Followers

কবীর সুমন ২

১৯৯০-এর দশকের কলকাতার বাঙালী বাড়িগুলোর ক্যাসেটের তাকে শোভা পেতেন এক ডেনিম-জড়ানো চল্লিশের যুবক। এবড়োখেবড়ো গাল, দাড়ি-গোঁফ, পিঠে বা হাতে গীটার। ভুরু সামান্য কুঁচকে আছে। ক্যাসেটের কভারের ওপরের দিকে লেখা থাকতো 'তোমাকে চাই', 'বসে আঁকো', 'জাতিস্মর', এসব কথা। আর নিচের দিকে ছোট ছোট করে লেখা থাকতো 'সুমনের গান'।
সুমন। সুমন চট্টোপাধ্যায়। 
   
আমরা বোধ হয় সেই কতিপয় বাড়ির এক বাড়ি ছিলাম, যেখানে সেই দশকে সুমনের গান শোনা হতো না। মানে, পণ করে নয়, এমনিই। আমাদের বাড়িতে গান বলতে রবীন্দ্রসংগীত, হেমন্ত-শ্যামল-মান্না-সন্ধ্যা-প্রতিমা, আর রফি-তালাত-কিশোর-আশা-লতা। কাজেই, সুমনের গান আমি প্রথম কবে শুনি, কে শোনায় বা কোন গান, কিছুই আজ আর মনে নেই। ভালোবাসার সঙ্গে এমনই হয় বোধ হয়! শুরুর দিনক্ষণ মনে থাকে না।
    
তবে এটুকু বুঝতে পারি এখন, সুমনের গান না শুনেও তাকে বাদ দিয়ে সে সময়ে থাকা বেশ কঠিন ছিল। এদিক-ওদিক থেকে তাঁর কথা, তাঁর কণ্ঠ এসে পড়তো। মাসির বাড়িতে সুমনের ক্যাসেট ছিল, মাঝেমধ্যে বাজতো, কানে আসতো। স্কুলে বন্ধুরা নতুন ক্যাসেট কিনে দেখতে নিয়ে এলো, দেখলাম সুমন আছেন। তবে স্কুলে পড়ার সময় সুমনের গান বোঝার মতো মন আমাদের তৈরি হয় নি আদৌ, কাজেই সে নিয়ে বিশেষ আক্ষেপ নেই আমার। শুধু মনে আছে, সুমনের যে কথাটা প্রথম আমার ভেতরে গুনগুন হয়ে রয়ে গিয়েছিল, "সন্ধে নেবে লুটে, অনেকটা চেটেপুটে/ অন্ধকারের তবু আছে সীমানা"। আর কণ্ঠ শুনেও মনে হয়েছিল, কেমন জানি ঠিক গান গান ঠেকছে না। মানুষটিকে একবারই কাছ থেকে দেখেছিলাম, গোলপার্কে আমার এক মামার বাড়িতে। তাঁদের সঙ্গে সখ্যের সূত্রে সুমন একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। একতলার ঘরে বসেছিলেন। সেই ডেনিম, সেই গীটার। আমি মাঝেমাঝেই দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসছিলাম, ঠিক ক্যাসেটের কভারের মতোই লাগছে কিনা।
      
এ'সব স্কুলের শেষদিকের কথা। কলেজে আমি সুমন শুনিনি। ইউনিভার্সিটিতেও অল্প-বিস্তর। অন্য অনেকের চেয়ে বেশ পরেই আমার সুমনের গান শোনা। কিন্তু যেদিন থেকে শোনা শুরু করলাম, সেদিন থেকে সুমন আমার কাছে এক ধরণের বেঁচে থাকা। আর আশ্চর্যভাবে, সুমন কখনো আমার গান শোনার সময়ের শৌখিন গান হয়ে ওঠেন নি। সবকটা গান, সবকটা, কোনো না কোনো রাস্তায়, কোনো না কোনো কথার উত্তরে, কোনো না কোনো দিনে, কারুর না কারুর ছেড়ে যাওয়ায় বা ফিরে আসায় বেজে ওঠে। যত তাঁর গান শুনতে শুনতে এগিয়েছি, তত তাঁর গান আমার অতীত, স্মৃতিগুলোকে জমাট করে তৈরি করে চলেছে আরেকটা আমি। 
    
সুমনের গান শুনে কখনো মনে হয়নি, এই কথাগুলো যেন এভাবেই আমি বলতে চেয়েছিলাম! কারণ, আমি চাইনি! চাইলেও পারতাম না! সুমনের গানে নিজের অব্যক্ত খুঁজে পাওয়ার মুরোদ আমার নেই। আছে বলতে শুধু মুগ্ধতা। সুমন আমায় আশ্রয় দেন। "আমি যাকে ভালোবাসি, সে কাঁদে দুনিয়ার জন্য/ সে বড় একলা, অনন্য/ বেশি বয়সের প্রেমের মতো", বা "খালি চোখে পড়তে গিয়ে হোঁচট খেয়ে চশমা নেওয়া/ বয়স হওয়ার মানেই বোধ হয় স্বচ্ছতাকে বিদায় দেওয়া", বা "তোমার চোখে আলোকবর্ষ/ করবে যখন গানরচনা/ তখন তোমার রাত্রি ছুঁতে/ আমার এমন কাঙালপনা"। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো! পেটকাটি চাঁদিয়াল, বোকা মেয়ে, মেঘদূত, মনখারাপ করা বিকেল, জমি, এটাই এখন কাজ, বিদায় পরিচিতা, গান তুমি হও, দায়, ফুলমণি ইশরাত, গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনজ, কখন তোমার দেখা পাবো, হঠাৎ রাস্তায় --- এই লিস্ট চলতে থাকবে। 
    
আজ কবীর সুমনের সত্তর। সেই দাপুটে মানুষটি বুড়িয়েছেন। আমারও সময় লেগেছে বুঝতে, কিন্তু এতদিনে বুঝেছি, ওই যে বলছিলাম, সুমন এক ধরণের বেঁচে থাকা। যে কথা এত অদ্ভুত লাগতো, যে কণ্ঠকে ঠিক গান-গান লাগতো না, যে সুর একসময় অচেনা লাগতো, এখন বুঝি, ১৯৯২ সালের ২৩শে এপ্রিল, যেদিন সত্যজিৎ রায় চলে গেলেন, এবং বাংলা গানের জগতে পদার্পণ করলো 'তোমাকে চাই', বাংলা গানকে কী আমূল বদলে দিতে চেয়েছিলেন সুমন! তাই তার সবকিছুতে নতুন! যা আগে কেউ পড়েনি, কেউ শোনেনি। একটা সমগ্র বিপ্লব! নাগরিক কবিয়াল, আর এখন আমরা ক'জন বন্ধু তাঁকে ভালোবেসে ডাকি আমাদের এক "নগরবাউল" বলে।
   
সুমন এভাবে প্রতিটা যৌবন ছিঁড়েখুঁড়ে দিন নতুনের আশায়। প্রতিদিন। নতুন আসবেই! সুমন এক প্রবহমান হারিয়ে যাওয়া, যার আদরে আমরা বেঁচে থাকি। 
   
সুমন। বেঁচে থাকা।
  
©শুভংকর (২০১৮)

Comments