শব্দবাজি সম্বন্ধীয় একটি খোলা চিঠি
প্রিয় সহনাগরিকা/নাগরিক,
এই চিঠি ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা উচিত, জানি না। উপরোক্ত ‘সহনাগরিকা/নাগরিক’ কথাটার মধ্যে যেমন শব্দবাজিতে আগুন দেওয়া প্রিয়জনেরা আছেন, তেমন পীড়িত প্রিয়জনেরাও আছেন। আমি, বলা বাহুল্য, পীড়িতের দলে। কাজেই এই চিঠির মূল উদ্দেশ্য শব্দবাজি-প্রিয় প্রিয়জনদের একটু সচেতন করার চেষ্টা, তাঁরা সচেতন হবেন – এই আশা করা। এর অধিক কিছু নয়।
আরেকটি দীপাবলি চলে গেল। খবরে দেখা গেল, দিল্লিতে বায়ু-দূষণ আগের বছরের চেয়ে ৪০% কমেছে। যদিও সর্বত্র দিল্লির সেই ঘোলাটে ছবিই দেখছি। ধরে নেওয়া যাক অঙ্ক ঠিক, বাস্তব নয়। তুলনায় কলকাতা এবার খুব ভাগ্যবান। বিচ্ছিরি গরমের পর নিম্নচাপ এসে তার ঘাড়ে ভর করেছে। কাজেই, সারাদিনরাতজুড়ে বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া বায়ুদূষণের মাত্রা বেশ অনেকটাই কমিয়ে আমাদের শান্তি দিয়েছে। গরমও কমেছে, চোখ জ্বালাও।
কিন্তু যেটা এবারেও কমলো না, শব্দ। প্রতিবারই খুচরো বিরক্তি, অসহায়তা, প্রতিবাদ এবং অনুনয়ে সংবাদপত্র আর সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যায়। সবাই পড়ি, বিচলিত হই। কিন্তু পরের বছর আবার যেই কে সেই। এই বছর, সম্ভবতঃ দীপাবলির আগে চেতন ভগত ওরকম একটি কালজয়ী মন্তব্য করার পর এই সম্বন্ধীয় সচেতনতামূলক কথাবার্তা আমাদের অনেককেই আশ্বস্ত করেছিল যে এবার বোধ হয় শব্দের প্রতাপ কমবে। এমন আশা করার কারণ একটাই – বিজ্ঞান বলে, মানুষ বুদ্ধি ধরে। এবং, এত সামান্য, সরল কারণের জন্যই বুঝবেন বন্ধুরা, এটা কোনও উচ্চাশাও নয়।
কিন্তু বিজ্ঞান এটা কখনও বলে না, মানুষ বুদ্ধিরও আগে হুজুগ ধরে। এবং সে মারাত্মক হুজুগ। শব্দ করবো না? সে কি! এত বছরের প্রথা আমাদের এমন শব্দ করার যে আজ কোনও অকলুষ শিশুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ডেসিবেল কিসের ইউনিট, সে বলবে “বাজি-র” -- হঠাৎ ছেড়ে দেব সে সব? ‘প্রথা’ শব্দটি আমাদের মতো করে তাঁদের বোঝাতে গেলে প্রিয়জনেরা নাক ফাটিয়ে দিচ্ছেন, দশটার বদলে চল্লিশটা বোম ফাটাচ্ছেন। এবং এবারেও সেই ‘প্রথা’ জারি রইল। উল্লেখ্য, এটি আনন্দ উদযাপনের ধারা। ঠিক যেভাবে গালাগাল দিতে না পারা মানুষকে খিস্তি করাও একধরণের আনন্দ উদযাপন! এই উদাহরণ টেনে আনা ইচ্ছাকৃত, কারণ আমি এই দু’ ধরণের উদযাপনের মধ্যে কোনও ফারাক দেখি না।
প্রসঙ্গত, আমি যে এলাকায় থাকি, সেখানে এবার এক অদ্ভুত খেলা দেখলাম। রাত ১০টা অব্দি সবাই লক্ষ্মী হয়ে ফানুস ওড়ায়, তারপর যত রাত বাড়ে, বোমের প্রকোপ বাড়ে। রাত একটার পর থেকে প্রায় লাগামছাড়া উল্লাস। প্রায় সোয়া দুটো অব্দি। তারপর বোম ফুরিয়ে যায়, না প্রিয়জনেরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন, না আমাদের ওপর দয়া দেখান, জানি না। তবে থামে। কিন্তু ততক্ষণে ঘুমের যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এবং আমার বা আমার বয়সীদের কথা আমি বাদই দিলাম। আমার নিজের বাড়ি এবং আশেপাশের তিন-চারটে বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষেরা আছেন অনেকে, তাঁদের সকলের হৃদয় দুর্বল না হলেও, অল্পবয়সের সহ্যশক্তি তাঁদের কমেছে। এই আওয়াজে তাঁরা যে বিশেষ খুশি হন, বা একইভাবে এই আনন্দ উদযাপনের প্রথা উপলব্ধি করতে পারেন বলে তো মনে হয় না। এই বেয়াদব উল্লাসের প্রতিবাদ জানানোর নিয়ম কাগজে-কলমে লেখা আছে অনেক কিছুই, কিন্তু সত্যি কথা এটুকুই, রাত দুটোর সময়ে সেই একটা উপায়ও মনে পড়ে না। উপরন্তু, যখন বারান্দায় গিয়ে দেখি সেখানে পুলিশ তো ছার, পাড়ার পাহারাদারও টহল দিচ্ছেন না, একেবারে অসহায় লাগে।
এ তো গেল মানুষের কথা। সভ্যতার বিস্তৃতি মানুষের বাইরেও। অন্যান্য জীবদের নিয়ে। উল্লাসের অঙ্গ হিসেবে কুকুরের লেজে পটকা বেঁধে জ্বালিয়ে দেওয়ার রীতি তো আমাদের বহুদিনের একধরণের অধিকারবোধ। তাকে কোণঠাসা করে একের পর এক শব্দবাজি ফাটিয়ে তার হৃদযন্ত্র বিকল করে দেওয়ার ক্ষমতা আমরা রাখি। বাড়ির লালনে বড় হচ্ছে যারা, তাদের কষ্টও কম নয়। লেজে পটকা বাঁধার বিপদ থেকে মুক্ত থাকলেও শব্দের আধিক্য যে তাদের কি ক্ষতি করতে পারে, সে আমরা বিভিন্নভাবে জানছিও। কলকাতায় এভাবে পীড়িত জীবও অনেক। আজ আনন্দবাজার পত্রিকা এরকম কিছু ঘটনাকে উল্লেখ করে এ’ বিষয়ে একটি খবর ছেপেছেন, সে জন্য তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু, কথা হচ্ছে, পৌঁছচ্ছে কি খবরগুলো জায়গামতো?
এই যে, দেখুন, এত যে লম্বা চিঠি, এতক্ষণে আমি বুঝেই গে’ছি যে এই চিঠি শব্দবাজিপ্রিয় মানুষেরা পড়বেন না। যে গুটিকয়েক লোক পড়বেন, তাঁরা সবাইই পীড়িত শ্রেণীর। খুব স্বাভাবিক। বাজিবাজেরা যদি এতটা বড় একটা চিঠি পড়ার ধৈর্য রাখতেন, তাহলে তাঁরা এমনিই আর বাজি পোড়াতেন না। এই চিঠি লেখার দরকার পড়তো না সেক্ষেত্রে। কিন্তু তা তো হয় না। আমরা নিজেরাই নিজেদের অসহায়তা একে অন্যকে বলি, কারণ, অসহায়তায় বরাবরই বিদ্রোহীর চেয়ে সঙ্গীর প্রয়োজন বেশি।
সেজন্যই চিঠির শুরুতে বলেছিলাম, এ চিঠি কাকে উদ্দেশ্য করে, জানিনা। আপনারা যারা পড়লেন এতটা কষ্ট করে, যদি মনে হয়, শেয়ার করবেন। না মনে হলে করবেন না। আমার কাজ ছিল এই বাৎসরিক কষ্টটুকু লিখে জানানো। তাতে যদি সত্যিকারের উদ্দিষ্ট যারা, তাদের কেউ জানেন এবং পরের বছর অব্দি এটা মনে রাখেন, তা নিতান্তই আমার প্রাপ্তি। এটুকুই বলার যে আমাদের আনন্দেও সমস্যা নেই, উদযাপনেও সমস্যা নেই। সমস্যা এই উদ্ভট রীতিতে। সবার কথা (মানুষ এবং মানুষের বাইরে) আরেকটু ভেবে যদি উদযাপন করা যায়, তাহলেই আর এত সমস্যা থাকে না। শব্দ কমাতে সুপ্রিম কোর্টও পারবে না, ব্যবসায়ীরাও বললেই বন্ধ করে দেবে না এসবের ব্যবসা। পারলে, আমরাই পারবো। নাহলে নয়।
দীপাবলি আলোর উৎসব। শব্দের নয়। উড়ুক না এক আকাশ ফানুস! আমরা মুগ্ধ হই। আর যদি শব্দ হতেই হয়, শব্দ করে ফুল ফুটুক, পটকা নয়। সুকুমার রায়ের দুনিয়ার মতো।
সবাই ভালো থাকুন।
(ফটো: পিন্টারেস্ট)
Comments
Post a Comment