Followers

কালবৈশাখী

আমার প্রথম কালবৈশাখী দেখা দিদির সঙ্গে, শিলিগুড়িতে। বিকেলের একটু আগে। চৈত্রের সেই দুপুরে রোদ ছিল না, অন্যান্য দিনের নীল আকাশ --- তখন আকাশ নীল হতো --- সেদিন সাদাটে। আমাদের দুপুর পড়তে তর সয়নি। কোয়ার্টারের পাশের মাঠে নেমে সকলে খেলছি। আমি খেলা থেকে একটু পর বিরতি নিয়ে চোরকাঁটা তুলছি নিজের মনে।
   
এমন সময় দিদি ডাকলো একটু দূর থেকে। তাকালাম। দিদির আগেও চোখে পড়লো দিদির মাথার পিছনের আকাশটা। কালো, আর ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে। এদিকে, আমার মাথার পিছনের আকাশ তখনও আগের মতোই ঘোলাটে, সাদাটে। অনেক, অনেক উঁচু থেকে সমুদ্রের দিকে তাকালে যেমন মনে হয় প্রতিটা ঢেউ বালির ওপর সমুদ্রের সীমানা আরো ছড়িয়ে দিচ্ছে একটা দাগ বরাবর, যেমন ছোটরা রঙের আনন্দে ক্যানভাসে শুধু হাতের ছোপ দিয়েই চলে, কালবৈশাখী তেমন গ্রাস করে আকাশকে।
   
দিদি শুধু আমার হাতটা ধরে বলেছিল, "ছোট্! ঝড়!" তারপর ছুট, ছুট, ছুট! কি বিরাট মাঠ, কতটা রাস্তা, কি দারুণ ঝড়! আমাদের পাশে পাশে কিছুটা দূরে মহানন্দার জল কাঁপতে শুরু করেছে! খরমড়িয়ে পাতা উড়ে আসছে চারদিক থেকে, দমকে দমকে হাওয়া আরো ঠান্ডা হচ্ছে। নিজেদের আরো, আরো ছোট, এতটুকু মনে হচ্ছে। হুমড়ি খেয়ে পড়ার সমূহ সম্ভবনা নিয়েও একবার আকাশে চাইলাম। সাদাটে বলে আর কোনো রং চোখে পড়লো না।
    
কোয়ার্টারের বারান্দা থেকে বাইরের হাওয়ায় দিকে হাত বাড়িয়ে দিদিকে জিজ্ঞেস করলাম, "কি ঝড় রে এটা?"
দিদি বৃষ্টির মতো বললো, "কালবৈশাখী।"
বৈশাখ! সেই প্রথম মনে হলো, নাম তো নয়, যেন রূপনারানের বুকে দু' হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বাউল! 
    
সেদিন অনেক সন্ধে অব্দি বাইরে শুধু টুপটাপ আওয়াজ। কার্নিশ বেয়ে জল পড়ার। ছোট আম খসে পড়ার। আর বৃষ্টিমাঠের গন্ধ। কল খুললে কনকনে ঠান্ডা জল। দিদি সেই জলে হাত ধুয়ে এসে আমার কপালে আঙুল রেখে বললো, "ইশ! কপাল তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! ক্যালপল খাবেন রোজ!" খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, "আমার হাত ঠান্ডা ঠান্ডা, তোর হাত বাজে, গরম।" 
মায়ের মতো, দিদির জল-ভেজা হাত সমস্ত ঝড় ভুলিয়ে দিতে পারে।

Comments