Followers

বিদ্যাসাগরের মূর্তি

গতকালের ঘটনা যেমন মর্মান্তিক, তেমনই, গতকালের ঘটনার বিরুদ্ধে উঠে আসা কিছু কিছু প্রতিবাদের ভাষা যা এখনও অব্দি আমার চোখে পড়েছে, একইরকম বেদনাদায়ক। বেদনাদায়ক, কারণ এই ভাষা উঠে আসছে আমাদের শিক্ষিত সমাজেরই কিছু কিছু অংশ থেকে। এখনও, এবং এরপর যদি আরও খারাপ কিছুও ঘটে, তবু আমি মনে করি, অশিক্ষার প্রতিরোধ কখনও অশিক্ষা হতে পারে না। 
  
আমাদের চারপাশে এখন যা-কিছু চলছে, তার মূলে কেবলমাত্র একটা তফাৎই আমি দেখতে পাই। কোনো দল, আদর্শ, ম্যানিফেস্টো, জনস্বার্থ, কম ভ্রষ্ট-বেশি ভ্রষ্ট নয়। মেরু কেবল দুটো -- শিক্ষা, আর অশিক্ষা। 'অশিক্ষা' -- এই অবস্থানটুকুই নির্ণয় করে দেয়, বাকিটা কেমন হতে চলেছে। 'শিক্ষা' -- এই অবস্থানটুকুই নির্ণয় করে দেয়, শিক্ষিতরা অশিক্ষিতদের তুলনায় কিছু জিনিস বেশি পাবে। যেমন, বেদনা, অনুশোচনা, পরিমিতিবোধ, এগুলো তাদের মধ্যে জারিত হবে, কারণ শিক্ষা তাদের সেইভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। শিক্ষার আক্রোশ যে অশিক্ষার বেলেল্লাপনার চেয়ে আলাদা হবে, সেটাই দস্তুর। তাই, যখন দেখি, শিক্ষিত সমাজের প্রতিবাদের ভাষাও অশিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে হঠাৎ হঠাৎ, রাগের চেয়েও বেশি ভয় হয়। অশিক্ষা তাহলে কি আমাদের একেবারেই গিলে ফেললো? তাই, প্রতিবাদও যেমন হওয়া আবশ্যক, প্রতিবাদের ভাষা বিগড়ে গেলে তা উল্লেখ করাও আবশ্যক। কারণ শুধরে নেওয়া শিক্ষার ধর্ম।
   
তাহলে কি প্রতিবাদ করা হবে না? যে যা ইচ্ছে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাবে, আর আমরা 'অ-এ অজগর আসছে তেড়ে' বলে বসে বসে পা দোলাবো?
একেবারেই না। আবারও বলছি, প্রতিবাদ হওয়া আবশ্যক। প্রতিবাদ হয় বলেই এখনও কোনো সুদূর প্রান্তে আশার আলো দেখা যায়। আমি বলছি কেবল কটু প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে। চন্দ্রিল ভট্টাচার্য একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, আজকাল তর্কে আমরা যুক্তিবিন্যাস করি এইভাবে, "অমুক খুব বাজে একটা মানুষ, কারণ সে একটি *চার অক্ষর*"। এতে যুক্তি বিন্যাস হয় না, যুক্তির বিনাশ হয়। রাগের মাথায় কার্যকারণ না ভেবে একটা গালি দিয়ে দেওয়া অনেক সহজ, অবদমিত সমর্থন এবং ফেসবুকে শেয়ারও পাওয়া যায় বটে। কিন্তু সেই সময়ের জন্য আমরা ভুলে যাই, আমরা আসলে ঠিক এই অশিক্ষিত প্রয়োগেরই প্রতিবাদ করছিলাম।
   
কিছু জিনিস সহজ করে নেওয়া যাক:
  
কেউ/কারা কেন খারাপ, এই নিয়ে যুক্তিবিন্যাস করতে আপনার অসহ্য লাগে, কারণ তারা এতই খারাপ যে সে আর বলার নয়!
তাহলে? 
বলবেন না! মিটে গেল! কর গুণে যুক্তি দেওয়ার তো দরকার নেই যে সে কেন খারাপ! যারা বোঝার, তারা বুঝে গেছে যে সে খারাপ। যারা বোঝেনি, তারা আপনার কথা শুনেই যে বুঝে যাবে, এমন না-ভাবাই ভালো, কারণ আপনি শিক্ষার জমিতে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছেন, আর তারা অশিক্ষার জমিতে দাঁড়িয়ে সে কথা শুনছেন (না)। যুক্তি দিয়ে তো তাদের বোঝানো যাবেই না, শেষে আপনি গালি দিলে তারা তখন সুর ধরবে, সেই তো নেমে এলি আমাদের লেভেলে, আবার এত শিক্ষা কিসের?
  
কাজেই, কে কতটা খারাপ, এবং কার কতটা শাস্তি পাওয়া প্রয়োজন, এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এর চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন আমাদের প্রতিবাদের ভাষা, সংগঠন মজবুত করার।
   
মনে রাখবেন, ধ্বংস আমরা সকলেই চাই কমবেশি। আমাদের অস্ত্রগুলো আলাদা। আর উদ্দেশ্য আলাদা। কেউ ধ্বংস চায় স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে। আমরাও প্রলয় চাই, সৃষ্টি আনার তাগিদে। কারুর অস্ত্র বোমা, ছুরি, বন্দুক, মুঠি, দম্ভ, গালাগালি, অযুক্তি -- weapons of annihilation!
  
আর আমাদের অস্ত্র?
   
দোহাই, আমাদের প্রতিবাদের ভাষা, আমাদের অস্ত্র গঠনমূলক করুন -- weapons of construction! রগ ফুলিয়ে, গলা ফাটিয়ে "দেখে নেবো", "বুঝে নেবো", "মেরে দেবো" বলে আপনি পেরে উঠবেন না, কারণ ওটা আমাদের পথ নয়। ছিলও না কোনোদিন। এরকম সময়ে নিজেকে সংযত রাখা কঠিন, আর ঠিক এই সুযোগটা নিয়েই অশিক্ষা আমাদের গালাগালি দেওয়ার শর্টকাট বাতলে দেয়।
  
বরং, কিছু গড়ে তোলা যাক। খুব কঠিন? 
আমরা এখনও বলি, বুদ্ধিজীবিরা কিছু বলছেন না কেন? বা এত কম বলছেন কেন? 
কী আশ্চর্য! বলছেন না, তো বলছেন না! কম বলছেন তো কম বলছেন! কী করা যাবে! আমরা কি এতই নিয়ম ধরে নিয়েছি, যে একদল শিক্ষিতই আমাদের হয়ে বলবেন, আমরা শুধু তাদের কথায় সায় দেবো, এবং তারা কিছু না বললে আমরাও বোবা? আমরাও যে স্বর হয়ে উঠতে পারি, সে ভরসাটুকুও কি নিজেদের উপর থেকে চলে গেছে?
   
এখনও সময় আছে। আসুন, স্বর গড়ে তুলি। প্রত্যাশিত কেউ কথা না বললে, আসুন, নিজেরা নিজেদের শিক্ষার রুচিতে কথা বলি। আমাদের অপরিচিতি হয়তো বাধা। আমরা একবার বললে হয়তো অনেকেরই কানে পৌঁছোবে না। প্রতিকূলতা অনেক। ভাবলে, আরও পাওয়া যাবে। কিন্তু স্বর-গঠনের পথে তা অন্তরায় হয়ে উঠবে কেন? আমরা যে বিরক্ত নই, আমরা যে শিক্ষিত পন্থায় প্রতিবাদ করছি না, আমরা যে নীরব, তা নয়। সবই হচ্ছে, কিন্তু ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাবে, sporadically, ব্যক্তিগত স্বর হিসেবে। এই ব্যক্তিগত স্বরগুলোই একসঙ্গে, একটানা কাজ করলে (সবসময় যে দল গড়ে একজোট হয়ে করতে হবে, এমন নয়) যৌথতা তৈরি হবে। এখন শুধু সেটুকু প্রয়োজন। যে যা পারি, করি!
  
যিনি বাগবিদ্যায় পারদর্শী, তিনি কথায় আমাদের ভাবান। তাঁর উচ্চারণ তাঁর দেশ।
 
যিনি লিখতে পারেন, লিখুন। ভাষা, শব্দ তাঁর দেশ।
 
যিনি গান বাঁধতে জানেন, বাঁধুন। সুর তাঁর দেশ।
  
যাঁর দেশ নাটক, চলচ্চিত্র, তাঁরা সেখানে স্বর খুঁজে নিন।
  
ছবি আঁকা, ছবি তোলা, ছোট ছোট হাতের কাজ, মাটির কাজ, ভাস্কর্য সব আমাদের দেশ, আমাদের স্বর।
  
বই পড়ে, পড়াশুনা করে যা জানলেন, নির্দ্বিধায় বলুন। তা যতই সামান্য হোক।
 
এপার্টমেন্টের বা পাড়ার কচিকাঁচাদের একজোট করে সম্ভব হলে বিনামূল্যে রবীন্দ্রনাথ পড়ান। ১৩০ কোটি যতটা আপনার দেশ, আপনার বাড়িটাও ঠিক ততটাই।
  
আসুন, শিক্ষার স্বর গড়ে তুলি। ইঁটের বদলে পাটকেল ছোঁড়ার পন্থা আমরা নিতেই পারি। কিন্তু আবারও, সে পথ আমাদের নয়।

Comments