Followers

শান্তিনিকেতন

শান্তিনিকেতন থেকে ফেরা কখনই সম্পূর্ণ ফেরা নয়। অনেক কিছু থেকে যায় প্রতিবারই সেখানে। সে কী বা কে, বলতে পারি না। শান্তিনিকেতন উচ্চারণে আমরা বেশিরভাগই যে-মর্মে উদ্বেল হয়ে পড়ি, এ ঠিক তেমন নয়। এ যেন আসলে এক না-দেখা অশোকফুল, না-থাকা বাসন্তী রৌদ্র, দরজাবন্ধ বাড়ির উঠোনে ফুটে থাকা বাগান, না-জানি কত বছরের স্মৃতি ধারণ করা একটা বিশাল, খাঁ খাঁ মাঠ, কাউকে কিছু না জানিয়ে নেমে আসা সন্ধে।
  
বিকেলের রেলগাড়ি ঝমরঝম শব্দে অজয় পেরিয়ে যায়। ট্রেনের পশ্চিমের জানালা থেকেও রোদ প্রায় সরে গেছে। এখনও যদিও অনেকটাই পথ বাকি, তবু, ট্রেনে করে কোনও নদী পেরোলে আমার মনে হয়, আমি বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ একপলকের জন্য বুকে কেঁপে ওঠে কিছু দৃশ্যকল্প। হাওড়া স্টেশনের ভিড়, ক্রমাগত ট্রেনের ঘোষণা, মাথায় ভার বা উদ্বেগ নিয়ে ছোটাছুটি কতজনের, সে সব ঠেলে ই-১ বাসে ওঠা। তারপর আর মনে পড়ে না। এই মিলিয়ে আসা বিকেল রৌদ্রের মতো হারিয়ে যায়। একটু আগে যখন অজয়ের চরা পেরোলাম, জানালায় রাখা আমার হাতের আঙুল ছুঁয়েছিল সে রোদ্দুর। এখন সে ছায়ার মতো লেগে আছে আমার শার্টের আস্তিনে। 
  
সূর্য যত সরে যায়, তত মনে পড়তে থাকে শান্তিনিকেতনের কথা। ইস্কুলের বন্ধুদের 'বড়' হয়ে প্রথম বেড়াতে যাওয়া শান্তিনিকেতনে। 'প্রান্তিক' নামটা শুনেই চলে যেতে ইচ্ছে করেছিল সেখানে। রেলব্রীজে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছি, নিচ দিয়ে থ্রু ট্রেন যাওয়ার সময় কেমনভাবে আমার পায়ের তলার পাটাতনগুলো কাঁপিয়ে দিয়ে যায়, অনুভব করবো বলে। শান্তিনিকেতনের মানুষ-না-থাকা বাড়িগুলোর জীর্ণ উঠোন দেখতে ভারি ভালো লাগে আমার। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ি, মনে মনে চরিত্র আঁকি সেই উঠোনে, দরজার গা ঘেঁষে একটা ইজিচেয়ার রাখি, বেতের চা-টেবিল রাখি, শুকিয়ে যাওয়া বাগান আবার সাজিয়ে দিই, জানালাগুলো খুলে পর্দার রং ভাবি মনে মনে। কিন্তু তারপর রোদ্দুর পড়ে আসে। আর কিছুই মনে পড়ে না তেমন। কষ্ট হয়। শুধু বুঝি, শান্তিনিকেতন থেকে সম্পূর্ণ ফিরে আসা যায় না কোনোদিন। এই যে এখন আমার এই ফেরা, তার কোনো সঠিক কারণ নেই। ফিরতে হয়, তাই ফিরছি।
  
হঠাৎ চোখে এসে লাগে কিসের ঝলক যেন? রৌদ্রের? আবার রৌদ্রের? তাহলে রেলগাড়ির পশ্চিমের জানালা দিয়ে সে হারিয়ে যায়নি, আড়াল হয়েছিল শুধু। এখন আকাশের কোন এক কোণা থেকে সে এসে পড়েছে অপরাজিতার ঘড়ির গোল ডায়ালে। সে ইচ্ছে করে আমার চোখের উপর ফেলছে সেই আলো, আমার উল্টোদিকে বসে। আমি মুখ সরিয়ে নিই; সে হাসে। রৌদ্রের বুঝি সোহাগ জাগে এসব দেখে, সে অস্তের উল্টোপথে এসে আবার, একবারের জন্য, অপরাজিতার মুখে শাশ্বত সময়ের মতো ঝরে পড়ে। রেলগাড়ি ঢালু রাঢ়ভূমি পেরিয়ে যায়। আমি সে মেয়েকে দেখি, রৌদ্রে। অশোকফুল, ফুটে থাকা বাগান, বাসাবাড়ি -- সব মনে পড়ে।

Comments