বইমেলা ২০২০: মুখবন্ধ
বছর ঘুরে যায়, বছর ঘুরে আসে। বছর-বছর নতুন বই লিখি, প্রকাশকের দরজায় যাই, আপনাদের কাছে পৌঁছানোর তাগিদে। পাণ্ডুলিপি কাটা-ছাঁটা, নামবদল, প্রচ্ছদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা, এবং সর্বোপরি সেই মহার্ঘ প্রুফ দেখার সন্ধেগুলো -- সবই আসে, যায়। বন্ধ দরজার ওপারে এই বিন্যাস ও সৃজনে নিজের কাজটুকু করে বেরিয়ে আসি আমিও। এসে, অপেক্ষা করি, পাঠকের মতোই। কিছুদিন পর নিচের এই ছবিগুলোর মতো বাঁধাই করা, রঙচঙে বই যখন হাতে পাই, নতুন লাগে সবকিছু খুব। লেখাগুলোকে, কবিতাগুলোকে আরও অনেক নগ্ন দেখেছিলাম আমি। তাদের এই আভরণের সঙ্গে আমিও অপরিচিত শুরুতে। কিন্তু যাঁদের জন্য লিখি, মনেপ্রাণে যাঁরা পড়ুন কামনা করি, বইগুলিকে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রেজেন্টেবল করে তোলার সৃজনশৈলী প্রকাশকের, প্রচ্ছদশিল্পীর, রাত জেগে প্রুফ ঠিক করে চলা কম্পোজারের, ছোট্ট ছাপাখানার, আরও অনেকের।
যবে থেকে লিখছি, সংখ্যায় এ' বছরই সবচেয়ে বেশি বই বেরুচ্ছে আমার। তিনটি। দুটি কবিতার, একটি নাটকের। 'কলকাতা ট্রিলজি' প্রকাশিত ঋতবাক (স্টল ৩২২) থেকে, সুস্মিতা দি'র (Sushmita Basu Singh) তত্বাবধানে। প্রচ্ছদশিল্পী মৈনাক বইটির অলংকরণ করেছেন। বইটি আমাদের দল অন্তর-রঙ্গ'র। তার কাজকর্মের বছর দুয়েককে বাঁধা হয়েছে দু'মলাটে। বড় আদরের বই আমাদের। ফেলে আসা দিনের দলিল কী অপ্রিয় হতে পারে!
শুভ দা'র (Subho Bondyopadhyay) তত্বাবধানে প্রকাশিত হলো 'আবর্ত', ধানসিড়ি (স্টল ২৩৮) থেকে। ধানসিড়ি-প্রকাশিত কবিতার, গদ্যের বই আগে পড়েছিলাম, পড়ে তার গুণগত মান সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েছিলাম। তারপরেই কথা হয় শুভ দা'র সঙ্গে। প্রাথমিকভাবে তৈরি 'একলব্য হৃদয়ের ক্ষয়' পাণ্ডুলিপিটি বিপ্রজিৎ ও ঈপ্সিতার যৌথ আপত্তিতে (যে সামান্য কিছু বিষয়ে ওরা একমত, তার একটি) নাম বদলে হয় 'আবর্ত'। নামটি ঈপ্সিতারই দেওয়া। কলকাতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা দু'জন মানুষের বহমান জীবনের আখ্যান আবর্ত। একের মধ্যে সে বহুস্বর ধারণ করবে, এইই আশা রাখি।
ঋত প্রকাশনের ঘরে (স্টল ২২৬) গড়ে উঠেছে 'অপরাজিতা'। চিরঞ্জিত সামন্ত নির্মিত প্রচ্ছদে দেখা যায় ভাঙা ভাঙা মুখবয়বের আভাস। ঘর, মেঘ, বৃষ্টি, গাছ মাঝে মাঝে। বইটি নিয়ে প্রথম যখন লিখেছিলাম, বলেছিলাম, এই বইয়ের কবিতাগুলিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের দর্শন যেভাবে জড়িয়ে আছে, আমার এযাবৎ অন্য কোনো লেখাতেই বোধ হয় নেই। আজও বলি, অপরাজিতা আমার কাছে এক সাহসের নাম, উচ্ছলতার পরিচয়। যা কিছু অন্ধকার, কঠিন, অসুখ, তার প্রত্যুত্তর অপরাজিতা। শেষ এক দেড় বছরে বারবার যখন কোনো না কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়েছি, উঠে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে পারছি না, নিজেকে ঘৃণা করছি, আমার ফিরে আসার, জীবনের কাছে নত হওয়ার, ভালোবাসার কথা বলে চলার সবটুকু সাহস লেখা আছে অপরাজিতায়। ঐত্রেয়ী দি'র (Aitrayee Sarkar) মনোনয়নে এবং ভালোবাসায় সে-ও রূপ পেলো এই মেলায়।
আজ থেকে শুরু হলো কলকাতা বইমেলা ২০২০। চলবে সামনের মাসের ৯ তারিখ অব্দি। আজই উদ্বোধনের পর গুটিগুটি অনেক মানুষের যাতায়াত শুরু হয়েছে মেলায়। সপ্তাহান্তে তা আরও বাড়বে নিশ্চয়ই। আমরা যারা লিখি, পড়ি এবং লেখাপড়া করি, আমাদের পুজোপার্বণ এই মেলা। এতদিন ধরে ফেসবুকে, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম মারফৎ মেলা জ্বালিয়েছি সব্বাইকে বইয়ের ব্যাপারে বলে বলে। এ জ্বালাতন সামনের কদিনও চলবে বলেই মনে হয়। তবে আজ, মেলার শুরুর দিন আপনাদের অপেক্ষায় রেখে দিলাম এই তিনটি বই। গ্রহণ, বর্জন আপনাদের হাতে। চেষ্টা করেছি সাধ্যমতো আলো-অন্ধকারে মোড়া আমাদের জীবনের কথা বলতে। বাকিটা সময়ই বলুক; সে আমার চেয়ে ঢের বেশি সুবক্তা।
Comments
Post a Comment