Followers

বইমেলার দশমী

বইমেলার কথা বললেই ময়দানের ধুলো মনে পড়ে সবার আগে। 'চিরকালের সেরা', 'টিনটিন', 'এক ডজন গপ্পো' এসব কিনে বাড়ি ফিরে সারা মাথাভর্তি বালি কিচকিচ। শীতের সন্ধেয় স্নান। তারপর জ্বর। এবং, সেরে উঠতে উঠতে কেনা বইগুলোর সদ্ব্যবহার। 
  
যুবভারতীর বইমেলার স্মৃতি খুব মলিন। শুধু মনে হতো, জায়গা কি কম পড়িয়াছে কলকাতায়? মিলন মেলায় আরেকটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেলা ফাঁদার সুযোগ এলো বটে, কিন্তু সন্ধের মুখে সায়েন্স সিটির উল্টোদিক থেকে বাসে, উরেব্বাপ, হয় আমি উঠবো, নয় আমার বই উঠবে! একবার তো বাসে উঠবো না পণ করে প্রায় পাঁচ-সাত কেজি বই পিঠে নিয়ে মিলন মেলা থেকে হেঁটে অভিষিক্তা চলে এলাম। সামান্য একটা বাসের উপর রাগ দেখানোর ফলে পরের দুদিন সর্ষের তেলের মতো টিউব-টিউব ভোলিনি মাখতে হলো সারা গায়ে। 
  
ইদানীং, সেন্ট্রাল পার্কে বইমেলা ঠাঁই পেয়েছে। বেশ লাগে আমার। বেরিয়েই টার্মিনাস। দুয়েকটা বাস ছেড়ে দিলে বসে, ধীরে-সুস্থে আসা যায়। 
  
কিন্তু কথা ওখানেই। আসতে আর মন চায় না মেলা থেকে। সুস্মিতা দি, সৌম্য দা, পল্লব দা'র সঙ্গে চা-পানির আড্ডা চলে, ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে। ঈশানী দি'র সঙ্গে এতদিনের ফেসবুক পেরিয়ে দেখা হয়, গল্প হয়, আসা-যাওয়ার পথের কথা হয়, কাঁটা ঘুরতে থাকে। যে মানুষটির লেখা 'তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি' পড়ে মনে হয়েছিল, ঈশ্বর মানুষ হলেই সবচেয়ে ভালো হয়, সেই সন্মাত্রানন্দ (শোভন দা) আমায় শুভেচ্ছা লিখে দেন আরেকটা বইতে, আলোচনা হতে থাকে সাহিত্য নিয়ে, মানুষ নিয়ে। শুভ দা'র হাজার ব্যস্ততার ফাঁকতালে উঠে আসে রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ, নানা বইপ্রকাশের ইতিহাস। ঐত্রেয়ী দি, সুমিতা দি'দের কাছে গেলেই নোনতা-মুখ, মিষ্টিমুখ চলছে, পাঠকদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। শিশির দা, তথাগত দা'র সঙ্গে মেলার নানা মোড়ে দেখা হয়ে যেতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা সরে যায়। বন্ধুরা আসে। চলে যায়। ফোন করে। ভাঙাচোরা সিগন্যালে কথা কেটে কেটে যায়। ৭ নং গেট? দে'জ এর  সামনে? ভাষানগরের কবিতাগাড়ির ডানদিকে? অনুষ্টুপ? মঙ্গল প্রকাশনী?! একটু চেনা জায়গায় এলে হয় না, পৃথিবীর কাছাকাছি? টয়লেটের সামনে?! মাইরি একটা জায়গা হলো এটা!! --- অনবরত লেগেই রয়েছে! 
   
এবার বই দেখতে বেরোলে টাকাপয়সা রাখছি না সঙ্গে বিশেষ। ওই একটিই উপায় নিজেকে আটকানোর বইয়ের স্তুপে চাপা পড়ে শহীদ হওয়া থেকে, সার বুঝেছি। সংযমের গাছ জন্মেছে আমার ভেতর। মেলায় এলোমেলো ঘুরি, স্টলে গিয়ে বই দেখি, বা বই দেখার ছলে দেখি, আর কে কে কী বই দেখছে। পছন্দ-অপছন্দের দাঁড়িপাল্লা কোনদিক থেকে কোনদিকে হেলছে। কাঁটা সরতে থাকে। সময় পালায়। দিন ফুরিয়ে আসে, ২৯ থেকে ৯ ... 
  
আগামীকাল বইমেলার দশমী। কাজ গোটানোর পালা সবার। অথচ তারই মধ্যে দেদার ভিড়ের সম্ভবনা। আকাশেরও বিদ্রূপ। কিন্তু আজকাল রগচটা, ভুরু-কুঁচকে থাকা উৎসবের এই শহরটায় শীতকালের শেষ পার্বণ শেষ হবে কাল। বইতে, লেখায় বেঁচে থাকি যারা, তাদের জন্য সারাবছর কলেজস্ট্রিট ঠিকই প্রাণবায়ু জুগিয়ে যাবে, কিন্তু এই বিশাল সমাবেশ, এই ভিড়ের মধ্যে একলা হওয়া আর একার মধ্যে অনেকের সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হবে আবার এক বছর। 
  
বেশ। তাইই হোক না হয়! আগামীকালটুকু তো এখনও হাতে আছে। আসুন সবাই। দেখা হোক! বৃষ্টি-মেঘ মাথায় নিয়ে শেষ একটা জমাটি আড্ডা হোক? শেষ এতদিন যাবৎ বইয়ের কথা বলে বলে আপনাদের বিরক্ত করে, এবার গড় করি, আপনারা আছেন বলেই বই লেখার ইচ্ছে, সাহস, সব। লিখি বলে এইটুকু বলার, বলতেই হয়। তাই শেষবারের মতো আপাতত, কালকে মেলার মাঠে থাকবে আবর্ত (ধানসিড়ি), অপরাজিতা (ঋত), কলকাতা ট্রিলজি (ঋতবাক); থাকবো আমরা সব্বাই। বইমেলার দশমী। বিসর্জনের সুরেও বেঁচে থাক শব্দেরা, অক্ষরেরা।
  
© শুভংকর

Comments