দিয়া
১
অনেকদিনই ভেবেছি, দিয়ার জন্য গল্প লিখব। ওকে নিয়ে, ওরই জন্য। তারপর সেই গল্পটা ছেপে বেরুলে সব্বাই জানবে সেই একরত্তি মেয়ের কথা। আর যারা দিয়াকে দেখেনি, তারা নিজেদের মনে মনে দিয়া কেমন হবে ভেবে নিয়ে, আমাকে লিখে পাঠাবে দিয়াকে নিয়ে গল্প। আর সে সব পড়ে আমি আর দিয়া হেসে কুটিপাটি, কারণ দিয়া তো একদমই ওই গল্পগুলোর মতো না। ওকে লেখা এতই সোজা?
মাঝেমাঝে ভাবি, দিয়াকে নিয়ে কি আদৌ গল্প বানানোর দরকার আছে? ওর সঙ্গে কাটানো পুরো সময়টাই গল্পের মতো। কখনও গম্ভীর মুখে মজার মজার কথা বলা, কখনও নাকের নিচে নুডলস্ ধরে গোঁফ তৈরি করে তার কি আনন্দ! কখনও একটা ঝমঝম-রাতে ওর লেখা প্রথম দু-লাইনের ছড়া ঝড়-বৃষ্টি-বিদ্যুৎ নিয়ে, কখনও ঝর্ণার মতো গেয়ে ওঠা, 'আলো আমার আলো'।
কিন্তু এসব যদি লিখি, দিয়া পড়ে বলবে, "এ তো সব সত্যি কথা! এতে গল্প কই?" তাই আমি সত্যি কথার সঙ্গে মিথ্যে কথা মিশিয়ে দিয়ার জন্য একদম সত্যিকারের একটা গল্প লিখব। একদিন ঠিক লিখব। সেখানে আমরা বেড়াতে যাব দূরের কোনও পাহাড়ি গ্রামে ...
২
সেদিন দিয়া বলল, কবে পুরোপুরি একদম শুধু শুধু গল্প করার জন্য আসবে আমাদের বাড়ি? আজ তো এত্ত কাজ নিয়ে এলে!
ঠিকই, একটা কাজ নিয়েই যেতে হয়েছিল। রাত হয়েছে মোটামুটি। উঠব উঠব করছি, শেষ কিছু কথাবার্তা চলছে। ওর কথা শুনে, একটু ভেবে বললাম, সে তো একফাঁকে তোর সঙ্গে গল্প করতে চলেই আসা যায়, কিন্তু তোরও তো গরমের ছুটি শেষ। স্কুল খুলে যাবে না?
খুব মুখ শুকনো করে দিয়া প্রায় নালিশ করার মতো বলল, হ্যাঁ এই তো সোমবার থেকেই, দ্যাখো না।
তারপর যখন ওদের বাড়ি থেকে বেরুচ্ছি, দরজায় এসে বলল, আবার এসো কিন্তু, এমনি এমনি গল্প করতে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হল, আমাদের এরকম শুধু শুধু, এমনি এমনি, একদম, পুরোপুরি গল্প করার দিনগুলো সরে গেছে। এখন খালি কথা, কাজের কথা, দুঃখ উগরে দেওয়া, আর চটুল ইয়ার্কি। গল্প নেই আর। শুধু মাঝেমাঝে এরকম দিনগুলোয় দিয়া যখন ঘাড় হেলিয়ে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা তোমার সমুদ্রে বেড়াতে যেতে ভাল্লাগে?, মনে পড়ে, বহুদিন ঢেউ দেখিনি।
৩
সহজ পাঠে নন্দলাল বসুর আঁকা সাদাকালো ছবিগুলো দেখলে দিয়ার কথা মনে হয়। কোনও ছবি এলোমেলো, কোনোটা একেবারে টানা টানা রেখায় আঁকা। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত মিলিয়ে দেওয়া সহজ কিছু দাগ কেমন ছবি হয়ে উঠলো হঠাৎ। ‘ও ঔ’ বলতেই সেই বড় বউয়ের ঘোমটা টেনে ভাত রান্না, বা আমগাছে কেমন রাশি রাশি আম হয়ে আছে? গরুর গাড়ি নিয়ে গাড়োয়ান ফিরে আসছে গ্রামে, বা শাল মুড়ি দিয়ে বুড়ো বসে কাশে।
এই ভীষণ সহজ দিনযাপনের ছবিগুলো দিয়ার চোখে দেখি। ভুরু কোঁচকানো মানেই আড়ি, ঘাড় একদম হেলিয়ে দেওয়া মানেই খুব প্রিয় একটা কিছুতে সায়, বড় বড় চোখ মেলে থাকা, জেদ-আব্দার, দিয়ার পৃথিবীর চাওয়া-পাওয়া, হিসেব-নিকেশ, স্বপ্নগুলো খুব সোহাগী। নন্দলালের তুলির টানের মতো। এক এক টানে ফুটছে এক এক স্বপ্ন, তুচ্ছ হচ্ছে এই রোজকার একঘেয়েমি, না-পাওয়া। ছোটবেলার যে ইচ্ছেগুলোকে বড়বেলার জন্য ফেলে রেখে পাত্তা দিইনি, আর শেষ অব্দি হারিয়ে ফেলেছি, এখন মনে হয়, তারা ফিরে আসুক দিয়ার কাছে। দিয়া পাক তাদের সবটুকু, এক নিমেষে, সেই ছড়াটার মতো –
“কতদিন ভাবে ফুল উড়ে যাব কবে,
যেথা খুশি সেথা যাব ভারি মজা হবে।
তাই ফুল একদিন মেলি দিল ডানা –
প্রজাপতি হল, তারে কে করিবে মানা।”
৪
এই নববর্ষের দিন দিয়া গাইলো “কি গা’ব আমি কি শুনাবো আজি আনন্দধামে”। পাড়ার রাস্তায় ছোট মঞ্চ তৈরি করে বর্ষবরণ উৎসব, সেখানে। সন্ধে থেকেই সেখানে ‘হ্যালো টেস্টিং’। আশেপাশের বাড়িতে খুদে খুদে গায়ক-গায়িকারা তখনও নিজের নিজের ঘরে শেষ প্রহরে গলা সাধছে। তাদের গানের সময় সবচেয়ে বেশি দর্শক থাকবে বাড়ির বারান্দায় বারান্দায়। মোড়া বা ইজিচেয়ার তাঁদের ব্যালকনি সীট। আর নিচে মঞ্চের সামনে এনে রাখা হয়েছে খান কুড়ি লাল-প্লাস্টিকের চেয়ার। কচি-কাঁচাদের দাদু-দিদারা এসে বসবেন। পাড়ার গুঁফো দাদা-কাকারা সেখানে আপাতত দৈনিক আড্ডা সারছেন। আমি যেতেই দিয়া উৎসাহভরে বলে উঠলো, এত দেরি করলে যে? আরেকটু হলেই তো শুরু হয়ে যেত অনুষ্ঠান, আমিই প্রথম গাইবো।
সন্ধের বেশ শেষ দিকে, যখন এই বাড়ি-ওই বাড়ির বারান্দা ভরে গেছে, আয়োজকরা ব্যস্ত মিষ্টি আর শরবতের ব্যবস্থা করতে, আমার ছোট্ট গায়িকা গেয়ে উঠলো “কি গা’ব আমি কি শুনাবো”। পাশের রাস্তাঘাট থেকে গাড়িঘোড়ার আওয়াজ আসতে থাকলো ঠিকই, নিত্যযাত্রীরা একবার সেদিকে তাকিয়ে যে যার পথে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু মঞ্চে উপস্থিত একরত্তি মেয়ের মুখের আলোটুকু নিয়ে দাদু-দিদাদের, বাবা-মায়ের গর্ব-হাসি রইল, পাড়াটাকে আলো করে। আর দিয়া যখন গাইছে, “অসীম আকাশ নীলশতদল/ তোমার কিরণে সদা ঢলঢল”, মনে হল শুধু এই কথাটুকুর জন্যই আজ নতুন বছর, নতুন দিন। নতুন করে দেখা দিক যা কিছু চিরন্তনী।
৫
দিয়াকে যদি জিজ্ঞেস করি, ওর প্রিয় সময় কোনটা, আমার দিকে ফিরে একদম বাবু হয়ে বসে ও গোটা গোটা কথায় বলে, "আমার প্রিয় সময় বসন্তকাল মানে ফাগুন আর চৈত্র মাস, কারণ তখন সবকিছু নতুন।" তারপর একটু থেমে, হাতদুটো দু' পাশে ছড়িয়ে দিয়ে আবার বলে, "স-অ-ব-কি-ছু।"
- আর বর্ষা? বর্ষা ভাল্লাগে না?
- লাগে, যখন খুব কালো হয়ে যায় মেঘগুলো। তখন ওদের খুব রাগী মনে হয়। তারপর গর্জন করে। কিন্তু শেষে তো একগাদা জল ঢেলে দেয় রেগে গিয়ে।
- তখন আর ভাল্লাগে না বুঝি?
দিয়া ঘন ঘন মাথা নাড়ে দু' দিকে।
শরৎ বা শীতকাল দিয়ার কেমন লাগে, এখনও জানা হয়নি। একদিন এমনি এমনিই হয়তো সে কথা জানতে চাইব। স্কুল যাওয়ার পথে মিন্টুকাকুর পুলকারের জানালা দিয়ে, বা স্কুলের জানালা দিয়ে বা বাড়িতে ঘর থেকে কতটুকু আকাশ দেখা যায় জানিনা। তবে এটা জানি, যতটুকুই দেখা যাক, দিয়া সেই আকাশের দিকে তাকায়। ওর আকাশ ভালোলাগে। আকাশে তারা দেখলে ওর মনে হয় কত দূর দূ-ঊ-র দেশের কথা, ছেঁড়া মেঘ দেখলে মনে পড়ে নৌকোর মাস্তুল। এই হেজে-মজে যাওয়া শহরেও দিয়ার বসন্তকাল সবকিছু নতুন করে ভরে দেয়। আর বর্ষার কালো মেঘের শেষে "পাতায় পাতায় টুপুর টুপুর নূপুর মধুর বাজে"।
৬
দিয়া সেদিন বলল, ওর রাগ হলে ও যখন বলে ওর রাগ হয়েছে, আমি তখন কেন বলি যে ওর লাগ হয়েছে। ও নাকি মোটেও লাগ বলেনা রেগে গেলে। রাগই বলে। আর আমরা তখন কেউ ওর রাগকে পাত্তা না দিয়ে যদি বলি ওর আসলে লাগ হয়েছে, ও আরো লেগে, না না, রেগে যায়।
এই বলে দিয়া সেদিন আরও কিছুক্ষণ প্রচন্ড লাগ করে বসে রইল।
৭
দিয়ার ভালোনাম ঐশী, আর বাজেনাম অনেকগুলো। যার আদর যত বেশি, তার দেওয়া বাজেনাম তত বেশি বাজে। তবে দিয়া এই বাজেনামগুলোকে খুব ভালোবাসে। অবিশ্যি ভালোনামটাকেও যে বাজেবাসে, এমন নয়।
এই ভালো-বাজে-বাসা-বাসি নিয়ে দিব্যি থাকে দিয়া। আমরাও ভাবি, সত্যিই তো, ভালোবাসলে বাজে আর ভালোয় কোনোই বিরোধ নেই।
Comments
Post a Comment