স্মরণে: অভিজিৎ আচায্যি
পরশুদিন খবর এল, অভিজিৎ হারিয়ে গেছে।
অর্থাৎ অভিজিৎ হারিয়েছে আরো এক বা দু-দিন আগে,
কিন্তু নিরুদ্দেশের বয়স না বাড়লে সে ঘোষিত হয় না;
তাই, পরশু অভিজিতের চলে যাওয়ার খবর পেলাম।
খবরটা ছড়িয়ে পড়ায় আমরা কয়েকজন
মধ্যপন্থা-অবলম্বনকারী
অশান্ত হলাম বটে, কিন্তু সময়ের বিশেষ কিছু একটা
গেল-এল না।
তখন যুদ্ধ। দেওয়ালির ফানুসগুলো ক'মাস পর
আকাশ থেকে নেমে আসছে টুপটাপ,
বহুদূরে কোথাও গাড়ি উড়ে যাচ্ছে,
সবে ঘর বেঁধেছে যারা, ছাদ ভেঙে পড়ছে তাদের নিয়ে,
চারদিকে সবাই হাতে হাত ঘষছে।
দু-দিন পুরোনো রক্তের যে হালকা নোনতা, টক,
ঈষৎ পচে যাওয়া একটা গন্ধ হয়,
সেই গন্ধের চা খাচ্ছে সবাই, বোমা দিয়ে।
নিমকি-বোমা। গুড-ডে গ্রেনেড।
দু-দিন হলো অভিজিৎ নিরুদ্দেশ। খোঁজ-খবর।
থানা-পুলিশ। দুশ্চিন্তা।
কিন্তু, তখন যুদ্ধ।
আটপৌরে বাড়ি, তাই এতদিন যা দেখে এসেছে
সেইমতো কাগজে দিল একটা
নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা।
ঠিক যেভাবে অনেক লেখকের প্রাণাধিক উপন্যাস
কেবল তার বন্ধুরাই পড়েন,
তেমনই এ' খবর পড়লাম আমরা
মধ্যপন্থা-অবলম্বনকারীর দল।
ভাবলাম, এ'ভাবে খবরে আসার কথা ছিল না অভিজিতের।
মাস্টার্স, রিসার্চ, চাকরি, সব হারিয়ে যাওয়ার জন্য?
ওই একই খবর, আমাদের অপরিচিত বাকি যাঁরা পড়লেন,
তাঁরা, আমরা যেমন অপরিচিত রকিব, সৌগত বা সুপ্রিয়ার
হারিয়ে যাওয়ার খবর পড়ে ভাবি,
তেমনই ভাবলেন,
পৃথিবীতে কেমন একটা মানুষ কেবলমাত্র ঠিকানায় না-থাকার সুবাদে
হারিয়ে গেল।
খোঁজে না কেউ। কাগজের পাতা থেকে অভিজিৎ অবাক চোখে
আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে,
পরবর্তী পদক্ষেপের আশায়।
খোঁজে না কেউ। বিলাপ উঠে আসে।
ফেসবুকে এর-তার শেয়ারে ছোট ছোট রাউন্ড দেয় অভিজিৎ।
নিরুদ্দেশের বয়স বাড়ে।
অথচ, এ'সবকিছুর আগে ছিল
অভিজিতের সেই প্রশ্ন।
যাদবপুর। বড় ঝিল। বসার বসার বেদী।
সন্ধে গড়িয়ে গেছে।
এমন সময়, অভিজিতের সেই প্রশ্ন,
"কিন্তু মানুষের কী হবে, ব্রাদার?"
বছর খানেক আগের ঘটনা হয়তো।
যতদূর জানি, যুদ্ধ তখনও চলছিল। সাঁজোয়া গাড়ি তখনও উন্মুখ।
তখনও দেশের সঙ্গে দেশের রোঁয়া-ফোলানো ঝগড়া।
কিন্তু তখনও সন্ধে, তখনও ঝিলপাড়। তখনও অভিজিৎ।
"কিন্তু মানুষের কী হবে, ব্রাদার?"
নিরুদ্দেশের বয়স বাড়লে সে 'নেই' হয়ে যায়।
অথচ আমরা,
এই মাঝপথের মানুষগুলো,
জানি, অভিজিৎও কাগজের পাতায় তার এই নিরুদ্দেশের খবর দেখেছে,
কিন্তু এই মরণোত্তর শহরে তার আর ফিরে আসার ইচ্ছে নেই, তাই
সে যোগাযোগ করেনি নিচের ঠিকানায়,
বলেনি, সে দেখেছে এমন কাউকে;
কারণ, অভিজিৎ সম্ভবতঃ চায় না এই শহরে আর ফিরে আসতে, কারণ
যুদ্ধ কবে থামবে, এই সদুত্তর কেউ তাকে দিতে পারেনি
কেউ তাকে বলেনি, মানুষের কী হবে,
মানুষের আর কী হওয়া বাকি আছে
Comments
Post a Comment