Followers

বাঙালীর বাথটাব

বছরকয়েক আগে চাকরিরই একটা কাজে আমাকে একরাতের জন্য একটা বেশ জম্পেশ নাম-করা হোটেলে থাকতে হয়েছিল। পরদিন সেখান থেকেই একজন অতিথিকে নিয়ে এয়ারপোর্টে সি-অফ করে তবে ছুটি।
         
প্রথমত, হোটেলের রুম এত বড়, আমার কোনও ধারণাই ছিল না। আলাদা আলাদা ভাবে তিনটে বিছানা, একটা সোফা, চায়ের টেবিল, মানে সে এক ফ্যাবুলাস ব্যাপার। ইতিমধ্যে হয়েছে কি, আমি তো এর আগে কোনোদিন বাথটাব দেখিনি, কোনোদিন দেখব – সে কথাও ভাবিনি। মধ্যবিত্ত ছেলে, লাল প্লাস্টিকের ওপর লোহার আস্তরণ মাখানো অজর-অমর বালতিতে জল ভরে স্নান করা কাজ। কাজেই বাঙালীর অভ্যেসমতো বাথরুমের দরজা খুলেই তো পেল্লায় চমকেছি। বাথরুমের আদ্ধেকটা জুড়ে একটা ফ্যাটফ্যাটে সাদা বড় সিঙ্ক নাকি ছোটো বিছানা, এসব ভেবে এসি-তেও প্রায় ঘেমে উঠেছি, এমন সময় আমার সহকর্মী এসে বললেন, ওটা বাথটাব।
            
সেই থেকে তো আমার ফ্যান্টাসি পুরো চিতার মতো ছুটছে। কোন্‌ শুভ গ্রহের ফেরে জীবনে একবার বাথটাব পেয়েছি, ভাই রে, জন্মের স্নান সেরে নেব! ভাবা যায় না জাস্ট! কিন্তু সেদিন রাত হয়ে গেছে, নিজেকে অনেক বোঝালাম যে, দ্যাখো, বাইরে অল্প অল্প ঠাণ্ডা পড়ছে এখন। এই রাতে স্নান করে যদি সর্দি লাগে, আবার ভুগতে হবে। ৫-৬ বার এমনিই বাথরুমে গিয়ে বাথটাবটা দেখে এলাম, কিন্তু ওর বেশি এগোলাম না। রাতে যতবার ঘুম ভাঙলো, শুধু মনে হতে লাগলো যে ছোটোবেলা থেকে বিজ্ঞাপনে মাধুরী-মনীষা-জুহি-সোনালী সব্বাইকে দেখেছি বাথটাব থেকে এক ঠ্যাং বার করে বসে থাকে, বা সোজা ক্যামেরার দিকে পা তুলে দেয়। আর বাকি বাথটাব ভরা থাকে গোলাপের পাপড়িতে। কিন্তু ছেলেরা বাথটাবে কি করবে? শাহরুখ? আমির? সলমন? একটা দৃশ্যও মনে এল না। আমি তাহলে আমার পা-দুটোকে নিয়ে কি করবো?
             
পরদিন সকালে একটুখানির জন্য বাথটাবের কথাটা ভুলে গেছিলাম, ঘুম থেকে উঠে একেবারে আলটাকরা এক্সপোজ করে হা-হা করে খানকতক হাই তুলছি, এমন সময় দেখলাম একজন রুম সার্ভিস খুব সন্তর্পণে বাথরুমে ঢুকে পকেট থেকে কি সব টুকটাক জিনিসপত্র বার করে সিঙ্কের ওপর সাজিয়ে দিল। তারপর বেরিয়ে আমার কানের কাছে এসে কেমন একটা দমচাপা কণ্ঠে আমাকে বারবার বলতে লাগলো, “আশ্যুইশ্যুইশ্যুইশ্যুই”। স্পষ্ট, তিনবার শুনলাম। “অ্যাঁ-অ্যাঁ” করেও এই-ই শুনলাম। "আশ্যুইশ্যুইশ্যুইশ্যুই"। শুনে আমি তো পুরো পোস্টকার্ড! গোপনীয়তা না হাঁপানি, বুঝেই উঠতে পারছি না। যখন সে দেখল আমি একেবারেই ভোম্বল হয়ে বসে আছি, সে বাধ্য হয়ে নিজের দামি হোটেলের ভাষা ছেড়ে যথাসম্ভব মানুষের ভাষায় বলল, “স্যর ফেস ওয়াশ-বডি ওয়াশ-লোশন-কন্ডিশনার রেখে গেলাম।” আমি বললাম, “অ! সাবান-শ্যাম্পু-তেল?” সে যারপরনাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে চলে গেল।
              
স্নান করতে বাথরুমে ঢুকে প্রায় একপ্রকার প্রার্থনার ভঙ্গীতে বাথটাবে দাঁড়ালাম। ঈশ্বর, তুমি করুণাময়! না চাইতেই সব দিয়ে দাও। সেখানে দাঁড়িয়েই প্রথমে মনে হল, এই বাথরুম, তার মধ্যে এই বাথটাব, তার মধ্যে আমি। সত্যিই আমরা কত ছোটো এই ব্রহ্মাণ্ডে। এই প্রসঙ্গে কিছু পূজা পর্যায়ের গান মনে এল তখনই। বারবার করে গাইলাম, “দিও তোমার জগতসভায় এইটুকু মোর স্থান”। এই বাথটাবে এসে পড়ার পর জগতসভায় আমার স্থান নিয়ে বেশ সম্যক ধারণা হতে শুরু করেছে আমার। আমার সহকর্মী বাইরে থেকে কিছুটা বাধ্য হয়েই বললেন যে, আমি ভালো গাই কিন্তু এখনও আরও দুজনের স্নান বাকি। তাই যদি একটু সদয় হয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ রেখে স্নানটা সেরে ফেলি...
            
কিছুক্ষণ পর। সমস্ত নিত্যকর্ম সমাপ্ত। বাথটাবে স্নান করবো বলে অধীর আগ্রহে শাওয়ার খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি নিরাপদ দূরত্বে, সেই জলে বাথটাব ভরলেই ঝপাং! শাওয়ার থেকে মৃদুমন্দ জল পড়ছে। নিতান্তই আস্তে। দামি হোটেলে বোধ হয় এর চেয়ে জোরে জল পড়লে শব্দ শালীনতার সীমা পেরিয়ে যায়। আমার পূজা পর্যায়ের নাতিদীর্ঘ একক অনুষ্ঠান শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু বাথটাব ভরছে না। একটু পর দেখলাম, বাথটাবের ঝাঁঝরিটা আমি বন্ধ করতে ভুলে গেছি। বাথটাবে যে ঝাঁঝরিরও ভূমিকা থাকে, ভেবে দেখিনি। জানতাম, ম্যাজিকের মতো জল আসে, স্নান সেরে আর কেউ পিছনে ফিরে তাকায় না। ভুল জানতাম। ঝাঁঝরি বন্ধ করলাম।
                 
আরও কিছুক্ষণ। এবার গণসঙ্গীত গাইবো ভাবছি। আমার ডায়াস্টোলিক প্রেশারটা সামান্য বেড়েছে। বাথটাবে জল পড়ছে। সেখানে নেমে দেখলাম, আমার গোড়ালি অব্দি জল। এবার? আমি দাঁড়াবো? না বসবো? না হামাগুড়ি দেব? আর আমার পা? সেগুলোকে নিয়েই বা কি করবো? এটুকু জলে স্নান করতে গেলে আমাকে যেরকমভাবে দুমড়ে মুচড়ে বাথটাবের মধ্যে গড়াগড়ি খেতে হবে, নিজের কাছেই নিজের সম্মান বলে আর কিছু থাকবে না, আর তার চেয়েও বড় ব্যাপার – চোট লেগে যেতে পারে।
              
আরও কিছুক্ষণ। হে পাঠক/পাঠিকা, আমি এখন বাথরুমের মধ্যে বসে আমার দিনপঞ্জী লিখছি। আমি জানি, বাইরে দুপুর হতে চলেছে, গঙ্গায় জোয়ার শেষে ভাটা আসার পথে; আমি এও জানি, দরজার বাইরে আমার সহকর্মীরা এখানেই আমার গয়া-গঙ্গা-প্রভাসাদি করে দিচ্ছেন, কিন্তু আমি নিরুপায়। আমি অসহায়। আমার এই অর্থহীন জীবনের আরেকটা অর্থহীন দিনে আমি শেষ অব্দি শাওয়ারের জলে স্নান করতে করতে বাথটাবের করুণাসিন্ধুতে দু-হাত রেখে ছপছপ করে আওয়াজ করছি, আর ভাবার চেষ্টা করছি, প্রভু কিছু তো করলাম! আমি জানি, আমার কারণে আমার অতিথিটি আজকে আর কোনও প্লেনই না পেতে পারেন। আমি দুঃখিত, আমি দুঃখিত। মা গো মা, এই হোটেলে কি একটা বালতিও নেই? কেউ আমায় একটা বালতি এনে দে, দু চার মগ জল ঢেলে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করি। এ কোথাকার শাওয়ার রে ভাই, ড্রপারের মতো জল ফেলছে! এবার কি শেষে বেসিনের কল খুলে মাথা রাখতে হবে?!
   
© শুভংকর (ফেব্রুয়ারী, ২০১৭)

ছবি: পিন্টারেস্ট

Comments