথে কি কি বিপদ? প্লেন যদি কখনও এয়ার পকেটে পড়ে? তবেই তো তার পরীক্ষা! ছোটোবেলায় তার প্রিয় বই ছিল 'তিব্বতে টিনটিন'। ওইরকম দুর্গমে যাবে সে।
অথচ, মধ্যবিত্তির শিকড় তার জন্য বরাদ্দ করেছিল কেবল প্রাইভেট ফার্মে ডেস্কজব। নাইট শিফ্ট থাকতে পারে, এই ভয়ে তাকে সাংবাদিকতাতেও ছাড়া হয় নি। ব্যাঙ্কের বদলে শিক্ষকতার কাজ হলেও হত। মেয়েটার কিছু যেত আসত না। তার কাছে এই সবই এক। আজ সেই মেয়ের বিয়ে।
শীতের সকালের রোদে, জানালার ধারে বসে থাকা মেয়ে যখন কাজল বেছে নেয় বিকেলের সাজের জন্য, একটু দূর থেকে তার মা দেখেন তাকে। অবাক হয়ে, মুগ্ধ দু' চোখ ভরে দেখেন। এই এতদিনে বুঝি তাঁর মনে হয়, তাঁর মেয়ে বড় হয়েছে। কনের সাজ ছাড়াই সে বধূরূপা। বাসন্তী শাড়িতে গায়ে-হলুদের প্রস্তূতি -- তার কন্যার ঠোঁটের কোণে যেটা লেগে আছে, তা হাসি, ঘুম না জাগরণ -- তা কি বোঝেন তিনি? মনে পড়ে প্রায় তেত্রিশ বছর আগের কথা? তার বিয়ের দিনের সকাল? মনে পড়ে। কিন্তু সেই সকালের আগের স্বপ্নগুলো ঠিক ঠাহর হয় না। ছিল কি কিছু স্বপ্ন? ছিল। না হলে অতদিনই বা বেঁচেছিলেন কি করে! ঐ স্বপ্নগুলোই আজ তাঁর কন্যার ঠোঁট ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। তাঁর চিনতে পারার কথা নয়।
বাইরে, ইলেকট্রিকের তারে তিনটে ফিঙে এসে বসেছে। শহরে ফিঙে নিত্যযাত্রী কি? তাদের কর্কশ ডাকে মনে পড়ে যায় শিলিগুড়ির কথা। একদম থুম মেরে যাওয়া দুপুরে টেলিগ্রাফের তারে ফিঙে বসে ডাকত। বারবার। স্পষ্ট মনে আসে। তাঁর কন্যার কি মনে আছে সে সব? তখন সে বেশ ছোটো। আর কতজনেরই বা ফিঙের ডাকে শৈশব উথলে ওঠে!
মা দেখেন, বাইরের ঝিরিঝিরি শিরীষ পাতা আড়াল করছে মেয়ের মুখে এসে পড়া রোদকে। আবার সরে যাচ্ছে। শীতের রোদ পালিয়ে বেড়ায় বড্ড। কিছুক্ষণ আগে যে রোদ কন্যার কাঁধ ছুঁয়ে ছিল, এখন সে তার গালে। উত্তুরে হাওয়ায় তরতর করে অবিবাহিতা শাড়ির আঁচল, কাঁধের ওপর পড়ে থাকা এলোচুল। কবিতার প্রতিটা শব্দ উচ্চারণের শেষে যেমন শুধু শূন্যতাই পড়ে থাকে, তেমনই, মা ভাবেন, যাবতীয় স্বপ্ন উচ্চারিত হওয়ার পর সেই ছেড়ে যাওয়াই একমাত্র ঠিক, দস্তুর। এ' কথা তাঁর আজ নতুন করে মনে হয়, তাঁর কন্যার ঠোঁটের কোণ দেখে। বাইরে সানাইয়ের সুর বেজে ওঠে মৃদু। একসঙ্গে, এই মুহূর্তে, মা ও মেয়ের সমগ্র কৈশোর তার উদ্ধত স্বপ্নগুলো নিয়ে প্রথম ও শেষবারের মতো ঝামরে পড়ে মধ্যবিত্তির বুকে।
ছবি: পিন্টারেস্ট
Comments
Post a Comment