Followers

অন্য প্রান্ত

ছেড়ে চলে যাওয়ার অপর প্রান্তে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে থাকে, ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়, এই অবিশ্বাস্য খড়কুটোয় বুক বেঁধে, তার কাজ কেবল ও কেবলমাত্র দেখে যাওয়া। যতক্ষণ অব্দি সেই চলে যাওয়া অবয়ব ছোট হতে থাকে, আরো ছোট হয়, পথের শেষ প্রান্তে, দিগন্তের গায়ে তাকে একফোঁটা কালির মতো লাগে, শেষে যখন সে এতটাই অগোচরে চলে যায় যে অনেক কিছুর ভিড়ে তাকে আর ঠাহর করা যায় না, কিন্তু মনে হয় সে এখনও আছে, তখনও সে বিরাট, পূর্ণ গ্লানি হয়ে জেগে আছে স্থির এই মানুষটার বুকে। তখন দেখা নিজের বাইরে, নিজের ভিতরেও। দেখাও এক পাঠ বটে। 
   
ছেড়ে চলে যাওয়াকে ইতি-কথা বলে ডেকেছো কি কোনোদিন? কখনও ভেবেছো, ছেড়ে যাওয়ার পর প্রখর হয়ে ওঠা স্মৃতিগুলোই আমাদের প্রকৃত, অগ্রন্থিত আত্মজীবনী? ভাবো নি নিশ্চিত। কেউ ভাবে না। কারণ, আমরা সবাইই দেখি সেই এক-পা দু-পা করে ছেড়ে যাওয়া, আর তার মধ্যেই আশ্চর্য গতিতে আমরা খুঁজে পাই, কীভাবে মিনিটে-সেকেন্ডে আমরা চিরন্তন পেয়েছিলাম একদিন, এই যে আমরা কেমন কিছু দিন-মাস-বছরের অভ্যাসকে, নিয়মকে ধরে নিয়েছিলাম আমাদের রাজ্যপাট। ছেড়ে যাওয়ার প্রতি পদক্ষেপে যখন ছন্দ খসে পড়ে, প্রতিটা আকাঙ্খিত উত্তর যখন এসে পৌঁছয় না আর, আমাদের কী সুন্দর মনে পড়ে না, বলো, যে এই না-পৌঁছানোও আসলে ছলমাত্র? উত্তর আসবে, অভ্যাস আসবে, প্রতিশ্রুতি আসবে। ফিরে আসবে। তাই, আমরা দেখে যাই। 
   
শীতশেষের বোলপুর। একজোটে গিয়েছি জনাকয়েক বন্ধু --- আমোদ-আহ্লাদ, আর কী! প্রান্তিকের রেলব্রীজে উঠলে অল্প কয়েকটা ঘরবাড়ি পেরিয়ে যদি চোখ রাখা যায়, শুধু ছড়িয়ে থাকা মাঠ, ফাঁকা জমি। বিকেল হয়েছে। আমরা ক'জন সেই রেলব্রীজে। একটা থ্রু-ট্রেনের ঘোষণা হলো। অল্পক্ষণের মধ্যে আমাদের কথা চাপা পড়লো তার ভারী গর্জনে, ব্রীজের পাটাতন কাঁপিয়ে সে বেরিয়ে গেল উত্তরে। আমরা দেখলাম তাকে, যতক্ষণ অব্দি না আসন্ন ধূসরে সে হারিয়ে গেল, যতদূর অব্দি গিয়ে আমাদের চশমা-আঁটা চোখগুলো আর সায় দিল না। আবার চারদিক নিঃঝুম। অন্ধকার জমা হচ্ছে গাছের পাতায় পাতায়, ঘাসে ঘাসে। প্ল্যাটফর্মের পাশে চায়ের ঝুপড়িতে কাপ ধোয়ার শব্দ। হঠাৎ, এমন মুহূর্তে, নিভে আসা পাখিদের ডাক ম্লান করে তীব্র হয়ে ওঠে স্মৃতি --- কতদিনের বন্ধু যেন আমরা সবাই? হিসেব নেই আর। কিন্তু আজ, এই ক্ষণে কেন মনে হলো, বহুদিনের জন্য এই-ই হয়তো আমাদের শেষ দেখা। এই-ই হয়তো শেষবার একে অন্যের কথা কেটে কথা বলতে চাওয়া, শেষবার নীরবতা বোঝা, শেষবার এরকম এক জমিতে একসঙ্গে দাঁড়ানো, বহুদিনের জন্য। সত্যিই তাই। ফেরার কদিনের মধ্যেই চাকরি নিয়ে দু'জন চলে গিয়েছিল অন্য দেশে, আরেকজন পড়াশুনার কাজে তৃতীয় আরেক দেশে, আর রয়ে গিয়েছিলাম আমরা দু'জন। আমরা দু'জন ক্রমশঃ না-আলো-না-অন্ধকার এক জগতে দেখে গিয়েছিলাম আমাদের সমস্ত স্মৃতিকে। তাদের নিজেদের বলেই মনে হয়, কিন্তু দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে এমন আলোয়।
   
সুমনের কণ্ঠে শুনছি রবীন্দ্রনাথ, "আকাশ আমায় ভরলো আলোয়, আকাশ আমি ভরবো গানে"। খবর এল, এক শিক্ষক এইমাত্র চলে গেলেন। ছুটে গেলাম তার বাড়ি। এ আরেক রকম চলে যাওয়া, আমার সমস্ত শোকই তাঁর কাছে অনুচ্চার হয়ে থেকে যাবে, তিনি জানবেনও না, এই আমি এসেছিলাম তাঁর খোঁজে, তিনি চলে যাওয়ার পর। ঘর দেখে এখনও মনে হয়, ওই চেয়ারে বসে তিনি আবার পড়বেন, উঠে হয়তো সামান্য কাজে বাইরে গেছেন। আলনায় রাখা জামাকাপড়ে স্নান করে পরার প্রতিশ্রুতি লেখা আছে। এমন কি, জলের গেলাসের ঢাকনাটাও যত্ন করে গেলাসের ওপর বসানো, যাতে জলে নোংরা না পড়ে। বইতে বুকমার্ক দেওয়া! কী বিহ্বল-করা, কী হাস্যকর একটা ব্যাপার! বইগুলো কী আশ্বস্ত, তাদের আবার নিশ্চয়ই পড়া হবে! আমরা গুটিকতক ছাত্র অদৃশ্যভাবে এই সমস্তকিছু বুকে চেপে ধরতে থাকি, গলা বুঁজে আসে। পাশের ঘরে তাঁকে তখন চন্দনে সাজানো হচ্ছে। স্মৃতিতে একটু আগেও রবীন্দ্রনাথ বলছিলেন, "আকাশ আমায় ভরলো আলোয়"...
  
ছেড়ে চলে যাওয়ার ওপর আমাদের খুব রাগ। কারণ, সে অসঙ্গতি। কারণ, সে অকারণে তছনছ করে সুখ পায়। কারণ, তার না গেলেও চলতো। কিন্তু তবুও সে রাজা। কোথায় জানো? একেবারে অন্তিম, শেষ, শেষেরও শেষ মুহূর্তে। যখন আমরা বুঝি, সব খোয়া গেছে; যখন বুঝি, আর যতই এগোনো যাক, কোনো হিসেবই পাল্টাবে না; যখন মনে হয়, এই সমস্ত কথা-রাখা, খেয়াল-রাখা, অনিয়ম, অভ্যাস, ইচ্ছে, রোদ, বৃষ্টি, সবকিছু শুধু এই আজকের দিনটার জন্যই আমাদের গড়ে তুলেছিল, এই দিনের মতো, ছেড়ে যাওয়ার মতো নিশ্চিত আর কোনোকিছুই মনে হয়নি অতীতে, তখন সেই যে শেষ একবার নত হয়ে, অভিমান সামলে তার পথ ছেড়ে দাঁড়ানো, সেই যে মনে হওয়া এবার তাকে পূর্ণ ভালোবাসা যায় কোনো হিসেব না রেখে, কারণ সে আর কখনই আমার নয়, সেই যে ভালোবাসি বলে তাকে যেতে দেওয়া, নিজের কাছে নিজে শেষ দানে জিতে যাওয়া --- ওইটুকুর জন্য ছেড়ে যাওয়া রাজা। এক বিমর্ষ, অমোঘ, স্বেচ্ছায় নির্বাসিত রাজা, যার অন্তঃপুরে কেবল এসরাজ বাজছে, আর আমাদের দূরে ঠেলতে ঠেলতে সে শুধু বলছে, দৃঢ় হও, পূর্ণ হও, প্রেম হও।
  
শুভংকর। (৪.৩.১৯)

ছবি: ঈপ্সিতা

Comments