Followers

বাঙালীর হিন্দি

১। প্রথমেই ‘হিঁয়া’ আর ‘হুঁয়া’। এই হল বাঙালির হিন্দির বাইনারি। গোটা পৃথিবী এ’ দিয়ে গুছিয়ে ফেলা যায়। উব্যর (গ্রেটার কলকাতায় ‘উবের’) বুক করে বাঙালি ড্রাইভার পেলে বাঁচোয়া, আর যদি অবাঙালি ড্রাইভার পড়ে, গড হেল্প হিন্দি! “আরে হাম তো কব সে বুকিং করাকে হিঁয়া খড়া হায়, আপ হুঁয়া কাহে?” এমনিতেই ট্যাক্সিচালকরা কি দোষ করেছিল ইতিহাসে জানি না, রাধারমণ মিত্র বা শ্রীপান্থ, কেউই সে নিয়ে লিখে যাননি, কিন্তু ৮০ বছরের বাঙালিও ট্যাক্সিচালক পেলে মাওয়ালি-ভাষায় কথা বলে। তাও ফেস-টু-ফেস হলে একরকম। উব্যরে আবার ফোনে ডিরেকশন! “হুঁয়া সে এইসা ঘুমো” বলে শূন্যে বাঙালি হাতটা শাঁই করে ঘোরালো, ভাবল জিপিআরএসে বুঝি এটাও ধরা পড়ে যাবে! ওদিকে ড্রাইভার তো ভোম্বল! “ফির হুঁয়া যো যা কে গিরা, হুঁয়া সে ওইসা, অউর দেখো হুঁয়া হিঁয়া হো গয়া!” (মানে পৌঁছে গেছো!)
               
২। দুই প্রকার হিন্দি বলা বাঙালি হয় – 
ক) সবেতেই ‘হ্যায়’ বসায়। যথা, “হাম খানে যাতা হ্যায়, তুম ভি যাতা হ্যায় কেয়া ম্যায় লে আতা হ্যায় তুমহারে লিয়ে?” এঁদের কাছে হিন্দি=হ্যায়। আর কোনোদিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। একটা লাইন পেয়েছিস? লাগা “হ্যায়”! দেখি, কার বাপের কত সাধ্যি আমার হিন্দি বলা আটকায়! “চন্দরা কহিল, মরণ হ্যায়!” “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা হ্যায়!” “এত রক্ত কেন হ্যায়?”
খ) কিছুতেই ‘হ্যায়’ বলবে না। সবকিছু থেকে ‘হ্যায়’ বাদ। কেমন একটা ‘be’-verb ছাড়া ‘M gonna fuckin screw it up’-kinda হিন্দি! আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভাষা। “কেয়া দেতা? হাঁ? ইয়ে কেয়া দেতা তু?” প্রথমে শুনলেই মনে হবে ড্রাগের কারবার করা লোককে ধরেছে, কাছে গেলে দেখবেন সবজিওয়ালা ১ কিলোর বদলে ৯৮৫ গ্রাম দিচ্ছিল, তাও আবার বাঙালি সবজিওয়ালা! কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না, রেগে গেলে আমরা দুর্বাসার মতো হিন্দি বলি, ওই হিন্দি শোনাই চোরের শাস্তি!
           
৩। আমরা প্রায়ই প্রফেশন দেখে ভাষা ঠিক করি। যেমন, আমাদের বাড়িতে আগে এক ঝাড়ুদার আসতেন, বাড়ি-শুদ্ধু সবাই তাকে দেখলেই তেড়ে হিন্দিতে ইন্সট্রাকশন দিত, এবং তিনিও অতিশয় মিনমিন করে কি বেশ বলে সে সব পালন করতেন। মাঝে মাঝে ব্যোমকে আমাদের দিকে তাকিয়েও থেকেছেন, কিন্তু আমাদের সন্দেহ হয়নি। রাস্তায় ঘোরা নাপিত মানেই হিন্দিভাষী, মেথর মানেই হিন্দিভাষী, ট্যাক্সিচালক তো ... বাবা রে, ছেড়েই দিলাম! আমাদের পুরোনো প্রেম। শেষে একদিন সেই ঝাড়ুদার কেঁদেকেটে “বাবু আমার নাম বল্টু” বলায় আমরা “অ হরি, ফাটা পোস্টার নিকলা বল্টু”-মার্কা একটা হাসি দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছিলাম হিন্দি বলা থেকে।  
             
৪। বেড়াতে গিয়ে কোনও বাঙালিকে হিন্দি বলতে শোনা এক অভিজ্ঞতা। বাংলা মেগা-সিরিয়ালে সেই যখন কেউ গিলে করা পাঞ্জাবি আর ঘিয়ে রঙের ধুতি পরে এসে সন্ধেবেলা পাতিলেবু খেতে চাইলে লোকজন “দ্রিমিকি দ্রিমিকি দ্রিমি” আবহে বারবার তার দিকে তাকায়, আমার অবস্থা ওরকম হয়। হয়তো দোকানে দরদাম করতে হবে, গ্রুপের সবচেয়ে ভালো হিন্দি বলা মানুষটিকে ডাকা হল। আহাহাহাহা! সে কি উচ্চারণ! যেন অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার ওপর বোমা ফেলছে! সে কি কমিউনিকেট করার ক্ষমতা! যেন অনিল কুম্বলের ফিল্ডিং!
          
৫। আমিও এসবের থেকে দূরে নই। একবার উঁচুদরের ছড়িয়েছিলাম! ন্যাশনাল পার্কে বেড়াতে গিয়ে যেই না গাইডের মুখে শুনেছি এখানে বাঘ দেখার চান্স বেশি, উৎসাহ আর ধরে না! “বাঘ সম্বন্ধে প্রশ্ন চলতে পারে?” জিজ্ঞেস না করেই বলে ফেলেছি, “ইয়াহা শের ডাকতা হ্যায়?” সঙ্গে সঙ্গে আমার অন্তরাত্মা নভজ্যোত সিধুর মতো হেসে উঠলো। বুঝলাম, খুব বাজে ভুল করেছি। সঙ্গে সঙ্গে শুধরে নিয়ে বললাম, “ইয়ে... পুকারতা হ্যায়?” এবার দেখি অন্তরাত্মার সঙ্গে আমার দিদিও হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। 
           
৬। বাঙালি সন্তানের অবাঙালি বন্ধু বাড়িতে এলে আপ্যায়নের রীতি –
বাড়িতে ঢুকলে পরে, “বেটা তুমহারা নাম কেয়া?” “বহুত আচ্ছা লেড়কা! যাও! গল্প করো!”
বাড়ি থেকে বেরুনোর সময়, “বেটা তুমহারা নাম কেয়া?” (বেটার যদি শেষ দু' ঘণ্টায় নাম পাল্টানোর শখ জেগে থাকে, বলা যায় না) “বাঃ! বহুত আচ্ছা লেড়কা! এসো!”
           
৭। নেকু বঙ্গ-অ্যাংলো শিশুদের দিয়ে বাংলা বলানোর সেরা অস্ত্র হল হিন্দি। তারা ইংরাজিতে চোস্ত। এমনি কথাবার্তায় কিছু মনে না পড়লে তারা বলে “Arreh! That one – say it nah!” আর হিন্দিভাষী কারুর সঙ্গে কথাবার্তায় কিছু মনে না পড়লে “আরেহ উও কেয়া কেহতে হ্যায়... বল্‌ না বাবু... একটুও মনে পড়ছে না!”
                 
৮। বিদিশি ভাষা শেখার এমন চল বাঙালিদের মধ্যে ছাড়া আর কোন জাতির আছে, জানা নেই। ফ্রেঞ্চ, জার্মান, জাপানিজ, স্প্যানিশ, ল্যাতিন, আরও কি কি ভাষা আমরা শিখি! কিন্তু হিন্দি নয়! নেভার! বাঙালি হয়ে হিন্দি শিখব? শচীন শিখবে কভার ড্রাইভ? আমাদের কলেজে একজন হিন্দির মাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি ক্লাস নিলে তাঁকে এবং তাঁর গুটিকতক ছাত্রকে আমরা উঁকি মেরে দেখতে যেতাম এবং “ইয়েম্মা, হিন্দিইই” বলে হাল্কা আওয়াজ দিয়ে পালিয়ে আসতাম।
                  
৯। বর্ডার অঞ্চলে বেড়াতে গেছেন? গালুডি? ঘাটশিলা? কি বলবেন বুঝতে পারছেন না? রেল স্টেশনে নেমে দেখেছেন হিন্দিতে স্টেশনের নাম লেখা? দেখেই আপনার হয়ে গেছে? নিশ্চিন্তে বাংলা বলুন। আপনি হিন্দি শিখবেন না, সে ওরা অনেক আগেই বুঝেছে, এবং আপনার জন্য বাংলা শিখে রেখেছে।
                
১০। ইদানীং মজার লেখা লিখতে খুব ভয় করে। কাকে আবার কোথায় আঘাত দিয়ে ফেলি হাসাতে গিয়ে। তাই এখন রেগুলার এ’সব লেখার সময় অক্সফোর্ড বুক অফ ক্রিটিকাল থিওরি নিয়ে বসি। সবসময় মেলাতে থাকি, এখন আমি কোন থিওরির কত নম্বর ধারার আওতায় পড়ছি। ওপরের লেখাটা লিখে এখন এটাই মনে হচ্ছে যে, এখানে আহতরা বলতেই পারেন, “বাঙালির কি দায় পড়েছে হিন্দি শেখার? কেউ একটা রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে দিলেই হল? আজ তো বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলে সবাই হাবুডুবু খেত! আপনি কি এই সহজ লজিকটা বুঝছেন না যে একজন পোস্টকলোনিয়াল সাবজেক্টের বেসিক রাইট হল তাঁর মাতৃভাষাতে আজীবন কথা বলে যাওয়ার ইচ্ছা করা, এবং বাঙালি হিন্দি বলতে পারে না বলে আপনি আসলে আবার এক ধরণের প্রচ্ছন্ন লিঙ্গুইস্টিক হেজেমনির আভাস দিচ্ছেন? বা আপনি যদি একটা পোস্টন্যাশনাল কালচারাল স্পেসের কথাও বলেন ...”, আমার একটাই কথা বলার। আমরা না, বাঙালি! ওসব পোস্টকলোনিয়াল সাবজেক্ট-ফাবজেক্ট হবে তোদের জন্য। লে যা! খুঁটে খা! হাসির কোনও থিওরি হয় না!

ছবি: পিন্টারেস্ট

Comments