Followers

ইউনিভার্সিটির দিনগুলো

ইউনিভার্সিটিতে তখন আমাদের হাতে পড়ে আছে শেষ ক'টা দিন। ২৬বি-তে বেশিরভাগ ক্লাস হয়। ক্লাসের সংখ্যা কমে আসে, ছাত্রছাত্রী কমে আসে, রোদ্দুরও। ক্লাসরুমের বিরাট জানলার বাইরে নুয়ে আছে বুড়ো কৃষ্ণচূড়ার ডাল। কচ্চিৎ কদাচিৎ সাড়ে দশটার ক্লাস করতে এলে দেখা যায়, সকালের সূর্য ঘোলাটে কাঁচের বাইরে ঝিরিঝিরি হয়ে পড়ছে কৃষ্ণচূড়ার প্রথম সবুজ পাতায়। বেলা বাড়লে আর সে রং থাকে না। মধ্যমার্চের সূর্য পশ্চিমে সরে যায়, কলুটোলা স্ট্রীটে গাড়িঘোড়ার ঝক্কি বাড়ে, বেলা দেড়টা নাগাদ একটা অদ্ভুত তেরছা, বিশ্রী, গরম রোদে জানলার গায়ে বসা দুষ্কর হয়ে ওঠে।
   
২০ নম্বর ঘরে মডার্ন ইউরোপিয়ান ক্ল্যাসিক্স-এর ক্লাসে রোদ ঢোকে না। বড় অন্ধকার সময়ের সাহিত্য সে-সব। চওড়া বেঞ্চগুলোয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকি আমরা হাতে গোনা কয়েকজন। সুদেষ্ণা দি লড়ে যান ব্যদল্যের নিয়ে -- সীন নদীর ধারে ঊষা ফুটে ওঠে 'মর্নিং টোয়াইলাইট'-এ। থার্ড ইয়ারে পড়া 'প্রেলিউডস'-এর সকালগুলোর সঙ্গে সে সকাল মিলে যায়। 'ইভনিং টোয়াইলাইট' পড়লে মনে পড়ে সুনীলের 'পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া আর কিছু থাকে না'। সেই রাতের কর্কশ স্বর দেশ দেশান্তরের সাহিত্যে, কালান্তরের সাহিত্যে প্রতিধ্বনিত হয়, ফিরে ফিরে আসে। আমাদের ছড়ানো ছিটানো দুটো বছর মোহনায় এসে পড়ে।
  
২৫০ জনের একটা প্রায় ছন্নছাড়া ব্যাচ ছিল আমাদের। 'একসঙ্গে', বা অন্ততঃ বেশ কিছুজন মিলে কিছু করার বাসনা কোনোদিনই বিশেষ জাগে নি আমাদের। আমার তো তেমন মনে পড়ে না। ক্লাসরুমগুলোয় আমাদের বেঁচে থাকা ছিল সমুদ্রে ভেসে থাকা দ্বীপপুঞ্জের মতো -- একদিকে জটলা করে ৭ জন, আরেকদিকে ৯ জন, ক্রমে ভেঙে ভেঙে ৫ জন, ক্লাসের শেষ দুটো বেঞ্চ মিলিয়ে ৫-৬ জনের দল, এরকম। আর ক্লাসে মন না টিকলে এসবিআই এর সামনে রুটি-ঘুগনির দোকান, বা দিলখুশা কেবিন, বা নিদেনপক্ষে ইউনিভার্সিটির পিছনের দিকে পাঁচিলের গায়ের ঝুপড়ি দোকান 'চিনিজ' -- আহা, সেখানকার প্যান-ফ্রায়েড মোমো! 
   
শেষ হয়ে আসার নিয়মই এই যে, আপাত-উড়ো, মনে-না-রাখলেও-চলে এমন স্মৃতিরা ভারি হয়ে আসে। হঠাৎ হঠাৎ, এক্কেবারে কোনোরকম ভূমিকা ছাড়াই কে যেন বাঁধের দরজা খুলে দেয় ইচ্ছেমতো, বিপদ বুঝতে পারার আগেই সখাতসলিলে ডুবে, ভেসে যায় 'এখন', আর আমরা মনে করি, 'তখন'-এ বেঁচে থাকার শান্তি আর কিছুতেই নেই। গোল হয়ে বসে যখন আড্ডা হয়, উঠে আসে ইউনিভার্সিটির শুরুর দিনগুলোর কথা। স্নাতকোত্তর স্তরে আসার আহ্লাদে তখন বেঞ্চে বেঞ্চে আঁতলামো প্র্যাকটিস করা হচ্ছে। ফার্স্ট বেঞ্চে আলব্যের কামু, সেকেন্ড বেঞ্চে অশ্রুতপূর্ব পাকিস্তানি লেখক সুলতান মামুদ, থার্ড বেঞ্চে একো, ফোর্থ বেঞ্চে ফুকো, ফিফথ বেঞ্চে ফেমিনিজম এর ছ্যাঁকা, সিক্সথ বেঞ্চে আমরা ভ্যাবাচ্যাকা। ‘নয়েন্দোপুর তেকে এয়িচি’ বললে লোকে বুঝছে না। পেছন থেকে ডেকে “এই, র‍্যাবোঁ পড়েছিস?” জিজ্ঞেস করলে শিউরে উঠছি, “সে কে রে ভাই?” “সে কি! আরতুর র‍্যাবোঁ! নাম শুনিসনি?” ওহ, যাকে আমরা বহুদিন অব্দি আরথার রিম্বো নামে জানতাম? র‍্যাম্বোর ভাই ভাবতাম? ছি ছি ছি ছি, কি লজ্জা! ওদিকে একজন প্রফেসর কি যেন একটা দুলে দুলে পড়িয়ে যাচ্ছেন। এক মাস হয়ে গেল, বুঝতেই পারছি না বিষয়টা কি! মাইক খারাপ, অন করলে পাম্পঘরের মতো আওয়াজ বেরোয়, এদিকে বাইরে দিয়ে ট্রাম, অ্যাম্বুলেন্স, বাস, ট্যাক্সি সব চলছে। সিলিঙে সিপাহী বিদ্রোহের সময়কার ফ্যান, কাজেই প্রতিদিনই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার লাইভ ডেমো। সব বেঞ্চেই মাথা গুঁজে গুনগুন করে গল্প হতে হতে সেই সম্মিলিত গুনগুনে একেবারে গোটা ক্লাস মাছের বাজারে ‘চড়া দামে সেরা ভেটকি’! একজন দিদি আসত মাঝেমাঝে, লিফলেট দিত, ব্যাজ পরিয়ে দিত, লাল বেদীর মিটিঙে ডাকত, আর আমরাও অমনি সোনামুখে বলতাম, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!” নয়েন্দোপুরের ছেলে বলে কতা, পাট্টি না বুজি, পলিটিক্স তো বুজি রে বাওয়া! 
   
কিন্তু এখন সব কেমন নিভে আসে। ২৫ নম্বর ঘর যেমন ফার্স্ট ইয়ারদের দাপটে গমগম করে, তাতে আমাদের বছর দেড়েক আগের কথা ধাক্কা খেয়ে বেড়ায় হয়তো, কিন্তু ২০, ২৬বি, বা ২৭ গোধূলিতে দাঁড়িয়ে থাকে লগ্নভ্রষ্টার মতো, 'আছে'র থেকে 'ছিল' হয়ে 'নেই'-তে যাওয়ার মুখে। দ্বারভাঙ্গা আর আশুতোষের মধ্যিখানের বারান্দাগুলো আচমকাই দুপুরের শেষে মেঘলা হয়ে যায়, আমরা ভাবি ঝড় আসবে। আসে না। কুমার এলোমেলো ঘুরে বেড়ায় ক্যামেরা হাতে, ফ্রেমের খোঁজে। বিরাট জানলার পাশে সপ্তর্ষি দাঁড়িয়ে থাকে। রাস্তা থেকে শব্দ ভেসে আসে। মিছিল বেরিয়েছে। দলে দলে যোগ দিতে হবে। শাসকদল হলে যা চলছে তা চলবে; বিরোধী হলে, চলবে না। পতাকা, প্ল্যাকার্ড হাতে কলেজস্ট্রীট পেরিয়ে কলুটোলা’র রাস্তা ধরে সেন্ট্রাল বেয়ে এগিয়ে চলেছে ধর্মতলার দিকে। এমনিতে শান্তিপূর্ণ। শুধু অশান্তি করছে এই বাস-ট্রাম-লরি গুলো। একটার পিছনে অন্যটা খাবি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে, হর্ন দিচ্ছে, চিৎকার করছে। রাস্তা পেরোতে গিয়ে মানুষ ঢুকে পড়ছে মিছিলে, মিছিলের মানুষ রাস্তা ভুলে যাচ্ছে। এর সামান্য দূরেই, ইউনিভার্সিটি গেটের পাশে চা-কাকু তার ছোট্ট পসার সাজিয়ে বসেছে। দুধ-চা, বেকারি বিস্কুট, আর কেক। আমরা নেমে ভিড় জমাচ্ছি সেখানে। ফি-সপ্তাহে হাজারো মিছিল গেছে, কেউ বলেছে “চলবে”, কেউ বলেছে “চলবে না”। চা-কাকু’র দোকান দিব্যি চলেছে। আমরাও চা খেয়েছি, পাশে দাঁড়িয়ে ওরাও খেয়েছে। দু’ পক্ষই একইভাবে বলেছি, “এই সে’দিন তিন টাকার ভাঁড় ছিল, আজ পাঁচ হয়ে গেল?” উত্তরে হাসি শুধু। 
    
চায়ের ভাঁড় শেষ করে আমরা বইয়ের খোঁজে এগোতে থাকি। ওরা মিছিলে যায় আবার। পিছন ফিরে তাকালে দেখি, মিছিল-শিকড় থেকে উপরে উঠে গেছে আশুতোষ বিল্ডিং। ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রী কমে আসে, রোদ্দুরও। আমাদের অনেক কিছু করার ছিল। যেমন সব্বার থাকে। আমাদের অনেক কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। যেমন কারুরই হয়ে ওঠে না। কৃষ্ণচূড়ায় ঝিরিঝিরি রোদ বিকেলের দিকে হারিয়ে যায়। সকাল আর বিকেলের মাঝের এই রোদে আমাদের হাতে অনেক গল্প গড়ার সুযোগ এসেছিল। যেমন সব্বার আসে। আর আমরা অনেক গল্প ভেঙেছি। যেমন সব্বাই ভাঙে।  অনেক বড় মিছিল। ন্যাজা-মুড়ো একবারে দেখা যায় না। একটার ওপর অন্য কথা বসতে থাকে, শুরুর কথাগুলো শেষে পালটাতে থাকে। ‘না’ টা ‘হ্যাঁ’, ‘হ্যাঁ’ টা ‘না’ হয়ে যায়। আমরা খেয়াল করি না, সেই বিরাট কৃষ্ণচূড়া-জানলার গায়ে রোদ দেখার দিন আমাদের আর নেই বিশেষ একটা।

Comments