২৫শে বৈশাখ
রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে এমন ভাবা বোধ হয় খুব অনুচিত হবে না, যে তাঁকে গ্রহণ করার, ধারণ করার দুটি দিক আছে। একটি আত্মিক, অতিব্যক্তিগত। দ্বিতীয়টি প্রায়োগিক, ব্যবহারিক, জনস্বার্থ-কেন্দ্রিক।
কিন্তু তাঁর জন্ম, কর্ম, ও মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে তাঁর উপর আমাদেরই আরোপিত একটি তৃতীয় দিক। তা হলো ঐশ্বরিক। লেখক হিসেবে, গীতিকার হিসেবে, সুরকার হিসেবে, নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে, চিন্তক হিসেবে, দার্শনিক হিসেবে, স্বদেশী হিসেবে তাঁর যে বিপুলতা, বিশালত্ব, তাকে আমরা কোনো যুক্তি দিয়ে যে কেবল বোঝার চেষ্টা করিনি তাই-ই নয়, অযুক্তি-কুযুক্তির নির্মম প্রয়োগে আমরা এই মানুষটিকে কখনও কখনও অবতার হিসেবে দেখতেও দ্বিধা করিনি।
এতে দোষ ছিল না। কেউ আত্মিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে ঈশ্বররূপে অর্চনা করলে তা কোনোমতেই দোষের নয়। বরং রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাজের সিকিভাগের মাধ্যমেই আমাদের অনেকের ব্যক্তিগত ঈশ্বর হয়ে উঠেছেন, সে আমাদেরই প্রাপ্তি। সমস্যা অন্যত্র। আমরা কিছু ভ্রান্ত বিবেচনা দিয়ে এই বিচারই করেছি, যে একবার ঈশ্বর-রূপে দেখে ফেলা হয়েছে যে মানুষকে, তাঁকে অন্য কোনো চোখে, অন্য কোনো পন্থায় দেখা 'পাপ'। অতএব, জনসমক্ষে তাঁকে নিয়ে প্রায় বেশিরভাগ আলোচনাতেই অযাচিত ভাবে ঢুকে পড়েছে, তিনি কতটা "প্রাণের ঠাকুর", তিনি কেমন বন্ধু, কেমন প্রিয়, তিনি কেমন আমাদের সমস্ত আবেগের আঁতুরঘর। সমস্ত আলোচনাই শেষ হয়েছে এক বিস্ময়কর নীরবতায় গিয়ে, যার ঠিক আগের মুহূর্তের উচ্চারণটি ছিল, "আহা কী ছিলেন তিনি!" এর ফলে আর কী হয়েছে জানি না, কিন্তু শিল্পী-রবীন্দ্রশ্রদ্ধা আর ব্যক্তি-রবীন্দ্রশ্রদ্ধার জগাখিচুড়ি মিশেলে রবীন্দ্রনাথের প্রায়োগিক দিক আজও আমাদের অসহায়, অবনত শ্রদ্ধায় আচ্ছন্ন। নিজেকে গড়ে তোলার পিছনে একজন শিল্পীর যে কী কঠোর পরিশ্রম থাকে, স্বপ্ন থাকে, উদ্যোগ থাকে, তা আমাদের সম্মিলিত "আহা"য় কোনোদিনই বোঝা যাবে না আর।
'রবীন্দ্রনাথ একজন অতিমানব' এবং 'রবীন্দ্রনাথ একজন অতিমানবিক কর্মী', এই দুয়ের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা নিয়ে আমরা আজও অবগত নই। তাই, রবীন্দ্রনাথকে আমরা আজও প্রয়োগ করতে পারলাম না কোথাও সমাজের জন্য, মানুষের জন্য, ছোটদের জন্য। তাই, আজও কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের 'শিক্ষা' বা 'ধর্ম' অবশ্যপাঠ্য করা হলো না। তাই, আজও রবীন্দ্রনাথের 'তালগাছ' দুলে দুলে মুখস্থ করে আবৃত্তি করার ছড়া হয়েই থেকে গেল। তাই, আজও কোনো রাজনৈতিক নেতা বক্তৃতা দিতে উঠে মনে করলেন না, 'সভ্যতার সংকট'-এর শেষ দশটা লাইন পাঠ করি বরং। তাই, রবীন্দ্র-উদযাপন বড় হয়ে গেল। তাই, ২৫শে বৈশাখ সবুজপাড় সাদাশাড়ি পরে রবীন্দ্রগান গাইবো নাকি খোয়াই-রঙের কুর্তা পরে, এটাই আলোচ্য বিষয় রয়ে গেল। তাই, "আরো আঘাত সইবে আমার" শুনে কারুর মনে হলো না, আগুন ভিতরে জ্বলা প্রয়োজন, বাইরে নয়।
রবীন্দ্রনাথকে আমরা প্রয়োগ করতে পারলাম না, ধারণ করা তো দূরে থাক।
অযোগ্য প্রয়োগ করার চেয়ে নীরবে নিজেদের তাঁর যোগ্য করে তোলা এখন বেশি প্রয়োজন।
বাংলায় একেবারে ইদানীংকালে ঋতুপর্ণ ঘোষকে বাদ দিলে যে সামান্য কিছু চেষ্টা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের 'শিল্পী' ও 'ব্যক্তি'কে আলাদাভাবে দেখার, তাঁর সৃষ্টির পিছনের নিয়োগ অনুধাবন করার, তেমন একটি প্রচেষ্টার অংশবিশেষ তুলে দিয়েই কথা শেষ করা যাক না হয়। বলার এটুকুই, মুগ্ধতা থাকুক। কিন্তু তারও যুক্তি থাকে।
"রবীন্দ্রনাথ বহু অনুশীলনে, চোয়ালে চোয়াল চেপে, অমানুষিক ক্ষমতায়, নিজের শিল্পীসত্তাকে ব্যক্তিসত্তা থেকে টেনে ছিঁড়ে বিযুক্ত করেছেন। বাইরের তাবৎ আফসানো ঝাপটার আড়ালে নিজের এক অচঞ্চল নিভৃত ধ্যানকুঠুরি নির্মাণ করে নিয়েছেন। এই চূড়ান্ত ঔদাসীন্যের বর্ম তাঁকে ভাল করে কোনও মানুষের সঙ্গে লিপ্ত হতে দেয়নি, আলিঙ্গন করতে গেলেই কবচের ইস্পাত অস্বস্তিভরে ফুটেছে। অনায়াসে স্বল্প আলগা করা যেত এই নিজের প্রতি অতলান্ত নিষ্ঠুরতার রাশ। নিজের অতন্দ্র প্রহরায় নিজে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার নিংড়োনো ডিউটি থেকে স্বল্প বিশ্রাম নেওয়া যেত। কিন্তু প্রতিভাকে যত্ন করার জেদ তার অনশ্বর। অকল্পনীয় অপমান চতুর্দিক থেকে সহ্য করেছেন, মেয়ের যক্ষ্মা হয়েছে বলে দেখা করতে গেছেন, জামাই টেবিলের ওপর পা তুলে সিগারেট খেয়েছে। শান্তিনিকেতন তিনি খুলেছেন পারভার্ট কাণ্ডকারখানা করার জন্য, শুনতে হয়েছে। কোনও আঘাতে, কোনও মুহূর্তে, এককণা কাজও থেমে থাকেনি। হৃদয় থেকে কোমল, মরমী লতাগুলি একে একে উপড়ে ফেলতে কী প্রাণান্ত কষ্ট হয়েছে তাঁর! এক উন্মাদ আত্মকেন্দ্রিকতায়, আত্মনিষ্ঠায়, নিজেরই বুকে হাঁটু চেপে শ্বাস রুখে দিতে কী হাঁকপাঁক, কী তাড়স জেগেছে! তবু থামেননি, কিছুতেই ভ্রষ্ট হবেন না। কিছুতেই ক্লান্তিকে, দুর্বলতাকে জিততে দেবেন না। অন্য কোনও মানুষ কখনও যা পারেনি, তিনি তা-ই পারবেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ হবেন। মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছেন, 'যাকে তোমরা ভালোবাসা বল সেরকম করে আমি কাউকে কোনোদিন ভালোবাসিনি।... বন্ধুবান্ধব, সংসার, স্ত্রী-পুত্র কোনো কিছুই কোনোদিনই আমি তেমন করে আঁকড়ে ধরিনি। ভিতরে একটা জায়গায় আমি নির্মম -- তাই আজ যে জায়গায় এসেছি সেখানে আসা আমার সম্ভব হয়েছে। তা যদি না হত, যদি জড়িয়ে পড়তুম তা হলে আমার সব নষ্ট হয়ে যেত।' প্রসন্নতা রক্ষার জন্য এই নির্দয় ঔদাসীন্য বপন ও লালনের স্ট্র্যাটেজি, এ ব্যাপার বুঝতেই এক জীবন লাগে কারও কারও, প্রায়-কৈশোর থেকে এর সার্থক সাধনা আয়ত্ত করার কথা তো ছেড়েই দিলাম। নিজের শিল্পকে, নিজের প্রতিভাকে কতটা আছাড়িপিছাড়ি ভালবাসলে এভাবে নিজের আদর সম্ভব, ভাবলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
কিছুটা রবীন্দ্রনাথ হয়ে জন্মানো যায়, কিন্তু পূর্ণ রবীন্দ্রনাথ তিলে তিলে পলে পলে হয়ে উঠতে হয়, তার কঠিন পরিকল্পনা ও অসহ্য শ্রম প্রতিটি, প্রতিটি, প্রতিটি ক্ষণ-খণ্ডে জারি থাকে, এই ধারণার বোধ ও স্বীকৃতি, এবং তুলকালাম আত্মপ্রয়োগ, শুধু এই জন্যই আরও সহস্র বছর তাঁর সূর্যবিভার পানে হাঁ করে থাকতে হবে মনে হয়।" (চন্দ্রিল ভট্টাচার্য, 'রবীন্দ্রপ্রোজেক্ট')
Comments
Post a Comment